ওহ্ মাই গড্! (OMG)

0
66

বলিউডের এক আলােচিত মুভিকে ঘিরে নানা প্রশ্নের পুনঃ উত্তর

চৈতন্য চরণ দাস

মধ্যবিত্ত পরিবারের কাঞ্জিভাই একজন আপাদমস্তক নাস্তিক। রীতিমত সবার ভগবান বা ধর্মীয় আচরণবিধির বিরুদ্ধে সরব। একদিন ভূমিকম্পে তার একমাত্র সম্বল দোকানটি ভেঙে যায়। এতে তিনি চরম হতাশ হন। হঠাৎ আশার আলােক দেখেন দোকানের নামে করা ইস্যুরেন্সে। কিন্তু তাতেও বিপত্তি বাধে, কেননা Act of God অর্থাৎ, ভগবান কর্তৃক সংঘটিত কার্যের ক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কোনাে অর্থ দিতে অপারগ। এটি সেই ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শর্ত ছিল। পরে কাঞ্জিভাই শেষ পর্যন্ত ভগবানের বিরুদ্ধে মামলা করেন, আর তার বিরুদ্ধে প্রতিনিধিত্ব করেন বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা। এ নিয়ে তিনি আদালত ও মিডিয়ার টক শােতে ধর্ম বা ভগবান নিয়ে অনেক সমালােচনা, প্রশ্ন ও মতামত উপস্থাপন করেন। রীতিমত বিভিন্ন মন্দির ও তথাকথিত ধর্মীয় নেতাদেরকে তিনি একরকম হেনস্থা করেন। একসময় কৃষ্ণ সাধারণ মানুষ রূপে এসে তাকে সহায়তা করেন। অবশেষে কাঞ্জিভাইও কৃষ্ণের সহায়তায় নাস্তিক থেকে আস্তিকে পরিণত হন। এটি বলিউডে তৈরি আলােচিত ও সমালােচিত ওহ্ মাই গড় বা সংক্ষেপে OMG মুভির পটভূমি। কিন্তু জনসাধারণ মুভিটি দেখে রীতিমত বিভ্রান্ত। এ বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য সমাজের কল্যাণার্থে ব্যাক টু গডহেড একটি প্রতিবেদন প্রকাশের গুরুত্ব অনুধাবন করে। সৌভাগ্যবশত চৈতন্য চরণ দাস এ নিয়ে একটি গ্রন্থও প্রকাশ করে। এখানে যৌথভাবে সে গ্রন্থ ও চৈতন্য চরণ দাসের প্রবচন থেকে নিম্নের প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হল।

চৈতন্য চরণ দাস : প্রায় ১৫ বছর পর আমি প্রথম কোনাে একটি মুভি দেখলাম যার নাম ওহ্ মাই গড্’! পুনের সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করার পর একটি মাল্টিন্যাশনাল সফটওয়্যার কোম্পানিতে যােগ দিই। পরবর্তীতে আমি যে কোনাে ভাবে হােক উপলব্ধি করছিলাম যে, সমাজকে সেবা করার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থাটি হল পারমার্থিক জ্ঞান অনুশীলন এবং তা বিতরণ করা। এজন্যে এই সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে ১৯৯৮ সালে ব্রহ্মচর্য আশ্রম গ্রহণ করি। তখন থেকে পারমার্থিক জ্ঞান অনুশীলন, অধ্যয়ন এবং লেখালেখির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়াতে মুভি দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।

তবুও মুভি জগতের সাথে সংস্পর্শ ছিল অন্যভাবে। কেননা ভারতে বিভিন্ন সময় সাধারণ লােকেদের মুভি সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে হয়। পারমার্থিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত এরকম অনেক মুভি তাদের মনে বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দেয়। যেমন-‘ওম্ শান্তি ওম্’ মুভিতে নায়ক নায়িকার পুনর্জন্ম তুলে ধরা হয়। এ নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল । কিন্তু ‘ওহ্ মাই গড্’ মুভি সম্পর্কে লােকেরা পূর্বের চেয়েও অনেক বেশী প্রশ্ন করতে থাকে। পরে উক্ত মুভির উপর ভিত্তি করে কাঞ্জি ভাইয়ের বিভিন্ন প্রশ্নের অডিও উত্তরও প্রদান করি এবং একটি প্রবন্ধও লিখি। কিন্তু আমার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী পরামর্শ দিলেন, যেহেতু মুভিটি অনেক বিতর্কিত প্রশ্নের উদ্রেক করে, সেহেতু ঐসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে একটি গ্রন্থ বের করলে সবাই উপকৃত হতাে। আর তাই OMG সম্পর্কে আরাে ভালােভাবে জানার জন্য মুভিটি দেখতে আমি বাধ্য হই।

এভাবে ১৫ বছর পর বলিউডের কোনাে মুভি আমি দেখি। অবশ্য কিছু লােক আমাকে পূর্বে সাবধান করেন যে, OMG তে ভগবানের নিন্দা করা হয়েছে, কিন্তু আমি সেটিকে ওভাবে দেখিনি। OMG তে প্রদর্শিত অনেক যুক্তিতর্ক ছিল সুনির্দিষ্টভাবেই যৌক্তিক। কিছু যুক্তি এমনকি খুবই চমৎকার ছিল। যখন অক্ষয় কুমার কৃষ্ণের ভূমিকায় বলেন, “মে ভগবান হু ইসলিয়ে চমৎকার করতা হু, না কি মে চমৎকার করতা হু ইসলিয়ে ভগবান হু। তিনি ভগবানের পরিচিতি এবং তার সুন্দর অলৌকিক লীলার মধ্যে সম্পর্কসূচক বিবৃতি দেন।

আমি OMG এর যুক্তি শুধু গ্রহণই করিনি, বরং কাঞ্জি ভাইয়ের উৎসাহ এবং ক্রোধের যৌক্তিক কারণও উপলব্ধি করেছি। আমার মনে পড়ে যখন আমি কিশাের ছিলাম তখন পরীক্ষায় ভাল করার জন্য গণেশ পূজা করেছিলাম। যখন ফলাফল প্রত্যাশা মত আসেনি, আমি ক্রোধে গণেশের একটি ছবি ছিড়ে ফেলেছিলাম। আমার মা আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন পূজা করার জন্য। তিনি তখন কিছুই বলতে পারলেন না। তবুও তিনি আমার ক্রোধকে থামিয়েছিলেন। এরপর থেকে আমিও নাস্তিক হয়ে যাই। যখন কাঞ্জিভাই তার দোকান ভেঙে যাওয়াতে ক্রোধান্বিত হলেন, তখন যেন আমার কৈশােরের সেই ঘটনাটির প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলাম।

