ইংল্যান্ডের রাজপুত্রের ভীমরতী

0
35

আচ্ছা যদি এমন হয় যে, ইংল্যান্ডের রাজপুত্র বাকিংহাম প্যালেসের বিশাল রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কোন ফুটপাতে একটি জরাজীর্ণ অতি সাধারণ মানের কাপড় গায়ে জড়িয়ে নিদ্রা যাপন করছে। কনকনে শীত, আশেপাশে অদ্ভুদ নোংরা চেহারার অনেক লোকেরা ঘোরাফেরা করছে। তাদের কেউ ড্রাগ আসক্ত কেউ বা দিনমজুরে আবার কেউবা রাস্তার ঝাড়দার। এরকম একটি অদ্ভুদ পরিবেশে ইংল্যান্ডের রাজপুত্রের নিদ্রা যাপন এতো রীতিমত রসিকতা ছাড়া আর কিছুই না। যেকেউ এরকম খবর শুনলে নিশ্চিতভাবেই অবাক হবেন।
যদিও খবরটি কোন রসিকতা নয় কিন্তু তবুও খোদ ইংল্যান্ডের লোকেরাই এ খবরটি তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দিয়ে নিতান্তই রসিকতা হিসেবে গ্রহন করেছিল। “এও হয় নাকি, ইংল্যান্ডের রাজপুত্র উইলিয়াম……..”। কিন্তু ব্যাপারটি সংবাদমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর এ বিষয়ে সত্যতা মেলে। তবে সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। রাজপুত্রের এরকম হঠাৎ ভীমরতী হওয়ার কারণটা কি হতে পারে? অবশেষে জানা গেল রাজপুত্রের খুব জানতে ইচ্ছা যে কিভাবে ঐ সমস্ত দরিদ্র লোকেরা ফুটপাতে থাকে। আলিশান রাজপ্রাসাদের চার দেয়ালের বাইরের জগৎটা এ কনকনে শীতে কীরকম হতে পারে তাদের জন্যে সেটা উপলব্ধি করার জন্যই গত মাসে নিজেই রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন এবং একজন হতদরিদ্র লোকের মত অতি সাধারণভাবেই রাতটা শীতের মধ্যে কাটিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে, রাজপুত্রের এহেন কার্যের সঙ্গে একজনের খুব অদ্ভুদ মিল পাওয়া যায়। তিনি হলেন সিদ্ধার্থ অর্থাৎ যিনি পরবর্তীতে বুদ্ধ হিসেবে জগতে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ভগবান বুদ্ধ সনাতন ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ অবতার হিসেবে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। সে রাজপুত্র সিদ্ধার্থ বর্তমান ইংল্যান্ডের প্রিন্স উইলিয়ামের মত চার দেয়ালের বাইরের জগৎটা দেখার জন্য বেরিয়ে পড়েছিলেন। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম এটুকুই প্রিন্স উইলিয়াম এরকম ভিন্ন উপলব্ধি অর্জনের পর তার আপন নিবাসেই ফিরে গেছেন অন্যদিকে ভগবান বুদ্ধ তার উল্টোটি। তিনি বাড়িতেই ফিরে যাননি বরঞ্চ পরবর্তীতে বুদ্ধ হিসেবেই জগৎ স্বীকৃত হয় । তাহলে শুনুন গল্পটি। সিদ্ধার্থ যখন জন্ম নিল তখন একজন জ্যোতির্বিদ ভবিষ্যৎবাণী করল যে এ শিশু আপনাদের ছেড়ে চলে গিয়ে চরম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে। তখন তার মা-বাবা সিদ্ধার্থকে হারাবার ভয়ে ভীত হয়ে পরিকল্পনা নিলেন যে, সিদ্ধার্থকে সবসময়ই জড়জগতের বাস্তবতা থেকে দূরে রাখা হবে। তখন সিদ্ধার্থ চার দেয়ালের মধ্যে বেড়ে উঠতে লাগল কিন্তু কোনদিন তাকে কোন রকম উদ্বিগ্নতায় ভুগতে হয়নি। একদিন সিদ্ধার্থের খুব ইচ্ছে হল, বাইরের জগৎকে দেখার এবং তিনি তার বিশ্বাসী একজন সহকারীকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়লেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি প্রথমে একজন বৃদ্ধাকে দেখলেন। যার ছিল চুলগুলো সাদা, নড়চড়তে অক্ষম, শারীরিক অসুস্থতাসহ চামড়াগুলো ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। তখন সিদ্ধার্থ তাকে জিজ্ঞেস করলেন এরকম কেন হয়েছে