দামবন্ধন লীলা থেকে ১০টি শিক্ষা

0
37

দামোদর

শ্রীমৎ রাধাগোবিন্দ গোস্বামী 

দি ভগবানের কীর্তন করার জন্য আমরা যথেষ্ট সময় না পাই, সেক্ষেত্রে শারীরিক কার্য করা কালীনও আমরা জপ এবং কীর্তন করতে পারি। যশোদা মন্থন রজ্জুটি টানলেই তার হাতের সোনার কাঁকনগুলি দুলে দুলে মধুর ধ্বনি সৃষ্টি করছিল, ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্। তার সঙ্গে কর্ণকুণ্ডল, নুপুর এবং কটির স্বর্ণবন্ধনীর ধ্বনিও যুক্ত হয়েছিল। তাঁর আভূষণগুলির ধ্বনি দক্ষ করতাল বাদকের সৃষ্ট ধ্বনির ন্যায় বোধ হচ্ছিল। তাঁর মন্থনদণ্ডের ধ্বনি ঘড়ড় ঘড়ড় ঘড়ড় ঘড়ড়, মৃদঙ্গের ধ্বনির ন্যায় বোধ হচ্ছিল। এইরূপে যশোদা মাতার কৃষ্ণমহিমা কীর্তনে সকল বাদ্যই অংশগ্রহণ করেছিল।
চিন্ময় জগতে সবই চেতনা সম্পন্ন

যখন যশোদা মায়ের কাছে গোপীগণ (গোয়ালিনী) শ্রীকৃষ্ণের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শুরু করলেন যে, কৃষ্ণ তাদের ননী চুরি করছে এবং ননীর ভাণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছে, তখন তিনি বিস্মিত হলেন যে, কেন তার পুত্র অপরের গৃহ থেকে চুরি করেছে? যশোদা ভাবলেন, ‘হয়তো আমার গৃহের ননী কৃষ্ণের পছন্দ নয়। হয়ত দধি ভালো না থাকায় ননী সঠিকভাবে প্রস্তুত করা যায়নি। নতুবা গৃহে থাকা সত্ত্বেও কেন কৃষ্ণ অপরের গৃহে যাবে? আজ আমি স্বয়ং ননী প্রস্তুত করব।’
যশোদা অনুধাবন করতে পারেননি যে, কৃষ্ণের প্রতি গোপীদের ভালোবাসাই তাঁকে তাদের গৃহে নিয়ে গিয়েছিল। সেই জন্য যশোদা মা স্বয়ং ননী প্রস্তুত করতে আরম্ভ করলেন। যদিও রাণীর পক্ষে এই কর্ম অস্বাভাবিক। তথাপি যশোদা ননী প্রস্তুত করছিলেন এবং তার দাসীদের অন্যান্য গৃহকর্মে নিযুক্ত করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে দাসীগণও সুস্বাদু ননী প্রস্তুত করতেন কিন্তু তিনি এই কর্ম স্বয়ং করছিলেন যাতে কৃষ্ণ গৃহে ই আনন্দে থাকেন এবং অন্য গৃহে চুরি না করেন।
দধিমন্থনের সময় যশোদা কৃষ্ণের বাল্যলীলার মহিমা কীর্তন করছিলেন। কৃষ্ণ যে যে লীলা করেছেন তিনি তার কীর্তন করছিলেন। এর থেকে আমরা একটি শিক্ষা পাই চিন্ময় জগতে এমনকি ভূষণ এবং বাসনকোসনও চেতনা সম্পন্ন, সেইজন্য যশোদা মাতাকে এই সেবা করতে দেখে তারা তাঁকে আনন্দে স্বাগত জানাচ্ছিল।

কৃষ্ণের জন্য কিরকম কর্ম করব?