অথচ, সেই আমিই এখন ব্রহ্মচর্য আশ্রম গ্রহণ করে ভগবানের বাণী প্রচারের প্রচেষ্টা করছি। আমার এ পরিবর্তনের মূল কারণ ছিল যথাযথ শিক্ষা। বছরের পর বছর ধরে যে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমি পূর্বে পাইনি সেগুলাের উত্তর পেয়েছিলাম। যা ছিল অত্যন্ত সন্তুষ্টিদায়ক। এজন্যে আমি এই বৈদিক জ্ঞান অধ্যয়ন ও বিতরণের সেবায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করি।

শিক্ষার দুটি মূল অংশ রয়েছে: একটি যা জানি না, তা জানা এবং দ্বিতীয়টি কি জানি না তা জানা। মুভিটিতে মূলত প্রথম অংশটিই আলােকপাত করা হয়েছে। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যা প্রদর্শন করে যে, ধর্ম সম্পর্কে মানুষ কত অজ্ঞ। এ প্রতিবেদনে সে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার দ্বিতীয় অংশটিকেই মূলত এখানে আলােকপাত করা হয়েছে।

OMG তে শুধু প্রশ্নই তুলে ধরা হয়নি বরং এর উত্তরও দাবি করা হয়েছে। এর কিছু উত্তর কাঞ্জিভাই তার টিভি টক শােতে দিয়েছেনও। কিন্তু তার সেই উত্তরসমূহ বরং জোরালােভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এজন্যে এ প্রতিবেদনটি মূলত তৈরি করা হয়েছে। সে সমস্ত প্রশ্নের পুনঃউত্তর প্রদানের মাধ্যমে।

মুভিটিতে Act of God বা ভগবান কর্তৃক সংঘটিত ভূমিকম্প নিয়ে যেটি উপস্থাপন করা হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েই প্রতিবেদনটি শুরু করা হল।

ভূমিকম্প কি ভগবান কর্তৃক সংঘটিত কার্য?

এটি কি সঠিক, যে সমস্ত কার্য মানুষের নিয়ন্ত্রণের অতীত সেগুলাে ভগবান কর্তৃক সংঘটিত? যদি তাই হয়, তবে কেন শুধুমাত্র খারাপ কার্যগুলাে? কেন ভাল কার্যগুলাে নয়? ভূমিকম্প হওয়া এবং না হওয়া দুটোই মানুষের নিয়ন্ত্রণের উর্ধ্বে। তাই কোন কিছু মানুষের নিয়ন্ত্রণের উর্ধ্বে হলে সেটি যদি ভগবান করেছেন বলে দাবি করা হয়, তবে অন্যান্য বিষয়গুলােও তিনি করছেন বলে দাবি করা উচিত। অর্থাৎ কোনাে স্থানে যদি ভূকম্পন না হয় তার জন্য কি ভগবানের কাছে আমরা ঋণী নই? একবার কাঞ্জি ভাইয়ের দোকান ভূকম্পনে ক্ষতিগ্রস্ত হলে যদি ভগবানকে তার মূল্য পরিশােধ করার জন্য বলা হয়, তবে এতদিন ধরে যে কাঞ্জি ভাইয়ের দোকান কোন ক্ষতিগ্রস্থ হয় নি তার জন্য কি কাঞ্জি ভাইয়ের উচিত নয় ভগবানকে এর মূল্য পরিশােধ করা?

ভূমিকম্পের কারণই বা কি?

আমাদের পূর্বকৃত কর্মসমূহের ফল প্রকৃতি প্রদান করেন বলেই ভূমিকম্পের মত এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাধিত হয়। ভগবদ্গীতার ৯/২৯ শ্লোকে বলা হয়েছে, ভগবান সকলের প্রতি সমভাবাপন্ন, শুধুমাত্র জীব নিজ নিজ কর্মফল ভােগ করছে মাত্র।

যখন একজন ব্যক্তি বৈদ্যুতিক তার স্পর্শ করে তবে, তিনি বৈদ্যুতিক শক্ প্রাপ্ত হন। তার এ অবস্থার জন্য আমরা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বাের্ডকে দায়ী করতে পারি না, যদিও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বাের্ড বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে, তবুও দুর্ঘটনার জন্য ব্যক্তিটি নিজেই দায়ী। কেননা তিনি তারটি স্পর্শ করেছেন।

তদ্রুপ, যখন আমরা কোন খারাপ কার্য করি তখন এর প্রতিক্রিয়া আমাদেরকে প্রাপ্ত হতে হয়। এজন্যে আমরা বলি বিশ্বজনীন ভগবানই এর জন্য দায়ী, যদিও তার সরবরাহকৃত শক্তির প্রভাবে ভূকস্পনটি সাধিত হয়েছে। আমরা দায়ী আমাদের কৃত দুষ্কর্মের জন্যই এবং সে সমস্ত কর্মের ফলাফল যথাসময়ে ভােগ হয়। কোনটা খুব দ্রুত অথবা কোনটা ধীরে প্রাপ্ত হয়।

কাঞ্জি ভাই আদালতে একেবারে শেষ পর্যায়ে ভগবদগীতার ৯/৮নং শ্লোকের উদ্ধৃতি দেন যে, ভগবান হলেন ধ্বংসকর্তা এবং এভাবে ভূমিকম্পকে Act of God হিসেবে প্রমাণ করেন।

শ্লোকটিতে শুধু ধ্বংসের কথাই বলা হয়নি, সৃষ্টির কথাও বলা হয়েছে। সুবিধামত একটি অংশ উপস্থাপন করে শ্লোকটির অর্থটিকে অবমাননা করা মােটেই উচিত নয়। তাছাড়া ভগবান বলেন নি ‘ভগবান ধ্বংসকর্তা। এখানে বলা হয়েছে। “ধ্বংসযজ্ঞ আমার ইচ্ছাতেই হয়। দুটি বাক্যের মধ্যে একটি বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এর পরবর্তী শ্লোকে (৯/৯) বলা হয়েছে, “হে ধনঞ্জয়! সেই সমস্ত কর্ম আমাকে আবদ্ধ করতে পারে না। আমি সেই সমস্ত কর্মে অনাসক্ত ও উদাসীনের ন্যায় অবস্থিত থাকি।”

