বিশ্বাস

0
149

পারমার্থিক প্রগতির জন্য এক আবশ্যকীয় উপাদান
বিশাখা দেবী দাসী

ধর্ম বলতে সাধারণত কোনো বিশ্বাসকে বোঝায় এবং এই বিশ্বাসের পরিবর্তন হতে পারে। কোনো বিশেষ পন্থার প্রতি কারো বিশ্বাস থাকতে পারে এবং সে এই বিশ্বাসের পরিবর্তন করে অন্য কিছু গ্রহণ করতেও পারে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে অবস্থিত বিশ্বাস হলো একটি অমূল্য ও পবিত্র গুণ। বিশ্বাস এই শব্দের সংস্কৃত শব্দ হলো শ্রদ্ধা, ব্যুৎপত্তিগতভাবে এর অর্থ হলো ’যেখানে হৃদয় অবস্থান করে’।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ৯ম অধ্যায়ের ৩নং শ্লোকের তাৎপর্যে শ্রীল প্রভুপাদ উল্লেখ করেছেন: “শুধুমাত্র বিশ্বাসের মাধ্যমেই কেউ কৃষ্ণভাবনায় অগ্রগতি সাধন করতে পারে।” এটি অধ্যয়ন করে আমি বিশ্বাস সম্পর্কে ভাবতে শুরু করি।
অভিধান ও আচার্যদের ভাষ্যানুসারে বিশ্বাস প্রসঙ্গে পৃথক পৃথক সংজ্ঞা রয়েছে। আভিধানিক অর্থে বিশ্বাসের সংজ্ঞা হলো, “কোনো কিছু বা কারোর ওপর পূর্ণ আস্থা বা বিশ্বাস।” অপরদিকে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বিশ্বাসকে সংজ্ঞায়িত করেছেন পূর্ণ প্রত্যয় (conviction) হিসেবে যে, শুধুমাত্র কৃষ্ণভাবনার মাধ্যমে কেউ জীবনের সর্বোচ্চ সিদ্ধি লাভের পথে উপনীত হতে পারে। এই হলো পারমার্থিক বিশ্বাস।
বিশ্বাসের আরেকটি অভিধানিক সংজ্ঞা হলো “কোনো ধর্মীয় তত্ত্বের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস”। এ বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “ধর্ম বলতে সাধারণত কোনো বিশ্বাসকে বোঝায় এবং এই বিশ্বাস যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। কোনো বিশেষ পন্থার প্রতি কারো বিশ্বাস থাকতে পারে এবং সে এই বিশ্বাসের পরিবর্তন করে অন্য কিছু গ্রহণ করতেও পারে।” [মুখবন্ধ, শ্রীমগবদগীতা যথাযথ] এটি হলো জড় বিশ্বাস।
প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই সহজাতভাবেই বিশ্বাস নামক গুণটি রয়েছে: “প্রতিটি মানুষেরই কোনো কিছুতে বিশেষ ধরনের শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস থাকে। [গীতা ১৭/৩ তাৎপর্য] বিশ্বাস প্রকৃতপক্ষে চিন্ময় বস্তু, কেননা এটির উৎস হলেন পরমাত্মা কৃষ্ণ, যিনি বলেন, “সবকিছু তার কাছ থেকেই আগত হয়।” [গীতা ১০/৮]
কৃষ্ণ আরো বলেন, “আমার থেকে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই, সূত্রে যেমন মণিসমূহ গাঁথা থাকে, তেমনই সমস্ত বিশ্ব আমাতে ওতঃপ্রোতভাবে অবস্থান করে।” “আমিই সমস্ত চিন্ময় ও জড় জগতের উৎস।” প্রত্যেকেই শ্রদ্ধার সহিত আমারই পথ অনুসরণ করে।” এবং “আমার কাছ থেকে স্মৃতি, জ্ঞান ও বিস্মৃতির উদয় হয় ।”
অন্য কথায়, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিজের প্রতি রয়েছে পূর্ণ বিশ্বাস! কৃষ্ণের অংশবিশেষ হওয়ায়, চিন্ময় জীব হিসেবে আমাদের রয়েছে চিন্ময় বিশ্বাস, যা তার প্রতি এবং তার শুদ্ধ ভক্তদের ওপর আরোপিত হয়। ভগবানের প্রতি এবং ভগবৎসুলভ ব্যক্তিদের প্রতি বিশ্বাস হলো একটি সহজাত গুণ এবং আত্মার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। একবার যদি আমাদের বিশ্বাস এই সমস্ত ব্যক্তিদের প্রতি দৃঢ়ভাবে আরোপিত হয়, তখনই শুধুমাত্র আমরা নিজেদের প্রতি বিশ্বাস অর্জন করতে পারি। অন্যথা আমরা চারটি ত্রুটি-ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা ও করণাপাটব দ্বারা আবদ্ধ এবং কালের বিধ্বংসী প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত, এসব বিশ্বাস হল ছলজাত।

