১৮ বছর পর সেই অদ্ভুত বৃক্ষগুলো !

0
21
জগন্নাথপুরীর সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর মধ্যে একটি হল নবকলেবর উৎসব। এ বছর শ্রীজগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা দেবীর পুরনো বিগ্রহ পরিবর্তন করে নতুন বিগ্রহ তৈরির জন্য কিছু অদ্ভুত বৃক্ষের সন্ধানে যাত্রা করেন জগন্নাথেরই প্রিয় ভক্তবৃন্দরা। যারা ‘পাণ্ডা’ নামে খ্যাত। সেই পবিত্র যাত্রা, বৃক্ষ অনুসন্ধান, নতুন বিগ্রহ নির্মাণ, ব্রহ্ম পরিবর্তন, পুরনো বিগ্রহ সমাধিস্থ অতঃপর বিশেষ নব কলেবর রথযাত্রা উৎসব আয়োজনের কাহিনি নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন।

সর্বানন্দ দাস

সাধারণতঃ প্রতি ১২ বছর অন্তর শ্রীবিগ্রহগণ নবকলেবরে প্রকটিত হন। কিন্তু এই নিয়ম সব সময় ঠিক থাকে না। যে বছর আষাঢ় মাসে দুটি পূর্ণিমা বা পুরুষোত্তম মাসের সঞ্চার হয়, কেবল সেই সময়ই শ্রীনীলাদ্রি মহোদয়ের বিধান অনুযায়ী শ্রীদারুব্রহ্মের নব-কলেবর উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। নব মানে নতুন। কলেবর মানে হলো দেহ। অর্থাৎ পুরাতন বিগ্রহ থেকে ভগবান নতুন বিগ্রহে অধিষ্ঠিত হবেন।
এক্ষেত্রে পুরুষোত্তম মাস হল একটি বিশেষ মাস। বৈষ্ণব পঞ্জিকায় পুরুষোত্তম মাস অতিরিক্ত মাস। চন্দ্র ও সৌর মাসের মিল রাখার জন্য ৩২ মাসে একটি করে মাস বাদ দিতে হয়। সেই মাসের নাম অধিবাস। যে মাসে দুটি অমাবস্যা তিথির আগমন ঘটে তাকেই অধিমাস বলে। স্মার্ত ও পরমার্থ ভেদে বৈদিক শাস্ত্র দুই রকমের। স্মার্ত বিধি কর্মকাণ্ডীয় । পরমার্থ বিধি ভগবদ্ভক্তি সম্বন্ধীয়। বছরে বারো মাসে স্মার্তপন্থীরা সর্ব পুণ্যকর্ম করতে উৎসাহী হন। বর্ণাশ্রমগত সর্ব কর্ম বারো মাসেই অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু অধিমাস বলে যে একটি মাসের উদয় হয় সেই মাসকে তাঁরা কর্মহীন মাস বা মলমাস বলে চিহ্নিত করেন। পরমার্থপন্থীরা এই অধিমাসকে মলমাস বলেন না। অধিকন্তু তাঁদের কাছে এই মাস শ্রেষ্ঠ ও হরিভজন-উপযোগী মাস বলে আখ্যায়িত হয় যা কার্তিক-মাঘ-বৈশাখাদি মহাপুণ্য মাস অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ।
নারদীয় পুরাণে ৩১ অধ্যায়ে অধিমাসের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। অধিমাস নিজের অপমান ও দ্বাদশ মাসের আধিপত্য বিচার করে বহু কষ্টে বৈকুণ্ঠের পতি নারায়ণের সমীপে নিজ দুঃখ জানিয়েছিলেন। বৈকুণ্ঠপতি কৃপা করে অধিমাসকে সঙ্গে নিয়ে গোলোকপতি শ্রীকৃষ্ণের কাছে উপস্থিত হন। অধিমাসের আর্তি শুনে দয়ার্দ্র শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেন, জগতে আমি পুরুষোত্তম রূপে বিখ্যাত। এই অধিমাসও জগতে পুরুষোত্তম মাস রূপে বিখ্যাত হবে। আমার ভক্তরা কখনো কখনো অপরাধ করে থাকে, কিন্তু পুরুষোত্তম মাসে ভক্তদের কখনও অপরাধ হবে না। মহা মূঢ় ব্যক্তিরা এই অধিমাসে নামজপ, দান-ধ্যান, ভক্তি অনুষ্ঠান, পবিত্র জলে স্নান করে না, ভক্তবিদ্বেষী হয়। সেই দুষ্টরা হয় দুর্ভাগা।