এই শ্লোকে স্পষ্টতই ভগবান ব্যক্ত করেছেন, তিনি নিরপেক্ষ। কাঞ্জিভাই এর সংশ্লিষ্ট শ্লোকটির বিবৃতি দেন যা সম্পূর্ণ বিতর্কিত। জীবের কর্মফল অনুসারে নিরপেক্ষভাবে প্রকৃতি তার কার্য সম্পন্ন করেন। তাই ভূমিকম্পের জন্য ভগবানকে দায়ী করাটা নিতান্তই অবাঞ্চনীয়। গীতার ব্যাখ্যা এজন্যে খুব সতর্কতা সহকারে অনুধাবন করতে হয়।

নাস্তিক কাঞ্জি ভাইকে ভগবান সহায়তা করেন, অথচ ভগবানে বিশ্বাসীদের পাশে তিনি দাঁড়াননি! তবে কি ভগবান নাস্তিকদের সহায়তা করেন? আর যারা ভগবানে বিশ্বাসী তাদের প্রতি বিরুদ্ধাচরণ করেন, যেটি `ওহ্ মাই গড্’ মুভিতে প্রদর্শিত হয়েছে?

ভগবান সবাইকে সহায়তা করেন, কিন্তু তিনি কাউকে জোড়পূর্বক সহায়তা করেন না। তিনি আমাদের ক্ষুদ্র স্বাধীন ইচ্ছার বিরুদ্ধ হন না। যেই মাত্রায় আমরা সাহায্য অনুসন্ধান বা গ্রহণ করতে আগ্রহী হই তার উপর ভিত্তি করে তিনি আমাদের সহায়তা করেন।
ভগবদ্গীতার ৪/১১ নং শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, আমি তাদের সেইভাবে পুরস্কৃত করি।

লীলাধর স্বামী ও সিদ্ধেশ্বর মহারাজ যারা তথাকথিত শোষক শ্রেণির ধমীয় ব্যক্তির ভূমিকা পালন করে।

ভগবান এটি কিভাবে করেন। বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারি OMGতে প্রদর্শিত ভগবানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনকারী তিন শ্রেণির লােকের ভিন্ন ভিন্ন কার্যকলাপ থেকে। সেই তিন শ্রেণির লােকেরা হলেন :

১। আবেগ নির্ভর ব্যক্তি :

ওহ্ মাই গড্ মুভিতে প্রদর্শিত এ রকম ব্যক্তিরা হলেন, কাঞ্জি ভাইয়ের স্ত্রী সুশিলা, তার প্রতিবেশী মহাদেব এবং অন্য সাধারণ লােকেরা। এই বিভাগে সাধারণত সমাজের অধিকাংশ ধর্মীয় বিশ্বাসীরাই অন্তর্ভুক্ত থাকেন, তাদের ভগবানের প্রতি সামান্যই বিশ্বাস রয়েছে, কিন্তু তারা ভগবান সম্পর্কে একনিষ্ঠভাবে জানার প্রয়াসের জন্য নিজেদের বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করেন না। ভগবান সমস্ত মানব জাতিকে জ্ঞানের আলাে দান করতে প্রদান করেছেন বিবিধ শাস্ত্র, কিন্তু এই ধরনের ব্যক্তিদের কাছে শাস্ত্র সম্পর্কে খুব কমই আগ্রহ রয়েছে। শাস্ত্রের উপর তাদের জ্ঞান বেশ সীমিত ও অনেকটা ভ্রান্ত হয়, কেননা তারা গুরুত্বের সহিত বা একনিষ্ঠভাবে শাস্ত্র অধ্যয়ন করে না, আর এজন্য তারা ভগবানের আরাধনার যথাযথ পন্থা সম্পর্কে অবগত নয়। তাই বংশগতভাবে কিংবা তথাকথিত সংস্কৃতি অনুসারে যে ধর্মীয় অনুশীলনই বিরাজ করুক তারা তা অবলীলায় প্রায় অন্ধভাবেই গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে সেটি যদি ইন্দ্রিয় তৃপ্তিমূলক বা তাদের মনােপুত হয় এবং প্রয়ােজনের সঙ্গে খাপ খায় তা তখন অধিক গুরুত্ব বহন করে। কেননা তাদের তথাকথিত ধর্মীয় অনুশীলন সম্পূর্ণ আবেগ নির্ভর, বুদ্ধিমত্তার নির্ভর নয় বা শাস্ত্রভিত্তিক নয়। তারা বিশেষত অনুভূতিপ্রবণ হয় এবং এজন্য তথাকথিত ধর্মীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে সহজে প্রতারিত হওয়ার সুযােগ থাকে।

২। শােষক শ্রেণির ধর্মীয় ব্যক্তি

ওহ্ মাই গড্ মুভিতে প্রদর্শিত এমন ব্যক্তিরা হলেন লীলাধর স্বামী, সিদ্ধেশ্বর মহারাজ এবং গােপী মায়া। তারা জড় সুবিধাভােগী এবং আবেগ নির্ভর বিশ্বাসীদের আবেগকে আশ্রয় করে অর্থ আত্মসাৎ করে এবং জাগতিক সম্মান লাভ করে। তারা ভগবান সম্পর্কে কথা বলে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভগবান সম্পর্কে তাদের নিজেদেরই কোনাে আগ্রহ নেই। তাদের জন্য ভগবান হচ্ছেন সব ধরনের প্রয়ােজন সরবরাহকারী। যেহেতু তারা ভগবানের সহায়তা চান না, তাই ভগবানও তাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করেন না। কিন্তু তারা প্রায়ই ভগবানকে এবং তার শিক্ষাকে ভুলভাবে প্রদর্শন করেন এবং যাদের ভগবানের প্রতি বিশ্বাস রয়েছে তাদেরকে ভুলভাবে পরিচালনা করেন। ভগবান তাদের এই খারাপ কর্মের ফলাফল যথাসময়ে প্রদান করে থাকেন।

৩) বুদ্ধিমান অবিশ্বাসী :

