দক্ষিণ ভারতের দ্বারকা শ্রীগুরুবায়ুর যাত্রা (শেষ পর্ব)

0
16
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নামে উৎসর্গীকৃত দক্ষিণ ভারতের এক অনন্য তীর্থস্থান

চন্দনযাত্রা দাস


ভগবান গুরুবায়ুরের অন্যতম বিখ্যাত হস্তী ভক্তের নাম ‘কেশবন’। যিনি গজরাজ নামে পরিচিত। ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে ভালিয়ার রাজা নিলাম্বর ভগবান গুরুবায়ুরের উদ্দেশ্যে ১২টি হস্তী অর্পণ করেন। কেননা ভগবান গুরুবায়ুরের আশীর্বাদে তিনি মালাবর বিদ্রোহের সময় প্রাণ রক্ষা পেয়েছিলেন। সেই হস্তীটির যখন ১০ বছর বয়স তখন তার নাম রাখা হয় ‘কেশবন’। সে ছিল অত্যন্ত দুষ্ট কিন্তু প্রভু ভক্ত। তার দুষ্টুমি বন্ধ করে তাকে ভগবানের সেবার জন্য যোগ্য করে তালার জন্য প্রতিদিন তাকে মাখন প্রসাদ খেতে দেওয়া হতো। এই বিশেষ মাখন মন্দিরের প্রধান পূজারী মন্ত্র বলে শুদ্ধ করতেন এবং মন্দিরে বিভিন্ন ভজনের মাধ্যমে ভগবানের কাছে প্রার্থনা নিবেদনের পর সেই মাখন কেশবনকে অর্পণ করা হতো।
এভাবে কেশবন আদর্শ ভগবানের সেবকে পরিণত হয়। ভগবানকে দর্শন মাত্রই সে গভীর শ্রদ্ধাই ও ভালোবাসাই হাটুগেড়ে বসে পড়তো এবং পাণ্ডারা খুব সহজেই ভগবানকে তার পিঠে পরিভ্রমণ করাতো। সে ছিল খুবই বিনয়ী ও সে মন্দিরের ভিতরে কিংবা বাইরে কখনোই কারো ক্ষতি করেনি। সে বাইরে থেকে মন্দিরে প্রবেশ করে সব সময় পরিক্রমা করতো। একবার কেশবন যখন মন্দিরের পরিক্রমা করছিল তখন অসাবধানতা বশত একজন তার পায়ের নিচে পড়ে যায়। অনেকেই ভেবেছিল সে বুঝি মারা গেল। কিন্তু কেশবন অত্যন্ত চতুরতার সাথে তার শুঁড় দিয়ে তাঁকে রক্ষা করে।
১৯৭৩ সালে তাকে গজরাজ অর্থাৎ হস্তী সমূহের প্রধান হিসেবে সম্মান করা হয়। এরপর থেকে অন্য কেউ ভগবানকে বহন করাটা তার পছন্দ হতো না। একবার মন্দির কর্তৃপক্ষ ভগবানের সেবার উদ্দেশ্যে অন্য এক হস্তীকে নির্বাচন করেছিল। এই ঘটনা বুঝতে পেরে কেশবন রাগান্বিত হয়ে সেই হস্তীকে আক্রমণ করে সেই মন্দির থেকে তাড়িয়ে দিল। ভগবানকে পিঠে বহন করার সময় সে অত্যন্ত সতর্ক থাকতো। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও অধিক সময় ধরে কেশবন গুরুবায়ুরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২ ডিসেম্বর মোক্ষদা একাদশীর তিথিতে ভগবানকে পিঠে নিয়ে পরিক্রমা করার সময় সে হঠাৎ কাঁপতে শুরু করে এরপর দ্রুত তাকে সেবা অব্যাহতি দিয়ে বিশ্রামে প্রেরণ করা হয়। একাদশী নিরাহারে রাত্রি যাপন করে। পরদিন সন্ধ্যায় যখন শঙ্খ ধ্বনির মাধ্যমে যখন ভগবানের আবির্ভাব ঘোষিত হচ্ছিল তখন কেশবন মন্দিরে গিয়ে ভগবানের সম্মুখে দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করল। এসময় উপস্থিত হাজার হাজার ভক্ত হরিনাম জপ করছিল এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিল। শ্রীভগবানের সম্মুখে কেশবন দেহত্যাগ করে বৈকুণ্ঠে গমন করে। মন্দির কর্তৃপক্ষ ভগবানের এই শুদ্ধভক্তের স্মৃতি রক্ষার্থে মন্দিরের পাঞ্চজন্য বিশ্রাম ঘরের সম্মুখে তার ১২ ফিটের একটি লৌহ নির্মিত মূর্তি উন্মুক্ত করেন।
শ্রী গুরুবায়ুরের অপ্রাকৃত লীলা
পুণ্যাথনম্ -ভগবানের এক শুদ্ধভক্ত
