১৪ বার প্রদক্ষিণে যে ব্যক্তির বিশ্বজয়

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৩ | ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৫ এপ্রিল ২০২৩ | ১২:৫২ অপরাহ্ণ

এই পোস্টটি 136 বার দেখা হয়েছে

১৪ বার প্রদক্ষিণে যে ব্যক্তির বিশ্বজয়

ভারতের অনুপম পারমার্থিক জ্ঞানভাণ্ডার সম্পর্কে বিশ্বের সবচেয়ে মহান আধুনিক ব্যাখ্যাকারকের জীবন বৃত্তান্ত।

চৈতন্য চরণ দাস


সেই ব্যক্তিটি

“এটি একটি আশ্চর্যকর কাহিনি, আপনাকে কেউ যদি এরকম কাহিনি শোনায়, তবে তা আপনি বিশ্বান করবেন না। এমন একজন ব্যক্তি যার বয়স সত্তর বছর, আর তিনি এমন একটি দেশে যাচ্ছেন যেখানে কেউ তাকে চেনেয় না, তিনি ও কাউকে চেনেন না, তার নেই কোনো অর্থ, নেই কোনো যোগাযোগ মাধ্যম, কোনো কিছুতে সফল হওয়ার জন্য বলার মতো কোনো কিছুই ছিল না। তিনি যেভাবে লোকেদের নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন তার পদ্ধতিগত কোনো ভিত্তিই নেই, বরং তিনি যাকে পেয়েছেন তাকে তুলে নিতে যাচ্ছেন। আবার তাদেরকেই তিনি বিশ্বব্যাপী প্রচারের গুরুদায়িত্ব অর্পন করতে যাচ্ছেন। আপনি হয়তো বলবেন “ এ কি ধরনের কর্মসূচী” সম্ভবত এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে রয়েছে। নাজারেতের যীশু চারদিকে সবাইকে বলেছিলেন, “এসো, আমাকে অনুসরণ কর। জাল ফেলা বা কর সংগ্রহ ছাড় এবং আমার সাথে এসে ও আমার শিষ্য হও।” কিন্তু সেক্ষেত্রে তিনি একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন না, যেখানে তাকে একটি অদ্ভুত সমাজে তার চেয়ে ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকদের সাথে তাঁর কার্যকলাপ প্রদর্শন করতে। তিনি তাঁর নিজ সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করছিলেন, ভক্তিবেদান্ত স্বামীর অর্জন তাই অবশ্যই অদ্বিতীয় হিসেবে দর্শন করতে হবে।” (অধ্যাপক তমাস হপকিনস্‌, হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ। পশ্চিমা বিশ্বের কৃষ্ণভাবনা আন্দোলনের ক্ষেত্রে পাঁচজন বিশিষ্ট স্কলার্স)

যে আন্দোলন

“আবার একটু ভাবুন, যদি মনে করেন বলিউড কিংবা ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় লেখালেখি দেশের ভারতের) সবচেয়ে বৃহৎ সংস্কৃতি রপ্তানি, তবে আপনার সেই ধারণা এই ধারে কাছেই থাকবে না যদি আপনি বলিয়ার কোচামাম্বা কিংবা বেটিস্বানার গ্যাবোরোন পরিদর্শন করেন; সেখানে এগুলোর পরিবর্তে দেখবেন আন্তজার্তিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন) কেন্দ্র। (দ্যা টাইমস্‌ অব ইন্ডিয়া, সম্পাদকীয়, ৬ জানুয়ারি, ২০০৬)
প্রত্যেকের জীবনের কিছু বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে এবং যে সমস্ত মহাত্মা লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণীত করেছেন তাদের জীবনে এমন সব মুহূর্ত আরো অধিক তাৎপর্যপূর্ণ।

