’’শ্রী পঞ্চতত্ত্ব আজ আসছেন!”

0
81

যথাযথ শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী দক্ষিণ ভারতীয় প্রাচীন বিগ্রহ খোদাইকারীদের উত্তরসূরিরা তৈরি করলেন পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহসমূহ

ব্রজসেবকী দেবী দাসী

সূর্যকে কুয়াশার চাদরে ঢেকে রেখে হাড় কাঁপানাে শীতের আগমন। সমগ্র মায়াপুরও যেন সে চাদরের অংশীদার। কিন্তু সেই শীত যখন প্রস্থান নিল, যেন সেই উষ্ণ হাওয়ার দিনের পুনরাগমন ঘটেছে। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের এমনই খানিকটা উষ্ণ এক সকালে আগমন ঘটেছে আরেক জনের, তাঁর আগমনে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল যেন হইহই রব। তিনি হলেন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু। তবে

ভক্তিসিদ্ধান্ত রোডে ভক্তদের শোভাযাত্রা সহকারে মায়াপুর ইস্কন মন্দিরে পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহের আগমন। (ওপরে) বিগ্রহ তৈরির বিভিন্ন পর্যায় (ডানে ওপর থেকে নীচে): প্রথম ধাপে মৃত্তিকা দ্বারা আবৃত মোমের তৈরি বিগ্রহের গঠন যা ধাতব বস্তু দ্বারা পুঞ্জীভূত করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে বিগ্রহ কাঠামোতে কিছু ছিদ্র অন্তর্ভুক্ত করে, সেগুলো দিয়ে গলিত ধাতু প্রবেশ করানো হয় । তৃতীয় ধাপে পূর্ণ কাঠামোটিকে একটি উত্তপ্ত চুল্লিতে স্থাপন করা হয়।