বিশ্বাসের ধরণ

যখন আমাদের প্রকৃত, শুদ্ধ বিশ্বাস জড়া প্রকৃতি দ্বারা আবৃত থাকে, তখন সেটি হলো জড়। শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন, “কারো বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা যতক্ষণ পর্যন্ত না শুদ্ধ সত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ তা জড় প্রকৃতির যে কোনো গুণের দ্বারা কলুষিত হতে পারে। এভাবেই এই জগতে আমরা ভিন্ন ভিন্ন রকমের শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস দেখতে পাই এবং ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের থেকে নানা রকম ধর্মের উদয় হয়েছে।” [গীতা ১৭/৩ তাৎপর্য]
শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/২৫/২৭) এ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আরো ব্যাখ্যা করেছেন, “পারমার্থিক জীবনের প্রতি পরিচালিত শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস সত্ত্বগুণ সমন্বিত, সকাম কর্ম ভিত্তিক বিশ্বাস হচ্ছে রজোগুণ সম্পন্ন, অধার্মিক কর্মে রত শ্রদ্ধা হচ্ছে তমোগুণ সম্পন্ন, কিন্তু আমার প্রতি ভক্তিযোগে যুক্ত শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস হচ্ছে বিশুদ্ধ রূপে গুণাতীত।” আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে অবস্থিত বিশ্বাস হলো একটি অমূল্য ও পবিত্র গুণ। বিশ্বাস এই শব্দের সংস্কৃত শব্দ হলো শ্রদ্ধা, ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘যেখানে হৃদয় অবস্থান করে’ (শ্রদ-হৃদয়; ধা-স্থান) যেখানে আমরা নিজেদের বিশ্বাসকে স্থাপন করি-যেখানে আমরা চাই আমাদের হৃদয় স্থাপিত হোক- সেটি আমাদেরই পছন্দ, এই পছন্দটি আমরা করতে পারি এবং সচেতনভাবে আমাদের এটি করা উচিত। “সব কিছুই সতর্কতার সঙ্গে বুদ্ধি দিয়ে, সদগুরুর সান্নিধ্যে বিবেচনা করতে হয়। এভাবেই মানুষ প্রকৃতির উচ্চতর গুণগত পর্যায়ে নিজের অবস্থার পরিবর্তন সাধন করতে পারে।” [গীতা ১৭/২ তাৎপর্য] আধুনিক জীবনে লোকেরা তাদের বিশ্বাসকে অর্পণ করে তাদের কর্মস্থলে, অর্থে, পরিবারে, খেলাধুলা বা খোলোয়াড়দের মধ্যে, পোষ্য প্রাণীদের মধ্যে কিংবা বিবিধ স্থানে যেখানে তারা মনে করে এর মাধ্যমে তারা সুখী হতে পারবে, কিংবা নাস্তিকতা বা অন্যান্য মতবাদে (isms ) আশ্চর্যহীনভাবে এই সমস্ত কিছুতে অর্পিত বিশ্বাস অপূর্ণই রয়ে যাই। ফলশ্রুতিতে কেউ অনুভব করে সে একটি বিষাদচ্ছন্ন, কপটতাপূর্ণ ভাবলেশহীন আবরণে আবৃত রয়েছে।