শাস্ত্রে নবকলেবর উৎসব

পুরাতন বিগ্রহ থেকে নতুন বিগ্রহে প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে বহু আচার অনুষ্ঠান সম্পাদিত হয়। প্রধান প্রধান পূজাগুলো প্রাচীন তালপাতায় রচিত সংস্কৃত ভাষায় লিখিত শাস্ত্র দ্বারা সম্পাদিত হয়। এই প্রাচীন তালপাতায় লিখিত শাস্ত্রসমূহ মন্দিরেই রাখা হয় এবং কেবলমাত্র প্রধান তিন পূজারীই এই শাস্ত্র পাঠ করতে পারেন। শাস্ত্রসমূহ নিম্নরূপ :
নীলাদ্রি মহোদয়া : নীলাদ্রি মানে নীল পাহাড়
এবং মহোদয়া এর অর্থ হল ‘মহৎ উদয়’। এই শাস্ত্রে সুপ্রাচীন জগন্নাথ মন্দিরের উৎপত্তি সম্পর্কে তথ্য আছে।
রুদ্র যামল : রুদ্র বলতে বোঝায় ভগবান শিবকে এবং যামল বলতে বোঝায় পূজানুষ্ঠানের শাস্ত্রকে। এই শাস্ত্রে বলদেব উপাসনার বিবিধ পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।
তন্ত্র যামল : তন্ত্র মানে আরাধনার গূঢ় পদ্ধতি। এই শাস্ত্রে বিভিন্ন বৈদিক চিত্র অংকনের মাধ্যমে পূজার্চনা পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। মন্দিরে প্রতিদিন পূজার অংশ হিসেবে বিভিন্ন রেখাচিত্র অংকনের মাধ্যমে সেই শক্তিসমূহের আহ্বান করা হয়। এই শাস্ত্রে সুভদা দেবীর আরাধনার পন্থা বর্ণিত হয়েছে।
ব্রহ্ম যামল : এই শাস্ত্রে ভগবান জগন্নাথদেবের পূজার্চনার যাবতীয় বিষয় আলোচিত হয়েছে। এই তালপত্রে লিখিত শাস্ত্রসমূহের উৎপত্তি সম্বন্ধে জানা যায় না।
প্রাচীন সময়কালে শুদ্ধভক্তগণ গভীর ধ্যানমগ্ন অবস্থায় এই শাস্ত্রসমূহ লিখেছিলেন যদিও তারা এই শাস্ত্রসমুহের মূল রচয়িতা নন। এই নবকলেবরের পদ্ধতিসমূহ এই সকল শাস্ত্র থেকে এসেছে যা ধাপে ধাপে এখন বর্ণিত হবে। বর্তমান সময়কালে এই সকল শাস্ত্র এবং নবকলেবর পদ্ধতিসমূহ সাধারণের দৃষ্টিগোচর নয় এমনকি এই বিষয়ে মন্দিরের কোনো পাণ্ডার বাইরের কারো সাথে আলোচনা করার অনুমতি নেই।
যেহেতু নতুন জগন্নাথ বিগ্রহ কাষ্ঠদ্বারা নির্মিত হবে তাই নবকলেবর যাত্রার সময় পূজারীকে প্রথমে সঠিক বৃক্ষের সন্ধান করতে হবে। কোনো সাধারণ বৃক্ষ বিগ্রহ নির্মাণে ব্যবহৃত হবে না। কিছু নির্দিষ্ট অসাধারণ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হলেই সেই বৃক্ষ অনুমোদিত হবে। তালপত্রে লিখিত শাস্ত্র নীলাদ্রি মহোদয়াতে লিখিত আছে যে, এই পবিত্র বৃক্ষ শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গ্রামে প্রতি ১২ বছর পর পরই খুঁজে পাওয়া যাবে। এমনকি প্রতি ১২ বছরের চক্রাকারে আবর্তনের সময় কোন সময়ে কোন গ্রামে সেই বৃক্ষ পাওয়া যাবে তা হাজার হাজার বছর পূর্বেই এই সকল শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে। ধরুন ১৯৯৬ সালের নবকলেবর যাত্রার কথা। সেই বছর যে গ্রামে সেই পবিত্র বৃক্ষগুলো পাওয়া গেছে সেই গ্রামের নাম সেই শাস্ত্রসমূহে বহু পূর্বেই উল্লেখিত আছে। কিন্তু তার সত্যতা প্রতিপাদিত হবে তখন, যখন জগন্নাথের প্রধান পূজারী তথা পাত্তার কাছে স্বপ্নে সেই স্থানের নাম উল্লেখিত হবে। বিগ্রহ খোদাই করার জন্য শুধুমাত্র নিমবৃক্ষই উপযুক্ত। সংস্কৃত ভাষায় এই বৃক্ষকে বলা হয় দারু।
গত ১০০ বছরের মধ্যে নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়েছিল যথাক্রমে-১৮৬৩, ১৮৯৩, ১৯৩১, ১৯৫০, ১৯৬৯, ১৯৭৮ এবং সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর এ বছরের ১৮ জুলাই হল নবকলেবর উৎসবের সেই পবিত্র দিন। ইতোমধ্যে জগন্নাথ পুরীতে এই উৎসবের জন্য সমস্ত আয়োজন সুসম্পন্ন হয়েছে। এমনকি রাজ্য সরকার এ উৎসবকে ঘিরে সব ধরনের সুব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। বার্ষিক রথযাত্রায় লক্ষাধিক ভক্ত উপস্থিত থাকলেও সাধারণত প্রতি নবকলেবর রথযাত্রায় ৫ লক্ষেরও বেশি লোকের সমাগম হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার উদ্ধৃতি মতে, এ বছরের রথযাত্রায় ধারণা করা হচ্ছে ৩০ লক্ষাধিক তীর্থযাত্রী অংশগ্রহণ করবে। যা ভারতে কুম্ভমেলার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোক সমাগম।