আমাদের হস্তদ্বয় স্বর্ণভূষণে সজ্জিত হলেই সুন্দর হয় না; ভগবানের সেবায় যখন তারা নিয়োজিত হয় তখনই শুধুমাত্র তারা সুন্দর। যশোদার কর্ণকুন্ডল চিন্তা করছিল যে, তারা কত ভাগ্যবান, কারণ যে কর্ণকুহরে কৃষ্ণকীর্তন প্রবেশ করছে তারা সেই কর্ণে অবস্থান করছে। একজন ভক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র অলসভাবে কালাতিপাত করতে হবে; অর্থ হলো এই যে, কৃষ্ণের জন্য ঘর্মাক্ত কলেবরে কর্ম সম্পাদন করতে হবে। যিনি আমাদের ইন্দ্রিয় সকল প্রদান করেছেন তাঁর সেবায় সেই সকল ইন্দ্রিয় সমূহকে নিয়োজিত করাই ভক্তি। কৃষ্ণ আমাদের ইন্দ্রিয় সকল প্রদান করেছেন সেই হেতু তাঁর সেবা করাই হলো এদের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম।
যশোদা মাতা অনলস ভাবে এই সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। এটি ছিল ব্রাহ্মমুহূর্ত Ñ যশোদা যখন পরিশ্রমে রত ছিলেন তখনও সূর্যোদয় হয়নি। তিনি চিন্তা করছিলেন, ‘কৃষ্ণ জেগে ওঠার পূর্বেই আমাকে দধি মন্থন করে ননী প্রস্তুত করতে হবে। যাতে সে জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তাকে খাওয়াতে পারি।’ তিনি তাঁর কর্মে এত মগ্ন ছিলেন যে, তাঁর কপালে স্বেদ বিন্দু জমা হয়েছিল এবং তাঁকে দেখতে আরও অধিক সুন্দর লাগছিল। এই রূপে কৃষ্ণলীলার মহিমা কীর্তনে তাঁর জিহ্বা নিযুক্ত ছিল, তাঁর কর্ণদ্বয় কীর্তন শ্রবণ করছিল, তিনি মনে মনে ধ্যান করছিলেন যে, কিভাবে তিনি কৃষ্ণের জন্য মাখন প্রস্তুত করবেন। তার হস্ত পদ দ্বয় মাখন প্রস্তুতিতে নিয়োজিত ছিল। এই হলো প্রকৃত ভক্তের লক্ষণ; যখন কায়, মন ও বাক্য কৃষ্ণের সেবা এবং ভক্তিতে পরিপূর্ণভাবে নিয়োজিত থাকে।

কৃষ্ণ কখন আগমন করবে?

যশোদার সুমধুর কীর্তন এবং মন্থনের ছন্দময় শব্দতে কৃষ্ণ অন্যান্য দিন অপেক্ষা পূর্বেই জাগরিত হলো। জেগে উঠেই মায়ের স্তন পান করতে চাইলেন। তিনি তাঁর মাতাকে অন্বেষণ করতে লাগলেন এবং অবাক হয়ে ভাবলেন, ‘আমার সঙ্গে মা আজ শয়নে কেন নেই? আমার জন্য তার বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই, কেন তিনি আমায় পরিত্যাগ করে গেছেন?’
শিশুরা মনোযোগ আকর্ষণ করতে ভালবাসে এবং মনোযোগ না পেলেই দুষ্টুমি করে। কৃষ্ণ কৃত্রিম ক্রন্দন করতে করতে যশোদা যেখানে কীর্তন করছিলেন সেই কক্ষে গমন করলেন। তিনি তার নিকটে উপস্থিত হয়ে অধীরভাবে দৃষ্টিপাত করলেন, কিন্তু যশোদা তাঁকে অবলোকন করতে পারলেন না। এখানে আমাদের জন্য একটি শিক্ষা রয়েছে। কখন কৃষ্ণ আমাদের নিকট আগমন করবেন? যখন আমরা তাঁর ভক্তিমূলক সেবায় এমন মগ্ন থাকবো যে, তাঁর আগমনও বোধের মধ্যে থাকবে না, তখন তিনি আগমন করবেন। আমরা তার প্রতীক্ষায় বসে থাকলে তিনি আমাদের কাছে আসবেন না। কৃষ্ণ মায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য তার মন্থন দন্ডটি দুই হাতে দৃঢ় ভাবে আকর্ষণ করলেন যেন চলন্ত সাইকেলের গতি রুদ্ধ করা হলো। তিনি তাঁর মাতাকে বলছিলেন, ‘দাঁড়াও, আমি মনোযোগ চাই। আমাকে খেতে দাও।’