চিন্ময় বিশ্বাসের ফল

কেউ যদি একবার যথাযথভাবে বিশ্বাসকে অর্পণ করে। তখন তার ফলাফল হয় অত্যাশ্চর্যকর। কৃষ্ণ ও তার ভক্তের প্রতি বিশ্বাস, এ ধরনের চিন্ময় বিশ্বাস থেকে চিন্ময় আশির্বাদ সঞ্চারিত হয়; এই পন্থাটি অত্যন্ত সরল। কেবল গুরুদেবের কাছ থেকে জানতে হবে যে, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং সম্পূর্ণভাবে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। কেউ যদি তা করেন, তাহলে শ্রীকৃষ্ণের কথা চিন্তা করে, শ্রীকৃষ্ণের নামকীর্তন করে এবং শ্রীকৃষ্ণের মহিমা প্রচার করে এই ভক্তিমার্গে আরও উন্নতি লাভ করা যায়। এইভাবে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের শরণাগত ভক্ত ভগবানের কৃপা-আশির্বাদ লাভ করবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
চিন্ময় বিশ্বাস থেকে দিব্য জ্ঞানের উদয় হয়।
এই সম্বন্ধে উপনিষদে বলা হয়েছে-

যস্য দেবে পরা ভক্তিঃ যথা দেবে তথা গুরৌ ।
তস্যৈতে কথিতা হ্যর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ ॥

“যে সমস্ত মহাত্মা ভগবান এবং গুরুদেবের প্রতি অনন্য ভক্তি-পরায়ণ, তাঁর হৃদয়ে সমস্ত বৈদিক জ্ঞান আপনা থেকেই প্রকাশিত হয়।” [শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ-৬/২৩]
“দিব্য বিশ্বাস থেকে জ্ঞান উপলব্ধি অনাসক্তি ও পারমার্থিক প্রগতির উদয় ঘটে। “আমার প্রতি এবং কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থার প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হওয়া প্রকৃত জ্ঞান লাভের পথে প্রাথমিক এবং একমাত্র যোগ্যতা। যদি শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস থাকে, উপলব্ধি আপনা থেকেই আসবে। আর ভগবদ্ভক্তির অনুভূতি যত বৃদ্ধি পাবে, মায়া শক্তির প্রভাবের প্রতি তোমার বিরক্তিও ততই বৃদ্ধি পাবে। আর যখন তুমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে জড় জগতের বন্ধন পরিত্যাগ করবে, তখন নিশ্চিতভাবে উন্নতি লাভ করবে।” (আদর্শ প্রশ্ন আদর্শ উত্তর, অধ্যায়-৮)

