ব্যাক টু গডহেডের উদ্দেশ্য

0
69

প্রতিষ্ঠাতার প্রবচন

বোস্টন-২৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৯
ব্যাক টু গডহেডের উদ্দেশ্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি অভয়চরণারবিন্দ শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
প্রতিষ্ঠাতা আচার্য : আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)

কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন ৪টি ভিন্ন ভিন্ন স্তরের সমন্বয়ে ঘটিত। প্রথম স্তরটি হল পরমেশ^র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক কি তা হৃদয়ঙ্গম করা। কেননা এ মূহূর্তে বদ্ধ জীবাত্মা ভগবানের সাথে তার সম্পর্কের কথা ভুলে গেছে। প্রকৃতপক্ষে জীবের সাথে ভগবানের এ সম্পর্কটি নিত্য, কিন্তু মায়ার প্রভাবে, প্রত্যেকেই মনে করছে, “আমি এ জড় জগতের বিশেষ কিছু’ বেং এভাবে নিজেকে তার দেহের পরিপ্রেক্ষিতে চিহ্নিত করছে। অতএব, আমাদের কর্তব্য হল তারা যেটি নয় সেই মায়ামোহ অবস্থা হতে তাদেরকে জাগিয়ে তোলা। দেহগত এ ধারণাই হল আধুনিক জীবন ব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ ভুল। এই ভুলটি যে শুধু বর্তমান আধুনিক সভ্যতারই তা নয়, কেননা এই ভুলটি সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকেই হয়ে আসছে।
কখনোবা সেটি চরম পর্যায়ে আবার কখনোবা অপেক্ষাকৃত একটু কম পর্যায়ে থাকে। সত্যযুগেও এ ভুলটি ছিল, তবে সেটি কম পরিমাপে। কিন্তু এই কলিযুগে এ ভুলটি বৃহৎ পরিমাপে অবস্থান করছে।
    তারা যে ভাবছে “আমি এই শরীর এবং এই দেহের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।” এই প্রকার মায়ামোহ অবস্থা থেকে সদ্ধ জীবদেও জাগ্রত করাই আমাদের প্রথম কাজ। “আমি এই শরীর এবং এই শরীরের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই আমার।” এই প্রকার ধারণাটি মোহ। আমার সাথে একটি নির্দিষ্ট নারীর সম্পর্ক রয়েছে, তাই আমি মনে করি, “উনি হলেন আমার স্ত্রী; আমি তাকে ছাড়া থাকতে পারব না।” অথবা, অন্য একজন নারী, যার গর্ভে আমি জন্ম নিয়েছি; “তিনি হলেন আমার মা, তদ্রæপ আমার পিতা, তদ্রæপভাবে আমার পুত্র। এইভাবে আমি আমার দেশ, সমাজের কথা সর্বোচ্চ মানবসেবার তাগিদে চিন্তা করি।” কিন্তু এই জিনিসগুলো হল মোহ, কেননা সেগুলো দেহগত সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। শাস্ত্রমতে, যারা এই ধরনের মায়ামোহ অবস্থায় রয়েছেন তাদেরকে গরু এবং গর্দভের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
    তাই আমাদের প্রথম কর্তব্য হল সাধারণ লোকদেরকে জাগিয়ে তোলা। ‘ব্যাক টু গডহেড’ মূলত এই উদ্দেশ্যেই প্রকাশিত। আমরা ‘ব্যাক টু গডহেড’ সাধারণ লোকদের জন্য বের করছি এ জন্যেই যে, তারা যেন পূর্ণ আলোকিত হওয়ার পথে আসতে পারেন। তখন আবার সে সমস্ত মানুষেরা এগিয়ে আসবে, যারা ক্রমাগত আলোকিত হচ্ছে এবং তারা বলতে পারে, “স্বামীজি অনুগ্রহপূর্বক আমাকে আপনাদের সোসাইটির একজন সদস্য করুন। অনুগ্রহপূর্বক আমাকে দীক্ষিত করুন।” যখন কেউ এভাবে তার অবস্থান উপলব্ধি করে এগিয়ে আসবে, বুঝতে পবে তিনি দ্বিতীয় স্তওে উপনীত হয়েছেন। ভগবৎ প্রেম জাগ্রত করার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান, সেটি হল অন্য স্তর। তাই সম্বন্ধ, অভিধেয়…তারপর যখন কারো ভগবৎ প্রেম লাভ হয় তখন তিনি উপলব্ধি করতে পারেন আরো উচ্চতর স্তর রাধাকৃষ্ণের চিন্ময় প্রীতি বিনিময় ও বৃন্দাবনবাসীদের সম্পর্কে। তখন সেটি হল তৃতীয় স্তর এবং চতুর্থ স্তরটি হল পরমহংস স্তর, যেই স্তরে কেউ সর্বদা আনন্দ উপভোগ করছে।