অনুসন্ধান যাত্রার সূচনা

প্রভু শ্রী জগন্নাথের নবকলেবর উৎসবের ক্ষন গণনা শুরু হয় একটি অনুসন্ধান দল গঠনের মাধ্যমে। এ দলটি জগন্নাথ পুরীর বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণ করে আকাঙ্ক্ষিত সেই পবিত্র দারুসমূহকে সনাক্ত করে। অনুসন্ধান দলটি গঠিত হয় এভাবে।
পাতি মহাপাত্র পরিবারের একজন সদস্য
২০ জন দয়িতাপতি
১ জন লেংকা
৯ জন মহারনা
১৬ জন ব্রাহ্মণ
৩ জন দেউলাকারনা
৩০ জন পুলিশ অফিসার এবং
২ জন পুলিশ ইন্সপেক্টর
মূলত জগন্নাথের পাণ্ডাদের সুরক্ষার জন্য বা জনগণদের ভীড় সামলানো জন্য পুলিশরা সেবা করে থাকে। তবে মূল কার্যটি সম্পাদন করে জগন্নাথের পাত্তাগণ। উল্লেখ্য, ‘পাণ্ডা’ বলতে জগন্নাথ পুরী মন্দিরের সেবক-সেবিকাদের বোঝানো হয়। এদের আবার বিভিন্ন নাম রয়েছে।
অনুসন্ধান প্রক্রিয়টি শুরু হয় ভগবান শ্রীজগন্নাথদেবের মধ্যাহ্ন ভোজের পরপরই। প্রক্রিয়ার শুরুতে ভগবানের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয় । ১২ ফুট দীর্ঘ ধানবা মাল্য নামে একটি বিশেষ পুষ্পমাল্য এই দিনে ভগবানকে নিবেদন করা হয়।
সেই বিশেষ মাল্যটি পরবর্তীতে পাতি মহাপাত্র পরিবারের সেই সদস্যকে প্রদান করা হয়, যিনি এ অনুসন্ধান যাত্রাটি পরিচালনা করবেন।
তিনি সেই বিশাল পুষ্পমাল্যটি পবিত্র দারুবৃক্ষের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত বহন করতে থাকবেন। যে মুহূর্তে কাঙ্ক্ষি দারুবৃক্ষের সন্ধান পাওয়া যাবে তখন সেই পুষ্পমাল্যটি একটি নারকেলের ওপর রেখে সেই দারুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়। পুষ্পমাল্য ছাড়াও, বিতরেচ্চা মহাপাত্র, দয়িতাপতি ও পাতি মহাপাত্রের উদ্দেশ্যে ভগবানের পোশাক প্রদান করা হয়, তারা তখন শোভাযাত্রার সময় তাদের মস্তকে একটি মুকুটের মতো পরিধান করে। পুষ্পমাল্য ও সেই বস্তু এটি নির্দেশ করে যে, সে অনুসন্ধান দলের সঙ্গে ভগবান স্বয়ং রয়েছেন।
লেংকা পরিবারের প্রতিনিধি ও নয় মহারানাকেও ভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত পত্ত নামে একটি বস্ত্র প্রদান করা হয়। তারা হলেন প্রকৃতপক্ষে জগন্নাথ পুরীর কাষ্ঠ খোদাইকারী। যারা প্রতি বছর নতুন রথ নির্মাণ করে। জগন্নাথের বিগ্রহও তারা তৈরি করেন। মেকাপ পরিবার নামে পাণ্ডাদের পরিবার যখন দারুবৃক্ষের অনুসন্ধানকারী সদস্যদের কপালে চন্দনের ফোটা বা লেপন দেন তখন থেকেই মূলত সেই অনুসন্ধান যাত্রার সূচনা ঘটে।
এ বছর অনুসন্ধানকারী দল যখন তাদের যাত্রা শুরু করল তখন তাদেরকে অনুসরণ করে প্রচুর দর্শনার্থী জড়ো হয়। এ বিষয়ে দলনেতা হালাধর দাস মহাপাত্র বলেন, “আমরা এত বিশাল জনতার ঢল আশা করিনি। ১৯৯৬ সালের যাত্রায় এত বেশি জনতার ঢল ছিল না। তা দেখে এক মুহুর্তের জন্য ভেবেছিলাম এটি রথযাত্রার জনসমাগম নয়তো।” জগন্নাথ মন্দিরে প্রধান অ্যাডমিনিস্ট্রেটর সুরেশ মহাপাত্র জানান, “দয়িতাপতিরা দারু অনুসন্ধানের জন্য ৪০টি স্থান ভ্রমণ করবে।”

প্রথম যাত্রা ও মঙ্গলা দেবীর মন্দির

প্রথম যাত্রাটি হয় পুরীর রাজা গজপতী মহারাজের প্রাসাদের উদ্দেশ্য। সেখানে গিয়ে পবিত্র যাত্রার উদ্দেশ্য তার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয়। সেখানে দু’দিন অবস্থানকালীন ধ্যান ও প্রার্থনার পর, দলটি ককটপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করে। এ ককটপুর গ্রামের পঞ্চাশ মাইল দূরে মাতা মঙ্গলাদেবীর একটি বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। সেই গ্রামে পৌঁছার পর তারা কয়েকদিন সেখানে বিশ্রাম করেন, সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ দয়িতাপতি মন্দিরের ভেতরে নিদ্রা যাপন করেন। তখন মাতা মঙ্গলা দেবী সেই দয়িতাপতিকে স্বপ্নে কোন স্থানে বিগ্রহের দারু আছে তার দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন।
প্রতিটি দারু ভিন্ন ভিন্ন স্থানে থাকে। যেগুলোর অনুসন্ধান লাভ করতে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। এই সময়ে তারা অধিকাংশই মাতা মঙ্গলাদেবীর প্রসাদ আস্বাদন করেন, মাঝে মাঝে পুরী মন্দির থেকেও মহাপ্রসাদ নিয়ে আসা হয়।