দিব্য বিশ্বাস থেকে দিব্য ক্ষমতার আবির্ভাব ঘটে

“হে প্রভু, আমি শুধু আপনার কৃপা প্রার্থনা করছি। যাতে করে তারা আপনার বাণী শ্রবণ করতে সমর্থ হয়।” (শ্রীল প্রভুপাদ, মার্কিনে ভাগবৎ ধর্ম)
দিব্য বিশ্বাস থেকে উৎসাহের উদয় হয়। দৃঢ় বিশ্বাসের কারণে ৫ বছর বয়সী প্রহ্লাদ অসুর পিতাকে অস্বীকার করেছিলেন। ঐ প্রকার বিশ্বাসকে অবলম্বন করে শ্রীল প্রভুপাদ একাকী নিজ দেশ ভারত ছেড়ে জলদূত জাহাজে করে আমেরিকার উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন। তার কাছে কোনো সম্পদ ছিল না, গুরুদেবের নির্দেশের প্রতি ছিল তার অগাধ বিশ্বাস।
কৃষ্ণের প্রতি কে বিশ্বাস পরায়ন হতে পারে? কিছু লোকের কৃষ্ণের বাণীর প্রতি বিশ্বাস রয়েছে আবার কেউ কেউ সেগুলোকে অমান্য করে কিংবা সেগুলোর প্রতি বৈরি ভাবাপন্ন হন। প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেন যে, “যারা ধার্মিক তাদের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপিত হয়: যাঁরা ধর্মীয় বিধি-বিধান পালন করে জীবনকে অতিবাহিত করেছেন। এবং যাঁরা পুণ্যকর্ম করে নিষ্পাপ হয়েছেন, তাঁরা ভগবানের শরণাগত হতে পারেন এবং ক্রমে ক্রমে পূর্ণজ্ঞান লাভ করে পরম পুরুষোত্তম ভগবানকে জানতে পারেন। (গীতা ৭/২৮)
কিন্তু আবার অন্য একটি স্থানে সুন্দরভাবে উল্লেখ রয়েছে যা কোনো পূর্বশর্ত সম্বন্ধীয় নয়:
“কোটি কোটি জন্ম জন্মান্তরের সুকৃতির দ্বারাও যা পাওয়া যায় না, অথচ লোভরূপ একটি মূল্য দিয়ে যা পাওয়া যায়, সেই কৃষ্ণভক্তি-রসভাবিতামতি যেখানেই পাও, অবিলম্বে তা ক্রয় করে নাও।” [চৈ.চ.মধ্য ৮/৭০]
চিন্ময় বিশ্বাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সুকৃতির ব্যাপারটি কি প্রয়োজনীয় না অপ্রয়োজনীয়? যেরকম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে চিন্ময় ও জাগতিক প্রকারভেদ রয়েছে, তাই সুকৃতি বা ধর্মীয় অনুরাগেরও (piety) চিন্ময় ও জড় প্রকারভেদ রয়েছে। “সুকৃতি তিন প্রকার- ভক্তি উন্মুখী সুকৃতি, ভোগ উন্মুখী সুকৃতি এবং মোক্ষ উন্মুখী সুকৃতি। যে সমস্ত কার্য সংসারে শুদ্ধভক্তি জনক বলে স্থির আছে, সেই সমস্ত কার্য ভক্তিমুখী সুকৃতিকে উৎপন্ন করে, যে সমস্ত কার্যের ফল-বিষয় ভোগ, সেই সমস্ত কার্য ভোগ উন্মুখী সুকৃতিপ্রদ; যে সমস্ত কার্যের ফল-মোক্ষ, সেই সমস্ত কার্যই মোক্ষ উন্মুখী সুকৃতি-জনক। সংসার ক্ষয় পূর্বক স্বরূপ ধর্ম কৃষ্ণভক্তির উদ্বোধনী সুকৃতি যখন পুষ্ট হয়ে ফলোন্মুখ হয়, তখনই ভক্ত সাধুসঙ্গে সংসার থেকে উদ্ধার পান এবং কৃষ্ণে তাঁর রতি উৎপন্ন হয়।” [চৈ.চ.মধ্য ২২/৪৫ তাৎপর্য]
জাগতিক পূর্ণ কার্যাবলী কাউকে সত্ত্বগুণে উপনীত করতে পারে কিন্তু কৃষ্ণের প্রতি ভক্তিমূলক সেবার স্তরে উপনীত করতে পারে না। কৃষ্ণভাবনায় আসতে হলে চিন্ময় সুকৃতির প্রয়োজন; তাঁর জন্য আমাদের কোন কৃষ্ণ ভক্তের সান্নিধ্যে লাভ করা প্রয়োজন।

কেন বিশ্বাস হ্রাস পায়?

