হরে কৃষ্ণ মন্ত্র হচ্ছে পরিশোধন পন্থা

0
126

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
ও তাঁর অন্যতম প্রিয় শিষ্য জর্জ হ্যারিসন, জন লেনন ও তার সহধর্মিনী ওকো ওনোর মধ্যে হওয়া কথোপকথনের অংশবিশেষ


জর্জ হ্যারিসন : ঋষিকেশে, যখন সাধুরা বহু বছর যাবৎ ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তখন তাদের মধ্যে একজন ধ্যান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে উদ্বিগ্ন হলেন। তিনি ধ্যান থেকে সরে আসার জন্য বিভ্রান্তি ছড়াতে লাগলেন। সে ভগবদ্গীতা সম্পর্কে বলল “গ্রন্থ পড়ো না, ধ্যান কর”
প্রভুপাদ : কে বলল?
জর্জ হ্যারিসন : গীতায় বলা হয়েছে (তাঁর ভাষ্যমতে)
প্রভুপাদ : “গ্রন্থ পাঠ করো না”? জর্জ হ্যারিসন : এখানে বলা হয়েছে, “গ্রন্থ পড়ো না, ধ্যান কর”।
প্রভুপাদ : কোথায়?
ওকো ওনো : না, কিন্তু দেখুন,
প্রভুপাদ : ব্রহ্মসূত্র পদায়িস চৈব হেতুমাধীর বিনিশ্চয় (ভগবদ্গীতা ১৩/৫)। তিনি বলেছেন যে, “বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, পরম সত্য, ব্রহ্মসূত্র, বেদান্ত সূত্রে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্য একটি স্থানে কৃষ্ণ বলেছেন,

যঃ শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য বর্ততে কামকারতঃ ।
নস সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্ ॥

