ইস্‌কনে নৃসিংহ পূজার সূচনা

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২২ | ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ১৩ মে ২০২৪ | ১২:১৪ অপরাহ্ণ

এই পোস্টটি 314 বার দেখা হয়েছে

ইস্‌কনে নৃসিংহ পূজার সূচনা

ড. নিতাই সেবিনী দেবী দাসী


একবার শ্রীল প্রভুপাদ লস অ্যাঞ্জেলেসে ছিল আর মন্দিরের সমস্ত ভক্তরা সান ফ্রান্সিসকোতে রথযাত্রায় গিয়েছিল।

ইস্‌কনে নৃসিংহদেবের পূজার ইতিহাস

তখন শ্রীল প্রভুপাদের শরীর ভাল ছিল না, কিছু ভক্ত তার সাথে মন্দিরে ছিল। এমন সময় কেউ একজন মন্দিরে ছোট একটা বোম নিক্ষেপ করে। এতে ক্ষতি তেমন একটা হয়নি কিন্তু ধোঁয়া ও তীব্র শব্দে ভক্তরা আতঙ্কিত হয়। তারপর শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমাদের প্রচার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তার জন্য কিছু ব্যক্তি আমাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত। এজন্য আমাদের জীবনে ভগবানের একটা বিশেষ রূপের আরাধনা প্রবেশ জরুরি। যে রূপটি হচ্ছে শ্রীনৃসিংহদেব ভগবান। এখন থেকে আমাদের সকল মন্দিরে নৃসিংহদেবের পূজা চালু থাকবে। কেননা নৃসিংহদেব ভক্তদের রক্ষা করে। তারপর ঐ মন্দিরে শ্রীল প্রভুপাদ প্রথম নৃসিংহ আরতি কীর্তন করেন এবং নৃসিংহদেবের চিত্রপত্র স্থাপন করেন। শুরুতে নৃসিংহদেবের পূজা করা ভক্তদের কাছে কঠিন হয়ে পড়ে কেননা এই ভয়ানক রূপ দেখে ভক্তরা ভয় পান। শ্রীল প্রভুপাদ মন্দিরের বেদীতে চিত্রপটটি রাখেন কিন্তু কিছুদিন পর চিত্রপটটি বেদীতে নাই।

শ্রীল প্রভুপাদ: আমি বারবার চিত্রপটটি বেদীতে রাখি কিন্তু কে বারবার তা সরিয়ে রাখে?

ভক্ত: আমি এটা তুলে রাখি না, বেদীর পিছনে লুকিয়ে রাখি।

শ্রীল প্রভুপাদ: লুকিয়ে রাখ কেন? বেদীতে রাখবে।

ভক্ত: নতুন কেউ দর্শন করলে ভীত হবে। বলবে এ কেমন ভগবান চারিদিকে রক্ত ছড়িয়ে আছে ?

শ্রীল প্রভুপাদ: (হেসে বলল) কেন নৃসিংহদেবকে দেখে ভীত হবেন ? নৃসিংহদেব ভগবানকে দেখে পাপী লোক ভীত হবে। ভক্ত কেন ভীত হবে, যে পাপ করবে সে ভীত হবেন। যেমন সিংহকে দেখে সবাই ভীত হন কিন্তু সিংহশাবক ভীত হন না। কেননা সিংহ তার শাবকে আদর করে তেমনি ভগবানের যেকোন রূপ দেখে ভক্তদের ভয় করা উচিত না। ভগবান তার ভক্তকে আদর করে তাকে রক্ষা করে।
তখনকার সময়ে শ্রীল প্রভুপাদের শরীর ভাল না, তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছে।
শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তদের বলল, আমার মিশন এখনও পূর্ণ হয়নি, আমাকে আরো প্রচার করতে হবে তোমরা নৃসিংহদেব ভগবানের কাছে প্রার্থনা কর। তখন সমস্ত ভক্ত নৃসিংহদেবের কাছে প্রার্থনা করে আর শ্রীল প্রভুপাদ সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। তখন থেকে শ্রীল প্রভুপাদ নৃসিংহদেবের পূজা ও আরতি করা ইস্‌কনে শুরু করে ।

যখন ভয় লাগবে তখন এই মন্ত্র জপ করুন-

জয় নৃসিংহ শ্রী নৃসিংহ ।
জয় জয় জয় শ্রী নৃসিংহ ॥
উগ্রং বীরং মহাবিষ্ণু
জ্বলন্তং সর্বতোমুখম্।
নৃসিংহ ভীষণং ভদ্রং
মৃতোমৃত্যুং নমাম্যহম্ ॥
শ্রী নৃসিংহ জয় নৃসিংহ জয় জয় নৃসিংহ ।
প্রহ্লাদেশ জয় পদ্মমুখ পদ্মভৃঙ্গং ॥