যশোদার মন্থনের কি প্রয়োজন?

বৈষ্ণব আচার্যগণ কৃষ্ণের এই মন্থন রোধ করার অন্য কারণ বর্ণনা করেছেন। সমস্ত শাস্ত্রকে মন্থন করেই কৃষ্ণপ্রাপ্তি হয় কারণ তিনিই সর্বশাস্ত্রের সার। কিন্তু যশোদার ইতিমধ্যেই কৃষ্ণপ্রাপ্তি হয়েছে সেই হেতু তাঁর মন্থনের কিবা প্রয়োজন?

কৃষ্ণ যশোদার দৃঢ়তার পরীক্ষা করছিলেন। তিনি ছেড়ে দেবেন, না প্রচেষ্টা করতেই থাকবেন? কারণ যদি তার প্রচেষ্টা অসম্পূর্ণ থাকে তবে কৃষ্ণের কৃপাও অসম্পূর্ণ থাকবে। ভগবদ্গীতায় (৪/১১) কৃষ্ণ বলছেন, যে যথা মাম্ প্রপদ্যন্তে ‘যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পন করে, আমি তাদেরকে সেভাবেই পুরস্কৃত করি। 

যশোদা কৃষ্ণের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন এবং কৃষ্ণ এরপর কি করেন তা দর্শন করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। কৃষ্ণ দুই হস্ত দ্বারা তার বাহু ধরে এক পদ দধিভান্ডের কানায় স্থাপন করে নিজেকে তার মাতার ক্রোড়ে স্থাপন করলেন এবং তার স্তন্যপান করতে শুরু করলেন। গর্বিত যশোদা সানন্দে তার পুত্রকে স্তন্যপান করতে রত হলেন। কৃষ্ণ গর্বিত হয়ে ভাবলেন, ‘আমি কতো বুদ্ধিমান। আমি মাতার কর্ম বন্ধ করে নিজের দাবী প্রতিষ্ঠা করেছি।’ এই ভেবে তিনি গর্বিত ভাবে হাসলেন। দুগ্ধপান করার সময় যশোদার দুগ্ধ এবং কৃষ্ণের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরম্ভ হলো। কৃষ্ণও সন্তুষ্ট হবে না এবং যশোদা মাতার দুগ্ধক্ষরণও তার অতি বাৎসল্যের জন্য স্তব্ধ হবে না। অধিক কালব্যাপী তিনি কৃষ্ণকে স্তন্য পান করালেন।

দুগ্ধ কেন আত্মহত্যা করল?

তখন এমন কিছু ঘটলো যাতে যশোদার মনোযোগ বিঘ্নিত হয়েছিল। কিছু দুগ্ধ তিনি যা নিকটস্থ উনুনের ওপর স্থাপন করেছিলেন তা উথলে উঠেছিল। যশোদা কৃষ্ণকে ক্রোড় থেকে নামিয়ে দুগ্ধ রক্ষার উদ্দেশ্যে ধাবিত হলেন। এই দুগ্ধ পদ্মগন্ধা নামক বিশেষ গাভীদের দুগ্ধ যা শুধু মাত্র কৃষ্ণের জন্য। এই চিন্ময় দুগ্ধ চিন্তা করছিল, ‘কেন আমি এই তাপ সহ্য করব যখন কৃষ্ণ যশোদা মাতার স্তনদুগ্ধ পান করে পূর্ণ তৃপ্ত হয়ে যাবে; তদপেক্ষা আমার এটাই শ্রেয় যে, আমি অগ্নিতে আহুতি দিয়ে আত্মহত্যা করব।’ এই চিন্তা করতে করতে দুগ্ধ উথলে উঠেছিল। যশোদামাতা এই দুগ্ধকে উনুন থেকে নামিয়ে নিচে স্থাপন করলেন। কিন্তু এর মধ্যে কৃষ্ণ কি করলেন?

