শ্রীকৃষ্ণ পরম বিজ্ঞানী

0
90
পরম বিজ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণের বুদ্ধিমত্তা ও সামর্থ্য অচিন্ত্য। কোনাে বিজ্ঞানী এটি অস্বীকার করতে পারে না।
স্বরূপ দামােদর স্বামী
 
আমরা যখন শান্তভাবে এবং সতর্কতার সাথে এই বিস্ময়কর মহাবিশ্ব সম্পর্কে ভাবি, তখন আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই যে, সবকিছুই পরম মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। প্রকৃতিতে সবকিছুই পূর্ণভাবে ক্রমবিন্যস্ত। কোনাে ধরনের বৈজ্ঞানিক কিংবা প্রকৌশলীর মস্তিষ্ক ছাড়াই সবকিছুই পর্যায়ক্রমিকভাবে সুসম্পন্ন হচ্ছে। একটি সাধারণ কথা প্রচলিত আছে যে, প্রত্যেক ক্রিয়ার পেছনে একটি কারণ লুকিয়ে রয়েছে।
সমস্ত রাসায়নিক উপাদানগুলাের সংমিশ্রনে তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন আবিষ্কার। কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষের কর্তব্য, এই প্রশ্ন করা যে, এই রাসায়নিক উপাদানগুলাের উৎসের পেছনে কে রয়েছেন?
একজন চালক ছাড়া কখনােই মেশিন চলতে পারে না। আধুনিক বিজ্ঞানীরা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রসমূহ নিয়ে গর্বিত হন, কিন্তু স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মধ্যেও বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্ক কাজ করছে। এমনকি আলবার্ট আইনস্টাইনও স্বীকার করেছেন যে, এই সকল প্রকারের প্রাকৃতিক, শারীরিক নিয়মগুলাের পেছনে একটি নিখুঁত মস্তিষ্ক কাজ করছে। যখন আমরা মস্তিষ্ক ও চালক’ সম্পর্কিত কথা বলি, তখন এটির দ্বারা, একজন ব্যক্তিকে নির্দেশ করা হয়। সেটি কোনাে ব্যক্তিত্বসম্পর্কশূন্য কেউ হতে পারেন না। কেউ হয়তাে অনুসন্ধান করতে পারে যে, সেই ব্যক্তিটি কে? তিনি হলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম বিজ্ঞানী এবং পরম প্রকৌশলী, যাঁর কৃপাতেই সমগ্র বিশ্বজগৎ-পরিচালিত হচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “এই জগৎ আমারই প্রকৃতির অধীন। তা প্রকৃতির বশে অবশ হয়ে আমার ইচ্ছার দ্বারা পুনঃ পুনঃ সৃষ্ট হয় এবং আমারই ইচ্ছায় অন্তকালে বিনষ্ট হয় ।
প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য বিসৃজামি পুনঃ পুনঃ ।
ভূতগ্রামমিমং কৃৎস্মমবশং প্রকৃতের্বশাৎ॥
                                                                                       (ভগবদ্গীতা ৯/৮)
এখন আমরা ভগবানের সৃষ্টির কিছু নমুনার দিকে দৃষ্টিপাত করব। এই আদর্শ দৃষ্টান্তমূলক দিকসমূহ গভীরভাবে চিন্তা করার মাধ্যমে সবার উচিত সর্বোচ্চ শক্তিশালী মস্তিষ্ক ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অস্তিত্ব সম্পর্কে বােঝা এবং যথাযথ উপলব্ধি লাভ করা। প্রতিদিন আমরা যে সূর্যকে দেখতে পাই সেটি হল সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র। পৃথিবীর ব্যাসের সমান ১০০টি পৃথিবীর সমান দূরত্বে এটি অবস্থিত যা পৃথিবী থেকে ৯৩ মিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থিত। প্রতিদিন সূর্য এই সৌরজগতে প্রচণ্ড তাপ, আলাে এবং শক্তি সরবরাহ করছে। অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ সূর্যের যে শক্তি পৃথিবীর ওপর পড়ছে তা পৃথিবীর সমস্ত কলকারখানায় মােট