দারু সনাক্তকরণ

প্রতিটি দারুবৃক্ষ সনাক্তকরণের জন্য কিছু বিশেষ বিশেষ লক্ষণ রয়েছে। অনুসন্ধান দলের পাণ্ডা সদস্যরা এ সমস্ত লক্ষণসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সনাক্ত করেন।
এর অবশ্যই কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। সেই বৈশিষ্ট্যগুলি হলো- (১) নিম্ন বৃক্ষের কাণ্ডটি সর্বনিম্ন বার ফুট হতে হবে। (২) এতে পবিত্র শঙ্খ, পদ্ম, গদা ও চক্র চিহ্নের যে কোনো দু’টি চিহ্ন থাকবে সেই কাণ্ডে। (৩) বৃক্ষটির রঙ হবে কালো (৪) এর প্রধান শাখা থাকবে চারটি। (৫) বৃক্ষটি থাকবে তিনটি পথের সংযোগস্থলে। (৬) বেলবৃক্ষ ও বরুণবৃক্ষ দ্বারা বৃক্ষটির আশপাশ পরিবেষ্টিত থাকবে। (৭) বৃক্ষটি তিনটি পাহাড়ের মধ্যস্থলে থাকবে। (৮) এর নিকটে কোনো আশ্রম থাকবে। (৯) বৃক্ষটির কাছে উই ঢিবি থাকবে। (১০) সেই বৃক্ষে কোন পাখির বাসা থাকবে না। (১১) কখনও বজ্রপাত হবে না এবং ঝড়ে ডাল পালা ভেঙে যাবে না। (১২) সেই নিম বৃক্ষের কাছাকাছি কোন শ্মশান থাকবে। (১৩) কোনো নদী বা পুষ্করিণীর পাশে থাকবে সেই নিমবৃক্ষটি। (১৪) বৃক্ষের নীচে থাকবে গোখরো সাপের বাসা। এই ১৪টি লক্ষণের মধ্যে অন্ততঃ পাঁচটি লক্ষণ মিলে গেলে তবেই সেই নিমবৃক্ষটি ভগবানের বিগ্রহ নির্মাণের জন্য চূড়ান্ত নির্বাচিত হবে।
১৯৯৬ সালে অর্থাৎ গত নবকলেবর উৎসবের সময় চম্পাঝাড় নামক স্থানে প্রাপ্ত জগন্নাথ দারুর নিন্মোক্ত নিদর্শনসমূহ ছিল:
১. বৃক্ষটির নিকটে একটি শ্মশান ছিল।
২. শঙ্খ ও চক্র এই দুটি নিদর্শন এই বৃক্ষের বাকলে ছিল।
৩. এর পাদদেশে একটি উই ডিবি ছিল।
৪. সেখানে কোনো পাখির বাসা ছিল না।
৫. উই ডিবি থেকে তিনটি কোবড়া বেরিয়ে এসেছিল।
৬. মাটির স্তরে ১১ ফুটের একটি ঘের এবং ১২ ফুট পর্যন্ত বৃক্ষটির শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত ছিল, যা বয়স্ক স্বাস্থ্যবান একটি বৃক্ষ ছিল।
৭. সেখানে কোনো পরজীবি বা লতাগুলা ছিল না।

নতুন বিগ্রহের জন্য দারু কর্তন

দারুবৃক্ষ নির্বাচিত হলে কর্তনের পূর্বে হোমযজ্ঞ সহ কিছু বিধি পালন করা হয়। এরপর দারুবৃক্ষ কর্তন প্রক্রিয়া শুরু হয়। যথাক্রমে স্বর্ণ, রৌপ্য ও লৌহ কুঠার দ্বারা বৃক্ষ কর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সে সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে ভগবানের ১০৮টি নাম জপ কীর্তন করা হয়। এই ১০৮টি নাম হলো পতল নৃসিংহদেবের নাম, যিনি পুরীতে জগন্নাথের আবির্ভাবের পূর্বেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। নৃসিংহদেবের নাম সকল পবিত্র কার্য সম্পাদনের পূর্বে জপ করা হয়, কেননা তিনি ভক্তদের সকল বিঘ্ন নাশ করেন এবং তার নামে সমস্ত কার্যের সফল সমাধান হয়। চার চাকা বিশিষ্ট একটি কাঠের ছোট ঠেলাগড়ি তৈরি করা হয় এবং বৃক্ষের প্রধান অংশটি সেই গাড়িতে করে জগন্নাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। দারুসমূহকে সংস্কার বিধি প্রক্রিয়ায় স্নান করানো হয় এবং যাত্রার পূর্বে রেশমী কাপড় দ্বারা বেষ্ঠিত করা হয়। কথিত আছে, অনাবৃত দর্শন করার অনুমোদন নেই কারণ ঐ অবস্থায় দারু দর্শন করা মহাপাপ। দারু যখন এভাবে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় তখন গ্রামবাসীরা শোভা যাত্রা দর্শনের জন্য অধিক আগ্রহে পথিমধ্যে প্রতীক্ষা করে থাকে। যথাক্রমে সুদর্শন দারু, বলদেব, সুভদ্রা এবং সর্বশেষ প্রভু জগন্নাথের দারু পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুরী শহরের প্রবেশদ্বারে আলাম চান্দি মন্দির নামে একটি মন্দির রয়েছে। পুরী অভিমুখে সেই গাড়িটি গমন করার সময় এই মন্দিরের সামনে দিয়ে গমন করতে হয়। এটি বিশ্বাস করা হয় যে, আলাম চান্দি এ দারুসমূহের শোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যাতে করে বিগ্রহ তৈরির সময় কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা না আসে। প্রথা অনুসারে আলাম চান্দি বিগ্রহের কাছ থেকে আজ্ঞামালা লাভ করার পর দারুসম্বলিত ঠেলাগাড়ি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করে। বিগ্রহের স্নান উৎসবের (দেবাস্নান পূর্ণিমা) নির্দিষ্ট তারিখের পূর্বে উত্তর দ্বার দিয়ে পুরী মন্দিরে প্রবেশ করে। দারুসমূহকে মন্দিরে উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত কলি বৈকুণ্ঠ নামক স্থানে রাখা হয়। এটি সেই স্থান যেখানে পুরোনো জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা রাণী বিগ্রহের সমাধি দেওয়া হয়। স্নান পূর্ণিমার সময় স্নান মণ্ডপে যখন পুরনো বিগ্রহসমূহের স্নান উৎসব অনুষ্ঠিত হয় তখন একই দিনে দারুসমূহকেও স্নান করানো হয়। স্নান পূর্ণিমার পরবর্তী দিবসে পূর্ব নির্ধারিত পন্থা অনুসরণের মাধ্যমে, পাতি মহাপাত্র কর্তৃক বিশেষ পূজা নিবেদনের পর অবশেষে দারুসমূহকে নির্মাণ মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়।