১৮৯৬ : জন্ম
১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৬ সালে কলকাতায় নন্দোৎসবের দিন তিনি আবির্ভূত হন। আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিতা নন্দমহারাজ পূর্ব মধ্যরাতে জন্য নেওয়া পুত্রের আবির্ভাব উদ্‌যাপন করেছিলেন। ঐ বিশেষ দিবসে প্রভুপাদের আবির্ভাবও তাই তাৎপর্য বহন করে: যেরকমভাবে সেই দিবসটি (নন্দোৎসব) ভক্তিমূলক উদ্‌যাপন হিসেবে চিহ্নিত, তেমনি তিনিও সারাবিশ্বে ভক্তিমূলক উদ্‌যাপন নিয়ে আসেন। তিনি একটি ভক্ত পরিবারে আবির্ভূত হন। পিতা গৌর মোহন দে ও মাতা রজনী দেবী তার নাম দেন অভয় চরণ।
বাল্যকালের অনেকগুলো স্মৃতির মধ্যে অন্যতম ছিল, পূজার্চনার সময় ঘণ্টা বাজার শব্দ শুনে নিদ্রা থেকে জেগে উঠা এবং বাল্যবয়সেই দঙ্গ ও করতাল শেখা। তখন তিনি এত ছোট ছিলেন যে, মৃদঙ্গ বাজানোর জন্য দুই হাত মৃদঙ্গের শেষ প্রান্তেই যেত না, সেরকম বয়সে তিনি এ শিক্ষা লাভ করতে থাকেন। তখন কেইবা বুঝতে পেরেছিল যে, এই বালকটিই মৃদঙ্গ বাজিয়ে বিশ্বের মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
১৯০১ : শৈশবে রথযাত্রা

খেলাধুলার বয়সে ছোট ছেলেমেয়েরা প্রায়ই বড়দের অনুকরণ করে থাকে এবং ছোট অভয়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবে তাঁর সেই অনুকরণ ছিল বিশেষ অনুকরণ নিজ গৃহের নিকটে রাস্তায় রথযাত্রা আয়োজন করা। সঠিক আকৃতির রথ নির্মাণ থেকে শুরু করে মৃদঙ্গ বাজিয়ে শোভা যাত্রা নেতৃত্ব দেওয়া ও পরিচালনা করার মাধ্যমে তিনি ভগবানের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন। করেন। যে রথযাত্রা জগন্নাথ পুরীতে লক্ষ লক্ষ লোককে আকর্ষণ করে। শৈশবে তাঁর এ কার্যকলাপ তাৎপর্য বহন করে যে, তিনি ভবিষ্যতে কি করতে যাচ্ছেন : সেটি হল সারাবিশ্বে রথযাত্রা আয়োজন করা।

১৯২২: গুরুদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ

অভয় এখন একজন সুশিক্ষিত, স্পষ্টবাদী যুবক। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি বৃটিশ সরকারের শোষণের বিরুদ্ধে গান্ধিজির আন্দোলনে যোগদান করেন। এই অসহযোগিতা প্রকাশের জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিবাদ স্বরূপ তিনি ম্যানচেষ্টারের কারখানা থেকে আগত প্রচলিত বস্ত্র বর্জন করে স্থানীয় হাতে বুনা রেশমী খাদি পোশাক বেছে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় বিশ্বখ্যাত স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে প্রাপ্ত এ্যাজুয়েশন ডিগ্রিও তিনি প্রত্যাখান করেছিলেন। ১৯২২ সালে তাৎপর্যপূর্ণ এক সাক্ষাতে তাঁর সেই প্রবল উদ্দীপনা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে পারমার্থিক প্রেক্ষাপটে রূপান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে পারমার্থিকতায় পর্যবসিত হয়। সেই সাক্ষাৎটি ছিল একজন সাধুর সঙ্গে যিনি পরবর্তীতে তাঁর গুরুদের হয়েছিলেন। তিনি হলেন ৬৪টি গৌড়িয় মঠের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর, যিনি কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য নিবেদিত ছিলেন। অভয় জীবনে অনেক সাধুকে দেখেছিলেন, যারা সমাজে পরজীবির ন্যায় বাস করে। তাই সেই সাধুকে আর সবার মতো মনে করে তিনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। শুধুমাত্র নাছোড়বান্দা এক বন্ধুর অনুরোধে তিনি তাঁর সাক্ষাতের সাথে জন্য গিয়েছিলেন। সে ধর্মীয় শিক্ষকের প্রতি সংস্কারবশতঃ প্রণাম নিবেদন করে উঠতে না উঠতেই মুখোমুখি আলোচনায় উঠে আসল ভারতসহ সমগ্র বিশ্বে সর্বোত্তম পন্থায় অবদান রাখা প্রসঙ্গে। সাধুটি সেই যুবকের মধ্যে পারমার্থিক ক্ষমতা দর্শন করেছিলেন এবং সেই প্রথম সাক্ষাতেই তিনি তাকে ভগবৎ প্রেমের বার্তা সারাবিশ্বে বিতরণ করার জন্য বলেন। আশ্চর্যান্বিত হয়ে অভয় তখন বললেন যে, পারমার্থিক বার্তা গ্রহণের পূর্বে সর্বপ্রথমে ভারতে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বাধীনতা। শ্রী গুরুদেব তখন প্রত্যুত্তরে বললেন, যে জিনিসটি বিশ্বের জন্য জরুরি তা হল ভগবৎ প্রেমের মাধ্যমে মানব সচেতনতা জাগ্রত করা, এছাড়া স্থায়ী পরিত্রাণ লাভ করার অন্য কোনো সমাধান নেই তারা যখন আলোচনা করছিলেন, সেই সমস্ত স্বতন্ত্র ও সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি স্বরূপ শুদ্ধ চেতনার প্রাধান্যতা সম্পর্কে তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। যদিও তিনি একজন দৃঢ় তার্কিক ছিলেন, অভয় অবশেষে সাদরে পরাজয় মেনে নিয়ে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, যিনি তার ওপর এরকম নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করেছেন তিনিই হবেন তার আধ্যাত্মিক গুরুদেব।


