চিন্ময় জগতে প্রবেশের গোপন সূত্র

0
17

ভগবান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নিম্নলিখিত উপায়ে আমরা চিন্ময় জগৎ লাভ করতে পারি (ভঃ গীতা ১৫/৫)

নির্মানমোহা জিতসঙ্গদোষা
অধ্যাত্মনিত্যা বিনিবৃত্তকামাঃ।
দ্বন্ধৈর্বিমুক্তাঃ সুখদুঃখসংজ্ঞৈ-
র্গচ্ছন্ত্যমূঢাঃ পদমব্যয়ং তৎ॥

এই পদম্ অব্যয়ম্ বা নিত্য জগতে সে-ই যেতে পারে, যে নির্মানমোহ অর্থাৎ যে মোহমুক্ত হতে পেরেছে। এর অর্থ কি? এ জড় জগতে সকলেই কিছু না কিছু হতে চায়। কেউ চায় রাজা হতে, কেউ চায় প্রধানমন্ত্রী হতে, কেউ চায় ঐশ্বর্যশালী হতে, এভাবে সকলেই কিছু না কিছু হতে চায়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই অভিলাষগুলির প্রতি আসক্ত থাকি, ততক্ষণ আমরা আমাদের দেহকে আমাদের স্বরূপ বলে মনে করি, কারণ দেহকে কেন্দ্র করেই এই সমস্ত আশা আকাক্সক্ষাগুলি জন্ম নেয়। আমরা যে আমাদের দেহ নই, এই উপলব্ধিটাই হচ্ছে অধ্যাত্ম-উপলব্ধির প্রথম সোপান। জড় জগতের যে তিনটি গুণের দ্বারা আমরা আবদ্ধ হয়ে পড়ি, তার থেকে মুক্ত হওয়াটাই হচ্ছে আমাদের প্রথম কর্তব্য এবং তার উপায় হচ্ছে ভগবদ্ভক্তি। ভক্তির মাধ্যমে ভগবানের সেবা করলে এই বন্ধন আপনা থেকেই খসে পড়ে। কামনা-বাসনার বশবর্তী হবার ফলে আমরা জড়া প্রকৃতির উপরে আধিপত্য করতে চাই এবং তার ফলে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ি। যতক্ষণ না আমরা আধিপত্য করার এই বাসনাকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে পারছি, ততক্ষণ আমরা জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের আলয় সনাতন ধামে ফিরে যেতে পারব না। সেই ভগবৎ-ধাম, যা সনাতন, সেখানে কেবল তারাই যেতে পারেন, যাঁরা জড় জগতের ভোগ-বাসনার দ্বারা লালায়িত নন, যারা ভগবানের সেবায় নিজেদের সর্বতোভাবে নিয়োজিত করেছেন। কেউ এভাবে অধিষ্ঠিত হলে তিনি অনায়াসে পরম ধামে উপনীত হন। ভগবদ্গীতায় অন্যত্র (৮/২১) বলা হয়েছে

অব্যক্তোহক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্।
যং প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ॥

অব্যক্ত মানে অপ্রকাশিত। এমন কি এই জড় জগতের সব কিছু আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়নি। আমাদের জড় ইন্দ্রিয় এতই সীমিত যে, জড় আকাশে যে সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রাদি আছে, তাও আমাদের গোচরীভূত হয় না। বৈদিক সাহিত্যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য গ্রহ-নক্ষত্রের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা সেই সব বিশ্বাস করতে পারি অথবা বিশ্বাস নাও করতে পারি। বিশেষ করে  শ্রীমদ্ভাগবতে এর বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। এই জড় আকাশের ঊর্ধ্বে যে অপ্রাকৃত লোক আছে, ভাগবতে তাকে অব্যক্ত অর্থাৎ অপ্রকাশিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই যে অপ্রাকৃত লোক যা নিত্য, সনাতন, যেখানে প্রতিনিয়ত দিব্য আনন্দের আস্বাদন পাওয়া যায়, যেখানে প্রতিনিয়ত ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করা যায়, সেই যে দিব্য জগৎ, তাই হচ্ছে মানব-জীবনের পরম লক্ষ্য মানব জীবনের পরম গন্তব্যস্থল। সেখানে একবার উত্তীর্ণ হলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না। সেই পরম রাজ্যের জন্যই মানুষের বাসনা ও আগ্রহ থাকা উচিত।

এখানে প্রশ্ন হতে পারে- কিভাবে সেই অপ্রাকৃত জগতে যাওয়া যায়?

ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ে (৮/৫) এই বিষয়ে বলা হয়েছে-“মৃত্যুকালে যিনি আমাকে স্মরণ করে শরীর ত্যাগ করেন, তিনি তৎক্ষণাৎ আমার ভাব প্রাপ্ত হন। এই বিষয়ে কোন সংশয় নেই।” মৃত্যুকালে শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করতে পারলেই শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরে যাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণের দিব্য রূপ স্মরণ করতে হবে; এই রূপ স্মরণ করতে করতে যদি কেউ দেহত্যাগ করে, তা হলে সে অবশ্যই দিব্য ধামে চলে যায়। শ্লোকটিতে মদ্ভাবম্ বলতে পরমেশ্বর ভগবানের পরম ভাবের কথা বলা হয়েছে। পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন সৎ-চিৎ-আনন্দ বিগ্রহ অর্থাৎ তাঁর রূপ নিত্য, জ্ঞানময় ও আনন্দময়। আমাদের এই জড় দেহ সৎ-চিৎ-আনন্দময় নয়। এই দেহ অসৎ, এই দেহের কোন স্থায়িত্ব নেই। এই দেহ বিনাশ হয়ে যাবে। এই দেহ চিৎ বা জ্ঞানময় নয়, পক্ষান্তরে এই দেহ অজ্ঞানতায় পরিপূর্ণ। অপ্রাকৃত জগৎ সম্বন্ধে আমাদের কোন জ্ঞান নেই, এমন কি এই জড় জগৎ সম্বন্ধেও আমাদের যে জ্ঞান আছে, তা ভ্রান্ত ও সীমিত। এই দেহ নিরানন্দ; আনন্দময় হবার পরিবর্তে এই দেহ দুঃখ-দুর্দশায় পরিপূর্ণ। এই জগতে যত রকমের দুঃখ-দুর্দশা আমরা পেয়ে থাকি, তা সবই এই দেহটির জন্যই। কিন্তু যখন আমরা এই দেহটিকে ত্যাগ করবার সময় পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য রূপটি স্মরণ করব, তখন আমরা জড় জগতের কলুষমুক্ত সৎ-চিৎ-আনন্দময় দিব্য দেহ প্রাপ্ত হব।

পরবর্তী জীবনে কে কি রকম দেহ প্রাপ্ত হবে?

এই জগতে দেহত্যাগ করা এবং অন্য একটি দেহ লাভ করা প্রকৃতির নিয়মের দ্বারা সুচারুভাবে পরিচালিত হয়। পরবর্তী জীবনে কে কি রকম দেহ প্রাপ্ত হবে, তা নির্ধারিত হবার পরেই মানুষ মৃত্যুবরণ করে। জীব নিজে নয়, তার থেকে উচ্চস্তরে যে-সমস্ত নির্ভরযোগ্য অধিকারীরা রয়েছেন, যাঁরা ভগবানের আদেশ অনুসারে এই জড় জগতের পরিচালনা করেন, তাঁরাই জীবের কর্ম অনুসারে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন। আমাদের কর্ম অনুসারে আমরা ঊর্ধ্বলোকে উত্তীর্ণ হই অথবা নিম্নলোকে পতিত হই। এভাবেই প্রতিটি জীব তার পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির কর্মক্ষেত্র এই জীবনে যদি আমরা জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবৎ-ধামে উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি, তবে এই দেহত্যাগ করবার পর আমরা অবশ্যই ভগবানের মতো সৎ চিৎ-আনন্দময় দেহ প্রাপ্ত হয়ে ভগবৎ-ধামে ফিরে যেতে পারব।

পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি, বিভিন্ন ধরনের পরমার্থবাদী আছেন- ব্রহ্মবাদী, পরমাত্মবাদী ও ভক্ত। আর এই কথাও বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মজ্যোতিতে বা চিন্ময় আকাশে অগণিত চিন্ময় গ্রহ  ভাসছে। এই সব গ্রহের সংখ্যা সমস্ত জড় জগতের গ্রহের থেকে অনেক বেশি। এই জড় জগতের আয়তন সৃষ্টির এক চতুর্থাংশের সমান বলে অনুমিত হয়েছে (একাংশেন স্থিতো জগৎ)। এই জড় জগতের অংশে অগণিত সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র সমন্বিত কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সমস্ত জড় সৃষ্টি হচ্ছে সমগ্র সৃষ্টির এক অতি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সৃষ্টির অধিকাংশই রয়েছে চিন্ময় আকাশে। পরমার্থবাদীদের মধ্যে যাঁরা নির্বিশেষবাদী, যাঁরা ভগবানের নিরাকার রূপকে উপলব্ধি করতে চান, তাঁরা ভগবানের দেহনির্গত ব্রহ্মজ্যোতিতে বিলীন হয়ে যান। এভাবে তাঁরা চিদাকাশ প্রাপ্ত হন। কিন্তু ভগবানের ভক্ত ভগবানের দিব্য সান্নিধ্য লাভ করতে চান, তাই তিনি বৈকুণ্ঠলোকে উন্নীত হয়ে ভগবানের নিত্য সাহচর্য লাভ করেন। অসংখ্য বৈকুণ্ঠলোকে ভগবান তাঁর অংশ-প্রকাশ চতুর্ভুজ বিষ্ণু এবং প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ, গোবিন্দ আদি রূপে তাঁর ভক্তদের সঙ্গদান করেন। তাই জীবনের শেষে পরমার্থবাদীরা ব্রহ্মজ্যোতি, পরমাত্মা কিংবা পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিন্তা করে থাকেন। সকলের ক্ষেত্রেই তাঁরা চিদাকাশে উত্তীর্ণ হন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেবল ভগবানের ভক্তেরাই বৈকুণ্ঠলোকে অথবা গোলোক বৃন্দাবনে ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ভগবান এই বিষয়ে বলেছেন, “এতে কোনও সন্দেহ নেই।” এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেই হবে। আমাদের কল্পনার অতীত বলে এই কথা অবিশ্বাস করা উচিত নয়। আমাদের মনোভাব অর্জুনের মতো হওয়া উচিত “তুমি যা বলেছ তা আমি সমস্তই বিশ্বাস করি।” তাই ভগবান যখন বলেছেন যে, মৃত্যুর সময় ব্রহ্ম, পরমাত্মা কিংবা পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য রূপের ধ্যান করলেই তাঁর আলয় অপ্রাকৃত জগতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়, এই কথা ধ্রুব সত্য বলে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

মৃত্যুর সময় ভগবানের রূপের চিন্তা করলে কি হয়?

মৃত্যুর সময়ে ভগবানের রূপের চিন্তা করে চিন্ময় জগতে প্রবেশ করা যে সম্ভব, তা ভগবদ্গীতায় (৮/৬) বর্ণিত হয়েছে-

যং যং বাপি স্মরণ্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্।
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ॥

“যে যেভাবে ভাবিত হয়ে শরীর ত্যাগ করে, সে নিঃসন্দেহে সেই রকম ভাবযুক্ত শরীর প্রাপ্ত হয়।” এখন, আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, জড়া প্রকৃতি হচ্ছে ভগবানের বহু শক্তির মধ্যে একটি শক্তির প্রকাশ। বিষ্ণুপুরাণে (৬/৭/৬১) ভগবানের শক্তির বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে-

