দামোদর মাসের মহিমা

0
942

শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ: এখন দামোদর ব্রত মাস আমরা পালন করছি। একবার শ্রীল প্রভুপাদকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম এই মাসে সবকিছু এত বিশেষভাবে করার প্রয়োজনীয়তা আমাদের আছে কি না। তিনি বলেছিলেন, এই দামোদর মাসটি বিশেষভাবে নতুন ভক্ত এবং যারা এখন ভক্ত নয়, তাদের আকর্ষণ করার জন্য। কেননা যারা নিয়মিতভাবে ভক্ত তারা তো সকল মাসগুলোতেই ভগবানের সেবা করছেন আর তার সুফল লাভ করছেন।
আমি এই বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম যারা ভক্ত নয় তাদের এবং যারা নতুন ভক্ত তাদেরকে আমরা গত বহু বছর ধরেই এই দামোদর মাসের সুযোগ দান করার চেষ্টা করে আসছি। এইভাবে আমরা আমাদের জন্য অনেক ধরনের আশীর্বাদও লাভ করতে পারি। অবশ্যই আমি মায়াপুর ধামে বাস করা একজন সন্ন্যাসী এবং দামোদর মাসে বৃন্দাবনে থাকার কল্যাণও আমি প্রাপ্ত হয়ে থাকি। কিন্তু অন্যান্যদের এই একই সুযোগ নাও থাকতে পারে। তাই আমরা তাদেরকে দামোদর অষ্টকম্ কীর্তন করার সুযোগ প্রদান করছি। আপনি যদি অন্যান্য আচার অনুষ্ঠান পালন নাও করেন, এইভাবে তাহলে যে কেউই কৃষ্ণকে আকর্ষণ করতে পারেন। কেবলমাত্র দামোদরের কাছে প্রদীপ নিবেদন দ্বারা আমরা মানুষকে ভগবানের কৃপা লাভের সুযোগ প্রদান করছি।
পদ্মপুরাণে বর্ণনা করা হয়েছে, ভগবানের প্রীতিসাধনের নিমিত্ত যেকোনো কার্যই অন্যান্য সাধারণ দনগুলির চেয়ে এই দামোদর মাসে শতগুণে মঙ্গল প্রদান করে। ভগবান দামোদরকে সন্তুষ্ট করার জন্য নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে তার কৃপা লাভের কোন তুলনা চলে না। ভগবান দামোদর অপরাজেয়। কিন্তু তিনি পরাজিত হয়েছিলেন তাঁর মাতার প্রেমের দ্বারা। এই বার্তাটিই দামোদর মাস স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে মা যশোদা দামোদরকে তাঁর সন্তান ভেবে বাঁধতে চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি বুঝতে পারেন নি দামোদর হচ্ছেন অসীম, পরমেশ্বর ভগবান। আর তাই তিনি তাঁকে বার বার বাঁধতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই দড়িটি দু’আঙ্গুল ছোট হয়ে যাচ্ছিল। এই দুটি আঙ্গুলের অর্থ কি? একটি হল শুদ্ধভক্তের আকাঙ্খা এবং দ্বিতীয়টি হল পরমেশ্বর ভগবানের অহৈতুকী কৃপা। মা যশোদার বাসনাটি ছিল শুদ্ধ আর কৃষ্ণ যখন সম্মত হলেন তখন তিনি বাঁধা পড়লেন। কৃষ্ণের সম্মতি বিনা কেউই তাঁকে বাঁধতে পারে না।
সুতরাং তিনি তার মায়ের প্রেমের দ্বারা বিজিত হয়েছিলেন। দামোদর মাসে এই বার্তাটিই আমরা লাভ করি। সুতরাং সাধারণ মানুষের কাছেও ভগবানের কৃপা লাভের এটি একটি সুযোগ। দামোদর মাসের গুরুত্বের কথা হরিভক্তি বিলাস, ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ও আরও নানা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ কিছুই আপনাকে করতে হবে না। ভগবানের কাছে দীপ নিবেদন করুন, ভগবানের কাছে আপনার প্রার্থনা নিবেদন করুন, তাহলেই হবে।
এই সমস্ত সাধারণ জিনিষগুলিই আমরা করে থাকি। দামোদর ব্রতের কথা এমনভাবে আমরা প্রচার করছি যে, ঘরে ঘরে ভগবান দামোদরের ছবি প্রদান করছি এবং মানুষ তাদের গৃহে দামোদর মাসের সময়ে দামোদরের ছবির সামনে আরতি নিবেদন করছে। ভগবান দামোদরের কাছে কোন প্রার্থনা করার কথাও আমরা তাদের বরছি।