যে শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে তার চেয়ে ১ লক্ষ গুণ বেশি। সূর্য এক সেকেন্ডে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত করে তা দিয়ে একটি এক কিলােওয়াট ইলেকট্রিক চুল্লিকে ১০ হাজার মিলিয়ন বছর অনবরত জ্বালানাে যাবে। অন্যভাবে দৃষ্টিপাত করলে আমরা পাই যে, সূর্য এক সেকেন্ডে যে পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করে তা মানুষ সৃষ্টি থেকে এখন পর্যন্ত যে শক্তি ব্যয় করেছে তার চেয়ে অনেক বেশি (Fred Hoyle, Astronomy (Garden city, New York Doubleday and Company, 1962), P. 232) । এ ছাড়াও মহাকাশে বিভিন্ন দিকে অবস্থানকারী যে পরিমাণ তারকা রয়েছে তা গণনা করা অসম্ভব। জড় বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্কের সাহায্যে তাপীয়, বৈদ্যুতিক এবং পারমাণবিক শক্তিঘর তৈরি করা হয়েছে। এই শক্তিঘরগুলাে তাপ, আলাে এবং শক্তি প্রদান করছে খুবই ক্ষুদ্র এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমগ্র সৌরজগতে অসীম শক্তি প্রদান করেছেন শুধুমাত্র একটি সূর্য দ্বারা। কৃষ্ণ বলেছেন, “সূর্যের যে জ্যোতি এবং চন্দ্র ও অগ্নির যে জ্যোতি সমগ্র জগৎকে উদ্ভাসিত করে, আমারই তেজ বলে জানবে।“
যদাদিত্যগতং তেজো জগদ্ ভাসয়তেহখিলম্ ।
যচ্চন্দ্রমসি যচ্চাগ্নৌ তত্তেজো বিদ্ধি মামকম্ ।।
                                                                          (ভগবদ্গীতা ১৫/১২)
গ্রহসমূহ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সূর্যের চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান রয়েছে। এমনকি ক্ষুদ্র অণু, ইলেকট্রন এবং প্রােটনও অত্যন্ত সঠিকভাবে নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে আবর্তন করছে। তাই অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু থেকে শুরু করে বৃহৎ সৌরজাগতিক বস্তু পর্যন্ত সবকিছুই অসাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মে জটিল কিন্তু নির্দিষ্ট সময়াঙ্গিকে ঘুরছে। বিজ্ঞানীরা কয়েকটি মহাকাশযান তৈরি করেই উচ্চতর প্রশংসা লাভ করছেন, যেখানে কৃষ্ণ অনন্ত বৃহদাকার মহাকাশযান প্রদান করেছেন যেমন গ্রহ ও তারাসমূহ, যেগুলাে সঠিকভাবে সজ্জিত ও পরিচালিত হচ্ছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-
“গামাবিশ্য চ ভূতানি ধারয়াম্যহমােজসা।
পুষ্ণামি চৌষধীঃ সর্বাঃ সােমাে ভূত্বা রসাত্মকঃ।।
আমি পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হয়ে আমার শক্তির দ্বারা সমস্ত জীবদের ধারণ করি এবং রসাত্মক চন্দ্ররূপে ধান, যব আদি ওষধি পুষ্ট করছি।” (ভগবদ্গীতা ১৫/১৩)
পরমেশ্বর ভগবান তথা পরম মস্তিষ্ক দ্বারা সৃষ্ট প্রাকৃতিক আইন সর্বদাই নিখুঁত, তা কখনাে লঙ্ঘিত হয় না। আমরা কখনাে সূর্যকে পশ্চিম দিকে উদিত হতে এবং পূর্বদিকে অস্ত যেতে দেখিনি। বৃষ্টির সময় সূর্যের উজ্জ্বল কিরণে যখন আমরা রংধনু দেখি তা তখনই দৃশ্যমান হয় যখন প্রতিসরণের নিয়মানুসারে সূর্য ব্যক্তিটির পেছনে অবস্থান করে। তা ছাড়াও প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় অন্তর ঋতু পরিবর্তিত হয় এবং প্রত্যেক ঋতুতে অদ্বিতীয় বিশেষ কোনাে লক্ষণই পরিলক্ষিত হয়।

