চাকরি ও কৃষ্ণভাবনা

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 111 বার দেখা হয়েছে

চাকরি ও কৃষ্ণভাবনা
পারমার্থিক আন্দোলনে অনেক বছর ধরে সেবা করার পর, একটি পাবলিক স্কুলের চাকরি একজন ভক্তের কাছে সর্বদা কৃষ্ণ স্মরণের বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছিল।

উর্মিলা দেবী দাসী


কোন স্বচ্ছ, বহমান নদীর পাশে অবস্থিত একটি পর্বত গুহা যেখানে পর্যাপ্ত ফল ও বাদাম বৃক্ষে পূর্ণ, সেখানে বসে ভাবতে পারেন যে, কোথাও যেকোন কিছুতে ব্যস্ত থাকি না কেন সর্বদা পারমার্থিকতার সাথে যুক্ত থাকলেই তো হয়, কিন্তু আপনি নিশ্চিত নন যে, পূর্ণ সততা ও নির্ভরযোগ্য পন্থায় কিভাবে এই পথে অগ্রসর হওয়া যায় যেখানে আপনার দক্ষতা বা গুণগুলো কিংবা অভ্যন্তরীণ পারমার্থিক ভাবনাও হারানোর আশঙ্কা থাকবে না।
কিভাবে পারমার্থিক সচেতনতা ও বিশ্বের কর্মস্থলের সঙ্গে সমন্বয় স্থাপন করা যায়? ভগবদ্‌গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার সখা অর্জুনকে বলেন, যে কেউ পারমার্থিকতার সাথে প্রতি মুহূর্তে ও নিশ্বাসে তার সমগ্র জীবনকে সংযুক্ত করতে পারে। জীবের চিন্তা-চেতনা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে এবং এ বিষয়টি সবচেয়ে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এই শিক্ষা প্রদানের পর, কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে কোথাও বসে ধ্যানে ব্রতী হতে হবে না বরং আমাকে স্মরণ কর আর যুদ্ধ কর”। যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে অর্জুন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কোন কারণবশত অনুৎসাহিত হয়ে তার শরীরে কম্পন শুরু হয়েছিল। ঐ অবস্থায় অর্জুনের প্রয়োজন অনেক বেশি ছিল শারীরিক দক্ষতা ও জয়ের জন্য এমনকি বেঁচে থাকার জন্য মানসিক শক্তি। এমতাবস্থায় কোন মানসিক বিচ্যুতি ছাড়াই কিভাবে অর্জুন মনকে কৃষ্ণের প্রতি পূর্ণরূপে নিবিষ্ট করতে পারে?
১৯৭৩ সাল থেকে আমি পারমার্থিক জীবন অতিবাহিত করার প্রতি সংকল্পবদ্ধ হওয়ার পর থেকে, সম মানসিকতার অনেক ব্যক্তির সঙ্গে একত্রে কৃষ্ণসেবা করেছিলাম। কিন্তু ২০০৫ ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমার ডক্টোরাল ডিগ্রির অংশ হিসেবে আমাকে আমেরিকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে চাকরি করতে হয়েছিল। আমেরিকার সরকারি স্কুলগুলোতে কোন উন্মুক্ত ধর্মীয় অনুশীলনের অনুমোদন নেই। এমনকি বিরতির সময় শিক্ষার্থীদের সামনে নিজের বাইবেল গ্রন্থ পাঠ করতে দেখলেও তারা শিক্ষকদের বরখাস্ত করে। কিছু কিছু রাজ্যে তো ধর্মীয় প্রতীক রয়েছে এমন কিছু পরিধান করার অনুমতি নেই, এমনকি নেকলেসের সঙ্গে ছোট্ট একটি যীশুখ্রীস্টের সিম্বলও আপনি পড়তে পারবেন না। কিছু কিছু স্থানীয় স্কুলগুলোর কর্তৃপক্ষ হয়ত কিছু খ্রিস্টান ধর্মের অনুশীলনের প্রতি শীতিলতা প্রদর্শন করতে পারে, কিন্তু তারা সম্ভবত উন্মুক্তভাবে কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন সহ্য করে না। মানসিক অবস্থার প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দৈনন্দিনভাবে উচ্চতর পারমার্থিক স্তর বজায় রাখা আমার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে যেত।
ইন্টার্নশীপের সময় আমি আভ্যন্তরীণ উন্নত চেতনার স্তরকে বজায় রেখে কিভাবে বাহ্যিক পারমার্থিক অনুশীলনে ব্রতী হওয়া যায় সে বিষয়ে আমার কিছু প্রচেষ্টা বা প্রতিফলন সম্পর্কে লিখেছিলাম । আশা করি অত্যন্ত ব্যক্তিগত চিন্তা ভাবনাগুলো অন্যদেরকে প্রতিকুল পরিস্থিতিতে কিছু প্রশান্তি ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে আমার মনোভাব