OMG তে এ প্রকার ব্যক্তি হলেন কাঞ্জি ভাই। ভগবান তাদেরকেই গ্রহণ করেন যারা তাদের বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করেন এবং এমনকি তারা সাময়িকভাবে ভগবানে অবিশ্বাসী হলেও। যদিও ভগবান তাদেরকে বুদ্ধিমত্তা প্রদান করেছেন এবং তিনি চান না যে সেই বুদ্ধিমত্তা শুধু অকেজো হয়ে পড়ে থাক বরং তিনি তার সদ্ব্যবহার চান। তাদের বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যদি জীবন সম্পর্কে কোনাে প্রশ্ন থাকে তবে তাদের অধিকার রয়েছে সে সমস্ত প্রশ্নগুলাে উত্তর জিজ্ঞেস করা। কিন্তু যখন তারা এর উত্তরগুলাে পায় না তখন তারা মনে করে প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয় হবে একেবারে নাস্তিক হয়ে থাকাটাই।

প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকের প্রশ্নের উত্তর প্রদানের জন্য ভগবান শাস্ত্র প্রদান করেছেন এবং তিনি এ ধরনের অনুসন্ধিৎসুতা সমর্থন করেন, যেটি তিনি শ্রীমদ্ভগবদগীতায় প্রদর্শন করেছেন। তিনি অর্জুনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেছিলেন। বৈদিক সাহিত্যে এ ধরনের প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে ভগবানকে জানা সম্বন্ধে আরাে অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। এমনকি বেদান্ত সূত্রে (১.১.১ অথাতাে ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা) সমগ্র মানব জাতির কাছে সনির্বন্ধ অনুরােধ জানানাে হয়েছে পারমার্থিক অনুসন্ধিৎসু হওয়ার জন্য।

যদি ঐ সমস্ত বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা হৃদয় খুলে আন্তরিকতার সহিত তাদের প্রশ্নের অনুসন্ধান করেন, তখন ভগবান তাদের সহায়তা করেন। তিনি তাঁর প্রেরিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে পারেন এবং এভাবে তারা একসময় বুদ্ধিমান বিশ্বাসীতে পরিণত হয় ।

ওহ্ মাই গড্ মুভিতে এভাবে কাঞ্জি ভাই ধীরে ধীরে বুদ্ধিমান অবিশ্বাসী থেকে পরিণত হয়েছিলেন, একজন বুদ্ধিমান বিশ্বাসী হিসেবে। কিন্তু তার এই অগ্রসরতার জন্য বিশেষ কিছুর প্রয়ােজন ছিল, যার জন্য কৃষ্ণ ব্যক্তিগতভাবে আবির্ভূত হয়ে তাকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেন এবং তার দুর্দশাগ্রস্ত জীবন থেকে পরিত্রাণ দেন।

OMG তে কৃষ্ণের অলৌকিক উপস্থিতির প্রয়ােজন ছিল, কেননা কাঞ্জি ভাইকে সহায়তার জন্য বুদ্ধিমান বিশ্বাসী ব্যক্তিদের সেই মুভিতে তুলে ধরা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিমান বিশ্বাসীরাও তার প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে সমর্থ হতেন। এখন প্রশ্ন, এ ধরনের বুদ্ধিমান বিশ্বাসীদের অস্তিত্ব কি আদৌ রয়েছে? বৈদিক শাস্ত্র ঘােষণা করছে, হ্যা রয়েছে। এ সমস্ত ব্যক্তিদের অস্তিত্ব গুরুপরম্পরা ধারায় রয়েছে। এ গুরুপরম্পরা ধারার উৎস হলেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। এ ধারার অন্তর্ভুক্ত সকল ব্যক্তিরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত জ্ঞান বহন করে, এজন্য তাঁরা হলেন বুদ্ধিমান বিশ্বাসী। পদ্মপুরাণে এমন ৪ ধরনের গুরু পরম্পরার কথা বলা হয়েছে। সেগুলাে হল শ্রী, ব্রহ্মা, রুদ্র ও কুমার। এ পরম্পরা ধারা আজও অবধি বহমান এবং আমরা সবাই এ পরম্পরা ধারার ভক্তদের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে পারি। এ ধারাসমূহের মাধ্যমে তখন ভগবান আমাদের সহায়তা প্রদান করেন।

কাঞ্জিভাই আদালতে এক পর্যায়ে বলছিলেন সমস্ত মন্দিরগুলাে ভগবানের নামে ব্যবসা করছে। গাড়ি পার্কিং এর জন্য, ভগবানের ফুল, চন্দন কেনার জন্য, প্রসাদের জন্য, ভগবানকে দর্শনের জন্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে সবাই অর্থ দাবি করে। এমনকি তথাকথিত এসব ধর্মীয় ব্যক্তিদেরকে সেলসম্যান বলেও আখ্যায়িত করেন, তিনি মন্দিরগুলােকে স্টোর বা দোকান হিসেবে অভিহিত করেন। অর্থাৎ কাঞ্জিভাইয়ের প্রশ্নটি হল, কেন ভগবানের নামে ধর্ম একটি প্রতারণারূপ ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে?

কিছু বিবেকবর্জিত লােকের কারণেই এটি হয়ে চলেছে, যারা সাধারণ জনতার ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণা করছে।

ধর্ম একটি ঔষধের মতাে যেটি পারমার্থিকভাবে আমাদের আরােগ্য বিধান করে। চিকিৎসা জগতে যেমন অনেক অযােগ্য ভুঁইফোর ডাক্তার আছে। এবং তারা রােগীর কখনােই আরােগ্য বিধান করতে পারে না; তেমনি ধর্মীয় জগতে এ ধরনের প্রতারক ধর্মীয় ব্যক্তিদের বিস্তার ঘটতে পারে, যারা পারমার্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে অযােগ্য এবং এজন্যে তারা লােকেদেরকে পারমার্থিকভাবে কোনাে সহায়তাও দিতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে ধর্ম খুব সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কেননা অধিকাংশ লােকেরা জানেই না যে ধর্মের উদ্দেশ্য কী। কোনাে ধর্মীয় পােশাকধারী, কিংবা গরগর করে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতে দেখলে, অথবা কোনাে ভাব-গম্ভীর শব্দসম্ভার শুনলেই লােকেরা তাদেরকে পবিত্র ধর্মীয় ব্যক্তির আসনে বসিয়ে দেয়।