নতুন বিগ্রহ খোঁদাই

স্নান উৎসবের পরদিন থেকেই বিগ্রহ তৈরি প্রক্রিয়া শুরু হয়। যে সমস্ত সুদক্ষ ভাস্কর শিল্পীরা এটি সম্পাদন করেন তাদেরকে গুপ্তভাবে বিশ্বকর্মা নামে ডাকা হয়, তাদেরকে দয়িতাপতিদের কঠোর পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। ভগবান জগন্নাথের বিগ্রহ খোদাইয়ের জন্য তিনজন সর্বোচ্চ বয়োজ্যেষ্ঠ বিশ্বকর্মাই হবেন প্রধান ভাস্করশিল্পী। বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ খোদাইয়ের জন্য দুটি দল থাকে এবং প্রতি দলে তিনজন ভাস্করশিল্পী থাকেন। প্রধান ভাষ্করশিল্পীদের সহায়তা করার জন্য ৫০ জনের বেশি ভাষ্করশিল্পী সেখানে অবস্থান করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সুসম্পন্ন হয় অত্যন্ত গোপনীয়তার মাধ্যমে এবং তখন ঐ স্থানে মন্দিরের প্রধান পূজারীরও প্রবেশ অননুমোদিত। বিগ্রহ নির্মিত স্থল খোলা আকাশের নীচে হলেও চারদিকে নিরাপত্তা প্রাচীর থাকে। খোঁদাইশিল্পীরা ঐ বেষ্টনীর ভেতর কোনো খাদ্য গ্রহণ করেন না এবং নির্দিষ্ট ২১ দিনের মধ্যে তারা মন্দির প্রাঙ্গন সাধারণত ত্যাগ করেন না। প্রসাদ আস্বাদন ও নিদ্রা যাপন মন্দির প্রাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে। ঐ ২১ দিনের সময় কলি বৈকুণ্ঠের বাইরে সর্বক্ষণ চলতে থাকে ভক্তিমূলক সংগীত। এটিকে ‘অখণ্ড ভজন’ বলা হয়। এটি করে থাকেন দেবদাসী ও মন্দিরের সুরক্ষকরা। ঐ সময় ব্রাহ্মণ পূজারীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে শাস্ত্র থেকে শ্লোক আবৃত্তি করেন।

বিগ্রহের ব্রহ্ম স্থানান্তরের প্রক্রিয়া

নতুন বিগ্রহ তৈরি যখন সুসম্পন্ন হয় তখন সেগুলোকে মন্দিরের অন্তর্দেশে নিয়ে পুরাতন বিগ্রহের সম্মুখে মুখোমুখি স্থাপন করা হয়। এই প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে করা হয়, তখন ভগবানকে দর্শনের জন্য মন্দিরে পূজারীরাও ভিতরে প্রবেশ করেন না। শুধুমাত্র দয়িতাপতি পরিবারের বংশধররাই নতুন বিগ্রহদের মন্দির অভ্যন্তরে প্রবেশ করান। একবার বিগ্রহগণ ভিতরে ঢুকলে, শুধুমাত্র তিনজন জ্যেষ্ঠ দয়িতাপতি সেখানে অবস্থান করতে পারেন। ঐ সময় কোনো পূজা বা ভোগ নিবেদন হয় না।
বিগ্রহগনের মধ্যে জগন্নাথের বিগ্রহের উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং তাঁর বাহুযুগল ১২ ফুট দীর্ঘ। ভারী ওজন সমৃদ্ধ বাহু বহন করার জন্য ৫ জন দায়িত্বে থাকেন, ২০ জন তার পেছনে এবং সামনে ৫০ জনেরও বেশি সেবক থাকে তাঁকে উত্তোলন করে টানার জন্য।
বলভদ্রের উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং তার বাহুগুলো ১২ ফুট। সুভদ্রা দেবীর উচ্চতা ৫ ফুটেরও কম । সুদর্শনের উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি। বিগ্রহের ব্রহ্ম স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি সেবা করে থাকেন দয়িতাপতিরা। কেননা তাদেরকেই সেই দয়িতাপতির বংশধর বলে বিবেচনা করা হয়, যিনি ভগবান জগন্নাথদেবকে প্রথম পূজা করেছিলেন। এই প্রক্রিয়াটি অনুষ্ঠিত হয় মহারথ যাত্রার তিন দিন পূর্বে। পুরাতন বিগ্রহ থেকে ব্রহ্ম নতুন বিগ্রহে স্থানান্তরিত হলেই পুরো কার্যটি সুসম্পন্ন হয়। সর্বপ্রথমে পাণ্ডারা জগন্নাথের আরাধনা করেন। যাতে তারা পুরনো জগন্নাথ বিগ্রহে অবস্থিত ব্রহ্মপিণ্ডকে নতুন বিগ্রহে প্রতিস্থাপিত করতে পারেন। উল্লেখ্য, ব্রহ্ম হলো এক মূল্যবান শালগ্রাম শিলা। যা শ্রীজগন্নাথের দারুবিগ্রহের মধ্যে লুকানো অবস্থায় থাকে। এই পবিত্র শালগ্রাম শিলা পুরনো বিগ্রহ থেকে বের করে নতুন বিগ্রহে স্থানান্তরিত করা হয়। এক্ষেত্রে দয়িতাপতিদের জন্য কিছু বিধিবদ্ধ নিয়ম রয়েছে। সেগুলো হলো:
১. তিনজন দয়িতাপতির চোখ আচ্ছাদিত করা হবে।
২. স্থানান্তর শুরু হওয়ার পূর্বেই তাদের হস্তযুগলে ভগবান জগন্নাথের বস্ত্রের একটি টুকরো দ্বারা বন্ধন করা হবে।
৩. শোভাযাত্রার প্রথম দিন থেকেই তারা ক্ষৌরকর্ম করবেন না।
স্থানান্তর দিবসের দিন সমস্ত দয়িতাপতি পরিবারের সদস্যরা নতুন বস্ত্র পরিধান করেন। এই সংস্কার বিধি জগন্নাথ মন্দিরের অন্য সব সংস্কার বিধির মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ঐ দিন মন্দিরের ভিতর তিন দয়িতাপতি সদস্যরা উপবাস রেখে সারাদিন ভগবৎভাবনায় নিয়োজিত থাকেন। মধ্যরাতের পর পিনপতন নীরবতার মাঝে ব্রহ্ম স্থানান্তর সম্পন্ন হয়। এ প্রসঙ্গে একজন দয়িতাপতি বলেন, “সে ব্রহ্মটি কি তা বর্ণনা করা কঠিন। এটি অদর্শনীয় এবং সাধারণের অস্পৃশ্য। এই সময় আমাদের চোখ কাপড় দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে এবং এটিকে বহন করার সময় আমাদের হাত কাপড় দ্বারা জড়ানো থাকে। তা সত্ত্বেও একটি শক্তিশালী শক্তির অবস্থান আমরা অনুভব করতে পারি।”
মধ্যরাতে দয়িতাপতিরা কাঁধে করে পুরানো বিগ্রহদের নিয়ে আসেন কলি বৈকুণ্ঠতে এবং প্রত্যুষের পূর্বেই তাদেরকে সে স্থানে সমাধিস্থ করা হয়। প্রতিটি বিগ্রহের জন্য পৃথক সমাধিস্থল রয়েছে, কিন্তু পূর্বে যে স্থলে জগন্নাথকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল সেই একই স্থানেই বর্তমান জগন্নাথকে সমাধিস্থ করা হয়। এটি প্রচলিত যে, এই নির্দিষ্ট দল ব্যতিত বাইরে থেকে কোনোভাবে যদি কেউ এই প্রক্রিয়াটি দর্শন করে তবে তার মৃত্যু অবধারিত। এজন্যে ওড়িষ্যা সরকার ঐ রাতে নির্দিষ্ট স্থানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। দ্বিতীয় দিবসে সকালে নতুন বিগ্রহসমূহ রত্নসিংহাসনে উপবিষ্ট হন। এই দিন থেকে অবশেষে মন্দিরের প্রাত্যহিক সেবা কার্য পুনরায় শুরু হয়। বিগ্রহদের সুগন্ধযুক্ত পুষ্পমাল্য, নতুন বস্ত্র ও ভোগ নিবেদন করা হয় এবং পূজাকার্য সম্পন্ন করা হয়। ভক্তরা পুণরায় ভগবানকে দর্শনের জন্য ভিতরে আসতে পারেন এবং তৃতীয় দিবসে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রথযাত্রা উৎসবের জন্য নতুন বিগ্রহদের মন্দির থেকে বাইরে জনসমক্ষে নিয়ে আসা হয়।