আমি কিছু কারণে অসুখী ছিলাম। এই চাকরিটি শুরু করার পূর্বে আমি অনেক জাগতিক পরিবেশে কাজ করেছিলাম। এক্ষেত্রে আমার লক্ষ্য হল সর্ব অবস্থায় কৃষ্ণকে গভীরভাবে স্মরণ করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাকে নিজের সম্পর্কে কিছু দর্শন পরিবর্তন করতে হবে, যে কিনা শুধুমাত্র কৃষ্ণভাবনার বিভিন্ন প্রজেক্টে সেবা করতে অভ্যস্ত।যদিও সারা বিশ্বে যে কোন কর্মস্থলে কঠিন পরিস্থিতির সময়ও উন্নত পারমার্থিক চেতনা লাভের জন্য শাস্ত্রসমূহ আমাদেরকে উৎসাহ দিয়ে থাকে। এই রকম অনেক দৃষ্টান্তই শাস্ত্রে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে কঠিন পরিস্থিতিতেও এই রকম পারমার্থিক পথে পরিচালিত করেছেন।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ হল কাজের মূল্যবোধকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা। আমি যে কাজটি করছি সেটি আমার পূর্বের কৃষ্ণসেবার অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন এবং আমি প্রত্যক্ষভাবে কৃষ্ণসেবা করতে পারছি না। যদিও শুধুমাত্র জাগতিক কাজকর্মের প্রতি আমার কম আগ্রহই রয়েছে। এজন্যে আমার যেটি প্রয়োজন তা হল আমি কর্মস্থলে যা করছি তার পারমার্থিক মূল্যবোধ সম্পর্কে উপলব্ধি করা।