লােকেদের এসমস্ত ধর্মীয় আবেগ দেখে, অনেক বিবেকবর্জিত লােক ধর্মীয় জগতে প্রবেশ করে নিজ নিজ ভঙ্গিমাতে বিশাল ধর্মীয় ব্যক্তি সাজার চেষ্টা করে এবং আবার তাদের কেউ যদি কোনাে কারিশমা বা হাতের ভেলকিতে অলৌকিক’ কিছু প্রদর্শন করতে পারে, তখন তারা ভগবানের কোনাে অবতার হিসেবে লােকমুখে স্বীকৃতি পায়। তারা তাদের নিজস্ব পূজা পদ্ধতির আবিস্কার করে এবং তাদের আরাধনাকারী লােকেরা তাদের কষ্ট উপার্জিত অর্থ অনায়াসে বিলি করে।

এ সমস্ত তথাকথিত ধর্মীয় ব্যক্তিরা ভগবানকে ভালােবাসার প্রতি আগ্রহী নন বা অন্যরা যাতে ভগবানকে ভালােবাসতে পারে সে বিষয়েও কোনােরূপ সহায়তা দিতে অপারগ। তারা শুধু : ভালােবাসে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস, ব্যাংক অ্যাকাউন্টস্ এবং অহংকারকে। এমন লােকেরা প্রকৃত ধর্মকে বিকৃত করে ভগবানের নামে ব্যবসায় নেমে পড়ে।

তবুও জগতে এমন সব ব্যক্তিরা রয়েছেন যারা সত্যিকার অর্থেই ভগবানকে ভালােবাসার জন্য ধর্ম অনুশীলন করে থাকেন। যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে, আমরা সেসমস্ত একনিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে শিখতে পারি এবং তাদের সঙ্গের প্রভাবে ভগবানকে ভালােবাসার পন্থা লাভ করতে পারি।

কাঞ্জিভাই মিডিয়ার এক সাক্ষাতকারে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। সেই সাক্ষাতকারে যে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর কাঞ্জিভাই দিয়েছিলেন সে উত্তরগুলাের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই সে প্রশ্নগুলাের যথার্থ উত্তর এখানে তুলে ধরা হল।

মিডিয়ার এ সাক্ষাৎকারে কাঞ্জিভাই বিভিন্ন প্র্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।

কাঞ্জিভাই বলছিলেন, আমরা যখন বাবার কাছে চকোলেট চাই তখন কি ‘পাপা পাপা বলে জপ করি? কিংবা ধূপকাঠি, পুস্প দিয়ে কি আরতি করি? না, সরাসরি বাবার কাছে হাত পাতি, বাবা তখন দিয়ে দেয়। একইভাবে ভগবানকে আমরা জানি পিতা হিসেবে। তাে পিতার কাছ থেকে কোনাে কিছু চাইতে হলে ঐসব পন্থার কি প্রয়ােজন?
কাঞ্জি ভাই এখানে ভগবানের নাম জপ ও ধর্মাচরণ পদ্ধতিসমূহ সম্পর্কে ভ্রান্ত মতামত পােষণ করেছেন। তার প্রশ্নগুলােকে বাস্তবতার ভিত্তিতে সুসংবদ্ধভাবে বিন্যস্ত করে নিয়ে যথার্থ উত্তর প্রদান করা হল।
পিতার কাছে চকোলেট চাইতে গেলে আমরা পাপা পাপা বলে জপ করি না, তবে কোনাে কিছু চাওয়ার জন্য আমাদের কেন ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ জপ করা উচিত?

ধর্ম প্রকৃতপক্ষে ভগবানকে ভালােবাসার পন্থা শিক্ষা দেয়, কিন্তু লােকেরা ভগবানকে ভালােবাসতে প্রস্তুত নয়। ভগবানের নিকট প্রতি ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার জন্য শাস্ত্রে ৪টি স্তরের কথা বলা হয়েছে। এ স্তরগুলাে পৃথিবীর সমস্ত ধর্মেই দেখা যায়। এ স্তরগুলাে হল ভয়, কামনা বাসনা কর্তব্য ও ভালােবাসা।

(১) ভয় : কিছু লােক ভয় পায়, “যদি আমি ভগবানকে অমান্য করি, তবে তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন। তাই বরং মন্দিরে যাওয়া যাক এবং তাকে আরাধনার মাধ্যমে সন্তুষ্ট করা যাক।” এ ধরনের আরাধনা নিশ্চিতভাবেই নাস্তিকদের চেয়ে অনেক উন্নত। কিন্তু তাদের আরাধনার ভিত্তি ‘ভগবান একজন বিচারক হিসেবে, পক্ষান্তরে ভগবানকে ভালােবাসার উপর নয়।

(২) কামনা-বাসনা : কিছু লােক মনে করে, “আমি অনেক কিছু চাই, যদি আমি ভগবানের প্রার্থনা করি, তবে সম্ভবত তিনি আমার কামনা- বাসনা পূরণ করবেন। এক্ষেত্রে ভগবান সম্পর্কে ধারণাটি আরাে ইতিবাচক, একজন কামনা-বাসনা পূরণকারী হিসেবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভগবানকে ভালােবাসার চেয়ে এ ধরনের সম্পর্কের ভিত্তিটি হল দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টি ।

(৩) কর্তব্য : কিছু লােক মনে করে, “ভগবান আমাকে অনেক দিয়েছেন প্রাণ, দেহ, বাতাস, সূর্যালােক খাদ্য, ভূমি ইত্যাদি। তাই আমার কর্তব্য তার মন্দিরে গিয়ে তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা। এ সম্পর্কের ভিত্তিটি দাড়িয়ে আছে কৃতজ্ঞতার উপর। তাদের কাছে প্রাধান্য পায় ভগবান আমার জন্য কি কি করেছেন। এছাড়া ভগবানের প্রতি তাদের কোনাে আকর্ষনই নেই।

(৪) ভালােবাসা : ভগবানের প্রতি অগ্রসরতার জন্য এটি হল সবচেয়ে বিশুদ্ধ স্তর। যেখানে ভক্ত অনুভব করেন, “হে আমার প্রিয় প্রভু, আপনিই হলেন আমার ভালােবাসার পরম বিষয়, আমি অনেক ব্যক্তি আর বিষয়ের প্রতি এতদিন আমার ভালােবাসা অর্পণ করে এসেছি, কিন্তু সেগুলাে আমাকে কখনাে সুখী করতে পারেনি। এখন আমি শুধু আপনাকেই ভালােবাসতে চাই এবং আপনার নিত্যসেবক হতে চাই। এর বিনিময়ে আমি আর কোনাে কিছুই প্রত্যাশা করি না। আমি শুধু আপনাকেই ভালােবেসে যেতে চাই এবং আপনার ভালােবাসা পেতে চাই। তাই এ পর্যায়ক্রমিক স্তরগুলাের লক্ষ্যই হল, ভগবানের প্রতি শ্রদ্ধপ্রেম লাভ করা । ভগবানের নাম জপের এটিই প্রকৃত উদ্দেশ্য, কোনাে কিছু চাওয়া নয় বরং ভগবৎপ্রেম হৃদয়ে জাগরিত করা।