নবকলেবর উৎসব ২০১৫
এ বছর নবকলেবর উৎসবের জন্য পূর্বেই কর্মসূচী নির্ধারিত হয়। সে কর্মসূচীর একটি তালিকা নিন্মে প্রদর্শন করা হল।
তারিখ – কর্মসূচী
২৯ মার্চ ২০১৫ – দারুবৃক্ষ অনুসন্ধানের জন্য যাত্রার সূচনা
৩০ মার্চ ২০১৫ – মধ্য রাতে দেউলী মঠের উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান দলের যাত্রা
২ এপ্রিল ২০১৫ – দেউলী মঠে রাত্রী যাপন
৩ এপ্রিল ২০১৫ – ককটপুর মঙ্গলাতে পূজা
৪ এপ্রিল ১৫-১৭ মে – দারু অনুসন্ধান
২ জুন ২০১৫ – দেব স্নান পূর্ণিমা
৫ জুন ২০১৫ – নতুন বিগ্রহ তৈরি ও যজ্ঞ প্রক্রিয়ার শুরু
১৫ জুন ২০১৫ – মধ্যরাতে ব্রহ্ম স্থানান্তর
১৭ জুলাই ২০১৫ – নবযৌবন দর্শন
১৮ জুলাই ২০১৫ – রথযাত্রা
২২ জুলাই ২০১৫ – হেরা পঞ্চমী
২৬ জুলাই ২০১৫ – বাহুড়া যাত্রা
২৭ জুলাই ২০১৫ – সোনাবেশ

