নবকলেবর মহোৎসব

0
91

এই উৎসব মানে স্বপ্নে দৃশ্যমান বৃক্ষ দিয়ে নির্মিত বিগ্রহত্রয় কিংবা শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ১২ বছরের পুরনো বিগ্রহের সমাধি নয়। রয়েছে আরও অনেক অদ্ভুত সব কার্যকলাপ। যা প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে এক অপূর্ব লীলার সম্পদস্বরূপ। নিম্ন প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন বিশাখা দেবী দাসী।

পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথের নবকলেবর যাত্রা উৎসব প্রতি ১২ বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসব দর্শনের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল এবং সমগ্র পৃথিবী থেকে ৫ লক্ষেরও অধিক লোকসমাগম হয়। এই উৎসবে মোট খরচ হয় প্রায় ৫ লক্ষ ডলার যা বার্ষিক রথযাত্রা উৎসবের মোট খরচের ১০ গুণ। এই বিশেষ বছরে শুধুমাত্র রথযাত্রার উদ্দেশ্যে নতুন ৩টি রথ তৈরির সাথে সাথে ভগবান জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা দেবী নবকলেবর বা নব দারুবিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরাতন বিগ্রহ থেকে নতুন বিগ্রহে প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে বহু আচার অনুষ্ঠান সম্পাদিত হয়। প্রধান প্রধান পূজাগুলো প্রাচীন তালপাতায় রচিত সংস্কৃত ভাষায় লিখিত শাস্ত্র দ্বারা সম্পাদিত হয়। এই প্রাচীন তালপাতায় লিখিত শাস্ত্রসমূহ মন্দিরেই রাখা হয় এবং কেবলমাত্র প্রধান তিন পূজারীই এই শাস্ত্র পাঠ করতে পারেন। শাস্ত্রসমূহ নিম্নরূপ:
নীলাদ্রি মহোদয়া : নীলাদ্রি মানে নীল পাহাড় এবং মহোদয়া এর অর্থ হল ‘মহৎ উদয়’। এই শাস্ত্রে এই সুপ্রাচীন জগন্নাথ মন্দিরের উৎপত্তি সম্পর্কে তথ্য আছে।
রুদ্র যামল : রুদ্র বলতে বুঝায় ভগবান শিবকে এবং যামল বলতে বোঝায় পূজানুষ্ঠানের শাস্ত্রকে। এই শাস্ত্রে বলদের উপাসনার বিবিধ পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।
তন্ত্র যামল : তন্ত্র মানে আরাধনার গূঢ় পদ্ধতি। এই শাস্ত্রে বিভিন্ন বৈদিক চিত্র অংকনের মাধ্যমে পূজার্চনা পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। মন্দিরে প্রতিদিন পূজার অংশ হিসেবে বিভিন্ন রেখাচিত্র অংকনের মাধ্যমে সেই শক্তিসমূহের আহ্বান করা হয়। এই শাস্ত্রে সুভদ্রা দেবীর আরাধনার পন্থা বর্ণিত হয়েছে।
ব্রহ্ম যামল : এই শাস্ত্রে ভগবান জগন্নাথদেবের পূজার্চনার যাবতীয় বিষয় আলোচিত হয়েছে।