গুরুবায়ুর থেকে ৬৫ কিলোমিটার থেকে দূরে পুণ্যাথমন্্ ইলম নামক স্থানে রয়েছে ভক্ত পুণ্যাথনম্‌রে বাড়ি। পুণ্যাথনম্ (১৫৪৭-১৬৪০) ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এমন এক শুদ্ধভক্ত ছিলেন। অত্যন্ত সম্ভ্রম যুক্ত ও নিষ্ঠা পরায়ণ ছিল তার ভক্তি।
তিনি ভগবানের সন্তষ্টির উদ্দেশ্যে বহু গীত রচনা করেন। পুণ্যাথনম হলো তার পারিবারিক নাম। কিন্তু তার প্রকৃত নামটি এখনো অজানা। এক সময় বিবাহ বদ্ধনে আবদ্ধ হন এবং বহু বছর যাবৎ তার কোনো সন্তানাদি হয়নি। এরপর পুণ্যাথনম্ গুরুবায়ুরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হন। এরপর গুরুবায়ুরের আশীর্বাদে ১৫৮৬ সনে তিনি এক পুত্র সন্তান লাভ করেন। সেই পুত্রের জন্ম উপলক্ষ্যে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কিন্তু সেই অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ১ঘন্টা আগে সেই নবাগত সন্তানটি মৃত্যু বরণ করে। পুণ্যাথনম্্ নির্বিকার চিত্তে সেই বিয়োগান্তক মেনে নেয় এবং ভগবানের ইচ্ছা রূপে সম্মত হয়ে তিনি
ভগবানের চরণে আশ্রয় লাভ করার জন্য গমন করেন। ধীরে ধীরে পুণ্যাথনম্ এক আত্মজ্ঞানী ও মহান ভক্তে পরিণত হলেন।
তিনি ভগবানের বাল্যরূপ তথা গোপালকে এতই বেশি ভালোবাসতেন যে তিনি তাকে নিয়ে একটি বিখ্যাত গীত রচনা করেন। সেই গীতের কথাগুলো ছিল-“যখন কৃষ্ণ আমার হৃদয়ে সদা সর্বদা নৃত্য করছেন তখন কি আমার অন্য কোনো সন্তানের দরকার আছে?” এরপর পুণ্যাথনম্ তাঁর পরবর্তী জীবনকাল (বয়স ৯০ পর্যন্ত) শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন এবং মালালায়ম্ ভাষায় ভগবানের ভক্তিমূলক গীত রচনা ও গাওয়ার মাধ্যমে কাটিয়ে দেয়। তিনি ভক্তিমূলক কাব্য ‘বশকর্ণামৃতম্’ রচনা করেন। তিনি ভক্তি সাহিত্যে উল্লেখ যোগ্য অবদান রাখেন। তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থ গীত ছিল ‘আনন্দকর্ণামৃতম্’। পুণ্যাথনমের জীবন কাহিনি থেকে আমরা শিক্ষা পাই কিভাবে একজন শুদ্ধভক্তের জীবনের শোক অপ্রাকৃত শ্লোকে পরিবর্তীত হয়।
প্রতি মাসে পুণ্যাথনম্্ নিজ গৃহ থেকে হেটে হেটে গুরুবায়ুরকে দর্শন করতে যেতো। কিন্তু সে যখন বৃদ্ধ হলো তখন তাঁর পক্ষে ভ্রমণ করা ছিল কষ্টকর। একবার তিনি কৃষ্ণকে দর্শনের উদ্দেশ্যে গুরুবায়ুরের অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি এতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি তাঁর যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হন। ঠিক সে সময় কৃষ্ণ দর্শন হবে না ভেবে পুণ্যাথনম্ গভীর আবেগে কান্না শুরু করে। ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি আশ্চর্য হয়ে দেখলেন শ্রীগুরুবায়ুর তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
শ্রীগুরুবায়ুর তথা শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে আশীর্বাদ করে বলেন “কষ্টকর ভ্রমণ করে তোমাকে আর মন্দিরে যেতে হবে না, আমি নিজেই তোমার পূজা গ্রহণের নিমিত্তে এখানে অবতীর্ণ হবো। এখানে আমার একটি মন্দির নির্মাণ করো এবং আমার আরাধনা ও সেবা চালু কর।” এরপর সেই স্থানে খুব দ্রুত একটি মন্দির স্থাপিত হয়। পুণ্যাথনম ভগবানের স্তুতি করেছেন তাঁর ‘বামপুরাদিনাথ’ গীতে। এই মন্দিরে একটি দিব্য স্থান রয়েছে যেখানে কৃষ্ণ আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং পুণ্যাথনম্ দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন।