যদি পরমাণুর জ্যামিতিক গঠনে ভিন্নতা আনা হয় অথবা পরমাণুর আকৃতিতে যদি পরিবর্তন আনা হয় তবে রং   কমলা থেকে লাল, মনােহর সুগন্ধি থেকে কটু ও বিরক্তিকর গন্ধে এবং স্বাদ মিষ্টি থেকে তিক্ততে পরিবর্তিত হতে  পারে।


এখন আণবিক শক্তির ক্ষেত্রে ভগবানের সৃষ্টির কিছু দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করব। রসায়নবিদগণ আবিষ্কার করেছেন যে, ফুলের বিভিন্ন রংসমূহ অ্যান্থােসায়ানিন নামক একপ্রকারের রাসায়নিক দ্রব্য থাকার কারণে হয়ে থাকে, এ ছাড়াও বিভিন্ন ফুলের বিভিন্ন সৌরভ আসে টারপিন এবং টারপিনয়েড অঙ্গজাত দ্রব্য ফুলে থাকার কারণে। এই দ্রব্যসমূহের আণবিক গঠনকাঠামাে অত্যন্ত সাধারণ থেকে অত্যন্ত জটিল পর্যন্ত ব্যাপ্তি হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ কপূর একটি টারপিনয়েডজাত দ্রব্য এবং এতে কিছুটা লেবুজাত সুগন্ধি আসে একটি সাধারণ টারপিন, লেমোনি থেকে। গাজর এবং টমেটোতে যে সাদৃশ্যপূর্ণ রং থাকে তা মূলত একটি উচ্চতর টারপিনজাত পদার্থ তথা ক্যারােটিনয়েড নামক আণবিক পদার্থের কারণে হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট রং এবং গন্ধের পারমাণবিক গঠন অসাধারণভাবে অদ্বিতীয়। যদি পারমাণবিক গঠনে কয়েকটি পরমাণুর অবস্থান পরিবর্তন করা হয়, যদি পরমাণুর জ্যামিতিক গঠনে ভিন্নতা আনা হয় অথবা পরমাণুর আকৃতিতে যদি পরিবর্তন আনা হয় তবে রং কমলা থেকে লাল, মনােহর সুগন্ধি থেকে কটু ও বিরক্তিকর গন্ধে এবং স্বাদ মিষ্টি থেকে তিক্ততে পরিবর্তিত হতে পারে। এক প্রান্তে আমরা সর্বাপেক্ষা ক্ষুদ্র হাইড্রোজেন অণুতে দুই অণু হাইড্রোজেন পরমাণু পাই, আর অন্যদিকে দৈত্যসদৃশ বৃহদাকার পরমাণু রয়েছে যেমন সুনির্দিষ্ট কর্মসম্পাদনের উদ্দেশ্য অসংখ্য পরমাণুতে নির্মিত প্রােটিন এবং নিউক্লিয়িক এসিড (DNA ও RNA), যা দ্বারা জড় শরীরের প্রতিটি অংশ নির্মিত হয়েছে। প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন পরমাণুর কেলাসন ভিন্নতর এবং অদ্বিতীয়। উদাহরণস্বরূপ, সােডিয়াম ক্লোরাইডের (খাবার লবণ) এর আণবিক গঠন হচ্ছে ঘনকাল। কাঠ, কয়লা, গ্রাফাইট এবং হীরক, তিনটি পদার্থই একই উপাদান কার্বন থেকে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও হীরক সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বলতর, স্বচ্ছ এবং কঠিন, কিন্তু গ্রাফাইট নরম, কালাে এবং অস্বচ্ছ। এই পদার্থসমূহের কেলাসন গঠন ভিন্নতর বলেই এমন পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। একটি হীরকের স্ফটিক ল্যাটিসে অবস্থিত প্রত্যেকটি কার্বন পরমাণু চতুষ্কোণে চারটি কার্বন দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং এদের মধ্যে দূরত্ব হল ১.৫৪ অ্যাংস্ট্রম (১ অ্যাংস্ট্রম = ১০-৮ সে.মি)। এর তুলনায় গ্রাফাইটে কার্বনের তিনটি বন্ধন একই সমতলে অবস্থিত হতে গিয়ে বিরূপাকার ধারণ করে এবং ৪র্থ বন্ধনে কার্বন সমকোণে অবস্থানগ্রহণপূর্বক পাশ্ববর্তী কার্বন পরমাণুর সাথে সংযুক্ত হয়।

এইভাবে আমরা আণবিক গঠনতন্ত্রের অসংখ্য উদাহরণ উপস্থাপন করতে পারি, যার মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় যে, সেগুলাে এতই অসাধারণ ও সুনিপুণ।

একটি তিল পরিমাণ ক্ষুদ্র বীজে এমন শক্তি নিহিত রয়েছে, যার ফলাফল একটি বিশাল বটবৃক্ষ। এই শক্তির উৎস কে?