আমরা প্রকৃতপক্ষে ভগবানের সন্তান সেটি আমরা ভুলে গেছি। তাই বিস্মৃতির ফলস্বরূপ আমরা অনেক দুঃখদুর্দশা ভােগ করছি। আমরা ভগবানের হারানাে সন্তান। চিকিত্সাবিজ্ঞান মতে স্মৃতিবিলােপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য, রােগীদের পূর্বের বিষয়গুলাের উপর ভিত্তি করে স্তিমিউলি (যে ক্রিয়া বা কারণের প্রতি দেহের অনুভূতি সাড়া দেয়) দেয়া হয়। যেকোনাে ভাবে হেক পরিচিত জিনিসগুলাে প্রদর্শনের মাধ্যমে তার স্মৃতিকে পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়। ঠিক তেমনি, পারমার্থিক Amnisia বা স্মৃতিবিলােপ থেকে আরােগ্য পেতে, আমাদের পারমার্থিক স্তিমিউলি নিজেদের উপর পুনঃ পুনঃ প্রয়ােগ করা প্রয়ােজন। সবচেয়ে কার্যকরী স্তিমিউলি (Stimuli) হল ভগবানের পবিত্র নাম। তার নাম ক্রমাগত জপ করাই হল সবচেয়ে শক্তিশালী চিকিৎসা।

সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে ও এ হরিনাম জপের প্রতি গুরুত্ব আরােপ করা হয়েছে। অধিকাংশই যেহেতু স্মৃতিবিলােপ থেকে মুক্ত হতে আগ্রহী নই, তাই শাস্ত্রে কিছু সুযােগ দেয়া হয়েছে, যদি জপ করা হয় তবে আমাদের কামনা বাসনা পূর্ণ হবে। এই ব্যাপারটি ঠিক একটি শিশুকে ঔষধ খাওয়ানাের জন্য মা-বাবার প্রতিজ্ঞার মত, ‘যদি তুমি ঔষধটি খাও তবে তুমি একটি মিষ্টি পাবে। ‘

শুরুতে আমরা ভগবানের দিকে অগ্রসর হয় ভয় আর কামনা বাসনা নিয়ে, আমরা কোনাে কিছু চাওয়ার জন্য জপ করি। পরবর্তী স্তরে যখন আমরা যথার্থভাবে শিক্ষিত হই তখন আমরা ভগবৎপ্রেম জাগরিত করার জন্য জপ করি এভাবে ভগবানের কথা সহজে স্মরণ করতে আমাদের সহায়তা করে।

কাঞ্জি ভাইয়ের সাক্ষাতকার অনুসারে, ধর্মে প্রথা বা রীতিনীতির কোনাে প্রয়ােজন রয়েছে?

প্রথা বা রীতিনীতি শুধু ধর্মেই নয় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও য়েছে। যেমন আমরা জন্মদিনে মােমবাতি জ্বালাই, বেলুন ফাটাই। এসবের প্রয়ােজন কী? অথবা ভালো কোনাে অনুষ্ঠান দেখে হাত তালি দিই, করমর্দন করি ইত্যাদি। কিন্তু এগুলাে কেন করি? হয়তােবা এটি আমাদের আনন্দ দেয়। মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা এসবের কোনাে ব্যাখ্যা খুঁজি না। তাহলে ধর্মীয় প্রথা বা রীতি-নীতির ব্যাপারে ব্যাখ্যা কেন? যদিও এসবের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য উভয়ই রয়েছে।

ভগবানের সামনে মাথা নত করা সেটি অনেক প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্য যা অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত।

ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মাচরণ প্রথা (Rituals) অবশ্যম্ভাবী। এসব প্রথার মাধ্যমে আমরা শ্রদ্ধা, সম্মান প্রদর্শন এবং যথাযথ ভক্তিপূর্ণ আবেগের অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ধূপকাটি জ্বালানাে, বিভিন্ন ভজন বা ধর্মীয় গীত, গীতা, ভাগবতাদি পাঠ, পবিত্র নাম জপ ইত্যাদি আমাদেরকে সহায়তা করে ভগবানের প্রকৃত উপলব্ধি অর্জনে। আপনি যখন মন্দিরে গিয়ে ভগবানের সামনে মাথা নত করেন, তখন আপনার দৈহিক ভাষা বিনম্রতার ভাব প্রদর্শন করে। ধরুন, ইজি চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে আছেন আপনি। আপনার হাত মাথার পেছনে। এখন আপনি বিতার ভাব আনতে চেষ্টা করুন। নিশ্চয়ই কঠিন মনে হবে। অথচ মাথা নত করার ব্যাপারটিই হল একটি সূক্ষ্ম বিজ্ঞান। এ প্রথাগুলাে বৈদিক ঐতিহ্য। আর এসবের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ভক্তিভাব জাগরিত করা। এক্ষেত্রে বলাবাহুল্য সব ধর্মাচরণপ্রথাকে চিন্ময় বা পারমার্থিক বলা উচিত নয়। অনেক প্রতারক ব্যক্তি নিত্যনতুন মনগড়া প্রথার সৃষ্টি করে লােকদের প্রতারণা করে। তাদের সৃষ্ট এ সমস্ত প্রথা কোনাে শাস্ত্রসম্মত নয় বরং তা পারমাথিক উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। এরকম একটি মনগড়া প্রচলিত প্রথা হল কিছু গুরুদেবের নাম পুনঃ পুনঃ জপ করার প্রথা, যা ভগবানের নামের সমান শক্তি বলে দাবি করা হয়। সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে আমরা সঠিক প্রথা গ্রহণ করে ভুইফোড় ধর্মীয় প্রথাগুলােকে অগ্রাহ্য করতে সমর্থ হব।

অনেক ভক্ত ভগবানের জন্য নিজের চুলগুলাে ভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন। এ নিয়ে কাঞ্জি ভাইয়ের প্রশ্ন হচ্ছে ভগবান যখন দরজা খুলে দেখবে তার চারপাশে কালাে চুল, সাদা চুল, সােনালী চুল, লাল চুল, লম্বা চুল, বেঁটে চুল তখন ভগবানের কেমন লাগবে? নিজের চারপাশে এরকম চুল থাকলে কেমন লাগবে? এবং এ নিয়ে কাঞ্জি ভাইয়ের আর একটি প্রশ্ন হচ্ছে এটি কী শ্ৰদ্ধার ধান্দা নয়?