বিষ্ণুশক্তিঃ পরা প্রোক্তা ক্ষেত্রজ্ঞাখ্যা তথাপরা
অবিদ্যা কর্মসংজ্ঞান্যা তৃতীয়া শক্তিরিষ্যতে॥

ভগবানের শক্তি বিচিত্র ও অনন্তরূপে প্রকাশিত। আমাদের সীমিত অনুভূতি দিয়ে তাঁর সেই শক্তি আমরা উপলব্ধি করতে পারি না। কিন্তু মহাজ্ঞানী মুনি ঋষিরা, যাঁরা মুক্ত পুরুষ, যাঁরা সত্যদ্রষ্টা, তাঁরা ভগবানের শক্তিকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং এই শক্তিকে তাঁরা তিনটি ভাগে বিভক্ত করে তার বিশ্লেষণ করেছেন। এই সমস্ত শক্তিই হচ্ছে বিষ্ণুশক্তির প্রকাশ, অর্থাৎ তাঁরা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বিভিন্ন শক্তি। সেই প্রথম শক্তিকে বলা হয় পরা শক্তি বা চিৎ শক্তি। জীবও এই উৎকৃষ্ট শক্তি থেকে উদ্ভূত, সেই কথা ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে। ভগবানের এই অন্তরঙ্গা শক্তি ব্যতীত আর যে সমস্ত শক্তি, তাকে বলা হয় জড়া শক্তি। এই সমস্ত শক্তি নিম্নতর শক্তি এবং সেগুলি তামসিক গুণের দ্বারা প্রভাবিত। মৃত্যুর সময় আমরা এই জড় জগতের তামসিক গুণের দ্বারা আচ্ছাদিত নিম্নতর শক্তিতে থাকতে পারি অথবা চিন্ময় জগতের চিৎ-শক্তিতে উত্তীর্ণ হতে পারি। তাই ভগবদ্গীতায় (৮/৬) বলা হয়েছে-

“যে যেভাবে ভাবিত হয়ে শরীর ত্যাগ করে, সে নিঃসন্দেহে সেই রকম ভাবযুক্ত শরীর প্রাপ্ত হয়।” আমাদের জীবনে আমরা হয় জড়া শক্তি নতুবা চিৎ-শক্তির সম্বন্ধে ভাবতে অভ্যস্ত। এখন, আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে জড়া শক্তি থেকে চিৎ-শক্তিতে কিভাবে রূপান্তরিত করতে পারি? খবরের কাগজ, উপন্যাস আদি নানা রকম বই আমাদের মনকে জড়া শক্তির ভাবনার যোগান দেয়। আমাদের চিন্তাধারা এই ধরনের সাহিত্যের দ্বারা আবিষ্ট হয়ে আছে বলেই আমরা উচ্চতর চিৎ-শক্তিকে উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়ে পড়েছি।

বৈদিক সাহিত্য কি মানুষের কল্পনাপ্রসূত?

আমরা যদি এই চিৎ-শক্তিকে জানতে চাই, বা ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে চাই, তবে আমাদের বৈদিক সাহিত্যের শরণ নিতে হবে। মানুষকে অপ্রাকৃত জগতের সন্ধান দেবার জন্যই ভারতের মুনি ঋষিদের মাধ্যমে ভগবান বেদ, পুরাণ আদি বৈদিক শাস্ত্র প্রণয়ন করিয়েছেন। এই সমস্ত সাহিত্য মানুষের কল্পনাপ্রসূত নয়; এগুলি হচ্ছে সত্য- দর্শনের বিশদ ঐতিহাসিক বিবরণ। শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (মধ্য খণ্ড ২০/১২২) বলা হয়েছে-