                     গদা চিহ্ন

এই তালপত্রে লিখিত শাস্ত্রসমূহের উৎপত্তি সম্বন্ধে জানা যায় না। প্রাচীন সময়কালে শুদ্ধভক্তগণ গভীর ধ্যানমগ্ন অবস্থায় এই শাস্ত্রসমূহ লিখেছিলেন যদিও তারা এই শাস্ত্রসমূহের মূল রচয়িতা নন। এই নবকলেবরের পদ্ধতিসমূহ এই সকল শাস্ত্র থেকে এসেছে যা ধাপে ধাপে এখন বর্ণনা করা হবে। বর্তমান সময়কালে এই সকল শাস্ত্র এবং নবকলেবর পদ্ধতিসমূহ সাধারণের দৃষ্টিগোচর নয় এমনকি এই বিষয়ে মন্দিরের কোন পাণ্ডার বাইরের কারো সাথে আলোচনা করার অনুমতি নেই। যেহেতু নতুন জগন্নাথ বিগ্রহ কাঠদ্বারা নির্মিত হবে তাই নবেকলেবর যাত্রার সময় পূজারীকে প্রথমে সঠিক বৃক্ষের সন্ধান করতে হবে। কোন সাধারণ বৃক্ষ বিগ্রহ নির্মাণে ব্যবহৃত হবে না। কিছু নির্দিষ্ট অসাধারণ বৈশিষ্ট্য পূরণ করতে পারলেই সেই বৃদ্ধ অনুমোদিত হবে। তালপত্রে লিখিত শাস্ত্র নীলাদ্রি মহোদয়াতে লিখিত আছে যে এই পবিত্র বৃক্ষ শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গ্রামে প্রতি ১২ বছর পর পরই খুঁজে পাওয়া যাবে।
যে বৃক্ষ দ্বারা জগন্নাথ বিগ্রহ নির্মিত হবে সেই বৃক্ষের সন্ধানে মন্দিরের পাণ্ডাদের যে দল বের হবে সেখানে অবশ্যই পাতি মহাপাত্রা পরিবারের একজন, ২০ জন দ্বৈয়িতাপতি, ১ জন মহারণ, ১৬ জন ব্রাহ্মণ, ৩ জুন দচুলকারানা, ৩০ পুলিশ অফিসার এবং ২ জন পুলিশ ইন্সপেক্টর উপস্থিত থাকতে হবে ৷এমনকি প্রতি ১২ বছরের চক্রাকারে আবর্তনকালে কোন সময়ে কোন গ্রামে সেই বৃক্ষ পাওয়া যাবে তা হাজার হাজার বছর পূর্বেই এই সকল শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে। ধরুণ ১৯৯৬ সালের নবকলেবর যাত্রার কথা।

                        শঙ্খ চিহ্ন

সেই বছর যে গ্রামে সেই পবিত্র বৃক্ষটি পাওয়া গেছে সেই গ্রামের নাম সেই শাস্ত্র সমূহে বহু পূর্বেই উল্লেখিত আছে। কিন্তু তার সত্যতা প্রতিপাদিত হবে তখন, যখন জগন্নাথের প্রধান পূজারী তথা পাণ্ডার কাছে স্বপ্নে সেই স্থানের নাম উল্লেখিত হবে। বিগ্রহ খোদাই করার জন্য শুধুমাত্র নিমবৃক্ষই উপযুক্ত। সংস্কৃত ভাষায় এই বৃক্ষকে বলা হয় দারু। জগন্নাথের এই প্রার্থনার শেষে গাওয়া হয়–ব্রহ্ম- দারু নমামী, ব্রহ্ম- দারু নমামী, ব্রহ্ম- দারু নমামী ।

 