মাঝে মাঝে যে সমস্ত ব্যক্তি কৃষ্ণ ভক্তের সান্নিধ্য লাভ করেছেন এবং কৃষ্ণভাবনার পন্থা আরম্ভ করেছেন তারা লক্ষ্য করে যে, তাদের এক সময়কার দৃঢ় সবল বিশ্বাস ক্ষীনপ্রায় হয়ে গেছে এবং ভক্তিমূলক সেবা নির্বাহের দৃঢ়তা হ্রাস পেয়েছে। এটি কেন হয়? তা আশ্চর্যজনক।
বেশ কয়েকটি বিষয় আমাদের চিন্ময় বিশ্বাসে পতন ঘটাতে পারে। কোনো একজন ভক্তের সঙ্গ প্রভাবে যেমন কেউ বিশ্বাস অর্জন করে ঠিক বিপরীতভাবে, জাগতিক ব্যক্তিদের সঙ্গ প্রভাবে সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায়। আরেকটি কারণে বিশ্বাস হ্রাস পেতে পারে, সেটি হলো অবাস্তব প্রত্যাশা করা (unrealistic expectations) আমরা হয়তো মনে করতে পারি, “পাঁচ বছর কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন করার পর আমি একজন শুদ্ধ ভক্ত হয়ে উঠব।” কিন্তু সেই সময়টি যখন অতিবাহিত হয়ে যায়, আমরা নিজেদের পারমার্থিক প্রগতি ও | বিশ্বাস প্রসঙ্গে হতাশ হয়ে পড়ি, বিশেষত যদি মৌলিক দীক্ষা ব্রত পালনের স্তরে উপনীত না হতে পারি। অথবা, আমরা ভাবতে পারি, “যেহেতু আমি ভক্তদের সান্নিধ্য থেকে অনেক বছর ধরে সেবা করেছি, তাই আমার এখন সোসাইটি থেকে নির্দিষ্ট সুফল লাভ করা উচিত।” যখন আমরা সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ অধিকার বা যে সম্মান আমরা প্রত্যাশা করি। সেগুলো না পায় তখন আমরা বিষণ্ন হতে পারি এবং আমাদের বিশ্বাসও হ্রাস পেতে পারে।
তদ্রুপ ভক্তিমূলক সেবা পন্থায় আমাদের বিশ্বাস নড়বড়ে হতে পারে যদি আমরা ভক্তদের মধ্যে অনৈতিকতা, ভক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরায়ণ বা ঈর্ষা মনোভাব পরিলক্ষিত করি।
যদি আমরা পারমার্থিক বা জাগতিকভাবে যা করেছি তা নিয়ে গর্বিত হয়ে পড়ি, তখন আমাদের ভক্তিমূলক সেবার রুচি ও বিশ্বাস উদ্‌গরিত হয়ে যায়।
যদি আমরা ভুলে যায় যে, যে যশ, লাভ ও বন্দনা (adoration) আমরা ভক্তিপথে আমাদের কার্যাবলীর জন্য যা অর্জন করি তা কৃষ্ণ ও গুরুদেবের কৃপা ছাড়া আর কিছু নয়। একজন ভক্তি অনুশীলনকারীর কাছে যে ঐশ্বর্যসমূহ আগত হয় তার সবটুকুই গুরু ও ভগবানের কৃপার প্রভাবে সাধিত হয়।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ এরকম দুর্বল শ্রদ্ধা বা বিশ্বাসের অন্যান্য কারণগুলো বর্ণনা করেছেন: “হৃদয়ে সুদৃঢ় বিশ্বাস সহকারে এই অতুলনীয় অমৃত পান কর। কুতর্করূপ গর্তে অথবা অপবিত্র
কর্কশ আবর্তে পতিত হইও না-তাতে পড়লে তোমার সর্বনাশ হবে।” [চৈ.চ. (মধ্য) ২৫/২৭৯]
দুর্বল বিশ্বাসের আরেকটি প্রধান কারণ হলো অপরাধ । যদি আমরা বিবেকনিষ্ঠ না হই, আমরা কৃষ্ণের বা তার ভক্ত, তার বিগ্রহ, তার জীবের প্রতি অপরাধ করতে পারি এবং ফলশ্রুতিতে বিশ্বাস হারিয়ে যায়।

