কিভাবে অবতার চেনা যায়?

0
93

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য : আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন)
২৬ ডিসেম্বর ১৯৬৬ সালে আমেরিকার নিউইয়র্কে প্রদত্ত প্রবচনের বঙ্গানুবাদ।


শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বৈদিক শাস্ত্রসমূহকে নির্ভুল পারমার্থিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে অবহিত করেছেন।

সর্বজ্ঞ মুনির বাক্য-শাস্ত্র-‘প্রমাণ’।
আমা-সবা জীবের হয় শাস্ত্রদ্বারা ‘জ্ঞান’ ॥

“সর্বজ্ঞ মহামুনি ব্যাসদেব রচিত বৈদিক শাস্ত্রই হচ্ছে একমাত্র প্রমাণ। আমাদের মতো বদ্ধ জীবেরা শাস্ত্রের মাধ্যমেই কেবল যথার্থ জ্ঞান অর্জন করতে পারে।” [চৈতন্য চরিতামৃত মধ্য ২০/৩৫৩]
আমরা তমগুণ থেকে সত্ত্বগুণে উন্নীত হওয়ার অতঃপর সেটিরও ঊর্ধ্বে যাওয়ার প্রচেষ্টা করছি মাত্র। এটাই হলো পারমার্থিক উপলব্ধির পন্থা। আমাদের কখনো ভাবা উচিত নয় যে, আমরা যা চিন্তা করি বা জানি তা পুরোপুরি নির্ভুল। কেননা আমরা কখনো ভগবান হতে পারি না একমাত্র ভগবানই পুরোপুরি নির্ভুল এবং শুদ্ধ। অপরদিকে আমরা প্রায় সবক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ জ্ঞান সম্পন্ন। এমনকি তথাকথিত মুক্ত স্তরেও আমরা ত্রুটিপূর্ণ। অতএব আমাদেরকে যথার্থ কর্তৃপক্ষের আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। কেননা স্বাভাবিকভাবেই আমরা ত্রুটিপূর্ণ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলছেন, আমা-সবা জীবের হয় শাস্ত্রদ্বারা ‘জ্ঞান’। যথাযথ জ্ঞানের জন্য আমাদের প্রকৃত শাস্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। সাধু-শাস্ত্র-গুরু। সাধু মানে পুণ্যাত্মা, ধার্মিক, সৎ ব্যক্তি যার চরিত্র কলুষমুক্ত তাকে সাধু বলে। সাধু ও গুরু একই সমতলে অবস্থান করে। কারণ এ সবের কেন্দ্রে রয়েছে শাস্ত্র। গুরুকে মুক্তাত্মা হিসেবে অভিহিত করা হয় কেননা তিনি শাস্ত্র অনুসরণ করেন। সাধুকে একজন সৎ ও সাত্ত্বিক ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করা যায় কেননা তিনিও শাস্ত্রকে অনুসরণ করেন। কেউ যদি শাস্ত্রের মূল নীতিগুলো অনুশীলন না করেন তবে তাকে সাধু বলা যায় না এবং সেই ব্যক্তিকে গুরুরূপে গ্রহণ করা যাবে না।

তদ্বিবিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ
সমিপাণিঃ শ্রোত্রিয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠম্।