সকালের কার্যক্রমে অবনতি

আমাকে সকাল ৭ টার দিকে স্কুলে যেতে হয়, যা আমার পারমার্থিক জীবনাচরনের বিরুদ্ধ, কেননা আমার অধিকাংশ পারমার্থিক অনুশীলন অনুষ্ঠিত হয় সকালেই। শাস্ত্র অধ্যয়ন, বিগ্রহ অর্চন, হরিনাম জপ ও প্রার্থনার মতো সকালের সমস্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য আমাকে প্রত্যহ ২ টার দিকে শয্যাত্যাগ করতে হয় ।
যদিও পূর্বে আমি ভোর ৪ টার দিকে শয্যাত্যাগ করতে অভ্যস্ত ছিলাম কিন্তু তবুও কিছুটা সমন্বয় করে ভোর ৩টায় শয্যাত্যাগের সিদ্ধান্ত নিই। সারাদিনের ব্যস্ত কর্মসূচীর মধ্যে সেটিও কঠিন বিষয় । এক্ষেত্রে আমার কিছু পারমার্থিক অনুশীলন চাকরির পর সন্ধ্যায় করার সিদ্ধান্ত নিই। যদিও তাতে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না, কারণ ক্লান্তির কারণে অনুশীলনে মনোনিবেশ করাটা দুরূহ হয়ে পড়ে।
আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হল ভক্তসঙ্গের সময়টি কমিয়ে আনতে হয়েছিল। একদিকে সকালের সময়টি বেশ সীমিত, অন্যদিকে সন্ধ্যায় শরীরের শক্তি স্তিমিত হয়ে যায়। আমি ইন্টারনেটে বিভিন্ন প্রজেক্টের ওপর কিছু কৃষ্ণভক্তের সঙ্গে সেবা করি, কিন্তু এক্ষেত্রে পারমার্থিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা প্রদান করে এমন ব্যক্তির সঙ্গ করার সময়টিও হ্রাস পায়।
আমি বিভিন্নভাবে অভ্যন্তরীণ ধ্যানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা করেছি। আমি মনে মনে হরিনাম জপ ও প্রার্থনা করার চেষ্টা করেছি। যদিও অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে বিচ্যুত হয়েছি। মাঝে মাঝে যখন আমি কর্মস্থলে থাকি, তখন অনেক ধরনের ঘটনা ঘটে যা আমাকে পারমার্থিক বিভিন্ন কাহিনি ও শিক্ষা সম্বন্ধে মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সেটিও নিরবচ্ছিন্নভাবে হয় না। আমার আশা থাকে সকালের কর্মসূচিতে মনোযোগ সহকারে পারমার্থিক অনুশীলন করব। যার প্রভাব দিন জুড় থাকবে। কিন্তু সকালে সময়ের অভাবে তা নিয়মিত করাটা কঠিন হয়ে যেত ।
আমি চেয়েছিলাম গভীর জপ ও প্রার্থনার মাধ্যমে একটি উন্নত চেতনার স্তরে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না কর্মস্থলে এই রকম প্রতিযোগিতার মধ্যে কিভাবে তা করা যায়। যদিও সারা বিশ্বে যে কোন কর্মস্থলে কঠিন পরিস্থিতির সময়ও উন্নত পারমার্থিক চেতনা লাভের জন্য শাস্ত্রসমূহ আমাদেরকে উৎসাহ দিয়ে থাকে। এই রকম অনেক দৃষ্টান্তই শাস্ত্রে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে কঠিন পরিস্থিতিতেও এই রকম পারমার্থিক পথে পরিচালিত করেছেন।
আমি এই বিষয়ে অনেক ভক্তদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। যারা আমাকে বিভিন্ন উপদেশ প্রদান করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাদের কারো অবস্থা আমার মতো দূরুহ ছিল না। তাদের সমস্ত কর্ম ছিল কৃষ্ণ কেন্দ্রিক।
আমি একটি শাস্ত্রীয় উক্তি অনুসন্ধান করছিলাম । যাতে এই পরিস্থিতির একটি সমাধান পাই। অবশেষে শাস্ত্র থেকে একটি শ্লোক খুঁজে পাই। যেখানে বলা হয়েছে-মনকে একটি আংটার মতো কৃষ্ণকেন্দ্রিক করতে হবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে পরিশেষে মনেরও ঊর্ধ্বে যাওয়ার প্রচেষ্টা করতে হবে। সেই শ্লোকের তাৎপর্যে শ্রীল প্রভুপাদ সমাধি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেছেন। এটি হলো ভগবানের ওপর সম্পূর্ণ ও দৃঢ় মনোযোগ নিবদ্ধ করা। তবে এটি চরম স্তরের নয়। এরও উর্ধ্বে রয়েছে আত্মার জীবন, মনের স্বাধীনতা ।