তারা হয়ত বুঝতে পারছে না, কিন্তু এইভাবে সাধারণ মানুষ ভগবানের অসীম কৃপা লাভ করছে। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলেছেন যাঁরা মানুষকে তাঁর ভক্তিপূর্ণ সেবায় নিয়োজিত করার জন্য যুক্ত রয়েছেন, সমস্ত ভক্তদের মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয়।
তাই এইভাবে দামোদর মাসে মানুষকে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত করে আমরা কৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠছি। আমার মনে আছে, একবার পাশ্চাত্যের ইকুয়েডর দেশের গুয়াকুইল শহরের ‘সিটি হল’ নামক সভাগৃহে আমরা প্রায় তিন/চারশত মানুষ একটি কৃষ্ণভাবনামৃত অনুষ্ঠানে সমবেত হয়েছিলাম। তখনও ছিল দামোদর মাস।
তাই সেখানে ভগবান দামোদরের একটি ছবি, সামনে এক থালা ভর্তি বালি ছিল আর সেখানে ছিল অনেক মোমবাতি। আমরা যেহেতু সেখানে ঘিয়ের বা তিল তেলের প্রদীপ জ্বালাতে অপারগ ছিলাম, তাই আমরা মোমবাতি জ্বালিয়েছিলাম।
আমরা যখন সমবেত মানুষকে ভগবান দামোদরের কাছে তাদের দীপ নিবেদন করতে বললাম, তাদের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না ঠিক কিভাবে ভগবান দামোদরের কাছে আরতি নিবেদন করতে হয় কিন্তু তবুও তারা উৎসাহের সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল এবং একে একে দামোদরের কাছে দীপ নিবেদন করেছিল।
এই সেবাটি করে তাঁরা অত্যন্ত আশীর্বাদধন্য বলে নিজেদের মনে করেছিল। তাই আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে যে এই সেবা ঠিক কিভাবে অংশগ্রহণকারীকে পরম আনন্দ দান করে। মায়াপুরেও ভক্ত ছাড়াও, দর্শনার্থীদের সবাইকে দীপ দান করার জন্য অনুরোধ করা হয় এবং এই বিশেষ মাসটিতে সহস্র সহস্র দর্শনার্থীর ভীড় হয়। তাঁরা সকলেই রাধারাণী ও মা যশোদা ও দামোদরে ছবিতে এবং বিভিন্ন বিগ্রহ সমূহের কাছে ঘিয়ের সলতের দীপ এই মাসে বিশেষভাবে নিবেদন করে থাকেন।
তাই মানুষকে ভক্তিসেবায় যুক্ত করার জন্য এমনভাবে আচরণ করা উচিত যাতে তারা যেন কখনও কৃষ্ণকে ভুলে না যায় এবং কৃষ্ণও যেন কখনও তাদেরকে ভুলে না যান। তাই আমি আশা করব ভক্তগণ এই সেবাটি অত্যন্ত উৎসাহের সাথে গ্রহণ করবে। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর ইস্‌কন মন্দিরে আমাদের শ্রীউত্তম চৈতন্য দাস ধীরে ধীরে সেখানে এই অনুষ্ঠানটি প্রধানভাবে গড়ে তুলেছিল।
দামোদর মাসটি যে কতখানি চমৎকার সে বিষয়ে বিভিন্ন শাস্ত্র থেকে সে বিভিন্ন উদ্ধৃতি সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু আমাদের কাছে এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে সে সহসা ভগবদ্ধামে ফিরে গেছে। এখন আমরা আশা করব যে দামোদর মাসের প্রতি তার নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মধারাকে স্মরণ করে আমরা আরও বৃহৎ এবং আরো বর্ণাঢ্য মহিমার মধ্য দিয়ে আরো নতুন নতুন চিন্তার মধ্য দিয়ে প্রতি বৎসর এই দামোদর মাসে সাধারণ মানুষকে কৃষ্ণ সেবায় নিয়োজিত করব।
দামোদর মাসে যারা এই ব্রত বা সেবায় যুক্ত থাকে আমরা যদি তাদের সকলের সঙ্গে যোগাযোগ বা সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি, তাহলে তাদেরকে আমাদের সঙ্গবদ্ধ প্রচারের অংশ করে তুলতে ও সামগ্রিকভাবে সবকিছু পরিচালনা করতে দামোদর ব্রতের ব্যাপারটি আরো সহজ হবে। অতএব দেখা যায় যে এইভাবে পবিত্র দামোদর মাসের কার্যাবলীসমূহ অত্যন্ত সহজ, বিনম্র ও অত্যন্ত কার্যকরী। তাই আশা করা যায় যে প্রত্যেকেই এই দামোদর মাসকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে। হরেকৃষ্ণ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here