৬০ হাজার মুনি-ঋষি কিভাবে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেছিল?

0
97

গৌরাঙ্গ দর্শন দাস ও মূর্তিমান মাধব দাস

প্রায় সময় আমরা বিভিন্ন মানুষের নিকট থেকে প্রশ্ন শুনে থাকি- শুকদেব গোস্বামী যখন পরীক্ষিৎ মহারাজকে শ্রীমদ্ভাগবতম পরিবেশন করেছিলেন, তখন সেখানে অবস্থানরত ৬০ হাজার মুনি-ঋষি কিভাবে শুনেছিলেন ? কারণ তখনকার দিনে সাউন্ডসিস্টেম বা মাইক কিংবা কোন টেকনোলজি ছিল না। তাহলে ৬০ হাজার মুনি-ঋষি কিভাবে শুকদেব গোস্বামীর নিকট থেকে একসাথে শ্রবণ করেছিলেন ?


শ্রীপাদ রাধেশ্যাম প্রভুকে আমি এই প্রশ্নটি করেছিলাম। তিনি তার উত্তরে আমাকে বলেছিলেন-শ্রীল শুকদেব গোস্বামী গঙ্গার তীরে পরীক্ষিৎ মহারাজকে শ্রীমদ্ভাগবতমের কথা বলেছিলেন। সে সময় গঙ্গার তীর বিশাল মাঠের মতো ছিল। সাধারণত নদীর তীর এমন একটা জায়গা যেখানে ছোট করে শব্দ করলেও সেইটি জলে প্রতিধ্বনি হয়ে অনেক বড় হয়ে যায়। সে কারণে মুনি-ঋষিরা রেঞ্জের মধ্যে ছিলেন। তাঁরা শুকদেব গোস্বামীর নিকট থেকে সরাসরি শ্রবণ করেছিলেন।
তিনি আরো বলেছিলেন-বেশির ভাগ মুনি-ঋষি শুকদেব গোস্বামীর সামনে বসেছিলেন। যত মুনি-ঋষি এসেছিলেন, তাঁদের সবাইকে তাবু করে দেওয়া হয়েছিল। ঐ মুনি-ঋষিরা সকালে ঘুম থেকে ওঠে স্নানাদি করে তারপর ঐ তাবুতে এসে সেখানে তাঁরা সমাধিস্থ হতেন এবং সমাধির মাধ্যমে তাঁরা শুকদেব গোস্বামীর সাথে যুক্ত হতেন। এই প্রসঙ্গে তিনি চেতনার চারটি ধাপের কথা বলেন।
১. জাগ্রুতি
জাগ্রুতি স্তরে আমাদের চেতনা সজাগ থাকে, কিন্তু তবুও আমরা নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে জড়দেহ এবং জড় জগতের সাথে সনাক্ত করি। সেই জন্য এই স্তরকে অভিনিবেশও বলা হয়।
২.স্বপ্ন
জীবের চেতনা আবৃত হয়ে স্বপ্নের স্তরে প্রবেশ করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মনে করুন, আপনি স্বপ্নে দেখলেন একটি বাঘ আপনাকে তাড়া করেছে। আপনি নিজের জীবন রক্ষার্থে দৌঁড়াচ্ছেন। কিন্তু বাঘ খুবই নিকটে আসছে এবং সে আপনাকে কামড়ে ধরেছে। জাগতিক ভীতিবশতঃ আপনি চিৎকার করেন এবং শয্যা থেকে লাফ দেন। আপনি ভূপতিত হয়ে জেগে উঠেন এবং উপলব্ধি করেন যে প্রকৃতপক্ষে কিছুই হয়নি, আপনি নিরাপদে শয্যায় ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু ভীতিবশতঃ আপনার দেহ ঘামতে শুরু করে। এভাবে স্বপ্নটি কাল্পনিক হলেও আপনার দেহের উপর এর একটি প্রকৃত দৈহিক প্রভাব রয়েছে। এর মানে হচ্ছে, স্বপ্নের স্তরে আপনি স্বপ্নটিকেও বাস্তবতা বলে মনে করেন।
৩. সুষুপ্তি
সুষুপ্তি স্তরে, জীবের চেতনা আরো বেশী আবৃত হয়ে পড়ে। সে এমন গভীর নিদ্রায় থাকে যে তার চারপাশে কি হচ্ছে সে তাও বুঝতে পারে না।
৪. সমাধি