“পারমার্থিক বিজ্ঞানকে উপলব্ধি করতে হলে অবশ্যই একজন সদগুরু গ্রহণ করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে গুরু গ্রহণেচ্ছু ব্যক্তিকে যজ্ঞকাষ্ঠ বহন করে গুরুর কাছে যেতে হবে। সদ্গুরুর লক্ষণ হচ্ছে যে, তিনি বৈদিক সিদ্ধান্তে পারঙ্গম এবং তাই তিনি সর্বদাই পরমেশ্বরের সেবায় নিযুক্ত থাকেন।” [মুণ্ডক উপনিষদ ১/২/১২]
শ্রোত্রিয়ং অর্থ যে ব্যক্তি বৈদিক সাহিত্যকে কুণ্ঠাহীনভাবে গ্রহণ করেছে। শাস্ত্র একজন গুরুর মতোই পথ প্রদর্শক। যদি সেই শাস্ত্র যথযথ না হয় তবে তা কোনো ব্যক্তিকে পথ প্রদর্শনের পরিবর্তে অন্ধ গলির গোলক ধাঁধায় ফেলে দেয়। কিছু ব্যক্তি ধর্মের মূল নীতিগুলো পরিবর্তন করে তাদের নিজেদের মনগড়া কিছু যুক্তিকে শাস্ত্রের মূলনীতি বলে চালানোর প্রয়াস করে।
সনাতন গোস্বামী চৈতন্য মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করেন, কিভাবে আমরা জানতে পারি কে অবতার? চৈতন্য মহাপ্রভু বলেন, “একমাত্র শাস্ত্রের মাধ্যমেই আমরা তাকে জানতে পারি এবং গুরু এই নির্দেশনা প্রদান করে।” মাঝে মধ্যে শাস্ত্রের ভিন্ন ভিন্ন উক্তি নিয়ে আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ি। এটি আমাদের স্বল্প জ্ঞানের পরিচয়। যা আমাদের স্বল্প জ্ঞানের ফলে শাস্ত্রকে যথাযথ বুঝতে অসমর্থ হই। আর এই সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একজন যথার্থ গুরুর তত্ত্বাবধানে থেকে শাস্ত্রকে অনুধাবন করতে হয়। চৈতন্য মহাপ্রভু বলছেন, “অবশ্যই শাস্ত্র চক্ষু দিয়ে বিচার করতে হবে কোন্ ব্যক্তি অবতার। কাউকে অন্ধভাবে অবতার বলে স্বীকার করে নেওয়া উচিত নয় আমাদের, কেননা বর্তমানে অবতারের সংখ্যা শাস্ত্রের উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে অধিক।” পরবর্তী শ্লোকে তিনি বলছেন,

অবতার নাহি কহে-‘আমি অবতার’।
মুই সব জানি’ করে লক্ষণ-বিচার।

“যিনি ভগবানের প্রকৃত অবতার তিনি কখনো বলেন না ‘আমি ভগবান’ অথবা ‘আমি ভগবানের অবতার’। মহামুনি ব্যাসদেব সবকিছু জেনে, শাস্ত্রে অবতারের সমস্ত লক্ষণ বিচার করেছেন।” [চৈ.চ. মধ্য ২০/৩৫৪]
এটি হলো অবতার চেনার আরেকটি উপায়। অবতার কখনোই বলবেন না ‘আমি ভগবানের অবতার’। আমি ভারতবর্ষে অবতার সম্বন্ধে একটি বড় গ্রন্থ পড়েছিলাম। সেই গ্রন্থের লেখক তার ছাত্রের সাথে আলোচনা করছিলেন, তুমি কি আমাকে অবতার বলে মান? তখন সেই ছাত্র অবজ্ঞা করে বলেছিল, ‘না’! আমি আপনাকে অবতার বলে মানি না। তার কিছু সময় পর সেই ছাত্রই বলেছিল আবার, “হ্যাঁ, আমি আপনাকে অবতার বলে গ্রহণ করছি।”
ইনি কখনো অবতার হতে পারেন না। কেননা চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, অবতার কখনো নিজেকে অবতার বলে প্রচার করেন না। অনুরূপভাবে গুরু কখনো নিজেকে গুরু বলে প্রচার করেন না, সাধু কখনো নিজেকে সাধু বলে প্রচার করেন না। স্বাভাবিকভাবে তার যোগ্যতা তাকে সবার কাছে গ্রহণ যোগ্য করে তোলে।
যে ব্যক্তি চিন্তাবিদ তিনি যখন সমস্ত লক্ষণ ও যোগ্যতা বিচার করে দেখেন তখনই কাউকে অবতার বলে স্বীকার করেন। কিভাবে আমরা অবতারের লক্ষণগুলো বিশ্লেষন করতে পারি? প্রথম লক্ষণ হলো- সেই ব্যক্তি সম্বন্ধে শাস্ত্রে উল্লেখ থাকবে এবং তিনি কোন সময়, কোথায় অবতীর্ণ হবেন সেই বিষয়ে। উল্লেখ থাকবে। এইরূপ ব্যক্তি ভগবানের অবতার বলে গণ্য। এমনকি তার পিতার নাম এবং আবির্ভাব স্থানও শাস্ত্রে উল্লেখ থাকে। এইভাবেই অবতারের লক্ষণ আমরা জানতে পারি। অবতার এভাবেই অবতীর্ণ হয়ে উল্লেখিত কার্য সম্পন্ন করবে।
শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু কখনো বলেন নি আমি অবতার। কিন্তু তার লক্ষণ তার চারিত্রিক গুণাবলী বিশ্লেষণ করে পরবর্তীতে অনেক বড় বড় সাধু সত্ত, দার্শনিক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তিনি অবতার। মহাপ্রভুর কাছে অবতার তথ্য সম্বন্ধে জেনে সনাতন গোস্বামী নিশ্চিত হন যে, মহাপ্রভু অবতার।

কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্।
যজ্ঞৈঃ সঙ্কীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ ॥

অর্থাৎ “কলিযুগে যেসব বুদ্ধিমান মানুষেরা ভগবৎ আরাধনার উদ্দেশ্যে সঙ্কীর্তন যজ্ঞানুষ্ঠান করেন, তাঁরা অবিরাম শ্রীকৃষ্ণের নামগানের মাধ্যমে ভগবৎ-অবতারের আরাধনা করে থাকেন। যদিও তাঁর দেহ কৃষ্ণবর্ণ নয়, তা হলেও তিনিই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর সঙ্গে পার্ষদরূপে রয়েছেন তার অন্তরঙ্গ সঙ্গীরা, সেবকগণ, অস্ত্র এবং সহযোগীবৃন্দ।” [শ্রীমদ্ভাগবত ১১/৫/৩২]
এই শ্লোকে কলিযুগে অবতীর্ণ অবতারের লক্ষণ সম্বন্ধে আলোচিত হয়েছে তিনি স্বয়ং কৃষ্ণ কিন্তু তাঁর অঙ্গকান্তি অকৃষ্ণ। তিনি সর্বদা তার অন্তরঙ্গ ভক্ত দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকবেন এবং যেই ব্যক্তিরা বুদ্ধিমান তারাই তার প্রবর্তিত সংকীর্তনের মাধ্যমে তার পূজা করবে। যজ্ঞৈঃ সঙ্কীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ। যার মেধা শক্তি খুব তীক্ষ্ণ। বোকা ব্যক্তি কখনো সুমেধসঃ বলে অভিহিত হন না। সুমেধসঃ ব্যক্তিরাই একমাত্র তাকে জানতে পারে। চৈতন্য মহাপ্রভু সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে, মহাভারতে, উপনিষদে, পুরাণে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে মহাপ্রভুর বিভিন্ন লক্ষণগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক নির্বোধ ব্যক্তি এই যথাযথ শাস্ত্র প্রমাণকে অবিশ্বাস করে। স্বীকার করুক বা না করুক ভগবানের কার্যাবলী তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সর্বজন বিদিত। ব্রহ্মা শ্রীমদ্ভাগবতে মহাপ্রভুকে অবতার বলে স্বীকার করেছেন। সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন তাই বৌদ্ধ ধর্ম সারা ভারতে প্রসার লাভ করে। বাস্তবে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই বৌদ্ধ ধর্ম প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে প্রচার লাভ করে। সম্রাট অশোকের সময় সারা ভারত বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হওয়ার পথে ছিল কিন্তু পরবর্তীতে শঙ্করাচার্য আবির্ভূত হয়ে এই বৌদ্ধ ধর্মের কাল যাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয়। তিনি বৌদ্ধ তত্ত্ব এবং হিন্দু তত্ত্বের মূল পার্থক্যটি প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস করেন। তার প্রয়াস পুরোপুরিভাবে সার্থক হয়। বৌদ্ধ বৈদিক কর্তৃপক্ষকে অস্বীকার করেন সেই কারণে তিনি বৈদিক জ্ঞানকেও অবমাননা করেন।

বৈদিক কর্তৃপক্ষ

বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে যদি কেউ বৈদিক প্রামাণ্যতা স্বীকার না করে তবে সে কখনো কর্তৃপক্ষ হতে পারে না।


মানুষ হয়তো বলতে পারে, আমরা যেই কৃষ্ণের কথা বলছি নির্বিশেষবাদীরা ভাবে শঙ্করাচার্য সেই কৃষ্ণের কথা বলেন নি। এই বিভ্রান্তির প্রধান কারণ শঙ্করাচার্যের অনুসারীরা তাঁকে যথাযথভাবে গ্রহণ করতে অসমর্থ। কিন্তু শঙ্করাচার্য এরূপ ব্যক্তিদের জন্য আরো সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন, দেবকী বসুদের জাতঃ। এর অর্থ হলো কৃষ্ণ সেই ব্যক্তি যার মা দেবকী এবং পিতা বসুদেব।