এই যাত্রার শুরু হবে বিগ্রহসমূহের একটি বৃহৎ মধ্যাহ্ন ভোগ দেওয়ার মাধ্যমে। প্রথমেই ভগবান জগন্নাথের আশীর্বাদ চাওয়া হয়। এই সময় প্রায় ১২ ফিট দীর্ঘ মালা যার নাম ধানবমালা তিন বিগ্রহকে পরানো হয়। মন্দিরের প্রধান পূজারী ধানব মালা জগন্নাথকে পরান এবং পরে জগন্নাথের এই মালা পতিমহাপাত্রা পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ পাণ্ডাকে পরানো হয়। তিনি খালি পায়ে বৃক্ষ সন্ধানের যাত্রার নেতৃত্ব দেন। তারা গলায় থাকা এই বৃহৎ মালাটি তাকে হাতেও নিতে হয়। যখন সেই পবিত্র বৃক্ষের সন্ধান লাভ হয় তখন একটি নারিকেলের উপর সেই মালাটি রেখে বৃক্ষের সামনে নিবেদন করতে হয়। বিতরচ্চ, দ্বৈয়িতপাতি এবং পাতি মহাপাত্র পরিবারের সদস্যগণ জগন্নাথের পোষাকের একটি অংশ তাদের মাথায় পাগড়ি হিসেবে বেঁধে দেন, যাতে স্বয়ং জগন্নাথ তাদের সাথে যাত্রা করেন। মন্দিরের বিগ্রহ সজ্জা পরিবারে সদস্যগণ ভগবান জগন্নাথের চন্দন সেই পবিত্র বৃক্ষে সন্ধানে গমনকারী প্রত্যেকের কপালে লাগিয়ে দেন। পাতযোচক মহাপাত্র বংশধরের মধ্যে একজন পূজারী জগন্নাথের ব্যবহৃত পোষাক লেঙ্কা বংশধরের অংশীদারকে প্রদান করেন এবং ৯ জন মহারণদেরকেও জগন্নাথের পোষাক দেয়া হয় তারাই হচ্ছেন সেই কাঠুরে যারা প্রতিবছর রথাযাত্রার রথসমূহ নির্মাণ করেন এবং সেই সাথে তারাই নব বিগ্রহসমূহ নির্মাণ করবেন। তারাই হচ্ছেন ইন্দ্রদ্যুম্ন মহারাজের আমলে প্রথম জগন্নাথ বিগ্রহ যিনি নির্মাণ করেছিলেন তাঁর বংশধর সেই প্রথম বিগ্রহ খোদাইকারক অপ্রাকৃত ব্যক্তিত্ব যিনি শুধুমাত্র এই অপ্রাকৃত সেবাসম্পাদনে পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র একটি বিশেষ শর্তে বিগ্রহ নির্মাণে সম্মত হয়েছিলেন, তা হল বিগ্রহ সম্পূর্ণ নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের দরজা খোলা যাবে না। কিন্তু একসময় মহারাজ অধৈর্য হয়ে সম্পূর্ণ নির্মাণের দুই সপ্তাহ পূর্বেই দরজা খুললেন। সেই খোদাইকারক শিল্পী তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হয়ে যান সেই অর্ধেক নির্মিত বিগ্রহ রেখে যা এখন অবধি সেই রূপেই সেবিত হচ্ছে। লেঙ্কা এবং মহারণার বংশধরগণও জগন্নাথের বস্ত্র মাথায় পাগড়ী হিসেবে পরিধান করেন।

                        বিমলা দেবী

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের বিগ্রহের সামনে থেকে সেই যাত্রা শুরু হয়। সেখান থেকে বের হয়ে পুরীর সামনের রাস্তার অর্ধেক পথের পর অবস্থিত রাজার বাড়িতে যাওয়া হয় রাজার অনুমতি নেওয়ার জন্য। তারপর যাত্রা শুরু হয় মন্দিরের জগন্নাথ বলদেব বাগানে যা রাজার বাড়ি থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। এখানে তারা দুই দিন অবস্থান গ্রহণ করে। এই সময়কালীন তারা বিভিন্ন পূজা এবং ধ্যানে কাটায়। এই সময়ে মন্দিরের প্রধান পূজারী কর্তৃক তাদের সকলের সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করা হয়। দুই দিন পরে সেই সন্ধানী দল কটকপুরের উদ্দেশ্যে গমন করেন যা পুরীর রোড থেকে কোনার্ক হয়ে পিপলি শহরের সন্নিকটে অবস্থিত যা পুরী রোড থেকে ৫০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। তারা এখানে দেউলি মঠ নামক একটি আশ্রমে বিশ্রাম গ্রহন করে যদি তারা খুব ক্লান্ত হয়, যা প্রায় ৩০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। তাদের অবশ্যই কটকপুরে পৌছাতে হয় কেননা মন্দিরের বাইরে একমাত্র বিমলা মন্দির এই স্থানেই অবস্থিত। এখানে বিগ্রহ হচ্ছে বিমলা যিনি মঙ্গলা নামে পরিচিত যার অর্থ মঙ্গলময়। এখানে পৌছানোর পর সকলেই কয়েক দিন বিশ্রাম গ্রহণ করেন কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠ দয়িতাপতি বিমলা মন্দিরের অভ্যন্তরে শয়ন গ্রহণ করেন। তাই এই মন্দিরে অবস্থান গ্রহণকালীন সময়ে তাকে অবশ্যই কোন স্বপ্নে মাতা বিমলাদেবী সেই বৃক্ষের সঠিক প্রাপ্তি স্থান উল্লেখ করেন। সেই জগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা এবং সুদর্শন চার বিগ্রহের জন্য চার বৃক্ষ চারটি ভিন্ন অবস্থানে পাওয়া যায়। যখন সন্ধানী দল সেই সঠিক স্থানে গমন করেন তখন তারা সেখানে বহু বৃক্ষ দেখতে পান কিন্তু কেবলমাত্র একটি বৃক্ষেই বিভিন্ন পবিত্র চিহ্ন দেখা যায়। সেই বৃক্ষ সন্ধান করতে ১৫ দিন থেকে ১ মাস পর্যন্ত সময় রাগে। এই সময়ে তারা দেবী বিমলার প্রসাদ গ্রহণ করেন এবং মাঝে মাঝে পুরী থেকে মহাপ্রসাদ নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিদিনই সন্ধান করার পরে তারা রাতে বিমলা মন্দিরে চলে আসেন বিশ্রাম নেওয়ার জন্য।