হৃদয়ের অভ্যন্তরে চতুর্ভূজ পরমাত্মাকে অনুসন্ধানের জন্য ধ্যান এবং ধ্যানে নিরন্তর তাঁকে দর্শন করাকে সমাধি বলে। অন্য তিনটি স্তর জীবাত্মার জন্য স্বপ্নসদৃশ এবং এতে জীব বিবিধ প্রকার দ্বৈততার সম্মুখীন হয়ে সুখ-দুঃখ ভোগ করে।
সমাধি স্তরে কেউ দেখে মনে করতে পারে উনি ঘুমাচ্ছেন। কিন্তু তার বাহ্যিক কোন চেতনা নেই। উনি যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আসলে উনি ঘুমাচ্ছেন না বরং চেতন। তবে চেতন থাকলেও কোন বাহ্যিক জ্ঞান নেই। কারণ তিনি স্বপ্ন দেখছেন না এবং গভীর নিদ্রাচ্ছন্নও নন। তাঁর চেতনা পরমাত্মার সাথে সংযুক্ত হয়েছে। ভগবানের সাথে আদান-প্রদান, দর্শন এবং তাঁর সাথে ভাব বিনিময় করতে পারেন। প্রত্যেক মুনি-ঋষি যোগাসনে বসে ধ্যানস্থ হতেন। শ্রীল শুকদেব গোস্বামী পরীক্ষিৎ মহারাজের সাথে যে কথা বলছিলেন, তাঁরা সে স্তরে পৌঁছে যেতেন এবং সে রেঞ্জের সাথে সংযুক্ত হতেন, ঠিক যেভাবে আমরা এফ.এম রেডিও শুনে থাকি।
যেমন ৯২.৪ এফ. এম। এই ধরনের অনেক রেঞ্জ আছে। একেকটা রেঞ্জে একেকটা রেডিওতে অনুষ্ঠানাদি শুনছে। যে রেঞ্জে শুনতে চাই সে রেঞ্জের সাথে যুক্ত হতে হয়। চিন্ময় জগতেও লীলা সব সময় চলছে। এগুলো দিব্য লীলা। আমরা শুনতে পারছিনা কারণ আমরা সেখানে যুক্ত হতে পারছি না। কিন্তু এই মুনি-ঋষিরা ছিলেন যোগী যেমন- ব্রহ্মর্ষী, মহর্ষী, রাজর্ষী। তাই তাঁরা সমাধিস্থ হয়ে সে রেঞ্জে শুকদেব গোস্বামী ও পরীক্ষিৎ মহারাজের কথোপকথন শ্রবণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের শিষ্যদের কাছে প্রচার করেছিলেন। ৬০ হাজার মুনি-ঋষি সাউন্ড ও মাইকিং সিস্টেম ছাড়াই এভাবে শুকদেব গোস্বামীর নিকট থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেছিলেন। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে, তখনকার বৈদিক সিস্টেম কতোই না উন্নত ছিল। এখন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আবিষ্কার হয়েছে। যেমন একটি টিভি। কিন্তু টিভি একসাথে ৬০ হাজার মানুষ দেখতে পারে না।
তখনকার দিনে টিভি ছিল না বরং সূক্ষ্ম উপায় ছিল। আমরা দেখতে পাই সঞ্জয় ঘরে বসে আছেন অথচ কুরুক্ষেত্রে কি হচ্ছে তিনি দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু বাহ্যিকভাবে টিলিভিশনের মতো স্ক্রিন ছিল না। সূক্ষ্মভাবে তিনি অন্তরে দর্শন করছেন। তখনকার বৈদিকযুগে টেকনোলজি এতই উন্নত ছিল। বর্তমানে সর্বাধুনিক টেকনোলজি সত্ত্বেও তারা ঐ স্তরে যেতে পারেনি। শ্রীল শুকদেব গোস্বামী ও পরীক্ষিৎ মহারাজ যে পদ্ধতিতে শুনছিলেন সে রকম প্রযুক্তি এখনো কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি। নিম্নে একটি প্রবচনে শ্রীল প্রভুপাদ দিব্য টেলিভিশন সম্বন্ধে বলছেন-