শ্রীল প্রভুপাদের আবির্ভাব সম্পর্কে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভবিষ্যদ্বাণী

যারি পাপী চারি ধর্ম দূর দেশে যারা মোর সেনাপতি-ভক্ত যাইবে তথায় “হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র সংকীর্তনের সুতীক্ষ্ম তলোয়ারের সাহায্যে আমি বদ্ধ জীবাত্মাদের হৃদয়ের সমস্ত আসুরিক মানসিকতার শিকড় উৎপাঠন ও ধ্বংস করব। যদি কিছু পাপী ব্যক্তি ধর্মীয় আদর্শ পরিত্যাগ করে দূরদেশে চলে যায়, তবে তাদেরকে কৃষ্ণভাবনা প্রদান করতে আমার সেনাপতি ভক্ত আবির্ভূত হবেন।”

-চৈতন্য মঙ্গল, সুত্রখণ্ড, লোচন দাস ঠাকুর

“পৃথিবীতে যত আছে নগরাদি গ্রাম, সর্বত্র প্রচার হবে মোর নাম।”

–চৈতন্য ভাগবত, অন্ত্যঃ ৪/১২৬

ভাগবত মাহাত্ম্যে নারদ মুনির উদ্দেশ্যে স্বয়ং ভক্তিদেবীর ভবিষ্যদ্বাণী

“ইদং স্থানং পরিত্যজ্য বিদেশাং জ্ঞান্যতে ময়া। আমি এই দেশ ভারতবর্ষ ছেড়ে দূর দেশে গমন করব।”

(পদ্মপুরাণ উত্তরকাণ্ড)


১৯২৫ : প্রথম বৃন্দাবন দর্শন

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মিশনে আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য অভয় তাঁর ঔষধের ব্যবসাকে আরো প্রসারিত করার প্রয়াস শুরু করলেন, যা তিনি শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পর থেকে শুরু করেছিলেন। তাঁর ব্যবসাকে বৃদ্ধি করার জন্য তিনি সারা ভারতবর্ষ ভ্রমণ করতে লাগলেন এবং তিনি সর্বদা তাঁর গুরু মহারাজকে হৃদয়ে ধারণ করতেন। যার ফলে অদৃশ্যভাবে তিনি তাঁর গুরুদেবের উপস্থিতি অনুভব করতেন। এক সময় তিনি জানতে পারলেন, তাঁর গুরু মহারাজ সে সময়ে বিশাল এক তীর্থ যাত্রী দল নিয়ে বৃন্দাবন পরিক্রমা করছিলেন। যা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান, যেখানে তিনি বহু বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ ও লীলাবিলাস করেছিলেন। অভয় সেই তীর্থযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানে তিনি অনেক কৃষ্ণভক্তের সঙ্গ লাভ করেছিলেন এবং ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সাথে শ্রীকৃষ্ণের সমস্ত দিব্য লীলাস্থলী দর্শন করেছিলেন, যা তাঁর কৃষ্ণভক্তিকে আরো বৃদ্ধি করেছিল। এই যাত্রায় সবচেয়ে যেটি বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হলো তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের শ্রীমুখনিঃসৃত প্রবচন শ্রবণ করতেন। যার মাধ্যমে তিনি যে জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন সে রাজ্যের ঐশ্বর্য সম্পর্কে আরো সুদৃঢ়ভাবে জ্ঞাত হচ্ছিলেন।