 রসায়নবিদগণ এই ভেবে আশ্চর্যান্বিত হন যে, কে তার গবেষণাগারে সেই পরম দক্ষ হাতে ও মস্তিষ্কের সাহায্যে এই সকল অসাধারণ শৈল্পিক ব্যবস্থাসমূহ করে যাচ্ছেন। বাস্তবিকপক্ষে পরম বিজ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণের বুদ্ধিমত্তা ও সামর্থ্য অচিন্ত্য। 

 
কোনাে বিজ্ঞানীই এটি অস্বীকার করতে পারেন না। তাহলে কীভাবে বিজ্ঞানীরা পরম পুরুষােত্তম ভগবানের এই সকল বিস্ময়কর কার্যসমূহের স্বীকার থেকে বিরত হন? ভগবদগীতায় আমরা পাই যে, “সর্বজ্ঞ, সনাতন, নিয়ন্তা, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর, সকলের বিধাতা, জড় বুদ্ধির অতীত, অচিন্ত্য ও পুরুষরূপে পরমেশ্বর ভগবানের ধ্যান করা উচিত। তিনি সূর্যের মতাে জ্যোতির্ময় এবং জড়া প্রকৃতির অতীত।” 
কবিং পুরাণমনুশাসিতারম্
অণােরণীয়াংসমনুস্মরেদ্ যঃ।
সর্বস্য ধাতারমচিন্ত্যরূপম্
আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ ॥
                                                                                  (ভগবদ্গীতা ৮/৯)
বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র পরমেশ্বর ভগবানের কর্মসমূহ অনুকরণ করার চেষ্টা করতে পারেন মাত্র। তাঁরা সেই কার্যও সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারে না। এমনকি তাঁরা যদি আংশিকভাবে সাফল্য লাভ করেন তাও বহু কষ্টার্জিত।
উদাহরণস্বরূপ, রসায়নবিদ্যায় নােবেল পদক জয়ী (১৯৬৫ সাল) হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আর.বি. উডওয়ার্ড এবং জুরিখের প্রফেসর এ.এসচিনমােসার ১২ বছর সময় অতিবাহিত করেছিলেন ভিটামিন বি১২ অণুর গঠন উপাদান আবিষ্কার করতে। এই শুধুমাত্র একটি সামান্য কাজ সাধন করতে ৯০টি দেশের ৯৯ জন বিজ্ঞানী একত্রে কাজ করেছিলেন। (James H. Krieger, Chemical and Engineering News, March 12, 1973, P.16) কিন্তু কৃষ্ণ তাঁর স্বইচ্ছায় সকল জটিল অণু সৃষ্টি করেছেন।
আরেকটি মজার বিষয় হল, যখন বিজ্ঞানীরা পুনঃ পুনঃ বিফল হচ্ছিলেন তখন তারা অবচেতন বা অনবচেতন অবস্থায় সাহায্যের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিলেন। এর মাধ্যমে কী পরম বিজ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণের অস্তিত্বের প্রমাণ এবং অন্যান্য সকল জীবসমূহের তাঁর অপেক্ষা নিম্নতর স্থিতি প্রমাণ করছে না? একটি অমার্জিত উদাহরণ হল ১৯৭০ সালের ১১ এপ্রিল অ্যাপেলাে-১৩ মহাকাশযান চন্দ্রাবতরণ করতে গিয়ে এর অভ্যন্তরে বিস্ফোরণ ঘটে। এই অ্যাপােলাে ক্যাপসুলটি শত শত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত মস্তিষ্কের জ্ঞানে নির্মিত এবং এতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। কেউই ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেনি যে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটবে। যখন সেটি ঘটল, তখন তিনজন নভােচারীর অবস্থা সংকটাপন্ন হল এবং যাঁরা এই মিশনে নিযুক্ত ছিলেন তাঁরা সকলেই পৃথিবীর মানুষদের ভগবানের প্রতি প্রার্থনা জানাতে বলেন যাতে নভােচারীরা নিরাপদে ফিরে আসতে পারেন। এটিই হল অবস্থা। বিপদের সময় অধিকাংশ মানুষ ভগবানকে স্মরণ করে, যদিও অন্য সময় তারা তাঁকে ভুলে যায়।