সঞ্জয়ের সূক্ষ্ম টেলিভিশন

শ্রীল প্রভুপাদ লন্ডনে ১৯৭৩ সালে শ্রীমদ্ভগবদ গীতার ১ম অধ্যায়ের ২৪ ও ২৫ নং শ্লোকের উপর প্রবচন দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “সঞ্জয়ঃ উবাচ, সঞ্জয় বললেন। এই সঞ্জয় ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের সচিব। তিনি কুরুক্ষেত্রের সমস্ত ঘটনা ব্যাসদেবের কৃপায় দর্শন করেছিলেন। যেহেতু ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন অন্ধ, সেহেতু সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রের নিকট কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। কিভাবে তিনি একটা রুমের মধ্যে বসে থেকে কুরুক্ষেত্রের ঘটনাবলী ব্যাখ্যা করলেন? সেখানে অবশ্যই টেলিভিশন বা ঐ জাতীয় কোনো একটা পদ্ধতি ছিল। হয়তো তার থেকে উন্নত কোনো পদ্ধতি সেখানে ছিল, যার মাধ্যমে তিনি তাঁর হৃদয়ে সবকিছু দর্শন করতে পেরেছিলেন।
বর্তমান সময়ে আমরা দেখি বিজ্ঞানের উন্নতি অনেক হয়েছে। কিন্তু এখনো বিজ্ঞান জাগতিক স্তরে রয়ে গেছে। ‘জাগতিক’ মানে হয় ‘সূক্ষ্ম জাগতিক’ অথবা ‘স্থূল জাগতিক’। পাঁচটি স্থূল উপাদান(মাটি, বায়ু, অগ্নি, জল ও আকাশ) সবাই দেখতে পাই। কিন্তু মন এবং বুদ্ধি কেউ দেখতে পাই না। যদিও মন ও বুদ্ধি হচ্ছে সূক্ষ্ম উপাদান, কিন্তু সেগুলোকে স্থূল উপাদানগুলোর মতো দেখা যায় না।
টেলিভিশন হচ্ছে একটা মেশিন, যেটি স্থূল উপাদন দিয়ে তৈরি। ‘ভূমিরাপোহনলো বায়ু: খং’ (গীতা-৭/৪) এবং এখনো পর্যন্ত এ ধরনের সূক্ষ্ম মেশিন যা মন ও বুদ্ধি দিয়ে তৈরি, তা এখনো পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এক ধরনের সূক্ষ্ম আবিষ্কার রয়েছে। যেটার মাধ্যমে সঞ্জয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দর্শন করেছিলেন। তা না হলে কিভাবে তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখতে পেলেন? এখনকার মানুষ খুব দাম্ভিক ও অহঙ্কারী হয়ে গেছে। তারা বলছে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে জাগতিক উন্নতি অনেক উচ্চস্তরে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তারা এখনো সূক্ষ্ম স্তরের এমন কোনো আবিষ্কার করতে পারেনি। মন এবং বুদ্ধির ক্ষেত্রে যেভাবে সঞ্জয় করেছিল এধরনের উন্নতি তারা এখনো করতে পারেনি। সমস্ত সূক্ষ্ম স্তরের ঊর্ধ্বে রয়েছে জীবের একটি আধ্যাত্মিক পরিচিতি, যেটা হচ্ছে ‘আত্মা’। সেজন্য আমাদের বৈদিক জ্ঞান সিদ্ধ ও প্রমাণিত। তাই আমাদের এই জ্ঞান গ্রহণ করা এবং পালন করা উচিত।”

