লিজার্ডম্যান, ক্যাটম্যান, লেপার্ডম্যান এবং আপনি

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২১ | ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ২১ জুন ২০২১ | ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 235 বার দেখা হয়েছে

লিজার্ডম্যান, ক্যাটম্যান, লেপার্ডম্যান এবং আপনি

বিচিত্র বাসনা আমাদেরকে এ জগতে বিচিত্র সব কার্যকলাপে নিয়োজিত করছে যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমরা এ বিষয়ে কতটা সচেতন?

সর্বানন্দ দাস

এরিক স্প্রাগু, সারাবিশ্বে পরিচিত দ্যা লিজার্ডম্যান হিসেবে। কেননা তার সর্বাঙ্গে ট্যাটু আর কিছু দৈহিক বিকৃতির মাধ্যমে নিজেকে তিনি পরিণত করেছেন একজন লিজার্ড বা টিকটিকির মতো। এরকম বিকৃত পরিবর্তনের পূর্বে তিনি নিউইয়র্কের হার্টউইক কলেজ থেকে দর্শনের ওপর ব্যাচলর অব আর্টস ডিগ্রি লাভ করেন। জাগতিক শিক্ষা অর্জনের পর এরকম বিকৃত দৈহিক পরিবর্তন বিষয়ে তার মন্তব্য, “আমি বিশেষভাবে টিকিটিকির মতো এরকম সরিসৃপ প্রাণী পছন্দ করি। এগুলো আমাকে অন্য কিছুর চেয়েও বেশি আনন্দ প্রদান করে। শরীর বিকৃতির কথা ভাবনাতে আসলে আমি এটি নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা করতে শুরু করি।”
তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন প্রাণীদের মধ্যে সরীসৃপ প্রাণীরা মানব সংস্কৃতিতে ও প্রতীক হিসেবে বেশ শক্তিশালী, আর তাই তিনি এই শক্তিশালী প্রতীক ধারণ করেছেন। এর মাধ্যমে আমি ইমেজকেও শক্তিশালী করি। আমি নিজের শরীরকে সেইভাবে গড়ে তুলি, যেটি অন্যদেরকে প্রভাবিত করে। যেটি দেখে তাদের মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়।” তাকে সারা শরীরে সবুজ পাখনার মতো ট্যাটু করতে সাতশ’র বেশি ডলার খরচ করতে হয়েছে, এরপর দাঁতগুলো ধারালো করা, জিহবা দুই ভাগ করা, সাবডামার ইমপ্ল্যান্ট (এক ধরনের জুয়েলারি যা চামড়ার নীচে প্রতিস্থাপন করা হয়, যেটি তিনি চোখের ওপরে ব্যবহার করেন)।
ডেনিস্ আভনার নামে আরেকজন আমেরিকান ব্যক্তি নিজেকে বাঘের মতো শরীরে রূপান্তর করে সর্বোচ্চ শরীর বিকৃতির জন্য বিশ্বরেকর্ড করেন। যিনি সারাবিশ্বে ক্যাটম্যান হিসেবে পরিচিত হন। তিনি নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে নারাজ, একটি বাঘ হিসেবে ভাবতে পছন্দ করেন। এজন্যে যা কিছু তার সঙ্গে সম্পর্কিত সবই বাঘকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে।
এরকম আরেকজন ব্যক্তি রয়েছেন। তার নাম টম লেপার্ড। নিজেকেও গড়ে তুলেছেন লেপার্ড বা চিতাবাঘের মতো করে, আর তাতেই তিনি গিনিজ ওয়ার্ল্ড বুকে রেকর্ড করেন। তিনি ৫ হাজার ৫০০ ডলার খরচ করে ট্যাটু করার মাধ্যমে নিজেকে এরকম বিকৃত শরীরে রূপান্তরিত করেন।
তার মস্তব্য, “সমাজের চাওয়া-পাওয়াগুলো আমাকে এক ধরনের ক্লান্তিবোধ এনে দিয়েছিল। এজন্যে আমি এই একান্ত পথ ও জীবন বেছে নিয়েছি।”