প্রথম দারুব্রহ্মের প্রকাশ

হাজার হাজার বছর পূর্বে শ্রীবিষ্ণুর এক পরম ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ভগবান জগন্নাথের বিগ্রহ প্রকটের উদ্দেশ্যে গভীর প্রতীক্ষায় দিনাতিপাত করছিলেন। প্রতীক্ষা করতে করতে একসময় তার ধৈর্য হতাশায় পর্যবসিত হল। তার জীবন নিরর্থক বিবেচনা করে অনশনে প্রাণ ত্যাগের সংকল্প করলেন। তখন শ্রীজগন্নাথ তাঁর নিকট স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “প্রিয় রাজন, উৎকণ্ঠা ত্যাগ কর; আগামী কাল আমি দারুব্রহ্মরূপে বাইকিমুহান নামক স্থানে সমুদ্রতীরে ভেসে আসব।” পরদিন আনন্দোল্লাসমুখর কীর্তন সহযোগে মহোদধি সমুদ্রের তট হতে দারুব্রহ্মকে জলে বিধৌত করা হল এবং একটি স্বর্ণরথে করে প্রাসাদে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের নিকট আনয়ন করা হল। তিনি ঐ দারু (কাষ্ঠ) হতে মূর্তি নির্মাণ করার জন্য অনেক ভাস্করকে ডাকলেন, কিন্তু তাঁদের কেউই ঐ দারু খোদাই করতে সমর্থ হল না; তাদের ছেনি দারু স্পর্শ মাত্র টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল। তারপর একজন শিল্পী নিজেকে অনন্ত মহারাণা রূপে পরিচয় দিয়ে রাজার নিকট বিগ্রহ খোদাইয়ের অনুমতি চাইলেন। অনেকের মতে এই মূর্তিশিল্পী, অনন্ত মহারাণা ছিলেন, ভগবান স্বয়ং; অন্য অনেকে বলেন যে দেবলোকের স্থপতি বিশ্বকর্মাই ভগবানের সেবা করার জন্য এসেছিলেন। তিনি শর্ত দিলেন যে বিগ্রহ নির্মাণের জন্য তাঁকে একুশ দিন সময় দিতে হবে, এজন্য তাঁকে কক্ষে একাকী রেখে কক্ষতার বন্ধ রাখতে হবে – একুশ দিনের মধ্যে ঐ ঘরে কেউই প্রবেশ করতে পারবে না। মূর্তি-নির্মাণ শুরু হল; প্রতিদিন রাজা মন্দির-কক্ষের দরজার সামনে দিয়ে ব্যাকুল প্রত্যাশা নিয়ে পদচারণা করতেন। কিন্তু চতুর্দশ দিনে তাঁর আশা উৎকণ্ঠায় পর্যবসিত হল, কেননা তিনি ঐ শিল্পীর যন্ত্রপাতির শব্দ আর শুনতে পেলেন না। তাঁর মন্ত্রীরা তাঁকে বার বার নিষেধ করলেও ব্যাকুলচিত্ত রাজা যারের তালা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকলেন। কিন্তু সেখানে কোথাও ঐ শিল্পী ভাস্করকে দেখা গেল না! রাজা দেখলেন, দারুব্রহ্ম হতে তিন বিগ্রহ প্রকটিত হয়েছেন জগন্নাথ, সুভদ্রা, এবং বলদেব। আরো কাছাকাছি গিয়ে রাজা লক্ষ্য করলেন যে বিগ্রহসমূহের হস্ত-পদ অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে।
“ওঁ, হায়! আমি এ কি করলাম।” রাজা তীব্র অনুশোচনা করতে লাগলেন, “আমি কেন এত অধৈর্য হয়ে | পড়লাম! এখনো বিগ্রহ-সমূহের নির্মাণকার্য অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, মূর্তি শিল্পীও অন্তর্হিত হয়েছেন। আমি একজন মহা অপরাধী। এইভাবে অনুতাপে দগ্ধ হয়ে রাজা আবারও অনশনে প্রাণত্যাগের সঙ্কল্প করলেন। রাত্রির প্রথমার্ধ্ব অতিবাহিত হলে শ্রীজগন্নাথ স্বপ্নে রাজার কাছে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “আমি এই জড়জগতে আমার ধাম-সহ চব্বিশ-মূর্তিতে অবতীর্ণ হই। আমার কোনো জড় হস্ত-পদ নেই, কিন্তু আমার অপ্রাকৃত ইন্দ্রীয় দ্বারা আমার সেবার্থে আমার ভক্ত-প্রদত্ত সমস্ত দ্রব্য গ্রহণ করে থাকি এবং জগতের মঙ্গলের জন্য আমি এক স্থান হতে অন্য স্থানে গমন করে থাকি। তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছ, কিন্তু সেটি এই জগতে আমার এই বিশেষ জগন্নাথ রূপ প্রকটিত করার লীলার একটি অংশ মাত্র, যার দ্বারা বেদের এই উক্তির সত্যতা প্রতিপালিত হয় যে, তাঁর পদ না থাকলেও তিনি গমন করেন,’ এবং হাত ছাড়াও তিনি আহার করতে পারেন। কিন্তু আমি এই রূপে প্রকটিত হলেও, যাঁরা আমার ভক্ত, তাঁরা আমাকে মুরলীধর শ্যামসুন্দর রূপেই দর্শন করবে। অবশ্য যদি তোমার আমাকে ঐশ্বর্য-আড়ম্বর সহকারে আরাধনা করার অভিলাষ হয়ে থাকে, তাহলে কখনো কখনো তুমি আমাকে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত হস্ত পদাদি দ্বারা শোভিত করতে পারো। অবশ্য তুমি নিশ্চিত জানবে যে, আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সকল রত্নাভরণের শোভা স্বরূপ।”


