বিশ্বাস কখনো প্রমাণ নয়

0
59

 

ড. প্রেমাঞ্জন দাস:-




সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক সমীপেষু পৃষ্ঠায় দীপশিখা পোদ্দারের বিশেষ প্রবন্ধ ‘ধর্মই পিতৃতন্ত্রের প্রধান শক্তি’ পড়লাম। তিনি লিখেছেন, “আমার বিশ্বাস নারী পুরুষের এই অসাম্যের মূল কারণ পুরোটাই অর্থনৈতিক বা জীবিকার্জন সম্বন্ধীয় নয়। অর্থনৈতিক কারণ নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সবটা নয়। মূল কারণ ধর্ম। শুধুই ধর্ম বা ঈশ্বরবোধের কারণেই যুগ যুগ ধরে নারী-পুরুষের এই অসাম্য।” লেখিকা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এটি তাঁর বিশ্বাস। এই বিজ্ঞানের যুগে একজন অল্পজ্ঞ মহিলার বিশ্বাসের মূল্য কতটুকু? এটা প্রমাণের যুগ, বিশ্বাসের নয়। লেখিকা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, ঈশ্বরবোধের উপর ভিত্তি করেই পুরুষরা যুগ যুগ ধরে নারীকে শোষণ করে চলেছে। আমাদের বক্তব্য, নারী নির্যাতন এবং নারী শোষণ অপরাধ প্রবণতার অন্তর্গত একটি জটিল বিষয়। এই অপরাধপ্রবণতা নিয়ে দেশে-বিদেশে বহু গবেষণা হয়েছে। সেই সব অসংখ্য গবেষণার তথ্য উপস্থাপিত করা এই ক্ষুদ্র পরিসরে সম্ভব নয়। আমি এখানে দু-একটি তথ্য উপস্থাপন করছি। বিশেষত: আমেরিকায় এমন কিছু অপরাধমূলক ঘটনা হামেশাই ঘটে যা আমাদের কল্পনারও বাইরে। এই কলিযুগে নারীরা ঘরেও নিরাপদ নয়। মিডিয়ায় এরকম জঘন্য সংবাদ প্রায়ই দেখা যায়। তারা অনেক সময় নিকট জন দ্বারাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা একশজন গুরুতর যৌন অপরাধী ব্যক্তি ঈশ্বরে অবিশ্বাসী। ধর্মের নামে অধর্ম, ধর্মের নামে নারী নির্যাতন এই অপরাধ প্রবণতারই একটি অঙ্গ। উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত টানাই যুক্তিযুক্ত হবে যে, মানুষ যতই নাস্তিক হবে, ততই সে ধর্মের নামে অধর্ম আচরণ করবে। ধর্মের নামে ভণ্ডামি, ধর্মের নামে শোষণ-এসবের মূল কারণ হচ্ছে ঈশ্বরে অবিশ্বাস। তাই চোখের ছানিকে নির্মূল করতে হবে, চোখকে নয়। ধর্মের নামে ভণ্ডামিকে দূর করতে হবে, প্রকৃত ধর্মকে নয়। ধর্মের নাম ভাঙিয়ে যারা নারীকে শোষণ করে, ঈশ্বরে তাদের বিন্দুমাত্রও বিশ্বাস নেই। বরং আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যারা যত বেশি ধর্মভীরু, অপরাধপ্রবণতাও তাদের মধ্যে তত কম। সুতরাং লেখিকার যে বিশ্বাস, তা অন্ধ বিশ্বাস। সমস্ত পৃথিবীতে অপরাধমূলক ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। দেশে দেশে থানা এবং পুলিশের সংখ্যাও বাড়ছে। অপরাধপ্রবণতা রোধ করার জন্য সব দেশের সরকারই কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, অপরাধমূলক ঘটনার সংখ্যাও ততই বেড়ে চলেছে। আমেরিকাকে মানুষ জ্ঞানে বিজ্ঞানে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সব চেয়ে উন্নত দেশ বলেই গণ্য করে। কিন্তু সেই দেশেই অপরাধের সংখ্যা সব চেয়ে বেশি।
প্রায়ই দেওয়ালে লেখা থাকে, নিরক্ষরতা জাতির লজ্জা। কিন্তু পত্র-পত্রিকায় মাঝে-মধ্যে এমন খবর পাই যে, একজন সুশিক্ষিত ডাক্তার একজন নারীকে ধর্ষণ করেছেন। কিংবা দেশের সর্বোচ্চ স্তরের শিক্ষিত কর্তারা ঘুষ খাচ্ছেন। এমনি কত কি। একজন সচ্চরিত্র অশিক্ষিত ঝাড়ুদার এবং একজন চরিত্রহীন প্রধানমন্ত্রী-কে দেশের গর্ব? অবশ্য যদি কেউ সুশিক্ষিত এবং সচ্চরিত্র হন, তা হলে তিনি সর্বোত্তম। তবে অশিক্ষিত সৎ ব্যক্তি নিয়েও আমরা গর্ব করতে পারি, কিন্তু শিক্ষিত গুণ্ডাবদমাশ নিয়ে কেউই গর্ব বোধ করে না (গুণ্ডারা ছাড়া)। সুতরাং নিরক্ষরতা জাতীয় লজ্জার অত্যাবশ্যক লক্ষণ নয়।