কৃষ্ণকথায় পালনীয় ৬টি সদাচার

শ্রীমদ্ভাগবত হল এক অনন্য সাহিত্যকর্ম। এটি পবিত্র জ্ঞানে সমদ্ধ এবং তা আধ্যাত্মিক। ফলে শ্রীমদ্ভাগবত আধ্যাত্মিকতা, দর্শন ও ভক্তিজ্ঞান সমভাবে রাজত্ব করে। এখানে শুকদেব গোস্বামী হলেন আদি বক্তা এবং পরীক্ষিত মহারাজ আদি শ্রোতা। শ্রীমদ্ভাগবতরূপী তাঁদের কথোপকথন শ্রীল সূত গোস্বামীপাদ নৈমিষ্যারণ্য নামক অরণ্যে শৌনকাদি ঋষিদেরকে ব্যক্ত করেন। ঋষিগণ জীবন দর্শন, সৃষ্টির কারণ, পরম সত্য, ভগবান ও অবতার, মানুষের সুখান্বেষণ প্রভৃতি সম্পর্কে এ কার্য সম্পাদন করতে গিয়ে তাঁরা বিগত যুগের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বা ভক্তচরিত্র ও কার্যকলাপ শ্রবণেও অনাগ্রহী ছিলেন না। যদি কোন বিষয় পরমেশ্বর ভগবান বা তাঁর ভক্তদের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সে বিষয়টিকেও তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের সরাসরি লীলার মতোই শ্রদ্ধাসহকারে শ্রবণ করেছিলেন। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে কেবল এরূপ শ্রবণের মাধ্যমে যে কেউ মায়ার অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র হতে পারে। এভাবে ঋষিরা ভগবানের ভক্তদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন এবং পরীক্ষিত মহারাজ, শুকদেব গোস্বামী ও অন্যান্যদের মহিমা কীর্তন করেছিলেন। জিজ্ঞাসা করলে শ্রীল সূত গোস্বামী তাঁর গুরুদেব শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর কাছ থেকে যেভাবে শ্রবণ করেছেন সেই অনুসারে বর্ণনা করেছেন। একজন উপলব্ধিসম্পন্ন অভিজ্ঞ বক্তার নিকট প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও উত্তর লাভ করে তা প্রয়োগ করার বাসনা করার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ হয়।

দিব্যভাব সহকারে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ, একজন যথার্থ চেতনাসম্পন্ন ঐকান্তিক শ্রোতাকে পারমার্থিকভাবে উন্নত করে। উৎসাহ, অকৃত্রিম তত্ত্বানুসন্ধান ও যথার্থ উদ্দেশ্য সম্পন্ন শ্রোতার প্রশ্নে একজন যোগ্য বক্তা বলার উৎসাহ লাভ করেন এবং এর ফলে পরমেশ্বর ভগবানের মহিমামৃত লাভ হয়। এরূপ মূল্যবান আদান-প্রদানের দ্বারা মানব সমাজ জ্ঞানালোক প্রাপ্ত হয়। ঋষিগণ নিম্নোক্ত (১/১৮/১৫) শ্লোকে শ্রীমদ্ভাগতের শ্রোতা ও বক্তার গুণাবলী বর্ণনা করেছেন-

তন্নো ভবান্ বৈ ভগবৎপ্রধানো
মহওমৈকান্ত পরায়নস্য
হরেরুদারং চরিতং বিশুদ্ধং
শুশ্রষতাং নো বিতনোতু বিদ্বন॥

