হরিনামের অর্থ ব্যাখ্যায় শ্রীল প্রভুপাদ

0
19

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥

এই অপ্রাকৃত মহামন্ত্র কীর্তনের ফলে আমাদের অপ্রাকৃত চেতনার পুনর্জাগরণ হয়। চিন্ময় আত্মারূপে আমরা সকলেই কৃষ্ণভাবনাময়, কিন্তু অনাদিকাল ধরে জড় জগতের সঙ্গে সংস্পর্শের ফলে, আমাদের চেতনা জড় কলুষের দ্বারা কলুষিত হয়ে পড়েছে। যে জড় পরিবেশে আমরা এখন বাস করছি, তাকে বলা হয় মায়া। মায়া মানে হচ্ছে ‘দযা নয়’। আর এই মায়া কি? এই মায়া হচ্ছে, জড়া প্রকৃতির উপর আমাদের প্রভুত্ব করার অপচেষ্টা। প্রকৃতপক্ষে, আমরা জড়া প্রকৃতির কঠোর নিয়মে আবদ্ধ। কোন ভৃত্য যখন কৃত্রিমভাবে তাঁর সর্বশক্তিমান প্রভুকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে, তখন বলা হয় যে, সে মায়াচ্ছন্ন আমরা এখন জড়া প্রকৃতির সম্পদগুলো ভোগ করার চেষ্টা করছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা জড়া প্রকৃতির জটিলতায় দৃঢ় থেকে দৃঢ়তরভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি। তাই যদিও জড়া প্রকৃতিকে ভোগ করার জন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা তার উপরে আরও বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। আমাদের কৃষ্ণভাবনার পুনর্জাগরণের ফলে জড়া প্রকৃতির সঙ্গে এই অলীক সংগ্রাম অচিরেই নিরসন হতে পারে।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥

এই মহামন্ত্র হচ্ছে আমাদের শুদ্ধ চেতনাকে জাগরিত করার অপ্রাকৃত পন্থা। অপ্রাকৃত শব্দতরঙ্গ উচ্চারণ করার ফলে, আমাদের হৃদয়ের সমস্ত কলুষ বিদূরিত হয়। হৃদয়ের সমস্ত কলুষের মূল কারণ হচ্ছে, সব কিছুর ওপর আধিপত্য করার ভ্রান্ত বাসনা।
কৃষ্ণভাবনামৃত মনের উপর কোন কৃত্রিম প্রক্রিয়ার আরোপ নয়। এই চেতনা জীবের মৌলিক এবং স্বাভাবিক বৃত্তি। আমরা যখন এই অপ্রাকৃত শব্দতরঙ্গ শ্রবণ করি, তখন আমাদের এই চেতনা জাগরিত হয়। ধ্যানের সব চাইতে সরল এই পন্থাটি এই যুগের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতেও আমরা দেখতে পাই যে, এই মহামন্ত্র কীর্তন করার ফলে তৎক্ষণাৎ চিন্ময় আনন্দ অনুভব করা যায়। জড়-জাগতিক জীবনে আমরা সকলেই নিম্নস্তরের পশুর মতো ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির প্রচেষ্টায় ব্যস্ত। এই ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির স্তর থেকে আর একটু উন্নত স্তরে মানুষ জড়-জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার যখন যথেষ্ট বুদ্ধি অর্জন করে, তখন অন্তরে এবং বাইরে সর্বকারণের পরম কারণ সম্বন্ধে জানতে চেষ্টা করে। আর কেউ যখন মন, বুদ্ধি এবং অহঙ্কারের স্তর অতিক্রম করে যথাযথভাবে পারমার্থিক জ্ঞান লাভ করেন, তখন তিনি অপ্রাকৃত স্তরে অধিষ্ঠিত হন। এই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন সম্পাদিত হয় আধ্যাত্মিক স্তরে এবং তাই এই শব্দতরঙ্গ সব রকম নিম্ন স্তরের চেতনা- যথা ইন্দ্রিয়জাত, মনোজাত অথবা বুদ্ধিজাত চেতনার স্তর অতিক্রম করে শুদ্ধ চিন্ময় স্তরে স্পন্দিত হয়। তাই এই মন্ত্রে ভাষা জানবার কোন প্রয়োজন নেই অথবা এই মহামন্ত্র কীর্তনের জন্য কোন রকম মনোধম প্রসূত জল্পনা-কল্পনা অথবা বিচার-বুদ্ধির সমন্বয় সাধনেরও প্রয়োজন হয় না। এটি স্বাভাবিকভাবে চিন্ময় স্তরে সম্পাদিত হয়। তাই যোগ্যতা নির্বিশেষে যে কেউ এই কীর্তনে অংশগ্রহণ করতে পারে। আরও উন্নত স্তরে, পারমার্থিক উপলব্ধির ভিত্তিতে সমস্ত অপরাধ মুক্ত হয়ে, এই মহামন্ত্র কীর্তন করতে হয় ।
এই মহামন্ত্র কীর্তনের শুরুতেই আটটি দিব্য আনন্দের উপলব্ধি নাও হতে পারে। সেই আটটি দিব্য আনন্দ হচ্ছে- (১) স্তম্ভ, (২) স্বেদ, (৩) পুলক, (৪) স্বরভেদ, (৫) কম্প, (৬) বৈবর্ণ, (৭) আনন্দজনিত ক্রন্দন ও (৮) সমাধি। প্রাথমিক স্তরে এই অষ্ট সাত্ত্বিক বিকারগুলো অনুভব নাও হতে পারে, কিন্তু এই মন্ত্র কীর্তন করার ফলে যে তৎক্ষণাৎ চিন্ময় স্তরে উন্নীত হওয়া যায়, সেই সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই এবং তার প্রথম লক্ষণ হচ্ছে এই মহামন্ত্র কীর্তন করার সঙ্গে সঙ্গে নৃত্য করার প্রবণতা। আমরা ব্যবহারিকভাবে তা দেখেছি। এই কীর্তনে একটি শিশু ও যোগদান করতে পারে। তবে যারা জড়-জাগতিক জীবনে অত্যন্ত গভীরভাবে আবদ্ধ, তাদের পক্ষে এই উপলব্ধির স্তরে উপনীত হতে কিছু সময় লাগে। কিন্তু এই ধরনের বিষয়ী মানুষেরাও এই মন্ত্র উচ্চারণের ফলে অচিরেই পারমার্থিক স্তরে উন্নীত হতে পারে। ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত যখন ভগবৎ-প্রেমে মগ্ন হয়ে এই মন্ত্র উচ্চারণ করেন, তখন তা শ্রবণে সব চাইতে বেশি ফলদায়ক হয়। এই মহামন্ত্রও কীর্তন সব সময় ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের শ্রীমুখ থেকেই শ্রবণ করা উচিত, যাতে তৎক্ষণাৎ তার সুফল লাভ করা যায়। যতদূর সম্ভব অভক্তের মুখ থেকে এই নাম শ্রবণ না করার চেষ্টা করতে হবে। সর্পোচ্ছিষ্ট দুধ যেমন বিষে পরিণত হয়, তেমনই অভক্তের মুখে এই নাম শ্রবণও তদ্রুপ খারাপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
‘হরা’ হচ্ছেন ভগবানের শক্তি এবং ‘হরে’ শব্দের মাধ্যমে তাঁকে সম্বোধন করা হচ্ছে। আর ‘কৃষ্ণ’ এবং ‘রাম’ হচ্ছে ভগবানের নাম। ‘কৃষ্ণ’ এবং ‘রাম’ উভয়েরই অর্থ হচ্ছে ‘পরম আনন্দ’। ‘হরা’ হচ্ছে ভগবানের পরম আনন্দদায়িনী হ্লাদিনী শক্তি। ভগবানের পরম আনন্দদায়িনী হ্লাদিনী শক্তি আমাদেরকে ভগবানের কাছে ফিরে যেতে সাহায্য করেন।
জড়া প্রকৃতি, যাকে বলা হয় ‘মায়া’, তাও হচ্ছে ভগবানের অনন্ত শক্তির এটি শক্তি। আমরা জীবেরা ভগবানের তটস্থা শক্তি। জীব পরা প্রকৃতির থেকে উৎকৃষ্টা শক্তি, তা যখন নিকৃষ্টা জড়া প্রকৃতির সংস্পর্শে আসে, তখন এক সঙ্গতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু উৎকৃষ্টা শক্তির সংস্পর্শে এলে আবার স্বাভাবিক আনন্দময় অবস্থা প্রাপ্ত হয়।
হরে, কৃষ্ণ এবং রাম এই তিনটি শব্দ হচ্ছে মহামন্ত্রের অপ্রাকৃত বীজ। এই কীর্তন হচ্ছে ভগবানের কাছে এবং তাঁর শক্তির কাছে বদ্ধ জীবের আশ্রয় ভিক্ষার ঐকান্তিক আবেদন। এই মন্ত্র কীর্তন ঠিক একটি শিশুর তার মায়ের জন্য ক্রন্দন করার মতো। হরা তাঁর ভক্তকে পরম পিতা ভগবানের কৃপা লাভের জন্য সাহায্য করেন এবং যে ভক্ত ঐকান্তিক নিষ্ঠা সহকারে এই মন্ত্র উচ্চারণ করেন, তাঁর কাছে ভগবান নিজেকে প্রকাশিত করেন প্রবঞ্চনা এবং প্রতারণার যুগ এই কলিযুগে কোন পন্থাই এই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার মতো এত কার্যকরী নয়।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥


ডিসেম্বর ২০২২ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here