আপনার, বৃদ্ধ লোকটি বলল এটি হল বৃদ্ধ বয়স এবং সবারই এই অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ খুবই বিষণ্ন হলেন। এর কিছুদিন পরে তিনি একজন রোগগ্রস্থ যুবককে দেখতে পেলে তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তখন তার মা-বাবা বলল “এটি হল রোগ এবং এটি সবাইকে ভোগ করতে হয় যুবক ছেলে।” সিদ্ধার্থ এসব কিছু আগে কখনো দেখেনি এবং শুনেনি। কেননা তার জগৎটা ছিল সম্পূর্ন বিপরীত। পক্ষান্তরে এসবের কোন চিহ্নই নেই। এবারও তিনি হতাশ হলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি একটি বাচ্চার কান্না শুনতে পেলে সেখানে যান এবং দেখেন একটি ছোট শিশু দোলনায় কান্না করছে এবং তার পাশে শুয়ে আছে তার মা। সেসময় সেখানে একজন সাধু উপস্থিত ছিলেন। রাজপুত্র তাকে জিজ্ঞেস করল ‘এটি কি?’ সাধু বলল, যুবক এটি হল জন্ম । সবাইকেই এভাবে আসতে হয় এবং সবাইকে এটার সম্মুখীন হতে হয়। জন্মের পর মৃত্যু এবং আবার জন্ম। এই হল সংসারের চক্র, জাগতিক জীবন।’ পরবর্তীতে সাধুর কাছে এ কথা শুনে তার হৃদয়ে একটি বিশেষ পরিবর্তন সাধিত হল। সে পূর্বোক্ত অসুস্থ ছেলের কাছে ফিরে গিয়ে দেখে যে সেই ছেলেটি সদ্য মারা গেছে। তখন রাজপুত্র শোকার্ত ও ক্রন্দনরত অবস্থায় অত্যন্ত দামী পোশাক এবং গলার হাড় পরিবেষ্টিত শরশয্যার পাশে দম্পতিকে দিলেন। তখন সিদ্ধার্থ তার সহকারীকে বললেন, “আপনাকে এই দিন উপহারের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি জড়জগতের কঠিন বাস্তবতা ছেড়ে একটি মোহের জীবন অতিবাহিত করছিলাম। কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি করতে পারলাম যে, সে রাজা বা নিসম্বল ব্যক্তিই হোক তাকে অবশ্যই জন্ম, বার্ধক্য, জরা এবং মৃত্যু ইত্যাদির সম্মুখীন হতে হবেই। যদি কেউ এসব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে না পারে তবে কিই বা মূল্য এসব রত্ন, স্বর্ণমুদ্রা এবং এরকম সুবিশাল রাজপ্রাসাদের? প্রকৃত সম্পদ হল জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি এসব থেকে মুক্ত হওয়ার পন্থা। ঐ সম্পদ আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। দয়া করে আমার পিতা-মাতাকে গিয়ে বলুন আমি তাদের ভালোবাসা ও স্নেহের জন্য ধন্যবাদ জানায়। কিন্তু আমি আর রাজপ্রাসাদে থাকতে চাই না। আমাকে ঐ সম্পদের খোঁজ করতে হবে যেটি আমার হৃদয় সর্বদা খোঁজ করছে। আর এভাবেই রাজপুত্র সিদ্ধার্থ পরম সত্যের অনুসন্ধান করতে করতে বুদ্ধ হলেন। আমরা জানি না ইংল্যান্ডের প্রিন্স উইলিয়ামের হৃদয়েও ঐ একটি রাতেই এ ধরনের অনুভূতি উদিত হলো কি না। এক্ষেত্রে এ ধরনের অনুভূতি না হলেও মানবতার সেবা করার একটা তাগিদ পেলেও বা কম কি? সেটি না হয় সময়েই বলে দিবে। তবে প্রিন্স উইলিয়ামসের এ ভীমরতী মনে করিয়ে দেয় আরেক প্রিন্স সিদ্ধার্থকে যিনি এক পরম সত্যের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। আমাদেরও এরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করা উচিত যাতে করে পরম সত্যের অনুসন্ধান করে ভগবধাম প্রাপ্ত হতে পারি। না না প্রিন্স উইলিয়ামের আপাতত বাইরে না গেলেও হবে। তবে এটুকু পর্যবেক্ষন করুন আপনার চারপাশের অনেক লোকই কিন্তু ঐ চারটি সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছে। তাই আপনি সাবধান হয়ে যান তখন। হরেকৃষ্ণ।


 

চৈতন্য সন্দেশ ফেব্রুয়ারি – ২০১০ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here