এখন আমরা ভগবানের সৃষ্টির অত্যন্ত সাধারণ এবং অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শনে দৃষ্টিপাত করব। আমরা দেখি যে, নিম্নস্তরের জীবকুলের মধ্যে সামাজিক দলবদ্ধতা খুবই সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, মৌমাছিদের দলে রানি মৌমাছি সুন্দরভাবে পালিত হন পুরুষ মৌমাছিদের দ্বারা, আবার শ্রমজীবী মৌমাছিরা সারাদিন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যকর বিষয় যে কীভাবে মৌমাছিরা তাদের এই অত্যন্ত ক্ষুদ্র দেহে তাদের জন্য এবং অন্যান্য জীবকুলের জন্য এত বিপুল পরিমাণ মধু সংগ্রহ করে। এইভাবে সমগ্র দলটি সুশৃঙ্খলক্রমে পরিচালিত হয়। এমনকি মা এবং তাঁর শিশুর মধ্যে যে ভালবাসার সম্পর্ক তা নিম্নতর প্রজাতির জীবের মধ্যেও দেখা যায়। উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলােতে বর্ষাকালে যখন বৃষ্টি প্রবলভাবে প্রবাহিত হয় তখন পিঁপড়েরা মাথায় তাদের ডিম নিয়ে নতুন আশ্রয় খোঁজে। মাকড়সারা এমন অসাধারণ স্থাপত্যশৈলিতে। তাদের জাল বিছায় যে, তা একটি আশ্রয়দাতা এবং বেঁচে থাকার জন্য শিকার ধরতেও সাহায্য করে। রেশমকীট শত গজ সুতা বুনে রেশমগুটি তৈরি করে মুককীট অবস্থায় বেঁচে থাকার জন্য। একটি ক্ষুদ্র বীজ যা সরিষার বীজের চেয়েও ছােট, তেমন বীজে বিশাল কলাগাছের সমগ্র ক্ষমতা বিরাজমান থাকে। এইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ক্ষুদ্র হােক বা বৃহৎ হােক সকল জীবের সৃষ্টি, পালন এবং দিকনির্দেশনার জন্য পরমেশ্বর ভগবান অসাধারণ ব্যবস্থাপনা রেখেছেন। কৃষ্ণ বলেছেন, “হে অর্জুন! যা সর্বভূতের বীজস্বরূপ তাও আমি, যেহেতু আমাকে ছাড়া স্থাবর ও জঙ্গম কোনাে বস্তুরই অস্তিত্ব থাকতে পারে না।”
যচ্চাপি সর্বভূতানাং বীজং 
তদহমর্জুন।
ন তদস্তি বিনা যৎ স্যান্ময়া 
ভূতং চরাচরম্ ॥”
                                          (ভগবদ্গীতা ১০/৩৯) 
জাগতিক বিজ্ঞানীদের একটি প্রধান সমস্যা হল তারা অনুসন্ধানের সময় সাধারণত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক দিক উপেক্ষা করে। উদাহরণস্বরূপ, যখন নিউটন ভূমিতে আপেল পড়তে দেখলেন তখন তিনি অনুসন্ধান করলেন কেন এবং কীভাবে আপেলটি ভূমিতে পড়ল। কিন্তু তিনি অনুসন্ধান করার চেষ্টা করলেন না, আপেল পতনের পেছনে কে দায়ী। তার অনুসন্ধানের ফলস্বরূপ তিনি মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করলেন। কিন্তু কে এই মহাকর্ষের সৃষ্টি করলেন? শ্রীল প্রভুপাদ কৃপা করে আমাদের ব্যাখ্যা করেছেন যে, আপেল যখন কাঁচা অবস্থায় থাকে তখন পড়ে না, শুধুমাত্র পাকা হলেই ভূমিতে পড়ে। তাই নিউটনের আপেলের ভূমিতে পতনের ব্যাখ্যা যথাযথ নয়। সমগ্র পতনের পেছনে কিংবা মহাকর্ষ সূত্রের বাইরে আরাে কারণ রয়েছে। সেই কারণটি হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভগবদগীতায় আমরা পাই যে, “বাসুদেব সর্বমিতিঃ কৃষ্ণ সকল কারণের পরম কারণ।” (ভগবদ্গীতা ৭/১৯) এ ছাড়াও তাঁদের জানা উচিত যে, বিজ্ঞানীরা যে ক্ষুদ্র সামর্থ্য পেয়েছেন তা কৃষ্ণই তাদের দিয়েছেন। কৃষ্ণ বলেছেন, পৌরুষং নৃষুঃ “আমি মানুষের পৌরুষ।” (ভগবদ্গীতা ৭/৮)