১৯৩২ : দীক্ষা গ্রহণ

দীক্ষা গ্রহণ প্রতিটি মানুষের জীবনে এক সাহেন্দ্রক্ষণ। অভয়ের জীবনেও সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসছিল ১৯৩২ সালে। তার এক দশক পূর্বে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সাথে যখন অভয়ের সাক্ষাৎ হয় তখনই সরস্বতী ঠাকুর অভয় যে তার ভাবী শিষ্য তার ইঙ্গিত প্রদান করেছিলেন। অভয় সেদিন জানতে না পারলেও তাঁর গুরু মহারাজ জানতেন এই ছেলেটি তার ভাবী শিষ্য। যখন অভয় দীক্ষাপ্রাপ্ত হন তখন শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর তাকে আরো সুদৃঢ়ভাবে তাঁর শ্রবণএবং অধ্যয়ন চালিয়ে যাওয়ার জন্য আদেশ দিলেন। দীক্ষা গ্রহণের পর তাঁর গুরু তার নতুন আধ্যাত্মিক নামকরণ করলেন অভয়চরণারবিন্দ দাস। পূর্বের অভয়চরণ পরিণত হলো অভয়চরণারবিন্দ দাসে। অভয় শব্দটির অর্থ হলো নির্ভয়। অরবিন্দ শব্দটির অর্থ হলো হৃদকমল (যার হৃদয় পদ্মের মতো কোমল)। চরণ শব্দটি দ্বারা বোঝায় পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মকে। সম্পূর্ণ শব্দটির অর্থ হলো-যার মন শ্রীকৃষ্ণের চরণকমলে আশ্রয় গ্রহণ করেছে ।


দশ লক্ষেরও বেশী

তিনি মাসিক ব্যাক টু গডহেড ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছিলেন। যেটিকে তিনি বলেছিলেন, তার আন্দোলনের মেরুদণ্ড স্বরূপ। মধ্য সত্তরের দিকে এর প্রচার এত উচ্চতায় চলে | গিয়েছিল যে, প্রতি সংখ্যা দশ লক্ষেরও বেশী | বিক্রি হতো। ১৯৪৪-৭৭ পর্যন্ত মোট ১৩০টি ব্যাক টু গডহেড তিনি প্রকাশ করেছিলেন ।

৩২ বছরের প্রস্তুতি!

১৯৩৩ সালে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের কাছ থেকে দীক্ষা লাভের পর শ্রীল | প্রভুপাদ পশ্চিমা বিশ্বে ভ্রমণের জন্য দীর্ঘ ৩২ | বছর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন।

কৃতিত্ব

ভক্ত : প্রভুপাদ তারা বলছিল, চৈতন্য মহাপ্রভু | যদি পশ্চিমা বিশ্বে প্রচার করতে চাইতেন, তবে তিনি নিজে কেন করলেন না? প্রভুপাদ : তিনি আমার জন্য সেই দায়িত্বটি রেখে দিয়েছিলেন। (হাসি)