বিচিত্র বাসনা

শুধুই কি লিজার্ডম্যান, ক্যাটম্যান কিংবা লেপার্ডম্যান, বিশ্বে রয়েছে সুপারম্যান, ব্র্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান থেকে শুরু করে আরো কত রকমের ম্যান। যা বিশ্ব চলচ্চিত্র কাঁপিয়ে সারাবিশ্বের মানুষের মনকে আন্দোলিত করেছে। এজন্যেই তো আজকালকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বাসনা হয় শুরু থেকে “না, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার নয়, আমি সুপারম্যান বা স্পাইডারম্যান ইত্যাদি হতে চাই”। এ সমস্ত চরিত্র তাদেরকে প্রাত্যহিক আচার আচরণে প্রভাব রাখে যেন এক ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড বা কল্পনার জগৎ। প্রকৃতির নিম্নগুণগুলোর সংস্পর্শে তাদের জীবনে তা ভয়ংকর প্রভাব ফেলছে।
অনেকের বাসনা আবার একটু ভিন্ন বা সূক্ষ্ম হয়। সাধারণত যে বাসনাগুলোতে মানুষ অভ্যস্থ তা হল অর্থ, বিত্ত, সম্পদ সঞ্চয় করা এবং একটি আরাম-আয়েশপূর্ণ সুখী জীবনযাপন করা। জড়জগতের ওপর আধিপত্য করার বাসনা প্রতিটি জীবের মধ্যে কম বেশি রয়েছে। কিন্তু এসব বাসনার চরম পরিণতি সম্পর্কে কেউই অবগত নয়। সূক্ষ্মভাবে তাদের মধ্যে যে কিছু চরিত্র গঠিত হচ্ছে তা পরবর্তী জীবনের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সুপারম্যান দেখে কারো বাসনা হতে পারে, ‘ইস্, যদি আকাশে উড়তে পারতাম’। জলে মাছেদের নির্বিঘ্নে বিচরণ করতে দেখে বাসনা হতে পারে, “ইস্, যদি অক্সিজেন ছাড়া যখন খুশি জলে বিচরণ করতে পারতাম।’ কারো সুন্দর ডিজাইনকৃত পোশাক দেখে বাসনা হতে পারে, ‘যদি এরকম অনেক পোশাক পড়তে পারতাম।” আমেরিকানদের আভিজাত্য দেখে অনেকের এ বাসনা জাগাও স্বাভাবিক, ‘যদি ওদের মতো সুন্দর হতাম বা আমেরিকায় জন্ম নিতাম। কোনো সুন্দরী রমণী বা সুন্দর পুরুষকে দর্শন করে বাসনা জাগতে পারে, যদি আমার জীবনসঙ্গী হতো।’ একজন গুণবান বা গুণবতী ছেলে বা মেয়েকে দর্শন করে কোনো পিতা মাতার বাসনা জাগতে পারে, “যদি এরকম সস্তান আমাদের থাকতো।’ বৃহৎ পরিসরে গেলে আমেরিকা, লন্ডনের মতো দেশকে দেখে বাসনা জাগতে পারে, ‘যদি এরকম একটি দেশ আমাদের থাকত। খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে ভাল ভাল খাবার খাওয়ার প্রতি বাসনা মোটামুটি সবার রয়েছে। আবার কারো কারো তো অবাধ বা বাচ-বিচারহীন খাদ্য গ্রহণের বাসনা রয়েছে যা আজকাল বিভিন্ন চ্যানেলেও প্রদর্শিত হতে দেখা যায়।
এ জগৎটি তিনটি গুণের সংমিশ্রণে তৈরি, তার মধ্যে এই কলিযুগে রজোগুণের প্রাধান্য বেশি। বিভিন্ন গুণজাত বিষয়ের সংস্পর্শে কোনো জীব যদি নিয়োজিত হয় তখন সে সেই গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায় কিংবা সহজভাবে বলতে গেলে সেই গুণসম্পন্ন বাসনার উৎপত্তি ঘটে।