মায়ামুগ্ধ জীবের নাহি স্বতঃ কৃষ্ণজ্ঞান।
জীবেরে কৃপায় কৈলা কৃষ্ণ বেদ-পুরাণ॥

স্মৃতিভ্রষ্ট জীবেরা ভগবানের সঙ্গে তাদের শাশ্বত সম্পর্কের কথা ভুলে গেছে এবং তাই তারা জড়-জাগতিক কার্যকলাপে মগ্ন হয়ে আছে। তাদের চিন্তাধারাকে অপ্রাকৃত স্তরে উন্নীত করবার জন্য শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস বহু বৈদিক শাস্ত্র প্রদান করেছেন। প্রথমে তিনি বেদকে চার ভাগে ভাগ করেন। তারপর পুরাণে  তিনি তাদের ব্যাখ্যা করেন এবং অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের জন্য তিনি মহাভারত রচনা করেন। এই মহাভারতে তিনি ভগবদ্গীতার বাণী প্রদান করেন। তারপর সমস্ত বৈদিক সাহিত্যের সংক্ষিপ্তসার বেদান্তসূত্র প্রণয়ন করেন। বেদান্তসূত্রকে সহজবোধ্য করে তিনি তার ভাষ্য শ্রীমদ্ভাগবত রচনা করেন। মনোনিবেশ সহকারে এই সমস্ত বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়ন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।

জড় জগতে আবদ্ধ সাংসারিক লোকেরা যেমন খবরের কাগজ, নানা রকমের পত্রিকা, নাটক, নভেল আদি পড়ে থাকে এবং তার ফলে জড় জগতের প্রতি তাদের মোহমুগ্ধ অনুরাগ গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে, তেমনই যারা ভগবানের স্বরূপ শক্তিকে উপলব্ধি করে ভগবৎ-ধামে ফিরে যেতে চায়, তাদের কর্তব্য হচ্ছে মহামুনি ব্যাসদেবের রচিত বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়ন করা।

বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়ন করার ফলে আমরা জানতে পারি- ভগবান কে, তাঁর স্বরূপ কি, আমাদের সঙ্গে তাঁর কি সম্পর্ক। এই সমস্ত শাস্ত্র অধ্যয়ন করার ফলে মন ভগবদ্মুখী হয়ে ওঠে এবং তার ফলে অন্তকালে ভগবানের সচ্চিদানন্দময় রূপের ধ্যান করতে করতে আমরা দেহত্যাগ করতে পারি। ভগবদ্গীতাতে ভগবান বারবার আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এটিই হচ্ছে তাঁর কাছে ফিরে যাবার একমাত্র পথ এবং তিনি বলেছেন যে, “এতে কোন সন্দেহ নেই।”

আমাকে স্মরণ করে তোমার কর্তব্যকর্ম কর

“অতএব অর্জুন! সর্বক্ষণ আমাকে স্মরণ করে তোমার স্বভাব বিহিত যুদ্ধ করা উচিত। তোমার মন ও বুদ্ধি আমাতে অর্পণ করে কার্য করলে নিঃসন্দেহে তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে।” (ভঃ গীঃ ৮/৭)।