প্রাতঃভ্রমণ, নিলোর, জানুয়ারি ৪, ১৯৭৬


১৯৩৭ : প্রথম নির্দেশকে তাঁর জীবনের অন্তিম নির্দেশ রূপে গ্রহণ

১৯৩৭ সালের প্রথম দিকে অভয়ের গুরুদেব এই ধরাধাম থেকে অপ্রকট হন। অভয় গুরুদেবকে হারিয়ে গভীরভাবে গুরুদেবের বিরহ অনুভব করছিলেন। তাঁর গুরু মহারাজ অপ্রকট হওয়ার কিছুদিন পূর্বে তাকে একটি পত্র প্রেরণ করেন। যে পত্রটির বিষয়বস্তু ছিল : প্রথম দর্শনেই তিনি তাকে যে আদেশ দিয়েছিলেন তা। এই চিঠিতে তাঁর গুরুদেব তাকে আবার প্রথম আদেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। আদেশটি ছিল ‘সারাবিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার’। অভয় তাঁর এই গুরুদেবের এই আদেশের মধ্যে গুরুদেবের প্রকট উপস্থিতি ও করুণা অনুভব করতেন। আর তাই সেই আদেশকেই সত্য পরিণত করাই তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছিল ।

১৯৩৯ : ভক্তিবেদান্ত উপাধি লাভ

অভয়চরণ তাঁর গুরুদেবের মিশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন সাময়িকিতে অনুচ্ছেদ এবং কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন এবং প্রতিটি লেখাতেই তিনি তাঁর গুরুদেবের আদেশের কথা দীপ্তকণ্ঠে ব্যক্ত করতেন। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের প্রকটকালীন সময়ে অভয়কে তাঁর গুরু মহারাজ বলেছিলেন, অভয় যদি পার লিখিও এবং তা ছাপিও। তোমার হাতে যদি যথেষ্ট অর্থ আসে তবে গ্রন্থ ছাপিও। অভয় নিরলসভাবে তাঁর লেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার ক্ষুরধার লেখনিতে প্রতিভাত হচ্ছিল তার জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেখে গৌড়ীয় মঠ থেকে তাঁর গুরুভাইরা তাকে ভক্তিবেদান্ত উপাধি প্রদান করেন। ভক্তি শব্দটির অর্থ কৃষ্ণের প্রতি ভালবাসা। অন্ত মানে শেষ। বেদ মানে জ্ঞান ৷

১৯৪৪ : ব্যাক টু গডহেডের যাত্রা শুরু

১৯৪৪ সালের শুরুতে সমগ্র বিশ্ব ২য় মহা বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবে কাঁপছিল। সমগ্র বিশ্ববাসী এই ধ্বংসযজ্ঞের সমাপ্তি কামনা করছিল। কলকাতাও এর বাইরে ছিল না। সমগ্র কলকাতা জুড়ে জাপানিদের বোমা হামলার আতঙ্ক। অভয় তখন হৃদয় থেকে অনুভব করছিলেন সমগ্র বিশ্বে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিলুপ্তির কারণে আজ বিশ্বের প্রতিটি দেশ, প্রতিটি জাতি পরস্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। আধ্যাত্মিক জ্ঞান বিতরণের বাহকরূপে ইনি ব্যাক টু গডহেড নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ শুরু করলেন । এর নামের মধ্যেই তাঁর মিশনের কথা ব্যক্ত আছে। তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলোকে সমস্ত জীবাত্মার চেতনাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নিজেই ম্যাগাজিনটির লেখা লিখতেন, টাইপ করতেন, ভুল সংশোধন করতেন, নিজের অর্থে ছাপাতেন এবং সর্বোপরি নিজেই তা বিলি করতেন। একদিন রাস্তার এক গরু তাঁকে মারাত্মকভাবে আহত করে। আরেকদিন তিনি কাঠফাটা রোদে অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। এতকিছুর পরেও তিনি তার পত্রিকা ছাপা এবং বিতরণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন সাধারণ মানুষের মাঝে ভগবদ্ভক্তি প্রচারের স্বার্থে।