বিভিন্ন যান্ত্রিক উপায়ে (টেলিস্কোপ ইত্যাদি), অনুমাননির্ভর, অভিজ্ঞতালব্ধ থিওরি এবং ধারণালব্ধ মডেল-এর মাধ্যমে সৃষ্টিতত্ত্ববিদ এবং জ্যোতির্বিদগণ দারুণ তেজোদীপ্তে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছেন যে, এই বিশ্বজগৎ কী, এটির আকৃতি কত এবং এই বিশ্বজগৎ কত পূর্বে সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে তারা কল্পনা করছেন যে, এই সৌরজগতে একটি দশম গ্রহ রয়েছে। এবং তারা সেটির খোঁজ করার চেষ্টা করছেন। (D. Rawlins and M. Hammeron, “Is there a Tenth Planet in the solar system of Nature?) তাঁরা তাঁদের খোঁজে সাফল্যের সাথে একটি সঠিক উত্তর পাওয়ার জন্য কতটুকু যেতে পারে তা সময়ই বলতে পারে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হল যে তাঁরা কখনই প্রকৃতির রহস্য পুরােপুরি উন্মোচন করতে পারবে না, কেননা প্রকৃতি পরম বিজ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণের সৃষ্টি। একজন যথার্থ চিন্তাশীল ব্যক্তি বুঝতে পারবেন যে, মানুষের পক্ষে সমগ্র মহাবিশ্বের আয়তন পরিমাপ করার স্বপ্নই হবে বােকামি কেননা তারা নিকটবর্তী নক্ষত্র সূর্যের প্রকৃতি সম্পর্কেও তেমন কিছুই জানে না। শ্রীল প্রভুপাদ এই সম্পর্কে ড. ব্যাঙ-এর দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতেন যে, একটি তিন ফুট কুয়ায় বসবাস করত এবং তাঁর বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর সম্পর্কে কোনাে ধারণাই ছিল না। সেই ব্যাঙ তার কুয়াের সাথে তুলনা করে কল্পনা করে বলত যে, প্রশান্ত মহাসাগর হয়ত ৫ ফুট প্রশস্ত, ১০ ফুট প্রশস্থ ইত্যাদি। প্রকৃত বিষয়টি হল, আমাদের ধারণার বাইরে অসীম জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা শুধুমাত্র সময় এবং শক্তির অপচয় করা মাত্র। সকল প্রকারের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে অনুমােদিত শাস্ত্র বেদে। শুধুমাত্র আমাদের একজন পরম কর্তৃপক্ষ শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ করা উচিত।
 
যখন নিউটন ভূমিতে আপেল পড়তে দেখলেন, তখন তিনি অনুসন্ধান করলেন, কেন এবং কীভাবে আপেলটি ভূমিতে পড়ল? কিন্তু তিনি অনুসন্ধান করার চেষ্টা করলেন না, আপেল পতনের পেছনে কে দায়ী?
এই জড় বিশ্বজগতের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং জীবসত্তা যেমন দেবতা, মানুষ এবং অন্যান্য জ্ঞান শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম স্কন্ধের, ৩য় অধ্যায়ের ১ম থেকে ৫ম শ্লোকে উল্লেখিত আছে। জড় এবং চিন্ময় জগতের সম্পূর্ণ বিবরণ দেওয়া হয়েছে ব্রহ্মসংহিতার ৫ম অধ্যায়ে এবং শ্রীমদ্ভগবদগীতা থেকে আমরা জানতে পারি যে, এই সমগ্র জড় জগৎ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মােট সৃষ্টির এক-চতুর্থাংশ মাত্র। সৃষ্টির অন্য তিনটি অংশ চিন্ময় জগতে প্রকটিত হয়েছে যার নাম বৈকুণ্ঠ।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বর্ণময় অবতার ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর একজন অন্তরঙ্গ পার্ষদ সনাতন গােস্বামীকে এই মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ভগবান ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই জড় বিশ্বজগতের নির্দিষ্ট আকার আয়তন রয়েছে। কিন্তু বৈকুণ্ঠ গ্রহসমূহের আয়তন কেউ পরিমাপ করতে পারে না। এই বৈকুণ্ঠ গ্রহসমূহ হল পদ্মপাতার পাপড়িসদৃশ, সমস্ত পাপড়ির মাঝখানে একটি ফুলসদৃশ গ্রহ রয়েছে। একে বলা হয় কৃষ্ণলােক বা গােলক বৃন্দাবন। এটি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত এবং নিত্য আলয়। অন্যান্য বৈকুণ্ঠ গ্রহসমূহও ষড় ঐশ্বর্য – ধন, বৈরাগ্য, জ্ঞান, সৌন্দর্য, যশ এবং বীর্য পূর্ণ অধিবাসী রয়েছে এবং প্রত্যেক গ্রহেই কৃষ্ণের বিভিন্ন প্রকাশ অবতারগণ নিত্য অবস্থান করে। জাগতিক বিজ্ঞানীদের এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের ব্যাপারে কোনাে তথ্যই নেই।
