সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা

0
222
ডা. প্রেমাঞ্জন দাস

বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক মহলে বহু রকমের সৃষ্টি তত্ত্বের কথা শোনা যায়। চান্স থিওরি, বিগ ব্যাঙ, ব্ল্যাক হোল, শূন্যবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। জগতে যত রকমের সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, সেগুলিকে সর্বমোট দু’ভাগে ভাগ করা যায় এবং তা নিম্নরূপ-

১. Something out of Something কিছু থেকে কিছু সৃষ্টি।

২. Something out of Nothing শূন্য থেকে কিছুর সৃষ্টি।

দ্বিতীয় তত্ত্বটি, অর্থাৎ শূন্য থেকে এই জগতের সৃষ্টি হলো, এটি একটি যুক্তিহীন তত্ত্ব।

কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণাগারে যদি একটি শূন্য জার বসিয়ে রাখা হয়, তা থেকে কিছুই সৃষ্টি হবে না। পৃথিবীর সমগ্র ইতিহাসে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত শুধু শূন্য থেকে কোনো কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। সুতরাং যারা বলে শূন্য থেকে জগতের সৃষ্টি হয়েছে, শুধু বদ্ধ পাগল এবং বিনা প্রমাণে, বিনা যুক্তিতে অন্ধ আবেগে ধাবিত হচ্ছে মাত্র।

এবার প্রথম তত্ত্বটির বিচার করা যাক। কিছু থেকে কিছুর সৃষ্টি হলো। X থেকে Y সৃষ্টি হলো। সহজ বুদ্ধিতে এই তত্ত্বটিকে অবশ্যই যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হয়। কারণ আমরা হামেশাই শত সহস্র X থেকে শত সহস্র Y কে সৃষ্টি হতে দেখি। একটি মাত্র ছাপাখানা থেকে শত সহস্র গ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। একটি মাত্র রান্নাঘর থেকে কত রকমের সুস্বাদু পদ বেরিয়ে আসছে। একটি মাত্র কাপড়ের কারখানা থেকে রঙ বেরঙের ডিজাইন করা শাড়ি ইত্যাদি বেরিয়ে আসছে। এইভাবে X থেকে Y, কিছু থেকে কিছুর সৃষ্টি আমরা হামেশাই দেখে থাকি। সুতরাং Something out of Something তত্ত্বটি নিঃসন্দেহে যুক্তিগ্রাহ্য সৃষ্টি তত্ত্ব।

তবে এখানেও একটি সুগভীর প্রশ্ন রয়েছে- X থেকে Y সৃষ্টি হলো। তাহলে X হচ্ছে Y সৃষ্টির উৎস। এবার এই X টি কীরকম। এই X টি কি কোন নির্বোধ জড় বস্তু, নাকি সুচতুর সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান ভগবান? একটি জটিল কম্পিউটার কখনো নির্বোধ জড় বস্তু থেকে সৃষ্টি হতে পারে না। মানুষের মস্তিষ্ক হচ্ছে এক অতি জটিল কম্পিউটার। তা কখনো কোনও নির্বোধ জড় বস্তু থেকে সৃষ্টি হতে পারে না। রঙ বেরঙের পাখি, বিচিত্র গন্ধময় ফুল, ফল, মশ4লা, জটিল শৃঙ্খলাবদ্ধ গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি, মহাজাগতিক ঋতু পরিবর্তন, সূর্য চন্দ্রের অশেষ তেজ- এসব কখনোই কোনও নির্বোধ জড় বস্তু থেকে আসতে পারে না। একটি সুন্দর ছবি যেমন এক খণ্ড নির্বোধ জড় বস্তু থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হতে পারে না, ঠিক তেমনি সুন্দর নর-নারী ময়ূরের পাখা, ফুল, পাখি ইত্যাদির মধ্যে আমরা যে অপূর্ব শিল্পকলা দর্শন করি, তার উৎস কখনো নির্বোধ জড় পিণ্ড হতে পারে না।

 ডারউইনের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা ভগবানের বংশধর নই, আমরা বানরের বংশধর। তাই আমরা বানরের মতোই নির্বোধ। কিন্তু যারা বানরের মতো নির্বোধ নয়, তারা কিন্তু বুঝতে পারেন, নিশ্চয়ই কিছু থেকে কিছুর সৃষ্টি হয়েছে- এ ব্যাপারে আমরা বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে একশো ভাগ একমত। কিন্তু সেই কখনো নির্বোধ নয়। সেই Something হচ্ছেন ষড় ঐশ্বর্যপূর্ণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। গীতা, ভাগবত ইত্যাদি বৈদিক গ্রন্থ থেকে সেই Something সম্পর্কে আমরা গভীর থেকে গভীরতম জ্ঞান লাভ করতে পারি। ভগবান যেহেতু নির্বোধ নন, তিনি আমাদের অসংখ্য শাস্ত্র দিয়েছেন, যুগে যুগে দূত পাঠাচ্ছেন, আবার নিজেও স্বয়ং অবতীর্ণ হন যুগে যুগে। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন: যখন যখন ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন তখন আমি সাধুদের সুরক্ষা এবং দুষ্টদের সংহার করার জন্য যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, ফেব্রুয়ারি ২০২0 সংখ্যা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here