ভারতবর্ষে মায়াবাদ (নির্বিশেষ) ও বৈষ্ণব দর্শন (সবিশেষ) নামে দু’ধরনের দর্শন প্রচলিত আছে। মায়াবাদ দর্শন বলে যে, ঈশ্বর কোনো ব্যক্তি নন তিনি নির্বিশেষ এবং বৈষ্ণব দর্শন বলে যে, নির্বিশেষ ব্রহ্ম অবশেষে সবিশেষ রূপ প্রাপ্ত হয়। তিনিই হলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ।

এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ং।
ইন্দ্রারিব্যাকুলং লোকং মুড়য়ন্তি যুগে যুগে ॥

অনুবাদ: সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন ভগবানের অংশ অথবা কলা অবতার, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং। যখন নাস্তিকদের অত্যাচার বেড়ে যায়, তখন আস্তিকদের রক্ষা করার জন্য ভগবান এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন। [শ্রীমদ্ভাগবত ১/৩/২৮]
এটাই হলো দুই দর্শন অনুসারী দলের পার্থক্য। এই নিয়ে দুই দলের অবস্থানগত দ্বন্দ্ব। এটি চলে আসছে বহুকাল ধরে। কিন্তু উভয় দলের অন্তর্গত ব্যক্তিরাই সনাতন ধর্মের অনুসারী। কেননা উভয়ই দলই বেদান্ত দর্শনকে স্বীকার করে। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও তারা বেদান্ত স্বীকার করে। কোনো ব্যক্তি আচার্যপদে অভিষিক্ত হলেই বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেন। বেদান্ত দর্শন, শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবত যে ব্যক্তি এই তিনটি গ্রন্থের যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেন তিনি আচার্য বলে অভিহিত। এটাই হচ্ছে বৈদিক নীতি।
সম্প্রতি নির্বিশেষবাদীরাও কৃষ্ণকে গ্রহণ করছে। শঙ্করাচার্য কৃষ্ণকে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘স্ব ভগবান কৃষ্ণ’ অর্থাৎ কৃষ্ণ পরমেশ্বর ভগবান। মানুষ হয়তো বলতে পারে, আমরা যেই কৃষ্ণের কথা বলছি নির্বিশেষবাদীরা ভাবে শঙ্করাচার্য সেই কৃষ্ণের কথা বলেন নি। এই বিভ্রান্তির প্রধান কারণ শঙ্করাচার্যের অনুসারীরা তাঁকে যথাযথভাবে গ্রহণ করতে অসমর্থ। কিন্তু শঙ্করাচার্য এরূপ ব্যক্তিদের জন্য আরো সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন, দেবকী বসুদেব জাতঃ। এর অর্থ হলো কৃষ্ণ সেই ব্যক্তি যার মা দেবকী এবং পিতা বসুদেব।
শঙ্করাচার্য কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেছেন—

ভজ গোবিন্দম্ ভজ গোবিন্দম্
ভজ গোবিন্দম্ মূঢ়মতে।
সম্প্ৰাপ্তে সন্নিহিতে কালে
নহি নহি রক্ষতি ডুকৃঙ্করণে ॥

“হে মৃঢ়মতি! প্রত্যয় ও উপসর্গ বিষয়ে তোমার ব্যাকরণগত বাচাতুরি এবং তোমার দার্শনিক জল্পনা-কল্পনা মৃত্যুকাল সন্নিহিত হলে তোমাকে আদৌ রক্ষা করতে পারবে না। সুতরাং শুধু গোবিন্দকে ভজনা কর, গোবিন্দকে ভজনা কর, গোবিন্দকে ভজনা কর।”
কিছু ব্যক্তি ভগবদ্গীতা থেকে ব্যাকরণের শক্তিতে নির্বিশেষবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এটা পুরোপুরি বোকামী। ভগবান এত সস্তা নন যে, তাকে ব্যাকরণের মাধ্যমে জানা যাবে। তিনি বিশেষভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা ও গঙ্গা জলকে মহিমান্বিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “একটুখানি গঙ্গাজল আর সামান্যতম ভগবদ্‌গীতার অধ্যয়ন তোমাকে অনেক ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারে। কেননা কৃষ্ণ তাঁর সম্মুখে কৃষ্ণের বিভিন্ন দিব্য গুণাবলী হৃদয়ে প্রকাশিত করেছেন। তাই শঙ্করাচার্য কৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান বলে স্বীকার করে নিয়েছেন কিন্তু অনেক ব্যক্তি তার এই স্বীকারোক্তিকে গ্রহণ করতে পারে না।