অবিশ্বাস, সন্দেহ ও বিশ্বস্ততা

যাদের ভগবৎ বিশ্বাস নেই অথচ নিজেদের প্রতি ও জাগতিক বিষয়ে প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তারা প্রায়ই কৃষ্ণের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ও ক্রোধান্বিত হয় এবং তাঁর ভক্তবৃন্দের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। তারাও অসন্তুষ্ট, অসুখী ও মনের মধ্যে অশান্তিপরায়ণ এবং তারা শাস্ত্রের জ্ঞান অগ্রাহ্য করে এবং তাদের নিজেদের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করে। এ প্রকার লোকেদের জন্য কৃষ্ণ গুপ্ত থেকে যায়, এক্ষেত্রে কৃষ্ণ বলেন, তিনি নির্মাৎসর ঈর্ষাহীন ব্যক্তিদের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন:
“হে অর্জুন! তুমি নির্মৎসর বলে তোমাকে আমি পরম বিজ্ঞান সমন্বিত সবচেয়ে গোপনীয় জ্ঞান উপদেশ করছি। সে জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তুমি দুঃখময় সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হও।” [গীতা ৯/১]
বিশ্বাসহীনতার একটি দৃষ্টান্ত হল শিশুপাল, যিনি কৃষ্ণের অপ্রাকৃত গুণাবলী শ্রবণ করেও তিনি তার ঈর্ষা ও বিচলিত প্রকৃতি প্রদর্শন করেন। তিনি অত্যন্ত অধৈর্য ও ক্রোধান্বিত হয়ে বলেন : “এই সভার পরমোন্নত সদস্য তপশ্চর্যার ক্ষমতা সম্পন্ন, দিব্য দৃষ্টি ও ব্রতনিষ্ঠ, জ্ঞান দ্বারা নষ্টপাপ, লোকপালগণ দ্বারাও পূজিত পরমব্রহ্মে উৎসর্গীকৃত পরম ঋষিগণকে আপনি কিভাবে অতিক্রম করতে পারেন? কিভাবে এই কুলদূষণ গোপবালক একটি কাকের পবিত্র পুরোডাশ খাওয়ার যোগ্যতার মতো আপনাদের পূজা পাওয়ার যোগ্য? (শ্রীমদ্ভাগবত-১০/৭৪/৩৪)
হিরণ্যকশিপু যিনি ভক্ত প্রহ্লাদের অসুর পিতা ছিলেন, তিনি বিচলিত ও অশ্রদ্ধাপরায়ণ প্রকৃতি প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি নির্দোষ প্রহ্লাদকে উদ্দেশ্য করে ক্রোধান্বিত হয়ে বলেছিলেন। “হে দুর্বিনীত, হে মন্দবুদ্ধি, হে কুলভেদকারক, হে অধম, তুই আমার শাসন লঙ্ঘন করেছিস্, তাই তুই এক জেদী মূর্খ। আজ আমি তোকে যমালয়ে পাঠাব।” [ভাগবত ৭/৮/৫]
যদিও আমরা সাধারণভাবে ভাবি সংশয় হলো অনাকাঙ্ক্ষিত, যখন নাস্তিকরা তাদের নাস্তিকতা বিষয়ে সংশয় পোষন করে তখন তাদের সেই সঙ্গে উপকারী। শ্রীল প্রভুপাদ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করেছেন,
“সংশয় বুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তি; অন্ধের মতো কোনো কিছু মেনে নেওয়া বুদ্ধির পরিচায়ক নয়। তাই সংশয় শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুদ্ধির বিকাশের জন্য প্রথমে সন্দিগ্ধ হওয়া উচিত।” [ভাগবত ৩/২৬/৩০]
নাস্তিকেরা প্রায়ই তাদের মনে উদ্ভূত বিবিধ প্রশ্নের সিংহভাগই কোনো রকম যাচাই বাছাই না করেই ভগবানকে অস্বীকার করে। যেরকম প্রভুপাদও তার অনুসারীদের অন্ধভাবে বিশ্বাস পরায়ণ হওয়ার বিষয়টি চান নি, তদ্রুপ তিনি জাগতিক ব্যক্তিদেরকেও অন্ধভাবে অবিশ্বাসী হওয়ার ব্যাপারটি প্রত্যাশা করেন নি। বরং আমরা অনুসারীরা সবাই বুদ্ধিমত্তা সহকারে স্বচ্ছ-জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গপ্রভাবে সতর্কভাবে সবকিছু বিবেচনা করার ব্যাপারটি উপভোগ করেছিলাম।
প্রভুপাদ বলেন “সংশয় অনুকূল হয় না যখন যথাযথ তথ্য থেকে তথ্য লাভ করা হয় না। কেউ জাগতিক না পারমার্থিক তা নির্ধারণ প্রক্রিয়া শুরু হয় সংশয়ের মাধ্যমে।”
যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা প্রামাণিক শাস্ত্র ও সাধুগণের কাছ থেকে শ্রবণ করছি না ততক্ষন পর্যন্ত সংশয় প্রকাশ করা উচিত। তখন তাদের অপ্রাকৃত রাণী উপলব্ধি ও ধারণ করতে আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করব।
যেরকম বিশ্বাসহীনদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তদ্রুপ বিশ্বাসী ব্যক্তিদেরও নির্দিষ্ট্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাদের জন্য বৈশিষ্ট্য হলো, সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও গুরুদেবের নির্দেশ পালন করা ও আত্মত্যাগ করা, শ্রীল প্রভুপাদ হলেন এই বিশেষ গুণের প্রতিমূর্তি।
বিশ্বাসী ব্যক্তির জানে, তারা কখনো পরাজিত হবে না, কেননা কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন “তুমি দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করো যে আমার ভক্তের কখনো বিনাশ নেই।” [গীতা ৯/৩১]
যারা বিশ্বাসী বা শ্রদ্ধাপরায়ণ তারা সর্বদা সন্তুষ্ট, কেননা তারা তাদের বর্তমান অবস্থান লাভ করেছেন