অর্থাৎ, একজন প্রামাণিক বক্তা যিনি শ্রীকৃষ্ণকে মূল প্রেমাম্পদ হিসেবে স্বীকার করেন, তাঁকে ভগবৎপ্রধান বলা হয় এবং যিনি ভগবান সম্পর্কে শ্রবণ করতে ও তা গ্রহণ করতে উৎসুক তাঁকে বলা হয় শুশ্রষতাং।
তাঁদের মধ্যে আলোচ্য বিষয়বস্তুকে বলা হয় হরেরুদারং চরিতং বিশুদ্ধং-অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে উদার ও বিশুদ্ধ বর্ণনা।
নৈমিষারণ্যের ঋষিদের শ্রবণ পিপাসা হতে আমরা শিক্ষা লাভ করতে পারি। শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণকালে যে গুণাবলী তাঁরা প্রদর্শন করেছেন তার কিছু নমুনা নিচে উল্লেখ করা হল:
১) বক্তার প্রতি শ্রদ্ধা
ঋষিরা শ্রীল সূত গোস্বামী স্বাগত জানিয়েছিলেন। তাঁর মহত্ব সম্পর্কে অবগত হয়ে তাঁরা তাঁর নির্মলতা (সৌম্য) ও গুরুবর্গের প্রতি তাঁর বিনয় ও শ্রদ্ধার (স্নিগ্ধতা) প্রশংসা করলেন, যা দ্বারা তিনি সমস্ত শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন (ভা ১/১/৪-৮)। এভাবে, শ্রীল সূত গোস্বামীর মহিমা কীর্তন কালে ঋষিরা এ গুণাবলী প্রদর্শন করেন এবং তাঁর কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেন। শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতে (১/১/২) তাৎপর্যে লিখেছেন, “পারমার্থিক জ্ঞান লাভ করার যথার্থ পন্থা হচ্ছে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে শ্রবণ। উদ্ধত ভাব সম্পন্ন হলে এ অপ্রাকৃত বাণী হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। নিষ্ঠাভরে তা শ্রবণ করাই হচ্ছে এই জ্ঞান আহরণের প্রাথমিক যোগ্যতা।”
কেবল শুষ্ক বুদ্ধি বা পাণ্ডিত্য দিয়ে ভাগবত উপলব্ধি সম্ভর নয় বরং সরলতা ও গুরুর প্রতি বিনীত ভাব থাকলে তা এই মহান সাহিত্যকে উপলদ্ধি করতে সাহায্য করবে। যা শ্রীকৃষ্ণ হতে অভিন্ন।
২) শ্রবণের আগ্রহ
ঋষিরা পরমেশ্বর ভগবানের লীলা ও অবতারদের সম্পর্কে শ্রবণ করতে উৎসুক ছিলেন (শুশ্রুষমাণানাং)। ভগবৎ বর্ণনা ও তাঁর মহিমা শ্রবণের পাবনীশক্তির প্রতি তাঁদের গভীর শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস ছিল (শ্রদ্দধানানাং)। এমন আগ্রহ ও বিশ্বাস নিয়ে তাঁরা মনোযোগ সহাকারে সূত গোস্বামীর বাণী শ্রবণ করেছিলেন এবং আরো প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেছিলেন।
বিভিন্ন লীলা ও দর্শনের বিষয়ে তাঁদের পুঙ্খানুপুঙ্খ জিজ্ঞাসা একজন যোগ্য বক্তার কাছ থেকে যথাযথভাবে তত্ত্বানুসন্ধানের পরিচয় দেয়। এভাবে, তাঁরা বিনীতভাবে সময়োপযোগী প্রশ্নের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে শ্রীল সূত গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করেন। প্রতিদান স্বরূপ; শ্রীল সূত গোস্বামী তাদের শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে শোনার আগ্রহের প্রশংসা করেন। কেননা, কেবল কৃষ্ণকথার মাধ্যমে সকল জীবের হৃদয় সন্তুষ্ট হতে পারে।
শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবত (১/১/৫) তাৎপর্যে লিখেছেন “ভাগবতের শ্রোতারা স্পষ্টভাবে তাঁর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা জন্য বক্তার কাছে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন, তবে তা কখনই উদ্ধত মনোভাব নিয়ে করা উচিত নয়। ভাগবতের বক্তা এবং সেই বিষয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল হয়ে বিনীতভাবে প্রশ্ন করা কর্তব্য।”
৩) আলোচ্য বিষয়বস্তুর প্রতি শ্রদ্ধা
চিন্ময় স্তরের সর্বোচ্চ পর্যায় লাভের উপায় স্বরূপ হরিকথা শ্রবণের প্রক্রিয়ার প্রতি ঋষিদের পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। শৌনক ঋষি ভা: ২/৩/১৭-২০ নং শ্লোকে বলেছেন, “সূর্যদেব প্রতিদিন উদিত ও অস্তগত হয়ে সকলের আয়ু হরণ করেন। কুকুর, শূকর, উট এবং গর্দভের মতো মানুষেরা তাদেরই প্রশংসা করে, যারা সমস্ত অশুভ থেকে উদ্ধারকারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য লীলাসমূহ কখনো শ্রবণ করে না। যে ব্যক্তি ভগবানের শৌর্য এবং অদ্ভূত কার্যকলাপের কথা শ্রবণ করেনি এবং ভগবানের গুণগাথা কীর্তন করেনি, তার কর্ণরন্ধ্র সর্পের গর্তের মতো এবং জিহ্বা ভেকের জিহ্বার মতো।

আয়ুর্হরতি বৈ পুংসামুদ্যিন্নন্তঞ্চ যন্নসৌ।
তস্যতে যৎ ক্ষণো নীত উত্তমশ্লোক বার্তয়া॥

