প্রীতিই চরম প্রয়োজন

0
18

শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর


বেদ বলিয়াছেন, (মুণ্ডক ৩/১৪)-

“প্রাণো হোষ যঃ সর্বভূতৈবিভাতি বিজানন বিদ্বান্ ভবতে নাতিবাদী।
আত্মক্রীড় আত্মরতি ক্রিয়াবানেব ব্রহ্মবিদাং বরিষ্ঠঃ॥”

অর্থাৎ ব্রহ্মবিদদিগের বরিষ্ঠ ব্যক্তি আত্মরতি ও আত্মক্রীড় হইয়া প্রেমের ক্রিয়াদ্বারা লক্ষিত হন; সেই রতিই প্রীতি।

“ন বা অরে সর্বস্য কামায় সর্বং প্রিয়ং ভবত্যাত্মনস্ত কামায় সর্বং প্রিয়ং ভবতি”

(বৃ: ২/৪-৫, ৪/৫-৬)

এই বৃহদারণ্যক-বাক্যে প্রীতিই যে জীবের মুখ্য প্রয়োজন, তাহা জানিতে পারা যায়। এরূপ বেদ ও ভাগবতপুরাণ-প্রমাণ বহুতর আছে। তৈত্তিরীয় উপনিষদ্ স্পষ্ট বলিয়াছেন (আ: ৭ম অনু)

“কো হ্যেবান্যাৎ কঃ প্রাণ্যাৎ।
যদেষ আকাশ আনন্দো ন স্যাৎ।
এষ হ্যেবানন্দয়াতি॥”

আনন্দ প্রীতি-পর্যায়। সকল জীবই আনন্দের জন্য চেষ্টা করেন-মুমুক্ষু ব্যক্তিরা মোক্ষকেই আনন্দ মনে করেন, এই জন্যই তাঁহারা ‘মোক্ষ’ ‘মোক্ষ’ করিয়া উন্মত্ত; বুভুক্ষু ব্যক্তিরা বিষয় ভোগকেই আনন্দ, বলেন। এই জন্যই তাঁহারা ভুক্তির পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিতÑআনন্দ-লাভের আশাই তাঁহাদিগকে সেই সেই কার্যে প্রবৃত্তি দেয়। ভক্তগণ কৃষ্ণসেবানন্দের জন্য চেষ্টাবান্, অতএব সর্বপ্রকার লোকেই প্রীতিকে অন্বেষণ করিতেছেন; এমনকি, প্রীতির জন্য দেহ-পরিত্যাগেও প্রস্তুত।
সিদ্ধান্ত এই যে, প্রীতিই সকলের মুখ্য প্রয়োজনÑইহা কেহই অস্বীকার করিবেন না। নাস্তিকই হউন বা আস্তিকই হউন, কর্মবাদীই হউন বা জ্ঞানবাদীই হউন, কর্মীই হউন বা নিষ্কামীই হউনÑসকলেই একমাত্র প্রীতিকে অন্বেষণ করিতেছেন। অন্বেষণ করিলেই যে প্রীতিকে পাওয়া যায়, এমন নয়। কর্মবাদী স্বর্গলাভকে প্রীতিপ্রদ মনে করেন, কিন্তু “ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি” (গীঃ ৯/২১) এই ন্যায়ানুসারে যখন স্বর্গ হইতে চ্যুত হন, তখন নিজের ভ্রম বুঝিতে পারেন।
মনুষ্যলোকে ধন, পুত্র, যশ: ও বল লাভ করিয়াও তাহাতে প্রীতি না পাইয়া স্বর্গসুখ কল্পনা করেন; স্বর্গচ্যুতিসময়ে তদুত্তর-লোক-সকলের সুখকে বহু সম্মান করিয়া থাকেন। যখন জানিতে পারেন যে, মর্ত্যলোকে, স্বর্গে বা ব্রহ্মলোক পর্যন্ত সুখ অস্থায়ী ও অনিত্য, তখন বিরাগ লাভ করিয়া ব্রহ্ম-নির্বাণকে অনুসন্ধান করেন, ব্রহ্ম নিবৃত্তি লাভ করিয়া যখন আর সুখসম্ভোগ হয় না, তখন তটস্থ হইয়া পন্থান্তর অন্বেষণ করেন। নির্ভেদ ব্রহ্মনির্বাণে আনন্দ বা প্রীতি কিরূপে সম্ভব হয়? যখন আমিত্বের একেবারে লোপ হইল, তখন আনন্দের ভোক্তা কে?
আবার যখন সমস্ত বস্তু এক হইয়া গেল, তখন আনন্দই বা কোথায়? আনন্দের অনুভবই বা কে করিবে? আমার আমিত্ব গেলে ব্রহ্মকেই বা কে অনুভব করিবে? ব্রহ্ম আনন্দ হইলেও ভোক্তার অভাবে নিরর্থক; তখন আনন্দ আছে কি না, এ বিষয়ের সিদ্ধান্তই বা কি? আমিত্বনাশের সহিত আমার সর্বনাশ; আমার আর তখন কি রহিল যে, আমার প্রয়োজন-লাভের অনুভব হইবে?
আমি নাই ত’ কিছুই নাই। যদি বল, ব্রহ্মরূপ আমি রহিলাম, তাহাও অকিঞ্চিৎকর, কেন না, ব্রহ্মরূপ আমি ত’ নিত্য আছি, তাহার সাধন ও সিদ্ধি অকর্মণ্য ও অযুক্ত; অতএব ব্রহ্মনির্বাণটা প্রীতিসিদ্ধি নয়তÑজীবের পক্ষে একটা ভ্রম মাত্র; সত্য হইলেও তাহা পুষ্পের ন্যায় অনুভূত। ভক্তিতেই কেবল প্রয়োজন-সিদ্ধি দেখা যায়, ভক্তির চরম অবস্থাই প্রীতি; সেই প্রীতিই নিত্য। শুদ্ধকৃষ্ণও নিত্য, শুদ্ধপ্রীতিও নিত্য; অতএব অচিন্ত্যভেদাভেদ-অঙ্গীকারে প্রেমের নিত্যতাই সিদ্ধ হয়, নতুবা জীবের চরম প্রয়োজন যে প্রীতি, তাহাতে অনিত্যতা আসিয়া তাহার সত্তাকে নাশ করে, এতন্নিবন্ধন সর্বশাস্ত্রই অচিন্ত্যভেদাভেদ-রূপ সত্য-সিদ্ধান্তকে দৃঢ় করিতেছেন; আর সমস্ত বাদই মতবাদ।


মাসিক চৈতন্য সন্দেশ জুন-২০২২ হতে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here