তিনি অর্জুনকে তাঁর কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত হয়ে তাঁর ধ্যান করতে আদেশ দেননি। ভগবান কোন অবাস্তব পরামর্শ দেন না। পক্ষান্তরে, তিনি বলেছেন, “আমাকে স্মরণ করে তুমি তোমার কর্তব্যকর্ম করে যাও।” এই জড় জগতে দেহ ধারণ করতে হলে কাজ করতেই হবে। কর্ম অনুসারে মানব-সমাজকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এতে ব্রাহ্মণেরা বা সমাজের বুদ্ধিমান লোকেরা এক ধরনের কাজ করছে, ক্ষত্রিয়েরা বা পরিচালক সম্প্রদায় অন্য ধরনের কাজ করছে এবং ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সম্প্রদায় তাদের বিশেষ ধরনের কাজ করছে। মানব-সমাজে প্রত্যেকেই, সে শ্রমিকই হোক, ব্যবসায়ী হোক, যোদ্ধা হোক, চাষী হোক অথবা এমনকি সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, বৈজ্ঞানিক কিংবা ধর্মতত্ত্ববিদই হোক না কেন, এদের সকলকেই জীবন ধারণ করবার জন্য তাদের নির্ধারিত কর্ম করতেই হয়। তাই ভগবান অর্জুনকে তার কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করেছেন। পক্ষান্তরে তিনি বলেছেন যে, সব সময় সকল কর্মের মাঝে তাকে স্মরণ করে, (মামনুস্মর) তাঁর পাদপদ্মে মন ও বুদ্ধি অর্পণ করে কর্তব্যকর্ম করে যেতে। দৈনন্দিন জীবনে জীবন-সংগ্রামের সময় যদি শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ না করা যায়, তবে মৃত্যুর মুহূর্তে তাঁকে স্মরণ করা সম্ভব হবে না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও এই উপদেশ দিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন যে, কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ-সর্বক্ষণ ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তনের অভ্যাস করা উচিত। ভগবানের নাম তাঁর রূপের থেকে ভিন্ন নয়; তাই যখন আমরা তাঁর নাম কীর্তন করি, তখন আমরা তাঁর পবিত্র সান্নিধ্য লাভ করে থাকি। তাই অর্জুনের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ, “সব সময় আমাকে স্মরণ কর” এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ “সর্বদাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম কীর্তন কর” এই দুটি একই উপদেশ। ভগবানের দিব্য রূপকে স্মরণ করা এবং তাঁর দিব্য নামের কীর্তন করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অপ্রাকৃত স্তরে নাম ও রূপ অভিন্ন। তাই আমাদের সর্বক্ষণ চব্বিশ ঘণ্টাই ভগবানকে স্মরণ করার অভ্যাস করতে হবে। তাঁর পবিত্র নাম কীর্তন করে আমাদের জীবনের কার্যকলাপ এমনভাবে চালিত করতে হবে যাতে আমরা সর্বদাই তাঁকে স্মরণ করতে পারি।

কিভাবে সর্বদাই স্মরণ করতে পারি?

এটি কিভাবে সম্ভব? এই প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ আচার্যরা বলেন যে, যখন কোন বিবাহিতা স্ত্রীলোক পরপুরুষে আসক্ত হয় কিংবা কোন পুরুষ পরস্ত্রীতে আকৃষ্ট হয়, তখন সেই আসক্তি অত্যন্ত প্রবল হয়। তখন সে সারাক্ষণ উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকে কিভাবে, কখন সে তার প্রেমিকের সাথে মিলিত হবে, এমন কি যখন তার গৃহকর্মে সে ব্যস্ত থাকে, তখনও তার মন প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হবার আশায় আকুল হয়ে থাকে। সে তখন অতি নিপুণতার সঙ্গে তার গৃহকর্ম সমাধা করে, যাতে তার স্বামী তাকে তার আসক্তির জন্য কোন রকম সন্দেহ না করে।

ঠিক তেমনই, আমাদের সর্বক্ষণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাবনায় মগ্ন থাকতে হবে এবং সুষ্ঠুভাবে আমাদের সমস্ত কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করতে হবে। এই জন্য ভগবানের প্রতি গভীর অনুরাগের একান্ত প্রয়োজন। ভগবানের প্রতি গভীর ভালবাসা থাকলেই মানুষ জাগতিক কর্তব্যগুলি সম্পাদন করার সময়েও তাঁকে বিস্মৃত হয় না।

তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে যাতে ভগবানের প্রতি এই গভীর ভালবাসা আমাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতে পারি। অর্জুন যেমন সব সময়ই ভগবানের কথা চিন্তা করতেন, আমাদেরও তেমন ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকা উচিত।


ব্যাক টু গডহেড অক্টোম্বর-ডিসেম্বর ২০২১ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here