তিনি একা নন সাথে আগমন ঘটেছে তাঁর পার্ষদদেরও। ঐ সময় সবার মুখে ঐ একটিই কথা,

‘শ্রী পঞ্চতত্ত্ব আজ আসছেন’।
ভক্তরা সবাই ঝড়ের গতিতে মন্দিরের প্রধান তােড়ন হয়ে ভক্তিসিদ্ধান্ত সড়কের ওপর এসে হাজির। সবাই হাঁটতে শুরু করল এবং তাদের গন্তব্যস্থল ছিল, শ্রী মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দির থেকে এক কিলােমিটার দূরে অবস্থিত শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব স্থান, যােগপীঠ। ভক্তরা সবাই যােগপীঠের তােড়নগুলাের সামনে জড়াে হয়, যেখানে কিছুক্ষণের মধ্যেই পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহের আগমন ঘটবে। উদ্বিগ্ন এবং কৌতূহল ভক্তরা সবাই প্রতীক্ষা করছে, কখন তাদের প্রাণপ্রিয় বিগ্রহগুলি এসে পৌঁছবে। অবশেষে খানিকক্ষণ পর অনেক দূর থেকে ভক্তদের কীর্তনের সুর ভেসে এল। বিগ্রহকে ট্রাকে করে নিয়ে আসতে শত শত ভক্তদের যে বিশাল দলটি গিয়েছিল, তাদেরই গাওয়া কীর্তনের সেই সুমধুর সুর এখন দূর থেকে ভেসে আসছে।
অবশেষে বিগ্রহ সমন্বিত সেই বিশাল শােভাযাত্রাটি সবার দৃষ্টিগােচর হবে, প্রতীক্ষারত ভক্তরা তা দর্শন করে দিব্য আনন্দে উদ্ভাসিত হয় । বিশাল শােভাযাত্রাটি দেখে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। বাঁশের অগ্রভাগে আটকানাে রং-বেরঙের অনেক পতাকা উড়ছে। সেইসাথে ট্রাকের চারপাশে ভক্তদের স্রোত, সত্যিই এক মনােরম দৃশ্য।
এদিকে যােগপীঠে অপেক্ষারত ভক্তরা বিগ্রহসহ ভক্তদের শােভাযাত্রাটি দর্শন করা মাত্রই ভূমিতে লুটিয়ে তাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করতে করলেন। ট্রাক চালক পাঁচদিন ধরে গাড়ি চালিয়ে দক্ষিণ ভারতের কুম্বকোনাম থেকে এখন অবশেষে মায়াপুরে।
এদিকে আগত শােভাযাত্রাটির সঙ্গে যােগপীঠের ভক্তদের কীর্তন সামিল হলাে এবং এটি উত্তরােত্তর আরাে বর্ধিত হতে লাগলাে। ভক্তরা একে অপরকে পরমানন্দে আলিঙ্গন করতে লাগলেন। সেইসাথে উদ্দণ্ড নৃত্যও চলতে লাগল। স্থানীয় গ্রামবাসী ও দোকানীরা অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে এই অতি মনােরম শােভাযাত্রাটির উৎসের সন্ধানে ব্যস্ত। যােগপীঠের পাশেই পাঁচ তলা বিশিষ্ট একটি দালানের নির্মাণকার্য বন্ধ করে শ্রমিকরা বারান্দায় এসে ভিড়
করেছে। তাদের মুখমণ্ডলে ছিল বাঁধভাঙা হাসির জোয়ার।
ট্রাকটি ধীরে ধীরে গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। একসময় দৃশ্যমান হয় নিত্যানন্দ প্রভুর একটি হস্ত। অতি সাবধানে আবৃত থাকা সত্ত্বেও আবরণটি খানিকটা খুলে যায়, আর তাতেই ভক্তরা ব্যস্ত হয়ে পরে, তার প্রথম আশীর্বাদ লাভের জন্য। পরম করুণাময় শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর দিব্য আঙ্গুলের কিঞ্চিৎ প্রেমময়ী স্পর্শ ভক্তদের আনন্দকে আরাে বর্ধিত করছিল।
অবশেষে মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দিরের পেছনের প্রবেশদ্বার দিয়ে ট্রাকটি প্রবেশ
করে। তখন বিগ্রহের চারপাশে নিরাপত্তাস্বরূপ ভক্তরা অবস্থান করেন। এখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে শ্রীনিত্যানন্দ, শ্রীঅদ্বৈত আচার্য, শ্রীগদাধর এবং শ্রীবাস পণ্ডিতের বিগ্রহ মায়াপুরে।
 