আংটির গল্প

পুণ্যাথনম্ তাঁর গৃহ থেকে ৬৫ কি.মি দূরে তাঁর অত্যন্ত প্রিয় স্থান শ্রীগুরুবায়ুর মন্দিরে পায়ে হেঁটে গমন করতো। পুণ্যাথনম্ যাত্রা পথে শ্রীকৃষ্ণের নাম স্মরণপূর্বক দ্রুত বেগে মন্দিরের উদ্দেশ্যে গমন করতো। একবার যাত্রা পথে ডাকাত দল তাকে আক্রমন করে। তাঁরা তাকে শারীরিকভাবে আঘাত
করছিল। তিনি এই জড় জগতের সবকিছু মূল্যহীন জেনে ডাকাতদের নিকট তাঁর সবকিছু দিয়ে দিলেন। তার মধ্যে ছিল একটি সোনার আংটি। কিন্তু ডাকাতরা তাতে তৃপ্ত হতে পারল না।পুণ্যাথনম্ তার পরবর্তী জীবনকাল (বয়স ৯০ পর্যন্ত) শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন এবং মালালায়ম্ ভাষায় ভগবানের ভক্তিমূলক গীত রচনা ও গাওয়ার মাধ্যমে কাটিয়ে দেয়। তিনি ভক্তিমূলক কাব্য ‘বশকর্ণামৃতম্’ রচনা করেন। তিনি ভক্তি সাহিত্যে উল্লেখ যোগ্য অবদান রাখেন। তার সর্বশেষ গ্রন্থ গীত ছিল ‘আনন্দকর্ণামৃতম্’।তারা ভাবল তাঁর কাছে আরো অনেককিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু তখন পুণ্যাথনম্‌রে কাছে ছিল একটি মাত্র শ্রীমদ্ভাগবত। সে এই দিব্য গ্রন্থকে তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যবান সম্পদ বলে মনে করতো। তাই সে এই গ্রন্থ তাদের হাতে দিতে চাইল না। কিন্তু ডাকাত দল তাঁর অনুনয় সত্ত্বেও তার শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিতে চাইল। তখন তিনি চোখ বন্ধ করে ভগবানের নিকট সাহায্য চাইলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে চোখ বন্ধাবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গলদেশে শোভিত পুষ্প মাল্যের সুগন্ধি পেলেন। তিনি চোখ খোলা মাত্রই দেখলেন স্থানীয় রাজার মন্ত্রী মঙ্গটাচাঁন সেখানে দাঁড়িয়ে। তার তরবারি রক্তে রঞ্জিত এবং পাশেই ডাকাতদের মৃত দেহ পড়ে রইল। প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর পুণ্যাথনম্ চিৎকার করে বললেন, “কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! তোমার অপরিসীম কৃপা।” পুণ্যাথনম্ সেই আংটিটি নিয়ে মঙ্গটাচাঁনকে উপহার দিলেন।
সেই দিন রাত্রে শ্রীগুরুবায়ুর মন্দিরে প্রধান পূজারী একটি দিব্য স্বপ্ন দেখলেন। স্বয়ং শ্রীগুরুবায়ুর তথা শ্রীকৃষ্ণ তাকে নির্দেশ দিলেন, “তুমি আমার বিগ্রহে একটি আংটি পাবে, আগামীকাল পুণ্যাথনম্ আসলে তাকে সেটি প্রদান করবে।” পরদিন সকালে পূজারী আশ্চর্যজনকভাবে বিগ্রহের হস্তে আংটিটি পরিহিত অবস্থায় দেখলেন। এর কিছুক্ষণ পর পুণ্যাথনম্ মন্দিরে আগমন পূর্বক ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা শুরু করলেন। সেই পূজারী পুণ্যাথনম্‌কে সেই আংটিটি প্রদান পূর্বক সমস্ত ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। পুণ্যাথনম্ হতবুদ্ধি হয়ে দেখলেন এই সেই আংটি যেটি তিনি মঙ্গটাচাঁনকে উপহার দিয়েছিলেন। ভগবান শ্রীগুরুবায়ুর স্বয়ং মঙ্গটাচাঁন রূপে এসে পুণ্যাথনম্কে উদ্ধার করেছিলেন।


 

জানুয়ারি-মার্চ ২০১৯ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here