আমরা ভুল করি, কেননা আমরা মোহাচ্ছন্ন

1
143
১৯৭৩ সালের ৩ ডিসেম্বর আমেরিকার লস এঞ্জেলেসের প্রশান্ত মহাসাগরের সৈকতে প্রাতঃভ্রমণের সময়

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

ও তাঁর বৈজ্ঞানিক শিষ্য ড. থৌডম সিংয়ের (শ্রীমৎ ভক্তিস্বরূপ দামোদর স্বামী মহারাজ) মধ্যে হওয়া কথোপকথনের অংশবিশেষ


ড. সিং : বিভিন্ন রকমের জীবের অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বৈজ্ঞানিকেরা বলে যে, বিবর্তনের কোনো এক সময় জীবকোষের বংশানুগতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক উপাদানগুলি যা সাধারণতঃ ঠিক নিজেদের মতো প্রতিকৃতির সৃষ্টি করে বংশানুক্রমিক ধারায় প্রবাহিত হয়, কখনও তাদের হুবহু প্রতিকৃতির সৃষ্টি করতে ভুলে যায় যেমন ছাপাখানায় মাঝে মাঝে ভুল হয়। তখন বিভিন্ন রকমের জীবের উদ্ভব হয়। এভাবে জীবকোষের বংশানুগতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক উপাদানগুলির পার্থক্যের ফলে ভিন্ন রকমের জীবের সৃষ্টি হয়েছে।
শ্রীল প্রভুপাদ : কিন্তু সেই ‘ভুলটি’ অনাদিকাল ধরে হয়ে আসছে, কেননা সবরকমের জীব চিরকালই ছিল। সুতরাং এই ‘ভুলটি’ নিত্য। একটা ‘ভুল’ যখন চিরকাল ধরে হতে থাকে, তখন আর সেটি ভুল নয়; তা হচ্ছে বুদ্ধিমত্তা।
ড. সিং : কিন্তু বৈজ্ঞানিকেরা বলে যে, যদি এই পরিবর্তন না হত, তবে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে কেবল এক রকমের জীব থাকত।
শ্রীল প্রভুপাদ : না, প্রতিটি জীবেরই ভিন্ন ভিন্ন রকমের মনোবৃত্তি রয়েছে এবং তাই বিভিন্ন রকমের মনোবৃত্তি অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন রকমের জীবনের উদ্ভব হয়েছে। যেমন, এখানে আমরা হাঁটছি, কিন্তু অধিকাংশ লোকই আমাদের এ সমস্ত আলোচনা শুনতে আসছে না, কেননা তাদের মনোবৃত্তি আমাদের থেকে ভিন্ন। এই পার্থক্য কেন?
ড. সিং : হয়তো সেটাও একটা ভুল । শ্রীল প্রভুপাদ : না, এটা ভুল নয় । এটা তাদের বাসনা। মৃত্যুর সময় সকলে তাদের বাসনা অনুসারে পরবর্তী শরীর প্রাপ্ত হবে। ভগবদ্‌গীতায় (৮/৬) শ্রীকৃষ্ণ বলছেন—

যং যং বাপি স্মরণ্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্ ।
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ ॥

“মৃত্যুর সময় যে যেই কথা স্মরণ করে দেহত্যাগ করবে, হে কৌন্তেয়, পরবর্তী জীবনে সে সেইরকম শরীর প্রাপ্ত হবে।” তোমার মৃত্যুর সময়কালীন চিন্তার দ্বারা তোমার পরবর্তী শরীর নির্ধারিত হবে। প্রকৃতি তোমাকে শরীরটি দান করবে। তুমি কি রকম শরীর প্রাপ্ত হবে সেটি তুমি বিবেচনা করতে পার না, তা প্রকৃতি করবে এবং প্রকৃতি ভগবানের নির্দেশানুসারে পরিচালিত হচ্ছে।
ড. সিং : কিন্তু ভুলবশতঃ যে বিভিন্ন রকমের জীবের উদ্ভব হয়, তার প্রমাণ বৈজ্ঞানিকদের কাছে আছে বলে মনে হয়।
শ্রীল প্রভুপাদ : সেটাই হচ্ছে তাদের ভুল। প্রকৃতির নিয়মে কোনো ভুল নেই। যেমন রেলগাড়িতে প্রথম শ্রেণী, দ্বিতীয় শ্রেণী, তৃতীয় শ্রেণী রয়েছে। এখন তুমি যদি তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট কেটে ভুল করে প্রথম শ্রেণীতে গিয়ে উঠে বসো তবে সেখানে তোমাকে বসতে দেওয়া হবে না। বিভিন্ন শ্রেণীগুলি যে রয়েছে সেটা ভুল নয়, সেটা হচ্ছে ব্যবস্থা; কিন্তু একটা ভুল কামরায় গিয়ে বসাটা তোমার ভুল। তেমনই ভগবান এত বিচক্ষণ যে, তুমি যে কি কি ভুল করবে তা তিনি জানেন। তাই তোমার ভুল অনুসারে তুমি কোনো বিশেষ শরীরে প্রবেশ কর : “এখানে এসো। এই শরীরটা তোমার জন্য তৈরী আছে।” চুরাশি লক্ষ বিভিন্ন রকমের শরীর রয়েছে এবং প্রকৃতি নির্ভুলভাবে বিভিন্ন জীবকে বিভিন্ন রকমের শরীর দান করছে। সরকার যখন একটা শহর তৈরি করে তার সঙ্গে একটা কারাগারও তৈরি করে। রাখে। কেননা সরকার জানে, বহু আসামীকে দণ্ড দান করার জন্য সেখানে পাঠাতে হবে। এটা সরকারের ভুল নয়; আসামীদের ভুল। যেহেতু তারা অপরাধ করে, তাই তাদের সেখানে যেতে হয়। এটা তাদের ভুল। প্রকৃতিতে কোনো ভুল হয় না শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় (৯/১০) বলছেন—

ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্ ।
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্বিপরিবর্ততে ॥

“হে কৌন্তেয় ! এই জড়া প্রকৃতি আমার অধ্যক্ষতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং স্থাবর ও জঙ্গম জাত নানারকমের জীব শরীর উৎপাদন করছে।” প্রকৃতি ভগবানের অধ্যক্ষতায় পরিচালিত হয়, সুতরাং প্রকৃতি ভুল করবে কি করে? কিন্তু আমরা ভুল করি, কেননা আমরা মোহাচ্ছন্ন, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি ভ্রান্ত, আমরা প্রতারণা করতে চাই। এটাই হচ্ছে ভগবানের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য। ভগবানের ইন্দ্রিয়গুলি ভ্রান্ত নয়, তাঁর ইন্দ্রিয়গুলি পূর্ণ।


 

এপ্রিল – জুন ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here