        বৃক্ষের সম্মুখে অগ্নি যজ্ঞ সম্পাদন

বৃক্ষের সন্ধান লাভ হওয়ার পরে সেখানে অগ্নি যজ্ঞ সম্পাদন হয় যেখানে সমস্ত দেব-দেবীকে আহ্বান করা হয় এবং আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়। বৃক্ষের সামনে তাদেরকে একটি তালপাতার একটি পর্ণকুঠির তৈরি করতে হয় যেখানে তারা সাময়িকভাবে অবস্থান করবেন। যজ্ঞের পরের দিন সেই পবিত্র বৃক্ষের কর্তন শুরু হয়। পতিমহাপাত্রের একজন স্বর্ণনির্মিত কুঠার দিয়ে জগন্নাথের বিগ্রহ নির্মাণের সেই বৃক্ষ স্পর্শ করেন। দয়িতাপতিগণ রূপালী কুঠার দিয়ে বৃক্ষ স্পর্শ করেন । অবশেষে মহারণ বংশধর কাঠুরেগণ লোহার কুঠার দ্বরা বৃক্ষ স্পর্শ করেন। বৃক্ষ কর্তনের সময় ভগবানের ১০৮ নাম জপ করা হয়। এই ১০৮টি নাম হল পতল নৃসিংহদেবের নাম যিনি পুরীতে জগন্নথের আবির্ভাবের পূর্বেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। নৃসিংহদেবের নাম সকল পবিত্র কার্য সম্পাদনে জপ করা হয় কেননা তিনি ভক্তদের সকল বিপত্তি দূর করন এবং তার নামে সমস্ত কার্যের সফল সমাধান হয়। সমগ্র বৃক্ষটিকে আর কোন দিকে না কেটেই মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অপ্রাকৃত বৃক্ষকে একটি বিশেষ কাঠের তৈরি গাড়ির উপর

      বিগ্রহ নির্মাণের জন্য কাষ্ঠ খন্ড বহন

রাখা হয় এবং দ্বৈয়িতাপতিদের সাহায্যে মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়।
কাষ্ঠসমূহ কইলি বেকুন্ঠ নামক একটি স্থানে রাখা হয়। এখানে পুরাতন বিগ্রহসমূহকে সমাধিস্থ করা হয় এবং নব বিগ্রহ তৈরি করা হয়। এটি মন্দিরের গজদ্বারের কাছেই উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত। জগন্নাথের বিগ্রহ খোদাই করার জন্য তিনজন বয়োজ্যেষ্ঠ খোদাইকারক থাকেন। ৩ জন সুভদ্রার জন্য এবং বাকী ৩ জন বলদেব বিগ্রহের জন্য। এছাড়া তাদেরকে সাহায্য করার জন্য আরো ৫০ জন থাকে যারা সুদর্শন বিগ্রহও তৈরি করে। বিগ্রহ তৈরিকালীন ২১ দিন যাবৎ কাউকেই সেখানে যেতে দেওয়া হয় না এমনকি মন্দিরের প্রধান পূজারীও না। সেখানে খুবই শক্তিশালী দরজা এবং পুরু দেওয়াল দেওয়া হয় যাতে কেউ দর্শন করতে না পারে। সূত্রধরগণ (কাঠমিস্ত্রি) ভেতর থেকে দরজা বন্ধ রাখেন এবং সমগ্র দিন সেখানে বিগ্রহের কাজ করেন যদিও শুধুমাত্র সূর্যোদয়ের সময় খোলা হয়। সূত্রধরগণ এই পবিত্র স্থানে খাওয়া এমনকি জল পানও করেন না তাই তারা মন্দিরের ভেতরে অন্য স্থানে গিয়ে প্রসাদ খান এবং রাত্রে ঘুমাতে যান। ২১ দিন যাবৎ তারা এই স্থান পরিত্যাগ করেন না।