অবশ্যই জাগতিক বিজ্ঞানীদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে এই বিশাল বিশ্বজগতের রহস্য উন্মােচন করা অসম্ভব। আমাদের অবশ্যই স্বীকার করা উচিত যে, সবদিকেই মানুষের দৃষ্টি খুবই সীমাবদ্ধ, কেননা তার ইন্দ্রিয়, প্রযুক্তি এবং তার মেধা সীমাবদ্ধ। তাই পরম বিজ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণের অস্তিত্বে কোনাে সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। তিনিই সবকিছুর জ্ঞাতা এবং মালিক। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,
বীজং মাং সর্বভূতানাং বিদ্ধি পার্থ সনাতনম্ ।
বুদ্ধিবুর্দ্ধিমতামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্ ॥
“হে পার্থ! আমাকে সর্বভূতের সনাতন কারণ বলে জানবে। আমি বুদ্ধিমানের বুদ্ধি এবং তেজস্বীদের তেজ।” (ভগবদ্গীতা ৭/১০)
মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয় ।
ময়ি সর্বমিদং প্রােতং সূত্রে মণিগণা ইব ॥
“হে ধনঞ্জয়! আমার থেকে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই। সূত্রে যেমন মণিসমূহ গাঁথা থাকে, তেমনই সমস্ত বিশ্বই আমাতে ওতঃপ্রােতভাবে অবস্থান করে।” (ভগবদ্গীতা ৭/৭)
ন মাং দৃষ্কৃতিনাে মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ ॥
“মৃঢ়, নরাধম, মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে এবং যারা আসুরিক ভাবসম্পন্ন, সেই সমস্ত দুষ্কৃতকারীরা কখনও আমার শরণাগত হয় না।”
অতএব, পরম বিজ্ঞানী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অস্তিত্বে কোনাে অস্বীকার না করে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে, আমাদের বিজ্ঞানী বন্ধুদের প্রধান কর্তব্য হল আমাদের ভাবনার অতীত ভগবানের মস্তিষ্ক এবং সর্বত্র তাঁর অসাধারণ প্রকাশ সম্পর্কে যথাযথ উপলব্ধি/মূল্যায়ন করা। কেউ হয়তাে বা ভুলবশত দাবি করতে পারে যে, সে রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার, পেনিসিলিন ইত্যাদির আবিষ্কারক। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টি হল সবকিছুই ইতােমধ্যে প্রকৃতিতে আছেই, তাই কোনাে কিছু থেকে অন্য কিছু বের হতে পারে না । কেউ যদি দাবি করে যে, কোনাে কিছু তার সম্পত্তি, তবে সে একজন বড় চোর। কেননা নিজের বলে দাবি করে সে মূলত পরম পিতা শ্রীকৃষ্ণের সম্পত্তি চুরি করছে। কোনাে কিছুই আমাদের নয়। সবকিছুই শ্রীকৃষ্ণের। শ্রীঈশােপনিষদে বলা হয়েছে,
ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।
তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ ধনম্॥
এই বিশ্বচরাচরে যা-কিছু আছে তার মালিক পরমেশ্বর ভগবান এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন। তাই জীবনধারণের জন্য তিনি যেটুকু বরাদ্দ করে দিয়েছেন, সেটুকুই গ্রহণ করা উচিত এবং সব কিছুই যে ভগবানের সম্পত্তি তা ভালভাবে জেনে, কখনই অন্যের জিনিস গ্রহণ করা উচিত নয় ।
(ঈশােপনিষদ-শ্লোক-১)
 
 
 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল-জুন ২০১৩

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here