এ মন্ত্র নৃসিংহ পূর্বতাপনী উপনিষদ্ থেকে গৃহীত হয়। এ মন্ত্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রথম সিংহাচলে বলেন। সিংহাচলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভগবান নৃসিংহদেবকে দর্শন করে তিনি উচ্চারিত করতে থাকে – “উগ্রং বীরং মহাবিষ্ণু”। এ মন্ত্র প্রবল শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। নৃসিংহ পূর্বতাপনী উপনিষদে এ মন্ত্র সর্ম্পকে বলা হয়েছে – এ মন্ত্র উচ্চারণ করার সময় হাত কখনও বক্ষস্থলে, কখনও কপালে, বাহুতে রাখতে হয় তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এ মন্ত্র এত শক্তিশালী যে ব্রহ্মা দেবতাদের এ মন্ত্র বলেছেন। ব্রহ্মা দেবতাদের বলেছেন, কখনও তোমাদের যদি ভয় লাগে তবে এই মন্ত্র তোমরা উচ্চারণ করবে।

নৃসিংহদেব কখন অবতীর্ণ হয়েছিল?

নৃসিংহদেবের অবতার এক বিশেষ অবতার, এই অবতারে ভগবান কেবল ভক্তকে রক্ষা করার জন্য অবতীর্ণ হন। লঘুভাগবতমৃতে শ্রীল রূপ গোস্বামী বলেছেন, নৃসিংহদেব অবতীর্ণ হন ষষ্ঠ মন্বন্তরের অন্ত কল্পে সত্যযুগের শেষে ত্রেতা যুগের শুরুর লগ্নে। সমুদ্র মন্থরের শুরুর পূর্বে। নৃসিংহদেব এসে প্রহ্লাদকে রক্ষা করেন ও হিরণ্যকশিপুকে বধ করে। এমন নয় নৃসিংহদেব এসেছিলেন প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছেন উনি আর প্রকট হবেন না তা নয়। যখনই ভক্ত তাকে স্মরণ করবে তিনি ভক্তকে রক্ষা করার জন্য প্রকট হবেন।

বিভিন্ন যুগে ভিন্ন ভিন্ন নৃসিংহদেব

ভগবান অবতীর্ণ হয়েছেন পুরাণে তা বর্ণিত হয়েছে।

নৃসিংহদেব শিবলিঙ্গ থেকে প্রকাশিত

পুরাণে কাহিনী রয়েছে, বিশ্বক্‌সেন নামক নৃসিংহদেবের ভক্ত ছিলেন। একবার বিশ্বক্্সেন এক গ্রাম হতে অন্য গ্রামে যাত্রা করেন। তখনকার সময় কোন যানবাহন ছিল না বিশ্বক্‌সেন হেঁটে যাত্রা করেন। এক গ্রাম হতে অন্য গ্রাম অতিক্রম করতে রাত হয়ে যায়। এখন কোথায় আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত? বিশ্বক্্সেন সেই গ্রামের প্রধানের ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। প্রধান বিশ্বক্্সেনকে বলল, তুমি আমার ঘরে রয়েছো, আমরা কিছু সেবা করতে হবে। সে বলে অবশ্যই বলুন আমাকে কি করতে হবে ? প্রধান বলল, আমি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি আমরা কাছে এক শিবলিঙ্গ রয়েছে তুমি সেটার পূজা কর। পূজার জন্য যা সামগ্রী প্রয়োজন আমি তোমাকে তা দেব। বিশ্বক্্সেন বলল, আমি বিষ্ণুভক্ত শিব পূজা করতে পারব না। প্রধান চাকু ধরে বলে তুমি করবে কি না বল! সে ভয় পায়। তার পাশের ঘরে সব সামগ্রী দিয়ে বলে তুমি পূজা শুরু কর। প্রধান পাশের ঘরে শুয়ে থাকে আর বিশ্বক্‌সেন পূজা করতে থাকে। বিশ্বক্‌সেনের মুখ দিয়ে “ওঁ নমঃ শিবায়” উচ্চারিত হয়ই না। সে শিবলিঙ্গে বিল্ব পত্র দিয়ে বলতে থাকে “ওঁ নরসিহায় নমঃ” “ওঁ নরসিহায় নমঃ”। পাশের ঘরে শুয়ে প্রধান ক্রোধান্বিত হয়ে যায়। একে বললাম শিবের পূজা কর। এ বারবার “ওঁ নরসিহায় নমঃ” “ওঁ নরসিহায় নমঃ” উচ্চারণ করছে। প্রধান ক্রোধান্বিত হয়ে দরজা খুলে চাকু নিয়ে তার গলায় ধরে। আর ভগবান নৃসিংহদেব শিবলিঙ্গ থেকে প্রকাশিত হয়ে ভক্তকে রক্ষা করে। এমন নয় নৃসিংহদেব শুধু সত্য যুগেই আসে। সে সব সময় আসে কিন্তু ডাকায় জন্য প্রহ্লাদের মতো ভক্ত হতে হবে।