কেন রাগান্বিত হলেন কৃষ্ণ?

শিশু কৃষ্ণ রাগান্বিত হলেন ‘আমি দুগ্ধপান করাকালীন শুধুমাত্র অল্প দুগ্ধকে রক্ষা করার জন্য মাতা আমাকে নামিয়ে দিলেন! আমি এখনও ক্ষুধার্ত।’ যিনি শুদ্ধতম অপেক্ষাও শুদ্ধ, জড়জাগতিক গুণসমূহ যাঁকে স্পর্শ করতে পারে না, তিনি রাগান্বিত হলেন। তিনি দন্তÍ দ্বারা ওষ্ঠাধর দংশন করায় তারা স্ফুরিত ও রক্তিম হয়ে উঠল। তিনি নিজেকে কি ভাবেন? আমি তাকে দেখাব। তিনি দুঃখিত হবেন। আমি এই গৃহের সবকিছু ভেঙ্গে ফেলব।’
তিনি চতুর্দিকে তাকিয়ে মশলা পেষাই করার একটি ছোট পাথর দেখতে পেলেন। সেই পাথরটি দিয়ে পরিকল্পনা করে মন্থন পাত্রের নিম্নাংশে আঘাত করলেন যাতে যশোদা কোন শব্দ না পান। সর্বত্র দধি ছড়িয়ে পড়ল। কৃষ্ণ অন্য ঘরে গেলেন। তিনি বাইরে গিয়ে ছড়ানো দধিতে পা দিয়ে ধীরে ধীরে ছাব, ছাব, ছাব, ছাব যাতে তাঁর মাতা শুনতে না পান। বামনদেব রূপে কৃষ্ণ তাঁর ত্রিপাদ দ্বারা সমগ্র বিশ্বকে আবৃত করেন এবং এখন তিনি দধির মধ্য দিয়ে হেঁটে গেলেন। কৃষ্ণ ভাবেননি, ‘সম্ভবত আমার দধির বাইরে দিয়ে হাঁটা উচিত ছিল।’ তিনি এর মধ্যে দিয়ে গেলেন, তাঁর ছোট্ট ছোট্ট সুন্দর পদচিহ্ন দেখাচ্ছিল তিনি কোন্ দিকে গেলেন। কৃষ্ণ অন্য ঘরে গিয়ে কাঠের একটি হামান দিস্তা উল্টে দিয়ে তার ওপরে উঠে শিকা থেকে মাখন নিলেন। সেই স্থানের সকল বানরকে সেই মাখন খাওয়ালেন। বানরগণ মহানন্দে মাখন ভক্ষণ করলো। উনুন থেকে দুধকে রক্ষা করে যশোদা ফিরে ভাঙ্গা পাত্র দেখলেন। যদি কৃষ্ণ সেখানে থাকতেন সেক্ষেত্রে তিনি ভাবতেন ঘটনাচক্রে পাত্রটি ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু কৃষ্ণ সেখানে না থাকায় তিনি জানতেন কৃষ্ণই দোষী এবং দৌড়ে পালিয়ে গেছেন। যশোদা পাত্র ভাঙ্গায় রাগান্বিত হননি। তিনি হেসে ভাবলেন, ‘কৃষ্ণ কত বুদ্ধিমান! সে এমনভাবে এই পাত্রটি ভেঙ্গেছে যে, আমি যেন শব্দ শুনতে না পাই।’
কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁকে শিক্ষা দেবার জন্য শাস্তি দেবেন। সেইজন্য তিনি তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করলেন। দেওয়ালের পিছনে লুকিয়ে তার খোঁজ করতে লাগলেন।

আজ কি হলো?