নাস্তিকেরা প্রায়ই তাদের মনে উদ্ভূত বিবিধ প্রশ্নের সিংহভাগই কোনো রকম যাচাই বাছাই না করেই ভগবানকে অস্বীকার করে। যেরকম প্রভুপাদও তার অনুসারীদের অন্ধভাবে বিশ্বাস পরায়ণ হওয়ার বিষয়টি চান নি, তদ্রুপ তিনি জাগতিক ব্যক্তিদেরকেও অন্ধভাবে অবিশ্বাসী হওয়ার ব্যাপারটি প্রত্যাশা করেন নি।

পূর্ব কর্মফলের কারণে এবং তারা সবকিছুর পেছনে এমনকি দুর্দশার পেছনেও ভগবানের চিন্ময় হাতকে দর্শন করেন।

তত্তেহনুকম্পাং সুসমী মাণো
ভুঞ্জান এবাত্মকৃতং বিপাকম্।
হৃদ্বাগ্বপুর্ভির্বিদধন্নমস্তে
জীবেত যো মুক্তিপদে স দায়ভাক্ ॥

অর্থাৎ, “যিনি আপনার অনুকম্পা লাভের আশায় তাঁর পূর্বকৃত মন্দ কর্মের ফল ধৈর্য সহকারে ভোগ করতে করতে তাঁর হৃদয়, বাক্য ও শরীরের দ্বারা আপনাকে প্রণতি নিবেদন করে জীবন যাপন করেন, তিনি অবশ্যই মুক্তি লাভের যোগ্য, কারণ তিনি উপযুক্ত উত্তরাধিকারী।” [ভাগবত ১০/১৪/৮]
যে সমস্ত ব্যক্তিরা কৃষ্ণের অবস্থান ও ঐশ্বর্যসমূহকে জানেন তারা দৃঢ় বিশ্বাস ও সংশয়াতীতভাবে তাঁকে গ্রহণ করেন এবং তার সেবায় ভক্তিভাবে নিয়োজিত হন। ফলে, তারা জাগতিক বাসনা শূন্য হন এবং সর্বদা অনুকূলভাব অবলম্বন করে আনন্দপরায়ণ হয়। তারা কৃষ্ণ সেবায় সন্তুষ্ট অনুভব করে এবং আশা ও কৃতজ্ঞতার সহিত তাঁর সেবা করে।