প্রেমাঞ্জনচ্ছুরিতভক্তিবিলোচনেন
সন্তঃ সদৈব হৃদয়েষু বিলোকয়ন্তি।
য শ্যামসুন্দরমচিন্ত্যগুণস্বরূপং
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।।

প্রেমাঞ্জন দ্বারা রঞ্জিত ভক্তিচক্ষুবিশিষ্ট সাধুগণ যে অচিন্ত্যগুণবিশিষ্ট শ্যামসুন্দর-কৃষ্ণকে হৃদয়ে অবলোকন করেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজন করি। যখন কেউ সম্পূর্ণরূপে ভগবৎ প্রেমের সাগরে নিমজ্জিত হয়। তখন তিনি তসর্বাবস্থায় আনন্দ উপভোগ করেন, কেননা সেখানে কৃষ্ণ বর্তমান। ‘কৃষ্ণ বর্তমান” মানে, কৃষ্ণের নাম, রূপ, লীলাসহ সবকিছুই বর্তমান। কৃষ্ণ একা নন। যেই মাত্র আমরা বলি কৃষ্ণ, তখন নাম, রূপ, পরিকর, সমন্বিত হয়ে কৃষ্ণ বিরাজ করেন। তাই ‘ব্যাক টু গডহেড’ সাধারণত প্রথম দুটি বিষয় উপলব্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত; সম্পর্ক জাগিয়ে তোলা এবং লোকদেরকে প্রশিক্ষিত করা। অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য হল প্রীতি বিনিময়ের সর্বোচ্চ স্তরে জীবকে উপনীত করা কিন্তু প্রাথমিকভাবে আমরা সাধারণ লোকদের কাছেই এটি প্রচার করছি। তাই আমাদের প্রচেষ্টা হচ্ছে কিভাবে লোকেদেরকে দর্শন, বিজ্ঞান বা অন্য কোনভাবে বোঝানো যে, তারা একটি মায়ামোহ অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এ সমস্ত রাজনীতিবিদ. বিজ্ঞানী, দার্শনিক-তাদের এ উন্নত জ্ঞান নেই। তাদের লক্ষ্য গিয়ে পৌছেছে এমন পর্যায়ে, যদি তারা কিছু কল্যাণমূলক, মানবসেবামূলক কাজ করতে পারে এবং যোগীরা ধ্যানের মাধ্যমে আত্মতুষ্টি পাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কেউই ভগবান বা কৃষ্ণকে নিয়ে চিন্তা করছে না। কেউই না। এই হল জগতের অবস্থা। তাই এই যখন পরিস্থিতি তখন আমাদের প্রথম কর্তব্যটি হল লোকেদেরকে তাদের কলুষময় অবস্থা থেকে জাগিয়ে তোলা। এজন্যে আমাদেরকে তাদের ঐ অবস্থা থেকে বের করে আনতে হবে। এটাই ‘ব্যাক টু গডহেড’ এর পলিসি। এর সম্পাদকবৃন্দ কৃষ্ণবাবনামৃতের এই প্রধান বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চয়ই অবগত থাকবেন।
যে সমস্ত সম্পাদক রয়েছেন তাদের এই উপসংহারটি জানা থাকার কথা…
‘ব্যাক টু গডহেড’ একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি আমাদের এ আন্দোলন বিজ্ঞানসম্মত, ভগবৎ ভাবনাময় আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পায় তবে এই ‘ব্যাক টু গডহেড কে কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত শাস্ত্র হিসেবে প্রকাশ করতে হবে। অতএব আমাদেরকে কর্র্তৃপক্ষ অবাঞ্চিত কিছুই ‘ব্যাক টু গডহেড’ তুলে ধরা হবে না। এটিই আমাদের পলিসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here