যখন এই বিষয়টি নিয়ে একজন বন্ধুর সাথে আলোচনা করেছিলাম, তখন আমরা একটি উপসংহারে পৌঁছে ছিলাম যে, আমার এই সফলতার অভাবের কারণ আমার চাকরি নয় বরং পারমার্থিক অপরিপক্কতা। এক্ষেত্রে আমার প্রগতির জন্য আমি সাধারণত গভীর ধ্যানে প্রবেশ করতে পারি। তখনই যখন বাহ্যিক পরিস্থিতি সহায়ক হয়। বাকী সময়টুকু আমি সাধারণভাবে কৃষ্ণভাবনায় থাকতে পারি। আমার বন্ধুটি এটিকে তুলনা করেছেন এভাবে যে, যখন আপনি গাড়ি চালান তখন যেভাবে পাশে বসে থাকা যাত্রীর প্রতি সচেতন থাকেন ঠিক তেমনি কৃষ্ণভাবনার ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে।
আমি এখন উপলব্ধি করি মনেরও উর্ধ্বে যে বিষয়গুলো প্রকাশিত হয়েছিল সেগুলো মোটেই আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। সেগুলো হল কৃপাস্বরূপ। আমি সেই কৃপাকে আকর্ষণ করতে পারি অন্তত প্রতিদিনের জপ-কীর্তনের সময় গভীর প্রার্থনায় মনোনিবেশের মাধ্যমে। যদিও এভাবে করাটাও আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং কারণ ভোরে আমার পর্যাপ্ত সময় থাকে না। আমি জপের মান উন্নয়নে কাজ করছি, এমনকি সন্ধ্যায়ও আমাকে জপ করতে হয়।
আমি দিনের বেশির ভাগ সময় যত বেশি সম্ভব কৃষ্ণের প্রতি আমার মনকে নিবদ্ধ করার চেষ্টা করি। নিঃসন্দেহে সেটি কষ্টসাধ্য। তাড়াহুড়া করে ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করা এর মাঝে সফলতার পরিমাণটি উঠানামা করে। আমি ভগবানের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি, যিনি যখন ইচ্ছা করবেন, তখন আমাকে উচ্চতর স্তরে টেনে তুলতে পারেন। কিন্তু কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় যখন আমি ভগবানের ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করি, কিংবা, এমনকি সাধারণভাবে কৃষ্ণচেতনায় অধিষ্ঠিত হই, মনের গভীর থেকে একটি ভাষা ও আচরণ উঠে আসে, স্বাগতম কৃষ্ণভক্তদের সমাজে, কিন্তু পাবলিক স্কুলের সঙ্গে যেটি কিছুটা অসঙ্গত হয়ে পড়েছে।
এক্ষেত্রে একটি বিষয় আমার জন্য খুব সহায়ক হয় তা হল কর্মস্থলে পারমার্থিক গান শ্রবণ করা । কারণ বৈদিক ভজন কীর্তন আমার সহকর্মীদের কাছে উদ্ভট মনে হয়। মাঝে মধ্যে কর্মস্থলে লোকজন আমার ভজন, কীর্তন শোনা থামিয়ে তাদের কাজ আদায় করত।
আরেকটি সহায়িকা অনুশীলন হলো মধ্যাহ্নকালীন গায়ত্রীমন্ত্র ধ্যান। মাঝে মাঝে আবহাওয়া, পরিস্থিতি এবং আশেপাশের লোকেরা অনুশীলনের সময় বিরক্ত করত। শান্তিপূর্ণভাবে গায়ত্রী ধ্যান করতে না পারলে, খুব খারাপ লাগত। সব মিলিয়ে আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অর্জন করেছিলাম, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল, আমি পরিকল্পনা করলেও তা বাস্তবায়ন করা কতটা দুরূহ হয়।
আমি আশা করি, এই ইন্টার্নশীপ যেন আমার শেষ চাকরি হয়, বিশেষত এমন একটি পরিবেশে চাকরি করা যেখানে উন্মুক্তভাবে পারমার্থিক অনুশীলনের সুযোগ নেই। তবুও ইন্টার্নশীপের পূর্বে আমি যে কোন ভাবে পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে আশা করি। যদিও এতে সন্দেহ রয়েছে আসলেই কি তা অর্জন করা সম্ভব।