ভালােবাসা দু’ভাবে প্রকাশ করা হয়। প্রিয়জনকে কোনাে কিছু নিবেদনের মাধ্যমে এবং প্রিয়জনের জন্য কোনাে কিছু ত্যাগ করার মাধ্যমে। চুলের প্রতি আমাদের স্বভাবজাত আকর্ষন রয়েছে। এটি অপরিচ্ছন্ন তখনই হয় যখন মাথা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। তার পূর্বে নয়। তার পূর্বে এটিকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে অনেক পরিচর্যা করা হয়। তার প্রমাণ হচ্ছে চুলের জন্যই কত আকর্ষনীয় রকমারি পণ্য যেমন জেল, তেল, শ্যাম্পু, চিরুনি, মেহেদী সহ বিভিন্ন মেশিনে বাজার সয়লাব। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে যুবক-যুবতীরা ভালােভাবেই জানে এ চুলের যত্ন নিতে কত টাকা খরচ হয় ।

কাঞ্জি ভাইকে কৃষ্ণরূপে অভিনেতা অক্ষয় কুমার শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা যথাযথ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করার জন্য প্রদান করছেন।

এই কারণে বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে এই বিষয়ের প্রতি আকর্ষন পরিত্যাগের জন্য সাধুগণ মস্তক মুণ্ডন করে থাকেন। এ প্রিয় জিনিস উৎসর্গের মাধ্যমে ভগবানের প্রতি ভক্তিভাব প্রদর্শিত হয়। আর তাছাড়া ভগবান ‘চুলগ্রাহি নয়। ভগবান হলেন ‘ভাবগ্রাহী’। তিনি ভক্তের চুল নয় ভাব গ্রহণ করেন।

প্রশ্ন হতে পারে এ প্রথাটি কি ব্যবসায়ে পরিণত হচ্ছে না? না মােটেই নয়। ভারতে বিশেষত বিখ্যাত বালাজী মন্দিরে এ ঐতিহ্য প্রাচীনকাল থেকে। চুল বিক্রির ব্যাপারটি আধুনিক যুগে শুরু। যদি এই চুল দিয়ে কিছু অর্থও আয় হয় তাতে ক্ষতিটা কি? এই অর্থ দিয়ে স্কুল, হাসপাতাল, অনাথ আশ্রম করা হয়।

তাহলেতাে এটি অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার । অথচ পরিতাপের বিষয় হচ্ছে কাঞ্জি ভাই এটিকেই ধান্দা বলছেন।

একজন দর্শক বলে উঠলেন ভগবান যদি আমাদের পিতা হন তবে তিনি কি আমার সামনে আসবেন? কাঞ্জি ভাইয়ের উত্তর, এমনকি আপনি মন্দিরের মূর্তি মানেন তবে তিনি আসবেন না।
প্রশ্নটি এভাবে লেখা যায় ; যখন ভগবান সর্বত্রই বিরাজমান, তবে কেন মন্দিরের মূর্তি বা বিগ্রহকে পূজা করব?

নিশ্চয়ই ভগবান সর্বত্রই বিরাজমান, কিন্তু তিনি কি আমাদের জন্য সর্বত্রই সুলভ? জল বাষ্প হিসেবে বায়ুর মধ্যে সর্বত্রই বিরাজমান। কিন্তু আমরা যদি বায়ুর মধ্যে জিহ্বা বের করে দিই তাহলে কি জল মুখের মধ্যে প্রবেশ করে আমাদের তৃষ্ণা মিটাবে? না। আমাদের যেতে হবে কোনাে টিউবওয়েল বা ট্যাপে কিংবা অন্য কোনাে উৎসে। তদ্রুপ যদিও ভগবান সর্বত্রই বিরাজমান, আমাদের প্রয়ােজন তার অধিগম্য রূপ যেটি তিনি মন্দিরে বিগ্রহরূপে প্রকাশিত হন। ভগবানের এই প্রকার রূপ অপরিহার্য। এমনকি ও মাই গড় এর কাল্পনিক কাহিনীতেও ভগবান কাপ্তি ভাইয়ের সামনে জড়রূপে আবির্ভূত হন। তাঁর এই রূপ দেখেই তিনি পাল্টে যান। এভাবে আমরা দেখতে পাই একজন অবিশ্বাসী ব্যক্তি ভগবানের সমস্ত জড় প্রকাশকে অগ্রাহ্য করলেও, তার বিশ্বাসকে বর্ধিত করার জন্য ভগবানের একটি জড় প্রকাশ বা রূপের প্রয়ােজন রয়েছে।

ওহ্ মাই গড্ এর কাল্পনিক কাহিনী ছাড়াও বাস্তবতা হল এই যে, আমরা যতদিন পর্যন্ত যথেষ্ট পরিশুদ্ধিতার স্তরে অধিষ্ঠিত না হচ্ছি, ততদিন পর্যন্ত ভগবান নিজেকে প্রকাশ করেন না। তবে কীভাবে ভগবানকে উপলব্ধি করতে পারি? যে সমস্ত মহাত্মা তার অপ্রাকৃত রূপ দর্শন করেছেন তাদের বর্ণনা অনুসারে এবং শাস্ত্রের নির্দেশনা অনুসারে ভগবানের প্রকটিত রূপ বিগ্রহের মাধ্যমে আমরা তাকে উপলব্ধি করতে পারি। তখন ভগবান বিগ্রহরূপে আমাদের আরাধনা গ্রহণ করেন।

মুভি নির্মাতা তার নিজস্ব মতানুসারে বলতে পারেন বিগ্রহ অর্চনা অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু শাস্ত্রানুসারে ভগবানের মতামত কি একান্ত তা জানা জরুরী। উদাহরণ স্বরূপ, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত, পঞ্চরাত্র বিধি সহ অনেক পুরাণে বিগ্রহ পূজা অর্চনার নীতি আদর্শ এবং অনুশীলন বিষয়ে অজস্র দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

কাঞ্জি ভাইয়ের সাক্ষাতকার থেকে আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ব্যক্তিরা ধর্মীয় লােকেদের ভবিষ্যত দুর্দশার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করে না?