পনেরাে শত বছরের ঐতিহ্য
 
শ্রীপঞ্চতত্ত্বের ভ্রমণ শুরু হয়েছিল স্বামীমালায় গ্রাম থেকে, যেখানে স্থপতি দেবসেনাপতি এবং তাঁর পুত্র রাধাকৃষ্ণ এবং শ্রীকান্তের সুদক্ষ হস্তে বিগ্রহগুলাে গড়ে তােলা হয়। পারিবারিকভাবে বিগ্রহ তৈরির এই ঐতিহ্য পনেরাে শত বছর পূর্বে রাজা ছােলের আমল থেকে, তিনশত প্রজন্ম ধরে। রাজা তখন তানজোর জেলা শাসন করতেন এবং তাঁর শাসনামলে চিত্রকর্ম, গানবাজনা, ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যশিল্পের প্রতি অধিক গুরুত্ব আরােপ করা যায়। তখন তিনি একটি মন্দির নির্মাণের বাসনা করলে উত্তর ভারত থেকে স্থপতিদেরকে (বিগ্রহ খােদাইকারী) পরিবারসহ সেই স্থানে নিয়ে আসেন। মন্দিরটি তৈরি করতে প্রায় ত্রিশ বছর সময় লেগেছিল যা আজও ঠাই দাড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের নিদর্শনস্বরূপ এবং সেটি তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মন্দির ছিল। এর গম্বুজটি নির্মাণ করা হয়েছিল একটি পাথর থেকে, যার ওজন ছিল প্রায় আশি টন এবং এটি পুরাে মন্দিরকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে। যেন মন্দিরের ছায়া কখনাে মাটিতে স্পর্শ না করে। মন্দিরটির নির্মাণকার্য সম্পন্ন হওয়ার পরও স্থপতিরা সেইস্থানে রয়ে যায় এবং আজও তারা স্বামীমালায় অবস্থান করছেন।
বিগ্রহ তৈরির পূর্বে, অনেক প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল; এই বিগ্রহগুলি তৈরির সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ভরত মহারাজ দাস। তিনি প্রথম থেকেই বিগ্রহ তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে রচিত শিল্প শাস্ত্রসমূহ অধ্যয়ন করেন।
তিনি একটি প্রধান সমস্যা আবিষ্কার করেন, বাংলার ঐতিহ্য থেকে শ্রীপঞ্চতত্ত্বের আরাধনার সূত্রপাত। কিন্তু তাঁদের আরাধনার জন্য কোনাে শাস্ত্র নেই। তাই ভরত দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং বিগ্রহগুলাের বৈশিষ্ট্যসূচক ধারণা অর্জন করেন প্রায় পাঁচশ বছর পূর্বের নবদ্বীপে পঞ্চতত্ত্বের অতীত লীলাবিলাসের লিখিত দলিল থেকে।
ইসকন মায়াপুরের প্রধান পূজারি শ্রীপাদ জননিবাস দাস স্থপতি রাধাকৃষ্ণের খোদাইকৃত নকশা পর্যবেক্ষণ করছেন। (ওপরে) শিল্পীরা বিগ্রহের ওপর নকশা খোদাই করছেন। (ডানে)
কিন্তু এখনও বিগ্রহ সম্পর্কে অনেক বিষয় জানার বাকি, যাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বিগ্রহের উচ্চতা এবং তাঁদের অঙ্গভঙ্গির বিষয়গুলােও। ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে, শ্রীমায়াপুর প্রােজেক্ট ডেভেলপেমেন্ট কমিটি (SMPDC) চৈতন্য চন্দ্রোদয় দাসের প্রস্তাবিত দাঁড়ানাের অঙ্গভঙ্গির ওপর কিছু অঙ্কিত ছবির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। উল্লেখ্য, চৈতন্য চন্দ্রোদয় দাস SMPDC এর লন্ডন অফিসে সেবা করতেন।
ভরত মহারাজের শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং তার অংকিত নকশা ও মাটির তৈরি শ্রীপঞ্চতত্ত্বের নমুনা, বিগ্রহ দেখতে কেমন হবে তার একটি শক্তিশালী ধারণা দান করে। তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে মায়াপুরের প্রধান পূজারি শ্রীপাদ জননিবাস দাসের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিলেন। শ্রীপাদ জননিবাস প্রভুর নির্দেশনাসমূহ পঞ্চতত্ত্বের প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য ও ভাবসম্পর্কিত ছিল ।
“আমরা শুধু কিছু ফর্মুলা বা কম্পিউটারের ক্যালকুলেশন অনুসারে এ বিগ্রহগুলাে তৈরি করিনি।” ভরত মহারাজ বলছিলেন, “শ্রীপাদ জননিবাস প্রভু প্রতিটি বিগ্রহের মধ্যে ভাব ও ব্যক্তিত্ব স্থাপন করেন; তিনি বিগ্রহের ভাবকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যেটি আপনারা প্রতিটি বিগ্রহের মুখমণ্ডলে দর্শন করছেন।”
শ্রীপাদ জননিবাস প্রভু তাঁর দিক্-নির্দেশনার যথার্থ বাস্তবায়নের জন্য ভরতের উপর নির্ভর করতেন, যিনি পরবর্তীতে বিগ্রহের বিশেষ বিশেষ অংশ নির্দেশনা অনুসারে মাটির মডেল তৈরি করেছিলেন। তারপর শিল্পীরা মডেলগুলাে যথাযথ অনুকরণ করে চূড়ান্ত খােদাই সম্পন্ন করত। এভাবে প্রতিটি বিগ্রহ তৈরি করা হয়েছিল। বিগ্রহের ফাইবার গ্লাস মডেলগুলাে পাঠানাে হয়েছিল দক্ষিণ ভারতে। প্রধান স্থপতি দেবসেনাপতি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নমুনাটি দেখে অনুমােদন করলেন এবং বললেন, এটি যথার্থই দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্র এবং ঐতিহ্য মেনেই তৈরি করা হয়েছে।