কৃষ্ণ চারিদিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন কারণ তিনি যে কোন মুহূর্তে মায়ের কাছে ধরা পড়ে যেতে পারেন। তাঁর চোখে ভয় ছিল। তিনি জানতেন যশোদা এসে তাঁকে শাস্তি দেবেন। যশোদা ধীরে ধীরে পিছন থেকে এসে তাঁকে ধরতে গেলেন। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁকে আসতে দেখেছেন। হাতে দণ্ড নিয়ে মাকে আসতে দেখে তিনি হামানদিস্তা থেকে নেমে পালিয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, ‘যদি আমি তাড়াতাড়ি যাই, মা আমাকে ধরতে পারবেন না। আমিও প্রহারের থেকে রক্ষা পাব।’ যশোদা স্থির করলেন তাঁকে পালাতে দেবেন না। তিনি তাঁকে ধরতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। হাতে দণ্ড নিয়ে তিনি তাঁর পিছনে ছুটলেন। শুকদেব গোস্বামী বলেন, ‘এমন কি যোগীগণ যাদের মন কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে শুদ্ধ হয়েছে, তারাও ধ্যানের মাধ্যমে কৃষ্ণকে প্রাপ্তি করতে পারেন না কিন্তু ঐদিন যশোদা মাতা হাতে লাঠি নিয়ে সেই কৃষ্ণের পিছনে দৌড়াচ্ছেন।’
প্রথমে কৃষ্ণ এক ঘর থেকে অন্য ঘরে দৌড়ালেন। অতঃপর গৃহ ছেড়ে গোকূলের পথে পথে দৌড়ালেন। যশোদা মা ভাবলেন, ‘আজ আমার কাছ থেকে পালাতে পারবে না। কোথায় যাবে? আমি ওকে ধরবই।’
তিনি সর্বত্র তাকে অনুসরণ করলেন। সকল ব্রজবাসী (স্থানীয় অধিবাসীবৃন্দ) অবাক বিস্ময়ে এই দৃশ্য দেখছেন। ‘আজ কি হলো? সাধারণত যশোদা এবং কৃষ্ণের মধ্যে বাৎসল্য প্রেমই দেখা যায়।’ যশোদা দৌড়াতে অভ্যস্ত ছিলেন না। তিনি ঘর্মাক্ত হয়ে গেলেন। অবশেষে তিনি শ্রীকৃষ্ণের দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেললেন। কৃষ্ণ তাঁর বাম হস্ত দিয়ে নিজের চোখের জল মুছলেন।

দোষীরূপে শাস্তির অপেক্ষায়

যশোদা কৃষ্ণকে প্রশ্ন করছেন, ‘বানরেরা কি তোমার আত্মীয়? তাই কি তুমি এদের এত সহজে খাওয়াতে পারছ? তুমি দধি ভাণ্ড ভেঙ্গেছ। আমি আজ পর্যন্ত গোপীদের বিশ্বাস করিনি, কিন্তু এখন আমি তোমাকে হাতে নাতে ধরেছি। আজ আমি তোমাকে প্রহার করে শাস্তি দেব।”
লাঠি দেখিয়ে যশোদা কৃষ্ণকে ভয় দেখালেন। কৃষ্ণ চোখের জল মুছতে গিয়ে তার চোখের কাজল সারা মুখে ছড়িয়ে গেল। এতে তাঁর মুখমণ্ডল অধিক সুন্দর হয়ে উঠেছিল। কৃষ্ণ বললেন, ‘মা, দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও। আমি প্রতিজ্ঞা করছি আর কখনো এমন করব না।’
কৃষ্ণের ভয় দেখে যশোদা মা তার লাঠি ছুঁড়ে ফেললেন। কৃষ্ণ শান্তির নিশ্বাস ফেললেন। তিনি ভাবলেন, ‘অন্ততঃ মা আমাকে লাঠি দিয়ে প্রহার করবেন না। হয়ত মুখে চড় মেরে ছেড়ে দেবেন।’
অবতার রূপে সব লীলার মধ্যে এই প্রথম কৃষ্ণ দোষীরূপে শাস্তির অপেক্ষায় দাঁড়ালেন। কৃষ্ণের ভাগ্য এখন যশোদা মায়ের হাতে। এই হলো কৃষ্ণের নিত্যধাম ব্রজের বাৎসল্য প্রেম।

