জগন্নাথ দর্শনে শ্রীল পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ঠাকুর।

0
464

 

একদিন পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি পুরীধামে এলেন। তাঁর  প্রিয় সখা ছিল স্বরূপ-দামোদর। দুজনেই নিয়মিত জগন্নাথ দর্শনে যেতেন। এমন সময় শ্রীক্ষেত্রে ওড়ন ষষ্ঠী যাত্রা আরম্ভ হল। জগন্নাথ নববস্ত্র ধারণ করলেন। ভগবানের নববস্ত্র হল মান্ডুয়া (মাড় দেওয়া) বস্ত্র। মান্ডুয়া বস্ত্র অশুদ্ধ হলেও ভগবানের ইচ্ছানুযায়ী তাঁর সেবকগণ ‘জগন্নাথ দেবকে’ এ বস্ত্র পরান। সেদিন নব মান্ডুয়া বস্ত্র ধারণ উৎসবটি খুব জাঁকজমকের সঙ্গে চলছিল। রাত পর্যন্ত চৈতন্য মহাপ্রভু এ যাত্রা-কৌতুক, আনন্দ চিত্তে দর্শন করলেন। তারপর ভক্তসঙ্গে নিজস্থান বিজয় করলেন। এমন সময় বিদ্যানিধি ও স্বরূপ-দামোদর ধামবাসী ভক্ত ও মান্ডুয়া বস্ত্র সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলছিলেন। বিদ্যানিধি বললেন ঈশ্বর স্বতন্ত্র। যা ইচ্ছা তিনি তাই করতে পারেন। কিন্তু এই ধামবাসী সেবক-পান্ডাগণ সে অপবিত্র মান্ডুয়া বস্ত্র ধারণ করল কেন? মান্ডুয়া বস্ত্র এত অপবিত্র যে স্পর্শ করলেও হাত ধুতে হয়। এসব কথা বলতে বলতে দুইজন বাড়ি ফিরলেন ও রাত্রিতে শয়ন করলেন। তখন পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ঠাকুর স্বপ্নে দেখলেন
স্বয়ং শ্রী জগন্নাথ ও শ্রী বলরাম দুইজনেই ক্রোধে অধীর হয়ে বিদ্যানিধির দুই গালে চড় লাগিয়ে বলতে লাগলেন – ‘আমার এবং আমার ধামে
বাস করা সেবকের জাতি-গোত্রের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; তাই না! তো, তুমি যদি সবই জানো তাহলে তুমি এই নিচু জাতির স্থানে আছ
কেন? যাও, তুমি তোমার উঁচু ভবনে চলে যাও। আমি আমার ধামবাসী ভক্তদের নিয়ে যে যাত্রার আয়োজন করেছি, তাতেও তোমার ভাব-অনাচার খুঁজতে হচ্ছে?’ এবার বিদ্যানিধি মহাশয় ক্রন্দন করতে করতে জগন্নাথের শ্রীচরণে মাথা রেখে বলতে লাগলেন – হে প্রাণনাথ! তোমার ধাম এবং ধামবাসীদের চরণে যেমন অপরাধ করেছিলাম, তেমন শাস্তিও পেলাম। তবে, আজ আমার পরম শুভদিন; যে তোমার শ্রীহস্ত আমার অঙ্গে  স্পর্শ হল। পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি সকালে গাত্রোস্থান করে দেখলেন শ্রীজগন্নাথ ও শ্রী বলদেবের হস্তাঘাতে তাঁর মুখ ফুলে গেছে। এখন   স্বরূপ-দামোদর সে স্থানে উপস্থিত হয়ে সমস্ত কিছু বিস্তারিত জেনে ও পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির মুখ ফোলা দেখে বললেন – জয় হোক, পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির জয় হোক। আজন্ম কোনদিন শুনিনি ভগবান এসে কাউকে নিজ হাতে শাস্তি দিয়েছেন। তোমার মত ত্রিলোকে কে আছে? জগন্নাথ যেমন তোমাকে কৃপা করলেন এবং তোমার মাধ্যমে জগৎকে শিক্ষা দিলেনঃ ভগবান, ভগবানের ধাম এবং সেইসমস্ত ধামে বাস করা ভক্ত  সকলেই ভগবানের হৃদয়ের জন। তাঁদের আঘাত করে কোন কথা বললে সেই কথা সরাসরি ভগবানকে আঘাত দেয়। এই শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে স্বয়ং জগন্নাথ-কর্মী ও জড় বুদ্ধিসম্পন্ন ভেকধারী সাধু ও স্মার্তদের ভগবানের ধামে বসবাসকারী সেবকদের আচরণের নিন্দা করার দুর্বুদ্ধির নিরসন করেছেন। পরবর্তীতে পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি রথযাত্রাদি মহোৎসবে স্বরূপ দামোদর সহ গৌর পার্ষদদের নিয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তভাব সুরক্ষা ও বর্ধন করতেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নীলাচলে ফিরে যাওয়ার পরে বাসুদেব ও মুকুন্দ দত্ত ঠাকুর নবদ্বীপে কুমার হট্টের নিকটে কাঞ্চন পল্লীতে (কাঁচড়া পাড়া) শ্রীপাঠ করিয়া ভজন করতেন। মুকুন্দ দত্ত কলির ব্যাসাবতার শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের শ্রীপাঠ মামগাছিতে ‘মদন
গোপালের’ সেবা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মোটের উপর মহাপ্রভুর সন্ন্যাস লীলার পর প্রতি বৎসর রথযাত্রার পূর্বে বঙ্গদেশ থেকে বাসুদেব ও মুকুন্দ দত্ত সহ চৈতন্যের নিজ জনেরা বিভিন্ন ভ্যাট নিয়ে পদব্রজে প্রতি বৎসর জগন্নাথ পুরীতে যেতেন এবং মহাপ্রভুর প্রতি আত্মনুরাগ প্রাণে  বৈষ্ণবেরা প্রথমে জগন্নাথ দর্শন না করে উদ্বিগ্ন চিত্তে মহাপ্রভুকে দর্শন করতে ছুটে যেতেন। মহাপ্রভু যতকাল শ্রীক্ষেত্রে ছিলেন তাঁরাও মহাপ্রভুর সঙ্গে কীর্তনীয়া হিসেবে ছিলেন। মহাপ্রভুর লীলায় সহায়ক হয়ে চট্টগ্রামের বৈষ্ণবগণ যেই মহৎ কাজ সম্পাদন করেছেন তা শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহাপ্রভু বিবিধ লীলা বিস্তার করে এবং কলিযুগ প্লাবনী যুগধর্ম হরিনাম প্রতিষ্ঠা পূর্বক ভক্তগণ সঙ্গে নৃত্য ও কীর্তনে ‘শ্রী জগন্নাথ মন্দিরে’, ‘টোটা-গোপীনাথের উরুতে’, ‘দধি মহাসমুদ্রে’ নন্দ যশোদার আহ্বানে একই সাথে তিন স্থানে যুগপৎ লীলা সংবরণ করেন। মহাপ্রভুর লীল আপ্রকটের পর তাঁর বিরহ সহ্য করতে না পেরে ‘শ্রীল পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি’ জগন্নাথ পুরীতে ‘দধি মহাসমুদ্র তটে’ (যা বর্তমান উড়িষ্যার বঙ্গোপসাগর) তীরে শ্রী গোলক-বৃন্দাবনের নিত্য প্রবাহমান পূর্বলীলায় যুক্ত হবার মানসে লীন হয়ে যান।

                                                                                                         জয় জগন্নাথ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here