রামানুজ আচার্য ধারায় অধিষ্ঠিত গুরু হতে প্রাপ্ত জ্ঞান

শ্রীযামুনাচার্য ছিলেন রামানুজ আচার্যের এক শিষ্য এবং ভগবানের মহান ভক্ত। পূর্ব আশ্রমে তিনি বিশাল এক সাম্রাজ্যের রাজা ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি মহান ভক্ততে পরিণত হন। রামানুজ আচার্য সম্প্রদায়ে ১২জন মহান আচার্যের মধ্যে তিনি একজন। তাঁর রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক হলো,

ত্বং শীলরূপচরিতৈঃ পরমপ্রকৃষ্টৈঃ সত্ত্বেন সাত্ত্বিকতয়া প্ৰবলৈশ্চ শাস্ত্ৰৈঃ ।
প্রখ্যাতদৈব পরমার্থবিদাং যতৈশ্চ নৈবসুরাপ্রকৃতয়ঃ প্রভবন্তি বোদ্ধৃম ॥

অর্থাৎ, “হে ভগবান, যদিও তোমার মহিমান্বিত কর্ম, মাধুর্যমণ্ডিত রূপ, মহিমাময় চরিত্র ও অসাধারণ ক্ষমতার বলে পরমার্থবিদ কর্তৃক প্রতিপাদিত হয়েছে, তবুও আসুরিক মনোভাবপন্ন ব্যক্তিরা তোমাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না।” [স্তোত্র রত্ন-১২]
নাস্তিকবাদী অসুর, ব্রাহ্মণ পুত্র রাক্ষস রাবণ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি বৈদিক দর্শনের মহান পণ্ডিত ছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি জাগতিকভাবে এত সমৃদ্ধি অর্জন করেছিলেন যে, তাঁর রাজধানী নির্মাণ করেছিলেন স্বর্ণ দ্বারা। এই কারণে তার রাজধানী স্বর্ণলঙ্কা নামে পরিচিত ছিল। তিনি যেমন ছিলেন জ্ঞানী তেমনি ঐশ্বর্যবান। তবুও তিনি রাক্ষস ও অসুর নামে পরিচিত ছিলেন। পরস্ত্রী হরনের মতো জঘন্য ও মারাত্মক ভুলের জন্যই তিনি অসুর নামে অভিহিত হন। শাস্ত্র অসুর বলে অভিহিত করছে নাস্তিকদেরকেই (যারা ভগবানের অস্তিত বিশ্বাস করে না)। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় ৭/১৫ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,

ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়া প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ ॥

বৈদিক পদ্ধতি এরূপ যে, যদি কিছু বেদে উল্লেখ থাকে এবং পূর্বতন আচার্যরা গ্রহণ করে, তবে তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতে হবে। যদি আমি বোকাও হই কিন্তু পূর্বতন আচার্যদের অনুসরণ করি তাহলে আমি সঠিক। যদি কোনো শিশু তার বাবার হাত ধরে তাহলে সে সঠিক। সে অনায়াসে রাস্তা পার হতে পারে এটাই হলো বৈদিক পন্থা।