এ বছরের অনুসন্ধান দলে বিশ্ববসুর ভূমিকা পালন করেন বিনায়ক দাস। বিশ্ববসু ছিলেন উপজাতিদের রাজা যিনি জগন্নাথের প্রথম ভক্ত ছিলেন। বিদ্যাপতি বিশ্ববসুর কন্যাকে বিবাহ করে যিনিও জগন্নাথের ভক্ত ছিলেন। তারা ৩০ মার্চ ককটপুরের দেউলী মঠের উদ্দেশ্যে মধ্যরাতে যাত্রা শুরু করেন। সেখানে মাতা মঙ্গলা দেবী থেকে দারু অনুসন্ধান সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা লাভের পর দারু সন্ধানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
এ বছর অনুসন্ধান দল প্রাথমিকভাবে ১০০টি নিম বৃক্ষ (দারু) চিহ্নিত করেছিল এবং তন্মধ্যে বিশেষভাবে ৮টি নিমবৃক্ষ অনুমোদিত হয়। এবারের দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন দালাপতি (দলনেতা) পতি মহাপাত্র, বড়প্রাহিবৃন্দ এবং জ্যেষ্ঠ দয়িতাবৃন্দ ।
এ বছর সুদর্শন দারুর সন্ধান মেলে গড়াকুগুনিয়া নামক এক গ্রামে। প্রভু সুদর্শনের দারুতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম চিহ্ন প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও বৃক্ষটিকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সর্পের উপস্থিতি দৃশ্যমান ছিল। সোমনাথ বেহারা নামক ঐ গ্রামের স্থানীয় সেবায়েত ১৯৯৯ সাল থেকে এই বৃক্ষটির পূজা করে আসছিলেন। তিনি যখন এই গ্রামে প্রথম আসেন তখন থেকেই তিনি অনুভব করেছিলেন যে, এই বৃক্ষটি ভগবানের হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি যখন প্রথম এই গ্রামে আসি এই স্থানে এই বৃক্ষটি ছাড়া কিছুই ছিল না। ১৯৯৯ সালের সেই ঘূর্ণিঝড়ের সময় এই বিশাল বৃক্ষের একটি শাখাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি।” এটি বলতে বলতে তাঁর অশ্রুপাত হচ্ছিল।
বৃক্ষটির পাশে নদী ও পাদদেশে একটি উইডিবি এবং পার্শ্বে একটি শ্মশান ছিল। তাছাড়া ঐ স্থানেই একটি শিব মন্দিরের নিকটেই বিখ্যাত চৌসতী যোগিনী মন্দির ছিল। এ সমস্ত নিদর্শন থেকে সনাক্ত করা হয় এটিই সুদর্শনের দারু। দারু সনাক্তকরণের পর ‘অঙ্কুরারোপন ও যজ্ঞ সম্পাদিত হয়। এ সময় চারপাশে ভক্তরা ভীড় করে। বেহেরা জানান “আমরা জেলা কর্মকর্তাদের কাছে জানাই দারু সংগ্রহের পর উক্ত স্থানে আরেকটি নিম বৃক্ষ রোপণের জন্য এবং সে সাথে একটি মন্দির নির্মাণের জন্য। উক্ত দারু সংগ্রহের পর অবশিষ্ট শাখা-প্রশাখা ঐ একই স্থানে মাঠিতে পুঁতে ফেলা হয় ।

বলভদ্র দারু

সুদর্শন দারু সনাক্তকরণের এক সপ্তাহ পর জগৎসিংহপুর জেলার ঝানকাড়া স্থানে বিমলা দেবীর মন্দিরের সম্মুখে প্রভু বলদেবের দারুর সন্ধান মেলে। ১৯৯৬ সালে নবকলেবরের সময় এই বৃক্ষটি সংক্ষিপ্ত তালিকার মধ্যে ছিল। বৃক্ষটির বয়স ১৫০ বছর এবং এর ওপরে ছিল শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম চিহ্ন।

সুভদ্রা দেবীর দারু

সুভদ্রা দেবীর দারু সনাক্ত করা হয় জগৎসিংপুর জেলার অধনগাগাড়া গ্রামে। এই স্থানে অবস্থিত নীলকাণ্ডেশ্বর মন্দিরের নিকটে দারুর সন্ধান মেলে।

জগন্নাথ দারুর সন্ধান

জগন্নাথের দারুর সন্ধান মেলে জগৎসিংপুর জেলার রঘুনাথপুরের খারিয়পাড়িয়ার নিকটে। দু’ সপ্তাহ পূর্ব থেকে যখন পাত্তাগণ পুনঃ পুনঃ ভ্রমণ করে তখন থেকেই স্থানীয়রা এই দারুটির উদ্দেশ্যে পূজা নিবেদন শুরু করে। বৃক্ষটি কর্তনের পর অবশিষ্ট অংশবিশেষ ঐ একই স্থানে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়।
নিম বৃক্ষটি পায়কা নদীর তীরের ওপর অবস্থিত এবং নিকটেই একটি শ্মশান রয়েছে। বৃক্ষটির নিকটে একটি উইয়ের ঢিবি ছিল। দাসমহাপাত্র বলেন, “বৃক্ষটির ওপর শঙ্খ, চক্র, পদ্ম, গদা চিহ্ন ছিল। এগুলোর বাইরেও এর ওপর একটি সুস্পষ্ট হাতির মস্তক চিহ্ন রয়েছে। অনুসন্ধানকারী দল অর্থাৎ বনযাগীরা ছয়বার এটি পরিদর্শন করে সমস্ত পবিত্র চিহ্নসমূহ পর্যবেক্ষন করেন। বৃক্ষটির প্রধান কাণ্ডের ওপর চারটি শাখা রয়েছে।
খাড়িপাড়িয়া গ্রামের প্রধান বলেন যে, গ্রামবাসীরা বৃক্ষটির আশেপাশে দুটি সর্প ও একটি সাদা পেঁচাও বসে থাকতে দেখেছিলেন। বিষয়টি জগন্নাথের এক সেবকও স্বীকার করেন। উল্লেখ্য, পেঁচা হল লক্ষ্মীদেবীর বাহন। জগন্নাথ দারুর রং ছিল কৃষ্ণবর্ণ যা শ্রীজগন্নাথের শ্রীঅঙ্গের বর্ণকে নির্দেশ করে।
১৯৯৬ সালে, বলভদ্রের কাট্টাক জেলার সালেপুরে, জগন্নাথ দারু কুর্দার দধিমাচ্চাগড়িয়াতে, সুভদ্রা দেবীর দারু পুরী জেলার মালদাতে, সুদর্শন দারু কাট্টাক জেলার নিয়ালিতে সন্ধান মেলে।

সূত্র : * শ্রী জগন্নাথ টেম্পল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (SJTA)
পোস্ট নিউজ নেটওয়ার্ক, www.orissapost.com www.eodisha.org, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ফোকাস উড়িষ্যা চ্যানেল ও নিউজ ফোর ইউ


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here