কিভাবে তাঁকে বাঁধলেন?

যশোদা সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁকে বাঁধবেন। তিনি যুক্তি দেখালেন যে, কৃষ্ণ রেগে আছেন এবং যদি তিনি যমুনার তীরে বা অন্য কোথাও যান তাহলে তিনি নিজেকে আঘাত করতে পারেন।
তিনি ভাবলেন, ‘আমি কিছুক্ষণের জন্য একে বেঁধে রাখি। আমি ততক্ষণ আরও মন্থন করে নিই এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ওকে তৃপ্ত করতে পারব।’
সুতরাং তিনি তাঁকে বাঁধতে শুরু করলেন। কিভাবে তিনি তাঁকে বাঁধলেন? তিনি যে পরমেশ্বর ভগবান তা না জেনেই। মা যশোদা জানতেন কৃষ্ণ তাঁর পুত্র সেইজন্যে তিনি তাঁকে বাঁধতে চাইলেন। পরমেশ্বর ভগবানের আদি নেই, অন্ত নেই, অন্তর নেই, বাহির নেই। তিনি সর্বব্যাপী। এমন গুণসম্পন্ন ব্যক্তি কিভাবে বাঁধা পড়বেন? এটা অসম্ভব। কৃষ্ণ সময়ের অধীন নন। তাঁর কাছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সর্বসময়ে তিনি চিন্ময়রূপে বর্তমান। পরমেশ্বর হওয়ায় তিনি আপেক্ষিকতার ঊর্ধ্বে। তিনি সর্ব কার্য-কারণের বিভেদের ঊর্ধ্বে। যদিও তিনি সর্ব কারণের কারণ। সেই ব্যক্তি যিনি সকল ইন্দ্রিয়ের অনুভবের ঊর্ধ্বে তিনি মানব শিশুরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং মা যশোদা তাকে সাধারণ পুত্র বোধে কাষ্ঠনির্মিত উদুখলের সঙ্গে রজ্জু বা দাম দ্বারা বন্ধনে রত।
প্রথমে তিনি তার কেশবন্ধনী ব্যবহার করলেন। যখন তা ক্ষুদ্র প্রতিপন্ন হলো, তিনি তখন গৃহ হতে রজ্জু আনয়ন করলেন। কৃষ্ণের কটিদেশ বাঁধনের প্রচেষ্টায় সকল রজ্জুই দুই অঙ্গুলি সমান ক্ষুদ্র প্রতিপন্ন হলো। কৃষ্ণের সকল শক্তিই তার রক্ষায় একত্র হয়েছে, ‘আমরা কিছুতেই কৃষ্ণকে বাঁধতে দেব না।’ হতবুদ্ধি যশোদা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন। কৃষ্ণ যশোদার দৃঢ়তা পরীক্ষা করছিলেন। তিনি ছেড়ে দেবেন, না প্রচেষ্টা করতেই থাকবেন? কারণ যদি তার প্রচেষ্টা অসম্পূর্ণ থাকে তবে কৃষ্ণের কৃপাও অসম্পূর্ণ থাকবে। ভগবদ্গীতায় (৪/১১) কৃষ্ণ বলছেন, যে যথা মাম্ প্রপদ্যন্তে ‘যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পন করে, আমি তাদেরকে সেভাবেই পুরস্কৃত করি।’ কৃষ্ণ আমাদের তার কৃপা করার পূর্বে আমরা আমাদের সর্বস্ব তাকে দিই কিনা তার প্রতীক্ষা করেন।

কৃষ্ণের চিরন্তন প্রকৃতি কেমন?