“মূঢ়, নরাধম, মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে এবং যারা আসুরিক ভাবসম্পন্ন, সেই সমস্ত দুষ্কৃতকারীরা কখনও আমার শরণাগত হয় না।”
যখন কোনো ব্যক্তি নাস্তিক হয় তাকে কোনো কিছু বোঝানো কষ্টসাধ্য। তাই আমাদের প্রচারকার্য নাস্তিকদের বাদ দিয়ে করা উচিত। অবশ্য কলির প্রভাবে বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ নাস্তিক। তাই আমরা নাস্তিকদের মধ্যেও প্রচারের ঝুঁকি গ্রহণ করি। কিন্তু প্রচারকদের সচেতন করে দেওয়া হয়, তারা যেন নাস্তিকদের সাথে সাবধানে কথা বলে। কেননা তারা শুধুমাত্র তর্কই করে। তারা কখনোই ভগবানকে গ্রহণ করতে চায় না।
এই শ্লোকটি যামুনাচার্য লিখেছেন প্রায়ই ১ হাজার বছর আগে। আমরা দেখতে পাই যে, নাস্তিকগুলো সেসময়ও ছিল।
যামুনাচার্য লিখেছে প্ৰবলৈশ চ শাস্ত্রে বিভিন্ন প্রকারের কর্তৃপক্ষ রয়েছে। প্রথম কর্তৃপক্ষ শাস্ত্র কর্তৃক অনুদিত। অবতারের চরিত্র, তার কার্য এবং গুণাবলী শাস্ত্রসিদ্ধ। প্রবল মানে খুব শক্তিশালী। বেদান্ত দর্শন, ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবত খুব শক্তিশালী। তাই আমরা প্রমাণগুলো এই তিনটি উৎস থেকে প্রদান করছি। প্রকয়ট দৈব পরমার্থ-বিদং মতৈক্ষ। অন্য কর্তৃপক্ষ হল মহান, স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তি। যেমন, ব্যাসদেব। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যিনি ব্যাসদেবের চেয়ে বেশি স্থিতপ্রজ্ঞ। তিনি সমস্ত বৈদিক সাহিত্য লিপিবদ্ধ করেন।
নারদ মুনি হলেন মহান ঋষিদের একজন। এছাড়াও অসিত, দেবল, বশিষ্ট এরূপ বহু ঋষি কৃষ্ণকে ভগবান বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ দ্বাদশ মহাজনরাও নির্দ্বিধায় কৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান বলে স্বীকার করেছেন। দ্বাদশ মহাজনরা হলেন, ব্রহ্মা, নারদ মুনি, ভগবান শিব, চতুঙ্কুমার, দেবহূতি নন্দন কপিল, স্বয়ম্ভূ মনু, প্রহ্লাদ মহারাজ, জনক রাজা, পিতামহ ভীষ্মদেব, বলি মহারাজ, শুকদেব গোস্বামী এবং যমরাজ। কিন্তু এরূপ মহান মহান স্থিতপ্রজ্ঞ ও ঋষি শ্রেষ্ঠরা শাস্ত্র প্রমাণের ভিত্তিতে কৃষ্ণকে পরমেশ্বর বলে স্বীকার করলেও নাস্তিকরা অস্বীকার করে।
বৈদিক পদ্ধতি এরূপ যে, যদি কিছু বেদে উল্লেখ থাকে এবং পূর্বতন আচার্যরা গ্রহণ করে, তবে তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতে হবে। যদি আমি বোকাও হই কিন্তু পূর্বতন আচার্যদের অনুসরণ করি তাহলে আমি সঠিক। যদি কোনো শিশু তার বাবার হাত ধরে রাস্তায় হাঁটে তাহলে সে সঠিক। সে অনায়াসে রাস্তা পার হতে পারে এটাই হলো বৈদিক পন্থা। তুমি কি ভগবান নিয়ে গবেষণা করছ? বৈদিক দর্শনে এরূপ গবেষণার কোনো স্থান নেই। তোমাকে কর্তৃপক্ষ যা বলে তাই গ্রহণ করতে হবে।