বাসনাগুলোর ফলাফল

কিছু কিছু বাসনার ফলাফল আমরা এ জগতে পরিলক্ষিত করি। যেমন লিজার্ডম্যানের স্বীকারোক্তি যে, তার সরীসৃপ প্রাণীদের প্রতি সহজাত আকর্ষণ ছিল, তাই বাসনার ফলস্বরূপ নিজেই সরীসৃপ প্রাণীর রূপ ধারণ করেছেন। ক্যাটমান তো নিজেকে মানুষই ভাবতে নারাজ, বিষয় বাসনা তাকে এতটাই মোহিত করে রেখেছে যে, তাকে শেষ পর্যন্ত মানুষরূপী ক্যাট সাজতে হয়েছে। লেপার্ডম্যান তো জীবনটাকে যথেচ্ছাভাবে গ্রহণ করতে গিয়ে শেষপর্যন্ত নিজেই লেপার্ডে পরিণত হলেন। নিশ্চয়ই লেপার্ডের প্রতি তার সহজাত বাসনা ছিল বা নতুন করে হৃদয়ে বাসা বেঁধেছিল।
বর্তমান জন্মে আমাদের বিবিধ বাসনার ফলাফল আমরা প্রত্যক্ষভাবে নিজেদের জীবনে কিছুটা দর্শন করে থাকি। এক্ষেত্রে এ জন্মে যদি বাসনা অপূর্ণ থাকে তবে পরবর্তী জন্মে সেটি পূরণ করার সুযোগ প্রকৃতি দিয়ে থাকে। আর বিপদটা এখানেই।
সূক্ষ্ম শরীরের বাসনা অনুসারে স্থূল শরীর লাভ হয়, ঠিক যেমন মনের চাহিদা অনুসারে পোশাকের দোকান থেকে আমরা পোশাক পছন্দ করি। জীবাত্মাকে এই পোশাক গ্রহণ করতে হয় তার অভিলাষিত প্রজাতির মাতৃগর্ভে অবস্থান করে। মনের সূক্ষ্ম বাসনা অনুসারে যে স্থূল শরীর হয়, এটির চাক্ষুষ প্রমাণ হচ্ছে, বর্তমান স্থূলশরীরেও মনের বাসনাগুলির ছাপ পড়ে। মুখ দেখেই আমরা সচরাচর বুঝে নিতে পারি কেউ ক্রুদ্ধ, উৎফুল্ল, হতাশ, প্রাণোচ্ছ্বল কিনা। সেজন্যই এই প্রবাদ বাক্যটি রয়েছে : “মুখ হচ্ছে মনের আয়না”। কিছু বাসনার ফলাফল নিম্নে তুলে ধরা হলো :

বেশি ঘুমানোর ইচ্ছা :

প্রকৃতিতে এইরকম সুযোগ রয়েছে। মেরুতে বছরের ছয় মাস রাত্রি, আর সেখানে মেরুভাল্লুকেরা সুনিদ্রার কি অপূর্ব সুবিধা পায়, তা সহজেই অনুমেয়। আর সাপ, ব্যাঙ-সহ বেশ কয়েক প্রজাতির সরীসৃপ বেশ কয়েক মাস একটানা শীতনিদ্রায় কাটায়। শুথেরাও দিনের অধিকাংশ সময় ঘুমে ঝুঁদ হয়ে থাকার জন্য বিশ্ব প্রসিদ্ধ। যারা অলস ও বেশি ঘুমায়, তাদের জন্য প্রকৃতি এই সব শরীর নির্দিষ্ট রেখেছে। কারো কোনো ভর্ৎসনা ছাড়াই মাসের পর মাস একটানা ঘুম!

রক্ত ও মাংস খাবার ইচ্ছা :

যারা মাছ-মাংসের প্রতি প্রলুব্ধ হয়, তাদের জন্য বাঘ, সিংহ, শেয়াল প্রভৃতি বহু মাংসাশী প্রজাতি রয়েছে। কারো মাংসাহারের বাসনা থাকলে প্রকৃতি তাকে আমন্ত্রণ জানায়, ‘হ্যাঁ, এসো! সিংহের দেহ গ্রহণ করো আর আজীবন মাংস ভক্ষণ করো!”