তিনি এই কার্যটি করতে সম্মতি প্রকাশ করে তাঁর পুত্রদের বললেন, “এই সেবাটি যত্ন সহকারে কর- এটি একটি বিশেষ প্রােজেক্ট”। দুঃখজনকভাবে দেবসেনাপতি এর ফলাফলটি দেখে যেতে পারেননি: তিনি বিগ্রহ হয়েছিল দক্ষিণ ভারতে। প্রধান স্থপতি দেবসেনাপতি শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর নমুনাটি দেখে অনুমােদন করলেন এবং বললেন এটি যথার্থই দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্র এবং ঐতিহ্য মেনেই তৈরি করা হয়েছে। তিনি এই কার্যটি করতে সম্মতি জ্ঞাপন করে তার পুত্রদের বললেন, “এই সেবাটি যত্ন সহকারে কর-এটি একটি বিশেষ প্রােজেক্ট”

পূর্ণরূপে ভগবান নিত্যানন্দ বিগ্রহের অবয়ব (ওপরে) বামে এবং নিচে, শিল্পকাররা বিগ্রহের ভিত্তিস্তর প্রস্তুত করছেন।

। দুর্ভাগ্যবশত দেবসেনাপতি এর ফলাফলটি দেখে যেতে পারেননি: তিনি বিগ্রহ তৈরির কার্যটি শুরু হওয়ার পূর্বেই ২০০২ সালে দেহত্যাগ করেন। দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে বিগ্রহের দিব্যঅঙ্গে প্রদর্শিত প্রধান নিদর্শনসমূহ হলাে, অলংকারাদি ও জটিল কারুকার্য। দেবসেনাপতি কর্তৃক শ্রীপাদ জননিবাস প্রভুর প্রতি শর্ত ছিল যে, তিনি বিগ্রহের শ্রীঅঙ্গে যতটুকু সম্ভব এই সমস্ত ঐতিহ্যবাহী অলংকার অন্তর্ভুক্ত করবেন।

 
তিনি জননিবাস প্রভুকে বলেছিলেন, এই শর্তটি অবশ্যই পূরণ করতে হবে; অন্যথায় তার বংশধরা অভিশপ্ত হবেন। কেননা স্থপতিরা কখনাে বস্ত্রবিহীন বিগ্রহ তৈরি করেননা। শ্রীপাদ জননিবাস প্রভু এতে সম্মতি দেন। অবশেষে তাই হল।
 
ভরত মহারাজকে দক্ষিণ ভারত থেকে আনা হয় খােদাই করার প্রতিটি পর্যায়ে যথার্থ উপাদানসমূহ ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের জন্য।
ভরত বললেন, “প্রতিটি পর্যায়ে পরিবর্তন পরিলক্ষিত করছিলাম এবং প্রতিটি ব্যক্তিই প্রয়ােজনীয় উপাদান সংযােগের কার্যে জড়িত ছিলেন। আমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলাম। সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে রয়েছে বিভিন্ন ধারণা। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকান উপজাতীয় ঐতিহ্যে বিগ্রহের দীর্ঘ কণ্ঠ থাকাকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দক্ষিণ ভারতের ক্ষেত্রে বিগ্রহের জন্য তাঁদের সৌন্দর্যের ধারণাটি বাঙালিদের থেকে ভিন্ন। তাই দক্ষিণ ভারতীয় স্থপতি এবং পশ্চিমা ভক্তদের যৌথ প্রচেষ্টায় আমরা এই বিগ্রহগুলাে তৈরি করছি।” তিনি মৃদু হেসে এর ফলাফলটি কি তা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, “পরিণতিটি অভূতপূর্ব সুন্দর।”
 