না। তাঁরা ডাক্তারের মত রােগীদের সাবধান করেন যে, ভবিষ্যতে তারা অসুস্থ হবে যদি তারা এখনই চিকিৎসা না নেয়। তাদের সেই উক্তি সাবধান করা, ভয় দেখানাে নয়। কাঞ্জি ভাই মাফিয়ার উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু মাফিয়ার মত লােকেরা যদি কিছু দাবী করে এবং আপনি যদি তা না দেন তবে তারা আপনার ক্ষতি করবে। কিন্তু ধর্মীয় ব্যক্তিরা কি ওদের মত আচরণ করেন?। অসুস্থতার ক্ষেত্রে ডাক্তাররা রােগীর দুর্দশা প্রতিরােধে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে। তদ্রুপ, বৈদিক সাহিত্য আমাদের অবগত করাচ্ছে যে, কর্মের আইনানুসারে আমাদের বিভিন্ন ধরনের দুঃখদুর্দশা ভােগ করতে হয়। আমরা সবাই পূর্বকৃত কর্মের ইনফেকশন বহন করি এবং তা যথাসময়ে ভােগ হবে। এজন্য একটি শিক্ষিত চোখের প্রয়ােজন হয়, যার মাধ্যমে সে বুঝতে পারে বর্তমান এ লক্ষণসমূহ ভবিষ্যতে সমস্যা সৃষ্টি করবে। নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান আমাদের পূর্বকৃত কর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে সব ধর্মীয় প্রথা প্রয়ােজনীয় নয়, যেমনটি সব মেডিকেল প্রেসক্রিপশন প্রয়ােজন নয়। কিছু ব্যবসায়ী মনােভাবের ডাক্তার বাড়তি আয়ের জন্য অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল টেস্ট সমৃদ্ধ পরীক্ষা দিতে পারে। তদ্রুপ কিছু স্বার্থান্বেষী ধর্মীয় ব্যক্তিরাও তা করতে পারে। এজন্যে আমাদের শিক্ষিত হতে হবে এবং সতর্কভাবে শুধু ডাক্তার নয়, সেরকম যথার্থ ধর্মীয় ব্যক্তি বা সাধুসন্তদের বেছে নিতে হবে।

কাঞ্জি ভাই নরকের ভয়ের কথাও বলেছিলেন, তিনি বলেন, ধর্মভীরু মানুষদেরকে তথাকথিত সাধুরা নরকের ভয়ও দেখায়।

শাস্ত্রানুসারে নরকের অস্তিত্ব রয়েছে। স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি দেশের সরকারের যদি জেলখানা তাকে, তাহলে বিশ্বজনীন সরকারের কি জেলখানা থাকবে না? নরকের ব্যাপারটি ভয়ের স্তরে রয়েছে। কিছু ধর্মীয় নেতারা ভগবানকে ভালােবাসার ব্যাপারটি সম্পর্কে অবগত না হয়ে, শুধুমাত্র নরকের ভয় দেখিয়ে লােকেদের নৈতিকতার আদর্শে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা করে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভগবানের প্রতি ভালােবাসার শিক্ষা যদি আমরা অর্জন করতে পারি, তবে এ ধরনের ভীতিপ্রদ ব্যাপার আমাদের বিরক্ত করবে না। তাতে আমরা আপনা আপনিই সেই শুদ্ধ জীবন-যাপনের প্রচেষ্টা করব।

কাঞ্জি ভাইকে প্রশ্ন করা হয় ধর্ম মানে কী?
তিনি বলেন, “ধর্ম মানে যেখানে সত্যের স্থান নেই, আর যা সত্য সেখানে ধর্মের প্রয়ােজনই নেই।”

কাঞ্জি ভাই ধর্মের যে সংজ্ঞা দিলেন তা নিতান্তই মনগড়া ছিল। সংস্কৃতে ‘ধূ’ অর্থ ধারণ করা বােঝায়। অর্থাৎ ধর্ম অর্থ যা আমাদের অস্তিত্বকে ধারণ করে। যেটি জীবের সারবস্তু, যেটি ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব নেই। এই সারবস্তুটি হল ভালােবাসা। জীবের ধর্ম হল সেবা করা। সুতরাং ভগবানকে প্রীতি সহকারে সেবা করার নামই হল ধর্ম।

কাঞ্জি ভাইয়ের ভাষ্য অনুসারে ধর্ম নাকি মানুষকে আগ্রাসী বা হিংস্র করে তােলে? কিংবা অসহায় করে তােলে?

যদি ধর্ম সহিংসতার কারণ হয়, তবে পৃথিবীর যে সব স্থানে কোনাে ধর্মই নেই সে সব স্থানগুলাে সহিংসতা মুক্ত হত। সাম্প্রতিক ইতিহাস মতে দুটি স্থানে নাস্তিকতা জোড়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে, সেগুলাে হল USSR এবং চীন। এ দুটি দেশের ফলাফল কী? দুই শতকে যত লােক এখানে নিহত হয়েছে, তার পরিমাণ বিংশ শতাব্দির সব যুদ্ধে নিহতদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

সহিংসতা ছাড়া, যুদ্ধের দিকে তাকালে পৃথিবীতে দুটি বিশ্ব যুদ্ধ হয়েছে। তার কারণ কিন্তু খুব কমই ‘ধর্ম’ ইস্যু ছিল। এই একই সত্যতা আরাে অনেক যুদ্ধের ক্ষেত্রেও, যেমন-কোরিয়ান যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও ইন্দো চায়না যুদ্ধ এবং আরাে অনেক যুদ্ধ।

বরং প্রকৃত ধর্ম কেউ নিজের জীবনে প্রয়ােগ করলে তা জীবনকে আনন্দময় করে তােলে। এটি প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর উপর নির্ভর করে। ভগবানের সাথে জীবের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে জীব আনন্দময় হয়ে ওঠে। 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জুলাই -সেপ্টেম্বর ২০১৩

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here