ঋষিরা কোন রোমাঞ্চকর গল্পের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক বিনোদনের অন্বেষণ করছিলেন না অথবা তাঁরা নিছক আরাম কেদারায় বসা তথাকথিত জল্পনা-কল্পনাকারী দার্শনিকও ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন অপাপবিদ্ধ, নির্মলচিত্তের ব্যক্তিবর্গ যাঁরা কেবল পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর ভক্তদের বিষয়ে শ্রদ্ধাপূর্বক শ্রবণ করতে চেয়েছিলেন।
(ভা. ১/১৬/৫-৬)
কিছু দেখা যাচ্ছে না যা একটি তরুণকে শিক্ষা অথবা সাহায্য করছে, যাতে তার এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান হয়। এ ব্যাপারে আমিও ভাবছি। আমাদের সব কিছু আছে।
এখন আপনি বাণীর মাধ্যমে তরুণদের জনগণকে কিছু দিন যাতে তার প্রতি তারা নাছোড়বান্দর মতো লেগে থাকতে পারে এবং যদি তা পারেন তবে সেটা কী?

৪) সকলের প্রতি করুণা
ঋষিরা সমগ্র মানবতা, বিশেষ করে কলিযুগের অধঃপতিত জীবদের প্রতি কৃপাপরায়ণ ছিলেন। এ কারণে তাঁরা পূর্বেই সহস্রবর্ষব্যাপী যজ্ঞানুষ্ঠান করেছিলেন। শ্রীল সূত গোস্বামীকে তাঁরা প্রথমেই জনসাধারনের পরম মঙ্গল কীভাবে সাধিত হয় সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
সমগ্র বৈদিক শাস্ত্র উপলব্ধি করতে কলিযুগের মানুষদের অসার্মথ্য দর্শন করে তাঁরা সমস্ত শাস্ত্রের সারমর্ম সম্পর্কে সূত গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। এ প্রশ্নের উত্তরে সূত গোস্বামী স্বার্থহীনভাবে ঘোষণা করলেন যে কেবল শ্রীকৃষ্ণের প্রতি, অহৈতুকী ও অপ্রতিহতা ভক্তিই সর্বসাধারণের আত্যন্তিক মঙ্গল সাধন করে। এটিই নিখিল শাস্ত্রের সারমর্ম।
ঋষিদের এরকম করুণার প্রশংসা করে শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতের (১/১/৪) তাৎপর্যে লিখেছেন- “আত্মবিস্মৃত মানুষেরা শান্তি এবং সমৃদ্ধি লাভের যথার্থ পন্থা সম্বন্ধে অবগত নয়, কিন্তু ঋষিরা সেই পন্থাটি সম্বন্ধে অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে অবগত এবং তাই সমস্ত মানুষের মঙ্গল সাধনের জন্য তাঁরা সর্বদাই সেই কর্ম করতে উৎকণ্ঠিত থাকেন, যার ফলে জগতে শান্তি স্থাপিত হয়।
তাঁরা সমস্ত জীবের যথার্থ সুহৃদ এবং তাঁদের ব্যক্তিগত অনেক অসুবিধা হলেও তাঁরা সর্বদাই পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় এবং জনসাধারনের মঙ্গল সাধনে যুক্ত থাকেন।”
৫) শ্রবণের সুযোগ লাভে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
শ্রীমদ্ভাগবতের ঐকান্তিক শ্রোতাগণ কখনো মহাত্মাদের কাছ থেকে শ্রবণের সুযোগকে সস্তা ভাবেন না। এরকম দুর্লভ সুযোগকে তাঁরা মূল্য দেন এবং তার জন্য হৃদয় থেকে কৃতজ্ঞ থাকেন। তাঁরা সময়ের মূল্য বোঝেন এবং তাই বাহ্যিক কোন কিছুতে তারা সময় নষ্ট করেন না। ঋষিরা সূত গোস্বামীর নিকট নিম্নোক্তভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।

ত্বং নঃ সংদর্শিতো ধাত্রা দুস্তরং নিস্তিতীর্ষতাম্।
কলিং সত্ত্বহরং পুংসাং কর্ণধার ইবার্নবম্॥