সঠিক সময়ে সঠিক কাজ
 
২০০১ সালের শেষের দিকে বিগ্রহ তৈরির ব্যাপারটি স্থির অবস্থানে ছিল। গঙ্গা দাস এবং ভাগবতমৃত দাস, উভয়ই এই বিগ্রহ তৈরির প্রােজেক্টে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জড়িত ছিলেন, তাঁরা সে-সময় সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এখনই যথার্থ সময় পুরাে প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়িত করার। তাঁরা বিষয়টিকে স্থির অবস্থান থেকে গতিশীল করার জন্য দৃঢ়তা প্রকাশ করেন এবং শেষ পর্যন্ত এটি নিয়ে যেতে প্রয়াসী হন।
গঙ্গা দাস ভরতকে বলেন, “আমরা ভাবছিলাম আমরা তাে মােটরবাইকে চড়ে দক্ষিণ ভারতে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে পারি এবং সব ঠিকঠাক হলে এই বিগ্রহগুলি আমরা ওখানেই তৈরি করতে পারি!
বিগ্রহ তৈরির পুরাে বিষয়টিই বাস্তবায়ন হতে অনেক দিন সময় লাগত, কিন্তু এতে কোনাে সন্দেহই নেই যে, মূলত এ দুইজন ভক্তের জড়িত থাকার ফলেই এই বিশাল প্রক্রিয়াটি সুসম্পন্ন হয়েছে। তারা দেবসেনাপতির সঙ্গে দেখা করেন এবং দেবসেনাপতি তখন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাধাকৃষ্ণকে মায়াপুরে পাঠান। রাধাকৃষ্ণ সবকিছু অবগত হলে, তিনি তাঁর পূর্বের কাজগুলাের কিছু নমুনা ভক্তদের সম্মুখে উপস্থাপন করেন। দেবসেনাপতির অসুস্থতার কারণে বিগ্রহ তৈরির ভারটি অর্পণ করা হয় রাধাকৃষ্ণ এবং তার ভাই শ্রীকান্তকে।
খােদাই প্রস্তুতি শুরু হয় বিশেষ পূজা সম্পাদনের মাধ্যমে। প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যক্ত করতে গিয়ে রাধাকৃষ্ণ বলেন, “বিগ্রহ খােদাই প্রক্রিয়াটি মনগড়া প্রক্রিয়ায় হয় না। এর সবকিছুই সম্পাদিত হয় সংস্কৃতি অনুসারে।
প্রথমে রাধাকৃষ্ণ ও শ্রীকান্তের সাথে তাঁদের পত্নীরা খােদাইকৃত স্থানে ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ জানান। তারপর একটি অগ্নিযজ্ঞের মাধ্যমে পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া সম্পাদিত হয় এবং ব্রাহ্মণদের কাছে বর চাওয়া হয় যেন কার্যটি সুন্দরভাবে অতিবাহিত হয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে গাে-পূজা এবং তুলসী পূজা সম্পাদন করা হয়। অবশেষে অগ্নি দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা সম্পাদিত হয়। কারণ বিগ্রহ তৈরির জন্য অগ্নির তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিগ্রহ তৈরির সময়কালীন ৬০ থেকে ১০০ জন ভক্ত নিরন্তর কীর্তন করতে থাকে।