নিজগৃহের সকল রজ্জু ব্যবহারের পর যশোদা অন্য গোপীদের গৃহ থেকে আরও রজ্জু চাইলেন। ইতিমধ্যে গোপীগণ সেখানে মিলিত হয়ে কৃষ্ণকে ছেড়ে দেবার জন্য যশোদার কাছে মিনতি করলেন। তারা বললেন, ‘ও বাঁধা পড়ার নয়। কেন তুমি জেদ করছ?’
কিন্তু যশোদা ছেড়ে দিতে রাজী নন। গোপীগণ এবং যশোদা হাসছিলেন কারণ তিনি কি ঘটছে তা বুঝতে পারছিলেন না। কৃষ্ণ বড় হয়ে পরবর্তীকালে দূতরূপে দুর্যোধনের রাজসভায় গেলে দুর্যোধন তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন যাতে আসন্ন মহাযুদ্ধে তিনি পাণ্ডবদের সহায়তা করতে না পারেন। দুর্যোধন রক্ষীদের কৃষ্ণকে বাঁধতে আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় কৃষ্ণ তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন যেন তিনি বলছেন, ‘ঠিক আছে বাঁধ। তোমাদের কি যথেষ্ট লম্বা দড়ি আছে? কোথা থেকে শুরু করবে?’ সেই বিরাটরূপ দর্শন করে রক্ষীরা বিমূঢ় এবং অচেতন হয়ে গেলেন। সুতরাং দুর্যোধন কৃষ্ণকে বাঁধতে সক্ষম হননি, কিন্তু মা যশোদা সফল হতে দৃঢ়চিত্ত ছিলেন। কেন? কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন কৃষ্ণ তাঁর পুত্র।
অবশেষে তাঁর মাতার অনন্ত প্রচেষ্টা এবং ক্লান্তি দেখে কৃষ্ণ তাকে কৃপা করে বাঁধনে ধরা দিতে সম্মত হলেন। কৃষ্ণকে হার স্বীকার করতে হলো।
এইরূপে কি কৃষ্ণকে বাঁধা যায়? শুকদেব গোস্বামী বলেন, ‘হ্যাঁ, কৃষ্ণ কৃপা করে ভক্তদের বাঁধনে বাঁধা পড়েন। কৃষ্ণের কৃপা সর্বময় হয়ে তাঁর অন্য সকল শক্তিকে আবৃত করে।”এইরূপে কৃষ্ণ দেখান যে, তিনি তাঁর ভক্তদের বাধ্য। ‘ব্রহ্মা এবং শিব সহ সমগ্র বিশ্বকে আমি নিয়ন্ত্রণ করি, কিন্তু আমাকে আমার ভক্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে’-এই হলো কৃষ্ণের চিরন্তন প্রকৃতি।
লেখক পরিচিতি: শ্রীমৎ রাধাগোবিন্দ গোস্বামী ১৯৭১ সালে ভারতের বারানসীতে শ্রীল প্রভুপাদের সঙ্গে মিলিত হন। তিনি তৎক্ষণাৎ শ্রীল প্রভুপাদকে তাঁর আধ্যাত্মিক গুরুরূপে গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ সালে তাঁর কাছে দীক্ষালাভ করেন। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি বৃন্দাবনের কৃষ্ণ-বলরাম মন্দিরে রয়েছেন। শ্রীল প্রভুপাদের আদেশক্রমে সমগ্র বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করেন। ইসকনে শ্রীমদ্ভাগবতের উপর পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভক্তিমূলক প্রবচন দানের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here