বেশিক্ষণ জলে থাকা আর সাঁতারের ইচ্ছা :

আজকাল অনেকেই সাঁতারে অত্যন্ত অনুরক্ত দেখা যায়। একটা পুরস্কারের আশায় তারা পাগলের মতো দিনে ৭-৮ ঘণ্টাই জলে পড়ে থাকে। দম শেষ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত পরিশ্রম করতে থাকে। কেউ কেউ তো আবার ইংলিশ চ্যানেলটাই সাঁতার কেটে পার হয়ে লোককে তাদের ক্ষমতা দেখায়। অন্য অনেকে আবার সমুদ্রের ঢেউয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা সার্ফিং করে থাকে। এরকম সাঁতারুদের প্রকৃতি আমন্ত্রণ জানায় : ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলে এসো, এই হাঙর, তিমি, কিংবা মাছের দেহ নাও, আর বিনা অসুবিধাতেই জলে পড়ে থাকো, সাঁতার কাটো!’

আকাশে ওড়ার শখ :

পৃথিবী জুড়ে ওড়ার ক্লাব রয়েছে। আর ওড়ার কতরকম ফন্দিও বেরিয়েছে : প্যারাসুট নিয়ে প্যারা গ্লাইডিং, অতিকায় ডানা যুক্ত গ্লাইডার, বেলুন, হেলিকপ্টার, প্লেন, রকেট-কত কি! কত লোক রয়েছে, ওড়াই যাদের জীবন, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু! প্রকৃতি তাদেরকে পাখীদের শরীর দেয়, যাতে যথেষ্ট ওড়ার সুযোগ পায় তারা!

স্বল্পবসনের প্রবণতা :

কিছু মানুষ রয়েছে যারা উপযুক্ত পোশাক পরতে চায় না –শরীরের বেশির ভাগ অংশ উন্মুক্ত রেখে তা বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে। এইভাবে সভ্য মানবসমাজে তারা প্রতিনিয়ত ঘটায় ছন্দ পতন। পরজন্মে প্রকৃতি তাদের আমন্ত্রণ জানায়, “এসো, একটি গাছের দেহ গ্রহণ করো! এখানে সূক্ষ্মদেহে নগ্ন, নিরাবরণ হয়ে মনের সন্তোষে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েকশো বছর, আর শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা-সমস্ত ঋতু উপভোগ কর!”
সুতরাং এইভাবে জীবজগতের প্রজাতির জীব-শরীরগুলি বিভিন্ন ধরনের সুখভোগের সুবিধা প্রদান করে। আর বিভিন্ন জীবসত্তাদের বিভিন্ন রকম বাসনা অনুসারে তাদের এইসব শরীরগুলি প্রদান করা হয়।
চেতনা, বাসনা, কর্ম-দ্বারা কিভাবে আমাদের পরবর্তী জীবন নির্ধারিত হয় বিধির বিধান অনুসারে, সেই বিষয়ে মহাজনেরা কোনো কোনো দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন। এগুলি কামনা বাসনার বিষয়। কারো অঙ্গহানি করলে নিজের অঙ্গহানি হয়, কেউ যদি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তবে পরজন্মে তাকে হত হতে হয়, কাউকে প্রতারণা করলে নিজে প্রতারিত হতে হয়। উপযুক্ত ব্যক্তিকে বস্তু দান করলে পরবর্তীতে বস্তুর অধিক গুণে প্রাপ্তি হয়। এগুলি কর্মের ফল। এই কার্যকরণ সূত্র আমরা সহজে দেখতে পাই না, তাকে ‘অদৃষ্ট’ নামে আখ্যায়িত হয়। কিন্তু কার্যকরণ সূত্র স্বীকার করতেই হয়।
বিদেশে শ্রীল প্রভুপাদ একটি গাছকে দেখেছিলেন। স্বভাবতই সূর্যলোকের দিকে গাছের শাখা প্রশাখা বৃদ্ধি হওয়ার কথা। কিন্তু ঐ গাছের শাখা-প্রশাখা গৃহের অভিমুখে প্রসারিত ছিল । তিনি বলেছিলেন, সেই গৃহসৌধটি যে নির্মাণ করেছিল সে অত্যন্ত আশা করেছিল সৌধমধ্যে থেকে সুখি জীবনযাপন করবে। কিন্তু অকালেই মানবজীবন হারিয়ে সে বৃক্ষশরীর পেয়েছে এবং সেই সম্পদ আগলে রেখেছে কেউ হয়তো রাজসিংহাসনে নিষ্কণ্টকভাবে সারাজীবন থাকতে চায়। রাজপদ বা মন্ত্রীপদ ত্যাগ করতে চায় না। তাঁর বাসনা সেভাবে একান্ত যদি হয়, কিন্তু কর্মটা যদি রাজা বা মন্ত্রীর মতো না হয়ে ইতর প্রাণীর মতো হয়, তবে পরজনো সর্ববাঞ্চাপূরণকারী শ্রীভগবান তাঁকে তার অবশ্যই অভীষ্ট আসনে রাখবেন। অর্থাৎ সেই সিংহাসনে সে সারাজীবন নিষ্কণ্টক নিঃশত্রুরূপে থাকবার সুযোগ পাবে, কিন্তু কর্মফল অনুসারে মানুষ জন্ম না পেয়ে ছারপোকা হয়ে আসনের গদিতে সারাজীবন থাকবে। বাসনা পূর্ণ করতে কল্পতরু ভগবান কখনো কার্পণ্য করবেন না। বাসনা পূর্ণ হবেই। কিন্তু কবে এবং কিভাবে হবে সেটি ভগবানের হাতে। এ এক দারুণ রহস্য বটে। কেউ যদি নারদমুনির মতো সারা দুনিয়ায় যেখানে খুশি সেখানে ইচ্ছামতো যেতে বাসনা করে, কিন্তু নারদমুনির মতো তার স্বভাব না হয়ে যদি ইতরতর কোনো প্রাণীর মতো হয়ে থাকে, তবে তার বাসনা ও কর্ম অনুসারে হয়তো সে একটি মশার দেহ লাভ করে যেখানে যখন খুশি চলে যেতে পারবে আনন্দে। কোনো প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি অন্য কোনো দরিদ্র নিরীহ ব্যক্তিকে প্রবঞ্চনা করে তার সমস্ত সম্পদ ছিনিয়ে নিতে পারে। পরবর্তী ঘটনাতে দেখা যাবে বঞ্চিত দরিদ্র ব্যক্তিটি দেহত্যাগ করে প্রবঞ্চকের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করল। সিন্দুকে প্রচুর টাকা জমা রেখে সেখানে একটি দেয়ালী পোকারূপে ধনী ব্যক্তিটি অবস্থান করতে লাগল। এক সাধু একজন লোককে বলেছিল, তুমি মাছ খেও না, তোমার শরীর-মন ভাল থাকবে। কিন্তু লোকটি তার মৎস্যভোজী ঠাকুরদার নির্দেশে সাধুর কথা অগ্রাহ্য করেছিল ঠাকুরদা মৃত্যুকালে মাছের চিন্তা করতে করতে পরজন্মে মৎস-শরীর জন্ম নিয়ে পুকুরে বাস করছিল, লোকটি সেই পুকুরের মাছ ধরে এনে তার স্ত্রীকে রান্না করতে বলল। অদৃষ্ট কর্মফল রহস্য এমনই যে, কে কাকে ধরছে, কে কাকে খাচ্ছে, তা বুঝে উঠা মুশকিল।