ভারত সাক্ষরতার হার, শিক্ষিতের হার এসব ব্যাপারে আমেরিকা থেকে পিছিয়ে। তবুও অপরাধপ্রবণতার সংখ্যা যেহেতু আমেরিকার তুলনায় ভারতে কম, তাই ভারত এখনও আমেরিকা থেকে উন্নত দেশ। অবশ্য বর্তমানে বহু ভারতবাসী আমেরিকার অনুকরণে ভারতেও অপরাধমূলক ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি করে চলছেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই অপরাধপ্রবণতার মূল ভিত্তি কী? এই অপরাধপ্রবণতার মূল ভিত্তি মনস্তাত্ত্বিক। কি সমাজতান্ত্রিক কি ধনতান্ত্রিক-সব দেশেই জেলগুলি আসামীতে ভরে থাকে। এমন কি রাজতন্ত্রেও অপরাধীদের কঠোর শাস্তি হতো। তবু আজ পর্যন্ত কোনো তন্ত্রই এই অপরাধপ্রবণতাকে নির্মূল করতে পারেনি।
কিন্তু আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি যে, ঈশ্বরে অবিশ্বাসই সমস্ত অপরাধপ্রবণতার মূল ভিত্তি। এই ব্যাপারে আমাদের বহু বাস্তব প্রমাণ রয়েছে। ঈশ্বরে অবিশ্বাস যত বেশি তীব্র হবে, অপরাধপ্রবণতাও তত বেশি তীব্র হবে। পক্ষান্তরে, ঈশ্বরে বিশ্বাস যত বেশি তীব্র হবে, অপরাধপ্রবণতাও তত বেশি কম হবে। আর যিনি ঈশ্বরকে সম্পূর্ণ উপলব্ধি করেছেন, তিনি এই অপরাধপ্রবণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
এই ব্যাপারে প্রথমে কিছু ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। কৃষ্ণভক্ত হওয়ার আগে জগাই এবং মাধাই সমস্ত রকমের অনাচার করতেন। কিন্তু কৃষ্ণভক্ত হওয়ার পর তাঁরা অনায়াসে শুদ্ধ জীবন যাপন করতে থাকেন। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত এবং শ্রীচৈতন্যভাগবতে শত শত শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তের কাহিনী বর্ণিত আছে। তাঁরা সমস্ত রকমের অনাচার থেকে মুক্ত ছিলেন। আমরা কখনও শুনি না, রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী প্রমুখরা ঘুষ খেয়েছেন কিংবা চুরি ডাকাতি করেছেন।
বলতে পারেন, ইতিহাস মানি না, বর্তমানের দৃষ্টান্ত দিন। আচ্ছা, শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় অসংখ্য মানুষ সমস্ত রকমের অনাচার থেকে মুক্ত হয়েছেন। যেহেতু তাঁরা পরলোকের শাস্তিকে ভয় করেন, ভগবানকে ভালবাসেন, তাঁরা অনায়াসে পাপকর্ম বন্ধ করতে সক্ষম। যিনি যথার্থ ধর্মভীরু তিনি কখনও চুরি করতে পারেন না, অনাচার করতে পারেন না।
আপনি হয়তো বলতে পারেন, আপনি বহু ধর্মভীরু ব্যক্তিকেও অনাচার করতে দেখেছেন। নিঃসন্দেহে তারা নকল ধর্মভীরু কিংবা তাঁর ঈশ্বর বিশ্বাস খুবই কোমল, গাঢ় নয়। যে ধর্ম অপরাধপ্রবণতা থেকে যত বেশি মুক্ত, নিঃসন্দেহে সেই ধর্ম তত শুদ্ধ। এই বিচারে শুদ্ধ বৈষ্ণব ধর্মই জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম।
বলতে পারেন, হনুমান এবং অর্জুন যথাক্রমে রামভক্ত এবং কৃষ্ণভক্ত হওয়া সত্ত্বেও অনেক হত্যা করেছেন। কিন্তু তাঁরা তা করেছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ স্বরূপ এবং ন্যায়কে রক্ষার স্বার্থে। রাবণ সীতা হরণ করেন আর দুর্যোধন পাণ্ডবদের প্রাপ্য সম্পদ দখল করেন। এরকম অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া ভীষণ অধর্ম। অর্জুন এবং হনুমান ধর্মভীরু হলেও অধর্মকে ভয় করতেন না। তাই তাঁরা দুঃসাহসিক যুদ্ধে যোগদান করে। অধর্মকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করেন এবং ভগবানের কৃপায় ধর্মের জয় প্রমাণ করেন।
যদি আমাদের কথার সত্যতা যাচাই করতে চান, বহু খুনী আসামী কিংবা গুরুতর যৌন অপরাধীকে প্রশ্ন করে দেখুন। তাদের বেশির ভাগই ঘোরতর নাস্তিক। কেউবা ভণ্ড ধার্মিক আর কারও কারও ঈশ্বর বিশ্বাস খুবই দুর্বল।
অবশ্য শত শত যুক্তি থাকলেও হতভাগ্য নাস্তিকেরা ধর্মের নামে ভণ্ডামিকেই প্রমাণরূপে উপস্থাপিত করতে পছন্দ করেন। তাঁদের দুর্ভাগ্যের জয় অবশ্যম্ভাবী।

চৈতন্য সন্দেশ  মে- ২০২২ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here