২০০৩ সালের এপ্রিলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিগ্রহ তৈরি সম্পন্ন হয়। এরপর যথাক্রমে সম্পন্ন হয়, নিত্যানন্দ, গদাধর, অদ্বৈত প্রভু এবং অবশেষে শ্রীবাসের বিগ্রহ। প্রতিটি বিগ্রহের গঠন তৈরি সম্পাদিত হয় অত্যন্ত কঠোরভাবে | জ্যোতির্বিদ্যার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে শুভ দিন, ঘণ্টা এবং মিনিট ইত্যাদি শাস্ত্রানুসারে নির্ধারণ করা হয় ।
দিব্য আনন্দে শ্রীপঞ্চতত্ত্বের চরণে এক ভক্তের প্রেমময়ী আলিঙ্গন (ওপরে) দক্ষিণ ভারতীয় সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত বিগ্রহের শিল্পকর্ম। (বামে)
গদাধরের বিগ্রহ তৈরির সময় ভারী বৃষ্টিপাত হতে থাকে এবং স্থানটি কাজ করার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। গলিত ধাতুর প্রচণ্ড তাপের কারণে ধাতুর মধ্যে এক ফোটা জল মিশতে পারবে না; যদি কোনােরকমে মিশে যায় তবে তা ছােটখাটো বিস্ফোরণ ঘটতে পারে ।
নিত্যানন্দ প্রভু যখন বাংলায় প্রচার রাধাকৃষ্ণ জননিবাস প্রভুকে বললেন, “হয়তাে আজকে আর কাজ করা যাবে না। এজন্যে ভগবানের কিছুটা কৃপার প্রয়ােজন ছিল এবং যেন কৃষ্ণ তারই ব্যবস্থা করে দিলেন।
গঙ্গা দাস বলছিলেন, “পুরাে আকাশজুড়ে কালাে মেঘ এবং অবিরত বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। কিন্তু ঐ বিশেষ নির্মাণ স্থানটি ছিল পুরােপুরিই শুকনাে”। ফলে বিগ্রহ তৈরির কার্য দিন-রাত চলতে থাকে। যখন তাদেরকে সাহায্যের জন্য বাইরের কারাে সাহায্যের প্রয়ােজন আছে কিনা জানতে চাওয়া হয় তখন শ্রমিকরা তার নিরর্থকতা প্রকাশ করে : শুধুমাত্র তারা ছাড়া আর কেউই এই বিগ্রহ তৈরির কার্যটি করতে পারবে না!
শ্রীপঞ্চতত্ত্বকে মন্দিরে স্থাপনের উদ্দেশ্যে ভক্তদের অক্লান্ত শ্রম
তারা দ্রুতগতিতে কাজ করতে লাগলেন। রাধাকৃষ্ণ বলেন যে, ভাগবতামৃতের তড়িঘড়ির কারণেই বিগ্রহ তৈরির কার্যটি ঠিক সময়ে সম্পাদিত হয়। তিনি প্রতিদিনই সব পর্যবেক্ষণ করতেন, সবাইকে দ্রুত কাজ করার জন্য উৎসাহ দিতেন। মায়াপুরে ঠিক সময়ে শ্রীপঞ্চতত্ত্বের আগমনের পেছনে তারই প্রধান ভূমিকা ছিল। দক্ষিণ ভারত থেকে তড়িৎ গতিতে পাঠানাে তার ই-মেইলগুলাে যে বার্তাটি সারা বিশ্বে ড়িয়ে দিয়েছিল তা হল-মায়াপুর আগমনের উদ্দেশ্যে শ্রীপঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহ প্রস্তুত।
 