একটি মাত্র বাসনা

জড় বাসনাগুলো থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় কিংবা যথার্থ বাসনা কিভাবে লাভ করা যায় সেই বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদ এখানে সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

(শ্রীল প্রভুপাদ কথোপকথন, মে ২২, ১৯৭৫)

“এটি ঠিক বিভিন্ন ধরনের রোগের মতো আপনি এক ধরনের রোগে আক্রান্ত, মানে সংক্রমিত হয়েছেন। আপনি ঐ রোগের কারণে কষ্ট ভোগ করছেন। বিভিন্ন বাসনার অর্থ হল বিভিন্ন ধরনের সঙ্গ লাভ করা। এজন্যে আমরা সুপারিশ করছি আপনি আমাদের সঙ্গ করুন। তখন শুধুমাত্র একটি বাসনা থাকবে, সেটি হল কিভাবে ভগবানকে উপলব্ধি করতে হয়, এটুকুই। এটিই আকাঙ্খিত । ভক্তি মানে হল

অন্যাভিলাষিতাশুন্যং জ্ঞান-কর্মাদ্যনাবৃতম্ ।
আনুকূল্যেন কৃষ্ণানুশীলনং ভক্তিরুত্তমা ॥

(ভক্তিরসামৃত সিন্দু ১/১/১১)