পরম লক্ষ্যের পথে কৌশলসমূহ

কোন প্রশস্ত লক্ষ্য পূরনের জন্য আমি সফলতার কৌশল নির্ধারণ করি। এক্ষেত্রে আমার প্রথম কৌশল হলো, আমাকে এমন চাকরি করতে হবে যেখানে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সহকর্মীরা আমার পারমার্থিক অনুশীলনগুলো মেনে নেবে। এক্ষেত্রে আমার কাছে পারমার্থিক ভাবে থাকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ যদি এ জন্মেই কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে চাই ।
আমার দ্বিতীয় কৌশলটি হল উন্নত পারমার্থিক স্তরে অবস্থান করছে এরকম ব্যক্তিদের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রাখা। আর আমি সেটি করতে পারি ই-মেইল, ইন্টারনেট ক্লাস বা ফোনের মাধ্যমে। আমি হয়তো তাদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য পাচ্ছি না, কিন্তু এভাবে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমেও আমি অনেক লাভবান হতে পারি। এক্ষেত্রে যদিও পৃথিবীতে বর্তমানে বিরাজমান নেই এমন মহাত্মাদের জীবনাবর্তের ধ্যানও করতে পারি। কেননা বর্তমান অবস্থায় পারমার্থিক জীবন রক্ষা করার জন্য আমাকে এর চেয়েও বেশি কিছুর প্রয়োজন।
তৃতীয় কৌশলটি হল, কৃষ্ণভক্তদের কমিউনিটির নিকটে বাস করা এবং তাদের নিয়মিত পারমার্থিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করা। সুন্দর ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিদিন স্থানীয় মন্দির পরিদর্শন কম আকর্ষনীয় ছিল এবং সে সাথে কর্মস্থল ও পারমার্থিক জীবনের মধ্যে সমন্বয় সাধন জটিল হয়ে পড়েছিল। এক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি ইতিবাচক দিক হলো, এর মাধ্যমে দৈনন্দিন পারমার্থিক শক্তি অর্জনের জন্য আমি মন্দিরের ওপর নির্ভরশীলতা বাদ দিতে শিখেছিলাম, অপরদিকে নেতিবাচক দিক হলো এভাবে পারমার্থিক অনুশীলনটি কষ্টসাধ্য ছিল যা অন্য কোনভাবে সমাধান করা যেত। ইন্টার্নশীপের শেষের দিকে এসে আমি এখন আমার সেই অনেক দশকের সুদীর্ঘ অনুশীলন দৈনন্দিনভাবে মন্দিরে যাওয়া শুরু করেছি এবং আশা করি অধিকাংশ সময় মন্দিরের সকালের কর্মসূচীতে উপস্থিত থাকতে পারব আবার সে সাথে ঠিক সময়ে কর্মস্থলেও যেতে পারব।
সফলতার চতুর্থ স্তরটি হল দিনের একটি সময়, এমনকি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যেও আমার অভ্যন্তরীণ পারমার্থিক প্রগতি বিষয়ে পুষ্টিসাধন করা। আমি সেটি করতে পারি, মহান মহান ভক্তদের রচিত ভক্তিমূলক পদ্য ও প্রার্থনা অধ্যয়নের মাধ্যমে, শাস্ত্র থেকে সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে মননের মাধ্যমে, ভজন গীতের মাধ্যমে এবং নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ধ্যানের মাধ্যমে। ইন্টার্নশীপের সময় এই কৌশলটি আমাকে অনেক সাহায্য করেছে, খুব সম্ভবত ঐ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জিনিসগুলো আমি করেছি।
পারমার্থিক ও জাগতিক দক্ষতাসমূহ একে অপরের বিপরীত বলে মনে হলেও যেহেতু সবকিছু কৃষ্ণেরই সৃষ্টি, তাই উভয় স্তরের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ছন্দময় গতিতে চলার জন্য কোন উপায় অবশ্যই রয়েছে। যিনি তা করতে পারেন তিনি এমনকি তার জাগতিক কর্ম বা কর্মস্থল ও পারমার্থিক চেতনার মধ্যে কোন পার্থক্য দর্শন করেন না ।
লেখক পরিচিতি : ড. এডিথ ই. বেস্ট (উর্মিলা দেবী দাসী) আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটি থেকে এডুকেশনাল লিডারশীপ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্যা। তিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক ব্যাক টু গডহেড ম্যাগাজিনের সহ সম্পাদক রূপে সেবা করছেন। এছাড়াও তিনি ইস্কন শিক্ষা বিভাগের উন্নয়নে নিরলস কাজ করে চলেছেন। অনন্ত বল্লভ দাস ও তার পরিবার ব্যাঙ্গালোরে, ইস্কন শ্রী জগন্নাথ মন্দিরের ভক্ত গোষ্ঠিদের সঙ্গে কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন করেন। উল্লেখ্য, তিনি Vaikuntha Children: a guide to Krishna Conscious Education for Children গ্রন্থের লেখক । 

 

জানুয়ারী-মার্চ  ২০১৮ ব্যাক টু গডহেড

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।