                                            কইলি বৈকুন্ঠ

সমগ্র দিন রাত্রি ২৪ ঘন্টাই কইলি বৈকুন্ঠ স্থানের বাইরে ভক্তিমূলক গান গাওয়া হয়, এই ধরনের গানসমূহকে বলা হয় অখণ্ড ভজন। দেবদাসী এবং মন্দিরের সংগীতজ্ঞগণ যখন এই গানসমূহ গান তখন ব্রাহ্মণেরা সর্বদাই বেদের এবং অন্যান্য শাস্ত্রের বিভিন্ন শ্লোক পাঠ করেন। যখন নতুন বিগ্রহ তৈরি সম্পন্ন হয় তখন সেগুলোকে মন্দিরের বেদির অভ্যন্তরে পুরনো বিগ্রহের চোখের সামনে রাখা হয়। এসময় কেউ মন্দিরে বিগ্রহ দর্শন করতে পারেন না এমনকি মন্দিরের পূজারীরাও। দয়িতাপতি বংশধরগণ মন্দিরে নতুন বিগ্রহসমূহকে বহন করে নিয়ে আসেন। বিগ্রহসমূহকে মন্দিরে নিয়ে আসার পর কেবলমাত্র বয়োজ্যেষ্ঠ দয়িতাপতি বংশধরদের ৩ জন উপস্থিত থাকবেন। এই সময় কোন পুজা সম্পাদন হয় না এবং কোন ভোগ নিবেদন হয় না। চার বিগ্রহের মধ্যে জগন্নাথের উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। জগন্নাথের ওজন এতই বেশি যে শুধুমাত্র তার একটি বাহু বহনের জন্য ৫ জন ব্যক্তির প্রয়োজন হয়, পেছনের অংশ বহনের জন্য ২০ জন এবং সামনের অংশ বহনের জন্য ৫০ জন অর্থাৎ মোট ৮০ জন। সুভদ্রা জগন্নাথের চেয়ে ৫ ইঞ্চি ছোট এবং হালকা । সুদর্শন শুধুমাত্র একটি লম্বা কাষ্ঠখণ্ড তৈরি বিগ্রহ, যদিও তা প্রায় ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের। বিগ্রহের রূপান্তর বা প্রতিস্থাপনের সময় শুধুমাত্র বয়োজ্যেষ্ঠ দয়িতাপতি বংশধরের ৩ জন উপস্থিত থাকেন। সর্বপ্রথম তারা জগন্নাথের পূজা আরাধনা করেন যাতে তারা পুরানো জগন্নাথ বিগ্রহে অবস্থিত ‘ব্রহ্ম পিণ্ড’ কে নতুন বিগ্রহে প্রতিস্থাপন করতে পারেন। উল্লেখ্য, ব্রহ্ম হল এক অমূল্য শালগ্রাম শিলা যা শ্রীজগন্নাথদেবের দারু বিগ্রহের মধ্য লুকানো অবস্থায় থাকে ৷ এই পবিত্র শালগ্রাম শিলা পুরনো বিগ্রহের থেক বের করে নতুন বিগ্রহে স্তানান্তরিত করা হয়। এই সময় মন্দিরের প্রধান পূজারী ও পাণ্ডাও উপস্থিত থাকেন না। এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় সেই বছরের রথযাত্রা উৎসবের ৩ দিন পূর্বে। এই দিনটিকে জগন্নাথ মন্দিরের সবচেয়ে পবিত্র দিন এবং ধর্মানুষ্ঠান বলে গণ্য করা হয়। একে নবকলেবর যাত্রা বলা হয়। ঐ ৩ জন দয়িতাপতি সদস্য মন্দিরের অভ্যন্তরে পুরোদিন উপবাস থেকে ভগবানের ধ্যান করেন। শুধুমাত্র মধ্যরাত্রিতে ঐ জীবনীশক্তির রূপান্তর (ট্রান্সফার) প্রক্রিয়া সম্পাদন করা হয়, যা সম্পূর্ণ নিঃস্তব্ধে করা হয়। একবার তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে একজন দয়িতাপতি বলেছিলেন যে “এটি খুবই কঠিন যে সেই ব্রহ্মটি কি তা বর্ণনা করা। এটিকে কখনো দর্শন বা স্পর্শ করা যায় না। এই সময় আমাদের চোখ কাপড় দ্বারা বন্ধ থাকে এবং এটিকে বহন করার সময় আমাদের হাত কাপড় দ্বারা জড়িয়ে রাখা হয়। তা সত্ত্বেও একটি শক্তিশালী শক্তির অবস্থান আমরা খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারি ঠিক যেমন একটি খরগোশ আমাদের হাত থেকে লাফ দিচ্ছে। এটিই আমাদের অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই শক্তিশালী ব্রহ্মটি কি, তা কেউ বলতে পারে না।”