কৃষ্ণের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস

আমাদের মধ্যে কৃষ্ণের প্রতি দৃঢ় ও চিন্ময় বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা বর্তমানে আবৃত অবস্থায় রয়েছে। আমরা সেটিকে অনাবৃত করতে পারি যার কাছে এটি রয়েছে সেই কৃষ্ণভক্তের সংস্পর্শে আশার মাধ্যমে এবং সর্বোপরি তার নির্দেশনা অনুসরণের মাধ্যমে। যখন আমরা চিন্ময় বিশ্বাস অর্জন করি, আমরা কৃষ্ণভাবনার অভিজ্ঞতা লাভ করব এবং সে সাথে পূর্ণ সুখ আস্বাদন করতে পারব।
বিশ্বাসের ব্যবহারিক প্রয়োগ হলো শরণাগতি, যেটি অর্জুন প্রদর্শন করেছিলেন, ভগবদ্‌গীতায় অন্তিমে তিনি বলেন:
“হে অচ্যুত! তোমার কৃপায় আমার মোহ দূর হয়েছে এবং আমি স্মৃতি লাভ করেছি। আমার সমস্ত সন্দেহ দূর হয়েছে এবং যথাজ্ঞানে অবস্থিত হয়েছি। এখন আমি তোমার আদেশ পালন করব।” [গীতা ১৮/৭৩]
প্রভুপাদের গুরুভ্রাতা শ্রীধর স্বামী বিশ্বাসের গুরুত্ব সম্পর্কে লিখেছিলেন, “যে রকম চোখ রঙ দর্শন করে আর কর্ণ শব্দ শ্রবণ করে, তদ্রুপ শুধুমাত্র বিশ্বাসের মাধ্যমে আমরা চিন্ময়জগৎকে প্রাপ্ত হতে পারি। শুধুমাত্র বিশ্বাসই এটি দর্শন করতে পারে এবং অনুভব করতে পারে। চিন্ময় বাস্তবতাকে অন্য কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া যায় না। বিশ্বাস হলো আত্মার প্রকৃত কার্য এবং সেটি জাগ্রত হয় বৈকুণ্ঠের প্রতিনিধি বা সাধুদের মাধ্যমে। বিশ্বাস বা শ্রদ্ধার মাধ্যমে সাধুসঙ্গ বর্ধিত হয় এবং এর মাধ্যমে বাস্তব সংস্কৃতির কার্যকলাপ সাধিত হয় …চিন্ময় বাস্তবতা প্রাপ্ত হওয়াই হলো আত্মার কার্য”। (subjective evolution of consciousness অধ্যায়-8।)
হৃদয় জানতে আগ্রহী হয় কেন এই বিশ্বজগতের সৃষ্টি ও জীবন। জাগতিক কোনো কারণ এই রহস্যের উন্মোচন করতে পারে না। কিন্তু বিশ্বাস পারে অতএব, চিন্ময় বিশ্বাস হলো মাবন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়। কৃষ্ণ স্বয়ং অপ্রত্যক্ষভাবে তা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যখন তিনি ঘোষণা দেন, “অজ্ঞ ও শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি কখনই ভগবদ্ভক্তি লাভ করতে পারে না। সন্দিগ্ধ চিত্ত ব্যক্তি ইহলোকে সুখভোগ করতে পারে না এবং পরলোকেও সুখভোগ করতে পারে না। [গীতা ৪/৪০]
চিন্ময় বিশ্বাস হল চিন্ময় জীবনের উদ্দিপক নীতি, অপরদিকে সংশয় পারমার্থিক জীবনকে বিতারিত করে। এজন্যে প্রভুপাদ লিখেছেন, “শুধুমাত্র বিশ্বাস বা শ্রদ্ধার মাধ্যমেই কেউ কৃষ্ণভাবনায় প্রগতি সাধন করতে পারে।”

লেখক পরিচিতি : বিশাখা দেবী দাসী ১৯৮৩ সাল থেকে ব্যাক টু গডহেড এর প্রবন্ধ লেখক। তার our-spiritual journey.com এই ওয়েব সাইট পরিদর্শন করতে পারেন।


 

এপ্রিল – জুন ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here