একটি অর্জিত উপাধি
 
বিগ্রহগুলি ট্রাকে বহন করা এবং নামানাের কাজগুলাে কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখিন হন, যার জন্য কয়েকদিন লেগে গিয়েছিল। অক্ষতভাবে বিগ্রহ বহন ও নামানাের দায়িত্বে নিয়ােজিত প্রধান ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন রবি চন্দ্র। কার্যটি তাঁর সামর্থ্য অনুসারে তিনি করতে পেরেছিলেন, অবশ্য এজন্য তার হাতের যথেষ্ট ক্ষতিও হয়েছিল। নিত্যানন্দ প্রভুকে ট্রাকে ওঠানাের সময় বিগ্রহ পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে, তিনি হাত দিয়ে প্রায় আড়াই টন ওজনের বিগ্রহকে থামানাের চেষ্টা করেন। যেকোনাে ভাবেই হােক তিনি এ প্রচেষ্টায় সফল হলে নিত্যানন্দ প্রভুকে রক্ষা করা যায়। কিন্তু রবির বাম হাতটি, বিগ্রহের বাম হাতের নীচে চাপা পড়ে। রবির হাতটি উদ্ধারের পর চব্বিশটি সেলাই দিতে হয়। এমনকি তার ডান হাতের একটি আঙুলও ভেঙ্গে যায়। তথাপিও তিনি পরের দিন আবারও তার নিজ কর্তব্যে ফিরে আসেন।
বিগ্রহের অভিষেক পর্যন্ত পরিশুদ্ধিকরণ অতিবাহিত হল। রাধাকৃষ্ণকে দেখে বিশেষভাবে কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছিল। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় তাঁর কার্যে তিনি সন্তুষ্ট কিনা।
শ্রীবিগ্রহের বেদিতে প্রবেশ
তিনি উত্তর দেন, “সাধারণত যখন আমরা কোনাে কার্য শুরু করি, আমাদের পিতা সর্বদা আমাদের পরিচালনা করতেন। একটি কার্য শেষ হওয়ার পর আমরা তার সম্মতি জানতে চাইতাম। কিন্তু এখন আমাদের পিতা নেই, তাই আমরা চেষ্টা করেছিলাম তার উপস্থিতিতে আমরা পূর্বে যা করেছিলাম, তার চেয়েও যেন এ কার্যটি ভালােভাবে সম্পাদিত হয়; যাতে করে আমরা বুঝতে পারি যে, বর্তমানে তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, আমাদের কার্যে তিনি সন্তুষ্ট।”
তিনি আরাে বলেন যে, বিগ্রহের পরিপূর্ণতা এবং প্রথম বিগ্রহ দর্শনের সময় ভক্তদের প্রতিক্রিয়া ছিল তার জন্য ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
“আমি বিগ্রহের সম্মুখে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু যখন দ্বার উন্মােচিত হল এবং ভক্তরা প্রবল আনন্দে চিৎকার করছিলেন, আমি ভাবছিলাম আমার পেছনে দাঁড়ানােই উচিত। কেননা বিগ্রহ দর্শনের পর ভক্তদের গভীর আনন্দময় মুখগুলাে আমি দর্শন করতে চেয়েছিলাম।”
অভিষেক অনুষ্ঠান বিষয়ে রাধাকৃষ্ণ বলেন, “আমি এ পর্যন্ত যত বিগ্রহ অভিষেক অনুষ্ঠান দর্শন করেছি, তার মধ্যে এটিই হল সর্বোকৃষ্ট।” তিনি ভক্তদের প্রতিক্রিয়া দেখে বিস্মিত হয়েছিলেনঃ ভক্তদের চোখগুলাে থেকে দিব্য আনন্দের জলধারা প্রবাহিত হচ্ছিল এবং তাদের হরিনাম কীর্তন ও আনন্দদায়ক মুখগুলাে প্রকৃতপক্ষে বিগ্রহের প্রতি তাঁদের গভীর ভালােবাসা প্রদর্শন করছিল।
মায়াপুরে ভক্তদের হাতে বিগ্রহগুলাে অর্পণ করার পর তিনি কেমন অনুভব করছেন জানতে চাইলে রাধাকৃষ্ণ বলেন, “সাধারণত পিতা দেখতে পছন্দ করেন যে, তার পুত্র খুব ভালাে ভাবেই আছেন, পিতার মত নয় বরং তার চেয়েও ভালভাবে। অনুরূপভাবে, যেহেতু আমি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর পরিকরদের তৈরি করেছি তাই তারা এখন আমার পুত্রের মতই।”
খানিকটা থেমে তিনি পুনরায় বলেন, “যখন আমি দেখলাম যে কত সুন্দরভাবে ভগবানকে সবাই আরাধনা করছে, আমি তখন অত্যন্ত খুশি হই।”এই বলতে বলতে তাঁর বস্ত্রের একটি কোণা উপরের দিকে তুলে চোখ মুছতে লাগলেন। তিনি কাঁদছিলেন। “আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, সবকিছু খুব সুন্দরভাবেই হয়েছে। তাঁর এই অভিব্যক্তি প্রমাণ কর যে, তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।
“ইতােপূর্বে অনেক বিগ্রহ তৈরি করেছি আমি, কিন্তু শুধুমাত্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই বিগ্রহ তৈরির পর আমি এখন বলতে পারি যে, ‘স্থপতি নামের যে উপাধি সেটি এখন আমার অর্জিত হয়েছে।” রাধাকৃষ্ণের শেষের এই উক্তিটির সঙ্গে নিশ্চিতভাবে ভক্তরাও সম্মত হবেন।

ব্রজ সখী দেবী দাসী শ্রীমৎ তমালকৃষ্ণ গোস্বামীর একজন শিষ্যা, লেখিকা। কৃষ্ণভাবনামৃতের ওপর তাঁর অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং সে সাথে অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনে কৃষ্ণভাবনামৃত বিষয়ক তাঁর রচিত বিভিন্ন কবিতা প্রকাশিত হয় । 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল – জুন ২০১৩

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here