যে শাস্ত্রবিধি পরিত্যাগ করে কামাচারে বর্তমান থাকে, সে সিদ্ধি, সুখ অথবা পরাগতি লাভ করতে পারে না। (ভগবদ্গীতা-১৬/২৩)
“যারা শাস্ত্রীয় বক্তব্য অনুসরণ করে না, তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। সে কখনো সুখী হবে না। পারমার্থিক জগতের কথা আর কি বলব?” শাস্ত্রে এগুলো আছে। কিভাবে তুমি বলতে পার যে কৃষ্ণ গ্রন্থ পাঠ করতে বলেন নি?
ওকো ওনো : আপনি যা বলছেন সে একই বিষয় আমি দেখেছি। যেমন হরে কৃষ্ণ হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ এবং যদি তা হয়ে থাকে তবে আপনারা অন্য কোনো শব্দ উচ্চারণ করেন না কেন? এটি কি জরুরি? কেন আপনি আমাদের উৎসাহিত করছেন, বলছেন আমরা গীতিকার …
প্রভুপাদ : না…হরে কৃষ্ণ মন্ত্র হচ্ছে পরিশোধন পন্থা।
ওকো ওনো : হ্যাঁ ।
প্রভুপাদ : প্রকৃতপক্ষে যিনি নিয়মিত হরেকৃষ্ণ মন্ত্র জপ করেন, তাকে আর কিছু করতে হয় না। প্রকৃতপক্ষে এটিই হল তার অবস্থা। তাকে কোনো গ্রন্থ পাঠ করতে হয় না।
ওকো ওনো : হ্যাঁ। তাহলে কেন আপনি বলছেন যে সবকিছু ঠিক আছে? আপনি কি কম্প্রোমাইজ করছেন? আমি বোঝাতে চাইছি যে আমরা গান লিখছি। এটি কি সময় অপচয় করা নয়? কৃষ্ণকে ছাড়া।
প্রভুপাদ : না, সেটা সময় অপচয় নয়। ঠিক চৈতন্য মহাপ্রভুর মত, চৈতন্য মহাপ্রভু শুধুমাত্র হরিনাম জপ কীর্তন করতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বহু সন্ন্যাসী কর্তৃক সমালোচিত হয়েছেন। “আপনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেছেন, কিন্তু বেদান্ত অধ্যয়ন করেন না, শুধু নৃত্য কীর্তন করেন।” তিনিও সমালোচিত হয়েছেন, কিন্তু তিনি যখন সেই সব বিদ্বান ব্যক্তিদের সম্মুখ হয়েও তিনি জ্ঞানে তাদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। তাই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রই যথেষ্ট। সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কেউ যদি দর্শনগত দিক দিয়ে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রকে উপলব্ধি করতে চায় গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমে বুঝতে চায়, বেদান্তের মাধ্যমে বুঝতে চায় তাহলেও সে সেটা করতে পারে। আমাদের বহু গ্রন্থ রয়েছে। আমরা বলছি না যে, হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র যথেষ্ট নয় কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা গ্রন্থ অধ্যয়নের প্রতি বিশেষ নজর দিই। চৈতন্য মহাপ্রভু যখন প্রকাশানন্দ সরস্বতীর সাথে সাক্ষাৎ হয় তখন মহাপ্রভু বেদান্ত দর্শন দিয়ে প্রকাশানন্দ সরস্বতীর সাথে তর্কে লিপ্ত হতে চাইলেন। আমাদেরও নিশ্চুপ থাকলে চলবে না। যদি কেউ বেদান্ত দর্শন নিয়ে আমাদের সাথে তর্কে লিপ্ত হতে চায় তবে আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে। যখন আমরা প্রচার করি তখন বিভিন্ন ধরনের বহু মানুষের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র আমাদের জন্য যথেষ্ট। আমাদের বাড়তি কোনো জ্ঞান লাভের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র হরেকৃষ্ণ জপের মাধ্যমেই আমরা পরম সিদ্ধি লাভ করতে পারব।
শ্যামসুন্দর : আপনি ইতোপূর্বে বলেছেন, আমাদের কাজের সময় এমনকি নখ কাটার সময়ও কৃষ্ণভাবনামৃত অবলম্বন করতে পারি।
প্রভুপাদ : হ্যাঁ।
শ্যামসুন্দর : তাই ভক্তিমূলক সেবার সাথে সাথে জপ করতে পারি। কৃষ্ণের প্রতি মনোযোগ নিবেশের পাশাপাশি আমাদের সেবা চালিয়ে যেতে পারি। এটিই কি সেই প্রক্রিয়া নয়?
প্রভুপাদ : হ্যাঁ, যে কোনো ভাবেই হোক। সম্পূর্ণ ধারণাটা হচ্ছে মন কৃষ্ণ নিবেশয়। অর্থাৎ মনকে অবশ্যই কৃষ্ণের প্রতি দৃঢ়ভাবে নিমগ্ন করতে হবে। এটিই হলো প্রক্রিয়া। হয় তুমি দর্শনের দিকে যাও অথবা তর্কের দিকে যাও, অথবা হরিনাম জপের মাধ্যমে যাও, যে কোনোভাবেই হোক। ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, যোগীনাম অপি সর্বেষাম- (গীতা-৬/৪৭)
সকল ধরনের যোগী…….. তোমার অবশ্যই এই শ্লোক পড়া উচিত।
জর্জ হ্যারিসন : আমি এখনও ষষ্ঠ অধ্যায়ের সম্পূর্ণটা পড়তে পারিনি।
প্রভুপাদ : ষষ্ঠ অধ্যায়ের সর্বশেষ শ্লোকে তোমরা পাবে যোগীনাম অপি সর্বেসাম মদ্‌গতেন। তোমাদের কাছে ভগবদ্গীতা যথাযথ আছে? সেখানে তোমরা দেখবে স্পষ্ট লেখা আছে, একজন যে যোগীর মন সর্বদা কৃষ্ণের প্রতি নিমগ্ন তিনি হলেন সর্বোত্তম যোগী। যোগীনাম অপি সর্বেসাম। সর্বেসাম মানে সমস্ত যোগীদের মধ্যে। বিভিন্ন প্রকারের যোগী রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র কৃষ্ণের পদারবিন্দে যাদের মন দৃঢ়ভাবে আকৃষ্ট তারাই সর্বোত্তম যোগী এবং সেই যোগী বা ভক্ত অন্তর্মন-“হৃদয়ের মধ্যে” এবং ভজতে—“ভগবানের সেবা করে, সমেযুক্ততমো মত, সে সর্বোত্তম যোগী। তমো-মানে সর্বোচ্চ, সর্বোত্তম। যুক্ততম অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ যোগী ।
জন লেনন : আমাদের যে রক্তবর্ণ প্রচ্ছদের ভগবদ্‌গীতা রয়েছে সেটি কার? আমি এই গীতাটি আমার অফিসে পেয়েছি। এছাড়াও একজন স্প্যানিস ভদ্রলোকের কাছে এই গীতাটি দেখেছি।
শ্যামসুন্দর : প্রভুপাদ যে বিষয়ে ব্যাখ্যা করছেন তা আমরা সঠিকভাবে বুঝতে পারিনি যে, ভগবদ্‌গীতার এই অনুবাদটি হচ্ছে পরম্পরাভাবে অনুমোদিত। যেহেতু তিনি বলেছেন, কৃষ্ণই হচ্ছেন আমাদের কর্তৃপক্ষ। তাই আমাদেরকে ভাবতে হবে যে, এই শৃঙ্খল বা পরম্পরা কৃষ্ণ থেকে এসেছে। কৃষ্ণ থেকে চারটি গুরু পরাম্পরা ধারা এসেছে। যার মধ্যে একটি পরাম্পরা এখানে বর্তমান।
জোকো উনো : শৃঙ্খল বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন?
শ্যামসুন্দর : এটি হচ্ছে গুরু পরম্পরা ধারা। শ্রীল প্রভুপাদ হচ্ছেন সেই গুরু পরাম্পরা ধারার একজন আচার্য।
প্রভুপাদ : ঠিক যেমন একটি শৃঙ্খল বললে আমরা খুব সহজে বুঝতে পারি। আপনি আপনার বন্ধুকে একটি মানি অর্ডার করেছেন। তবে সে কোন চ্যানেলের মাধ্যমে সেটি গ্রহণ করবে? সে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে সেটি গ্রহণ করবে। অন্য কোনো মাধ্যমে নয়। কেননা পোস্ট অফিসের পিয়নই কেবলমাত্র চিঠি বিলি করে। সেই বিষয়ে আপনি নিশ্চিত। আপনি অর্থ গ্রহণ করার পরও কেন পিয়নের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করছেন? কেননা, সেই পিয়ন হচ্ছেন পোস্ট অফিসের প্রতিনিধি। একইভাবে কৃষ্ণ হচ্ছেন প্রকৃত কর্তৃপক্ষ। তাই যারা কৃষ্ণের প্রতিনিধি তারাও কর্তৃপক্ষ। তাহলে কৃষ্ণের প্রতিনিধি কারা? ভগবদ্‌গীতা মতে, কৃষ্ণভক্তরাই হলেন কর্তৃপক্ষ। ঠিক যেমন আপনি কৃষ্ণভক্তদের মাধ্যমে এই ভগবদ্‌গীতা লাভ করেছেন। যিনি কৃষ্ণ সম্বন্ধে কিছুই জানেন না তিনি কিভাবে ভগবদ্‌গীতা সম্বন্ধে প্রচার করতে পারবেন? এটাই হলো সাধারণ বিষয়।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here