বিড়ালনৃসিংহ রূপে ভগবান

এক ঋষি কন্যা ছিল নাম তার মালতী। মালতী প্রত্যেহ তিনি ভোরে গোদাবরীতে স্নান করতে যেতে। আর স্নান করে যজ্ঞের জন্য বাগান হতে ফুল সংগ্রহ করত। একদিন স্নান শেষ করে আসায় সময় দেখে রাবণ সামনে দাঁড়িয়ে। রাবণ তার পুষ্প রথ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরত আর সুন্দরী কন্যা দেখলে সেখানে থেমে যেতেন। রাবণ মালতীকে বলে, তুমি আমার রথে চলে আস আর আমাকে বিবাহ কর। মালতী তা প্রত্যাখান করেন কিন্তু রাবণ তাকে বলপূর্বক তার পানিগ্রহণ করেন মালতী বসে ক্রন্দন করতে থাকে আমি কিভাবে আশ্রমে যাব? সেখানে এক মূষককে (ইঁদুর) মালতী অনুরোধ করে তাকে যেন আশ্রমে রেখে আসে। মূষকও মালতীর সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তাকে পাণি গ্রহণ করেন। এতে মালতীর গর্ভে হতে এক শিশুর জন্ম হয় তার অর্ধেক ইঁদুর আর অর্ধেক মানুষের মতো। রাবণের পুত্র হওয়ায় তারই মতো শক্তিশালী হয়।
তার নাম হয় মূষকদৈত্য। মূষকদৈত্যও রাবণ ও হিরণ্যকশিপুর মতো ব্রহ্মার তপস্যা করে। ব্রহ্মা প্রসন্ন হলে মূষকদৈত্য বর চায় যে, আমাকে যেন কেউ মারতে না পারে। ব্রহ্মা বলল, কেউ তোমায় মারতে পারবে না তবে নৃসিংহদেব মারতে পারবে। মূষকদৈত্য বলে, ঠিক আছে। সে মনে মনে ভাবে কে আর প্রহ্লাদের মতো ভক্ত হবে আর নৃসিংহদেবকে ডাকবে আর আমার মৃত্যু হবে! এরপর ত্রেতাযুগে যখন রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা গন্ধমর্দন পর্বতে যায় ওখানকার ভক্তরা রামের কাছে প্রার্থনা করে আমাদের মূষকদৈত্য হতে রক্ষা করুন। ভগবান শ্রীরাম মূষকদৈত্যকে বধ করার জন্য নৃসিংহরূপ ধারণ করেন কিন্তু এ রূপ ভিন্ন রকম।
মোবাইলের যেমন প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন মডেল আসে ভগবান তেমনি বিভিন্ন যুগে ব্যতিক্রম রূপ ধারণ করেন। মূষকদৈত্যকে বধ করার জন্য ভগবান রাম যে রূপধারণ করে তার নিচের অংশ সিংহের মত মাঝের অংশ মানুষের মত আর উপরের অংশ বিড়ালে মতো। কেন বিড়ালের রূপ ধারণ করলেন? কারণ মূষকদৈত্যকেই বধ করতে হবে। এজন্য উড়িষ্যার ভক্ত এরূপের নামকরণ করে বিড়ালনৃসিংহ। বিড়ালনৃসিংহ রূপে ভগবান মূষকদৈত্যর পিছন পিছন ঘুরছে। মূষক (ইঁদুর) কি তখন গর্তে গর্তে প্রবেশ করে। মূষকদৈত্য গন্ধমর্দন পর্বতের বিভিন্ন গর্তে প্রবেশ করছে আর ভগবান রাম বিড়ালনৃসিংহ রূপে লাঠি নিয়ে তার পিছন পিছন ঘুরছে। কথিত আছে, এখন পর্যন্ত ভগবান বিড়ালনৃসিংহ গন্ধমর্দন পর্বতে মূষকদৈত্যের পিছন পিছন ঘুরছে ।
আমরা এসব ঘটনা হতে পরিলক্ষিত করছি, ভগবান তার ভক্তকে রক্ষা করার জন্য যেকোন মুহূর্তে অবতীর্ণ হতে পারে। এমন নয় যে ভগবান এই যুগে আসে অন্য যুগে আসে না।
লেখক পরিচিতি: ড.নিতাই সেবিনী দেবী দাসী মুম্বাইয়ে একটি গুজরাটি ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অনেক জেষ্ঠ্য ভক্তদের দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি পরে ১৯৯৭ সালে পূর্ণকালীন ভক্ত হন এবং ১৯৯৮ সালে শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ব্যবস্থাপনায় একটি পিজি ডিপ্লোমা সহ বাণিজ্যে স্নাতক, শিক্ষায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি ইস্‌কনের ডিভাইন টাচ স্কুলের অধ্যক্ষ, সংগ্রহে সক্রিয়ভাবে জড়িত, উৎসব সমন্বয়, গৃহস্থ প্রচার, কলেজ প্রচার এবং তার স্বামী শ্রীমান সাম্বা দাস, সভাপতি ইস্‌কন বিশাখাপত্তনমের সাথে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।



এপ্রিল – জুন ২০২২ ব্যাক টু গডহেড

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।