ভীষ্মদেবের স্বীকারোক্তি

কৃষ্ণের চরিত্র ভীষ্মদেব কর্তৃক স্বীকৃত। ভীষ্মদেব ছিলেন অর্জুনের পিতামহ। তাই সেই সূত্রে তিনি কৃষ্ণেরও পিতামহ ছিলেন। তিনি ছিলেন এক মহান যোদ্ধা এবং শ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয়। তার চরিত্র ছিল নিষ্কলুষ । যদিও তিনি একজন গৃহস্থের মতো বাস করতেন তবুও তিনি ঋষিদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। তিনি ছিলেন গঙ্গা ও মহারাজ শান্তনুর পুত্র। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের কারণে গঙ্গাদেবী মহারাজ শান্তনুকে ছেড়ে চলে গেলে তিনি পুনঃরায় বিবাহ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তাই তিনি খুব সুন্দর এক বালিকাকে নির্বাচন করেন। কিন্তু সেই বালিকা ছিল নিম্ন বর্ণের। ক্ষত্রিয়রা যেকোনো বর্ণ থেকে বিবাহ করা রীতিবিরুদ্ধ নয়। বালিকা ছিল এক ধীবর (জেলে) কন্যা। মহারাজ শান্তনু কন্যাটিকে বিবাহ করতে ইচ্ছে করলে কন্যার পিতা বললেন, “আমার কন্যাকে আপনার হাতে অর্পণ করতে পারি না। আপনি বিবাহিত এবং আপনার পুত্র সন্তানও আছে একটি।” শান্তনু রাজা বললেন, “আমি আপনার কন্যাকে সর্বসুখ দেব, রাজপ্রাসাদ দেব।” তখন ধীবর বললেন, “আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, আমার কন্যার ঔরসজাত পুত্রই একমাত্র রাজ্যের অধিকারী হবে।”
শান্তনু রাজা বললেন, “না আমি আপনার প্রস্তাবে সম্মত নই, কেননা আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র এখনো জীবিত।” এই বলে মহারাজ শান্তনু রাজ প্রাসাদে এসে আহারাদি পরিত্যাগ করে দিন। অতিবাহিত করতে লাগলেন। ভীষ্মদেব সব বুঝতে পেরে সেই কন্যার পিতার কাছে গিয়ে “ঠিক আছে বললেন, মহাশয় বলুন আপনার কি শর্ত? ভীষ্মদেব শর্ত শ্রবণ করে বললেন, আমি পিতার রাজ্য গ্রহণ করবো না। আপনার কন্যার পুত্রই রাজা হবে।” তখন ধীবর বলল, “ঠিক আছে তুমি না হয় মেনে নিলে, কিন্তু তোমার পুত্র রাজ সিংহাসন দাবী করতে পারে, কারণ তুমি হচ্ছ রাজ্যের যুবরাজ।” ঠিক আছে আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ‘আমি বিবাহ করব না। এবার আপনি আমার পিতার সাথে আপনার কন্যার বিবাহ দিতে সম্মত হোন। এমনি শুদ্ধ ও ধীরচেতা ব্যক্তি ছিলেন ভীষ্মদেব। ভীষ্মদেব আজীবন নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করে গেছেন। এমনই গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তি ভীষ্মদেব রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণকে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি রূপে মহার্ঘ প্রদান করার জন্য যুধিষ্ঠির মহারাজকে নির্দেশ দেন। যখন কেউ রাজসূয় যজ্ঞ করে সেই যজ্ঞে বিশ্বের সমস্ত যুবরাজদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তারা সবাই বিশ্বের সম্রাট নির্বাচন করে এই যজ্ঞে। একেই বলা হয় রাজসূয় যজ্ঞ। এই যজ্ঞে বহু স্বনামধন্য যুবরাজ উপস্থিত ছিলেন এবং কৃষ্ণকে এই সভার প্রধান সম্মানিত ব্যক্তি নির্বাচন করার জন্য ভীষ্মদেব প্রস্তাব করেন। যদিও কৃষ্ণ ছিলেন ভীষ্মদেবের অনুজ তথাপিও কৃষ্ণ যে পরমেশ্বর ভগবান এ বিষয়ে পিতামহ ভীষ্মদেব স্বয়ং অবগত।
কিন্তু কৃষ্ণ বিরোধী শিশুপাল ও দন্তবক্র এর বিরুদ্ধে ছিলেন। না কৃষ্ণ কখনো এই সবার শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি হতে পারেন না। সভায় আরো অনেক যোগ্য ব্যক্তি আছে। কিন্তু ভীষ্মদেব তা নাকচ করে বলেন, কৃষ্ণের মতো এমন নিষ্কলুষ ব্যক্তি ত্রিভুবনে নেই। যখন তাঁর ১৬ বছর বয়স তখন সে বালিকাদের দ্বারা পরিবেষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে কোন কাম ভাব ছিল না। আমি জন্ম থেকেই ব্রহ্মচারী থাকলেও কখনোই কৃষ্ণের মতো এরূপ সংযম আমি অর্জন করতে পারি নি। তার এই স্বীকারোক্তি মহাভারতে লিপিবদ্ধ আছে এটাই হলো অবতারের চরিত্র।
তাই যামুনাচার্য বলছেন “আপনার চরিত্র, সৌন্দর্য এবং চির বিস্ময়কর কার্য মহান কর্তৃপক্ষ দ্বারা স্বীকৃত। আপনি শাস্ত্র কর্তৃক স্বীকৃত। এত কিছুর পরও নাস্তিকরা আপনাকে কখনোই গ্রহণ করে না।” অবতারের বৈশিষ্ট্যাবলী শাস্ত্র স্বীকৃত। আমাদের উচিত, যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের অনুসারী হওয়া। এটিই হলো বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।


 

জানুয়ারী-মার্চ ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here