যদি অন্যাভিলাষ, অন্য কোনো বাসনা বা জড় বাসনা পরিত্যাগ করা হয় তখন একটি মাত্র বাসনা হৃদয়ে স্থিত হয় সেটি হল কৃষ্ণসেবার বাসনা, আর সেটিই হল সিদ্ধি। এই বিষয়টি আমাদের শিখতে হবে, সংক্রমণ ও সঙ্গ প্রভাবে নিশ্চিতভাবে আমাদের অনেক বাসনা রয়েছে। কিন্তু যখন আমরা সে সমস্ত বাসনা পরিত্যাগ করতে সম্মত হই… সেক্ষেত্রে বাসনা তবুও থাকবে। যদি কোনো বাসনাই না থাকে, তবে আপনি একটি জীবন্ত লাশ। তাই বাসনা থাকবেই। তা না হলে সে কিভাবে বসবাস করছে? সে তখন একটি পাথর। কিন্তু আমাদের যথাযথ বাসনা থাকা উচিত। যেহেতু আমরা ভগবানের নিত্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই আমাদের বাসনা থাকা উচিত, কিভাবে তাঁকে (ভগবানকে) পুনরায় দর্শন করতে পারি এবং তাঁর প্রতি সেবা নিবেদন করতে পারি। এটিই একমাত্র বাসনা থাকা উচিত। তাই, ভগবান শ্ৰীকৃষ্ণ যখন আসেন তখন তিনি আদেশ দেন।

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

“সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না।” (ভগবদ্‌গীতা ১৮/৬৬)
এটিই প্রয়োজন এবং এটি এই মনুষ্য জীবনেই সম্ভব। কেননা আমাদের ভিন্ন ভিন্ন বাসনা রয়েছে, যেটি ইতোমধ্যে বিশ্লেষন হয়েছে। জড়া প্রকৃতির বিভিন্ন গুণের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া থেকে ৮১টি মিশ্রণ হয়। তাই আমাদের মধ্যে অনেক বাসনা রয়েছে, এই বাসনা অনুসারে আমরা অনেক ধরনের শরীর লাভ করেছি। তাই কিভাবে এই জড় বাসনাগুলো স্তমিত করতে হবে সে সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে এবং শুধুমাত্র আমাদের বাসনাগুলোকে কিভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিয়োজিত করা যায় সে সম্পর্কে মনোনিবেশ করতে হবে। এটি হল প্রশিক্ষণ। যেরকম এই সমস্ত ছেলে মেয়ে, তারা কৃষ্ণভাবনা গ্রহণ করছে…., তাদের অন্য কোনো বাসনা নেই। তাদের একমাত্র বাসনা হল কিভাবে এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, এটুকুই। একসময় তাদের অনেক বাসনা ছিল। তাদের এখন অন্য কোনো বাসনা নেই। এটিই হল সিদ্ধি। যখন আপনি শুধু এই একটি বাসনায় নিয়োজিত থাকবেন যে, “আমি কৃষ্ণসেবা করব,” তখন আপনি অন্য সমস্ত বাসনা থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন। অন্যথা বাসনাগুলো পরিত্যাগ করা অসম্ভব। যদি এগুলো থেকে পরিত্রাণ পাওয়া না যায় তবে সেগুলো আপনাকে ভিন্ন ভিন্ন শরীরে টেনে নিয়ে যাবে। তখন আপনার দুঃখ দুর্দশা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কেননা প্রকৃতির আইন অত্যন্ত কঠোর। আপনার বাসনা অনুসারে, প্রকৃতি আপনাকে শরীর প্রদান করবে। যদি আপনি কৃষ্ণসেবা করার বাসনা করেন, তবে ভবিষ্যতে আপনি কৃষ্ণের মতো একটি শরীর লাভ করবেন।” অতএব, লিজার্ডম্যান, ক্যাটম্যান কিংবা লেপার্ডম্যানের মতো বিচিত্র বাসনা আমাদের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে রয়েছে। কিন্তু সেই বাসনাগুলো ভবিষ্যতে আমাদের জন্য ভয়ংকর দুঃখ দুর্দশা নিয়ে আসবে, তাই যথার্থ বাসনা হল কৃষ্ণভাবনা যা সমস্ত সমস্যার সমাধান করে আপনাকে নিত্য আনন্দ লাভে সহায়তা করবে।


 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৪

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।