সেইদিনই সন্ধ্যার পূর্বেই পুরাতন বিগ্রহসমূহকে সমাধিস্থ করা হয়। দয়িতাপতিগণ সেই পুরাতন বিগ্রহসমূহকে সমাধিস্থলে নিয়ে যায়। ত্রিবিগ্রহের তিনটি আলাদা সমাধিস্থল আছে, পূর্বের সব জগন্নাথসমূহকে সেই একই স্থানে সমাধিস্থ করা হয়েছে। বছরের অন্যান্য সময়ে দর্শনার্থীগণ কইলি বৈকুণ্ঠতে প্রবেশ করতে পারেন তবে সেই সমাধিস্থলের কোন বিশেষ চিহ্ন রাখা হয়নি তাই দর্শনার্থীদের অলক্ষ্যে থেকে যায় সেই স্থান। কথিত আছে যে, কেউ যদি সমাধির অনুষ্ঠানে সেখানের নির্দিষ্ট পাণ্ডাদল ছাড়া অন্য কেউ কোনভাবে লুকিয়ে দর্শন করে তবে তার অবশ্যই মৃত্যু হবে। এই কারণে উড়িষ্যা সরকার ঐদিন রাত্রে ঐ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। নতুন বিগ্রহসমূহকে দ্রুতই রত্ন সিংহাসনে বসানো হয়। ৫৮ দিনের বিরতি শেষে এই দিন থেকেই মন্দিরের সার্বিক কার্যক্রম পুণরায় শুরু হয়। নতুন বিগ্রহকে সুগন্ধযুক্ত ফুলের মালা এবং নতুন বস্ত্র পরানো হয় এবং পূজা, ভোগ অর্পণ অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা আবার জগন্নাথ দর্শনে মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন।

৩য় দিন নতুন বিগ্রহসমূহ রথযাত্রার উদ্দেশ্যে মন্দির থেকে বের করা হয়। বার্ষিক রথযাত্রায় লক্ষাধিক ভক্ত উপস্থিত থাকলেও নবকলেবর যাত্রায় ৫ লক্ষেরও বেশি লোক সমাগম হয় যা কুম্ভমেলার পর পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী লোকসমাগম অনুষ্ঠান।

সর্বশেষ নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালে এবং এই উৎসবে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের মত ভক্তের সমাগম ঘটে (সূত্র উইকিপিডিয়া)।  ।।হরে কৃষ্ণ।।


 

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, জুন-২০১২ ইং সংখ্যায় প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here