“আমরা মানুষের সদ্গুণ অপহরণকারী কলিকাল-রূপ দুর্লঙ্ঘ সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে ইচ্ছুক। সমুদ্রের পরপারে গমন করতে ইচ্ছুক মানুষের কাছে কর্ণধার সদৃশ আপনাকে বিধাতাই আমাদের কাছে পাঠিয়ে আপনার দর্শন লাভ ঘটিয়েছেন। (শ্রীমদ্ভাগবত ১/১/২২)
৬) শ্রবণে অক্লান্তি
একজন ঐকান্তিক শ্রোতা বারংবার শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেও কখনো বিরক্ত হন না। এ প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “এই জড় জগতের সমস্ত খবর স্থাবর বা নিশ্চল, কিন্তু অপ্রাকৃত সংবাদ গতিশীল, ঠিক যেমন আত্মা গতিশীল আর জড় পদার্থ স্থাবর। যাঁরা অপ্রাকৃত বিষয় হৃদয়ঙ্গম করার স্বাদ পেয়েছেন তাঁরা বারবার সেই বৃত্তান্ত শ্রবণ করেও ক্লান্ত হন না। জড় জাগতিক কার্যকলাপে অচিরেই অতৃপ্তির উদয় হয়, কিন্তু ভগবদ্ভক্তির চিন্ময় সেবায় যুক্ত হলে কখনই যেন তৃপ্তি হয় না।”
শ্রীল সূত গোস্বামীকে সম্বোধন করে ঋষিরা নিম্নোক্তরূপে তাঁদের হৃদয়ের অতৃপ্তির কথা নম্রভাবে ব্যক্ত করেন:

বয়ং তু ন বিতৃপ্যাম উত্তমশ্লোক বিক্রমে।
যচ্ছৃন্বতাং রসজ্ঞানাং স্বাদু স্বাদু পদে পদে॥

“উত্তম শ্লোকের দ্বারা বন্দিত হন যে পরমেশ্বর ভগবান, তাঁর অপ্রাকৃত লীলাকথা যতই আমরা শ্রবণ করি না কেন, আমাদের তৃপ্তি হবে না। যাঁরা তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত হওয়ার অপ্রাকৃত রস আস্বাদন করেছেন তাঁরা নিরন্তর তাঁর লীলাবিলাসের রস আস্বাদন করেন।”(শ্রীমদ্ভাগবত ১/৯/১৯)

পরিশেষে বলা যায়, সমস্ত ভক্তিযোগীর আধ্যাত্মিক জীবনে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। যখন নৈমিষারণ্যের ঋষিদের পদাঙ্ক অনুসরণপূর্বক যথার্থ মনোভাব সহকারে তা শ্রবণ করা হয়, তখন যে কেউ ক্রমশ শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর গুণবৈশিষ্ট্য উপলব্ধির স্তরে নিজের চেতনাকে উন্নীত করতে পারে।

লেখক পরিচিতি: শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী মহারাজের শিষ্য গৌরাঙ্গ দর্শন দাস । তিনি ইস্‌কন গোবর্ধন ইকো ভিলেজ (জিইভি)-এর ভক্তিবেদান্ত বিদ্যাপীঠের ডিন হিসেবে দায়িত্বরত। তিনি ভাগবত সুবোধিনী, চৈতন্য সুবোধিনী ও গীতা সুবোধিনীসহ বিভিন্ন স্টাডি গাইডের প্রণেতা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে পারমার্থিক কোর্সের শিক্ষক। এছাড়া, তিনি জিইভি-এর পূজারী বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক।

মূর্তিমান মাধব দাস শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজের শিষ্য। তিনি ইস্‌কন ইয়ূথ ফোরাম চট্টগ্রামের সিনিয়র যুব-প্রচারক ও কাউন্সিলর। তিনি চাটার্ড একাউন্টিসী অধ্যয়নরত অবস্থায় ইস্‌কনের যোগদান করেন এবং যুব প্রচার সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ ও অন্যান্য উপকরণ ভাষান্তরে ব্রতী হন। বর্তমানে তিনি ভয়েস প্রকাশনার ইন্‌চার্জ ও সম্পাদক এবং মায়াপুর ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করে যুবকদের মধ্যে নিরলসভাবে প্রচার করে চলেছেন।

সূত্র: ব্যাক টু গডহেড ( এপ্রিল – জুন) ২০২০ সালে প্রকাশিত।

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ ও ব্যাক টু গডহেড এর ।। গ্রাহক ও এজেন্ট হতে পারেন

প্রয়োজনে : 01820-133161, 01758-878816, 01838-144699

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here