১৯৫৩ : প্রথম শিষ্য গ্রহণ এবং ‘লিগ অব ডিভোটি’র যাত্রা শুরু

অভয় তাঁর ঔষধ ব্যবসা আস্তে আস্তে গুটাতে শুরু করলেন এবং একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষক হয়ে ভারতবর্ষ পরিভ্রমণে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি উত্তর প্রদেশের একটি অঞ্চল ঝাঁসিতে গিয়ে তাঁর প্রচার কার্য শুরু করলেন । প্রচারের ফলে সেখানকার স্থানীয়রা তাকে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে অনুরোধ করেন। স্থানীয় কলেজের একজন লিগ অব ডিভোটির এক সভায় বক্তব্য প্রদান করছেন শ্রীল প্রভুপাদ। সংস্কৃত অধ্যাপক প্রভাকর তাঁর প্রথম শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। স্থানীয় প্রশাসন অভয়কে একটি পরিত্যক্ত ভবন ব্যবহারের জন্য অনুমতি দিলেন। যা তিনি তাঁর প্রসারমান মিশনের প্রধান কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। তাঁর প্রচারের ফলে ঝাঁসিতে ব্যাপক পরিবর্তন অধিবাসীদের আধ্যাত্মিক চেতনা বিকশিত হয়েছিল । কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু স্থানীয় রাজনীতিবিদ ‘ও ব্যবসায়ী তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং তাকে তল্পিতল্পাসহ ঝাঁসি ত্যাগ করতে বাধ্য করে। অভয় হতাশ হয়েছিলেন কিন্তু ভেঙে পড়েননি। তিনি আবার তাঁর ভ্রাম্যমান আধ্যাত্মিক শিক্ষকতায় ফিরে গেলেন ।

১৯৫৬ : বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তন

তাঁর ভ্রমণের অংশ হিসেবে অভয় বৃন্দাবনে যান। সেখানে গিয়ে তিনি স্থায়ীভাবে কিছুকাল থাকতে মনস্থ করলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনেক ভক্ত শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তিকে আরো সুদৃঢ় করার নিমিত্তে জীবনের অন্তিম সময়গুলো বৃন্দাবনে কাটাতে চান। কিন্তু অভয়ের বৃন্দাবনে অবস্থানের কারণ ছিল ভিন্ন। তিনি তাঁর শেষ সময় বৃন্দাবনে অবস্থান করার জন্য বৃন্দাবনে থাকতে চাননি। তিনি, বৃন্দাবনে অবস্থানরত ভগবানের শুদ্ধ ভক্তদের সান্নিধ্য লাভ করে আরো উজ্জীবিত হতে চেয়েছিলেন। যা সারা বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। তিনি বৃন্দাবনে একটি মন্দিরে থাকতেন । তিনি সেখানে প্রার্থনা, পূজা, অধ্যয়ন, স্মরণ এবং লেখালেখিতে সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন ৷

১৯৫৯ : সন্ন্যাস গ্রহণ

অভয়কে তার শুরু মহারাজ স্বপ্নে আদেশ দিয়েছিলেন সন্ন্যাস গ্রহণের জন্য। তাঁর গুরুদেবের আদেশ অনুসারে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করতে মনস্থ করলেন। সন্ন্যাস মানে সমস্ত জীবন কৃষ্ণের জন্য উৎসর্গীকৃত। অভয় সন্ন্যাস গ্রহণ করে তাঁর গুরুদেবের আদেশের প্রতি জীবন উৎসর্গ করতে মনস্থ করলেন। প্রায় ৪ দশক ধরে বয়ে বেড়ানো পরিবারের বোঝা ত্যাগ করে মধুরার একটি মন্দিরে সন্ন্যাসব্রত অবলম্বন করলেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তাঁর নাম হল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী। 1 শ্বেতশুভ্র পোশাক পরিহিত বৃদ্ধ ব্যক্তিটি সবার মাঝে এক নতুন রূপে দর্শন নিলেন। তার দেহ গৌড়ীক বসনে আবৃত। হস্তে দত্ত এবং হৃদয় আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অত্যুজ্জ্বল আলোক প্রভায় বিভূষিত।

১৯৬০: প্রথম পুস্তক প্রকাশ ‘পরলোকে সুগম যাত্রা’

স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিশ্বের দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়া যখন পরস্পর ভিন্ন গ্রহে তাদের নভোযান পাঠানো ও অবস্থান নিয়ে তর্ক বিতর্কে লিপ্ত ঠিক সে সময়ে এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী। প্রভুপাদ লিখলেন বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক বৈদিক জ্ঞানের অপূর্ব সমন্বয়কারী গ্রন্থ পরলোকে সুগম যাত্রা। গ্রন্থটি আকারে ছোট, হলেও তার তত্ত্ব সম্ভারের দিক থেকে বেশ সমৃদ্ধ ছিল। সেই সময়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তার লেখা ৮০টি গ্রন্থের মধ্যে এটি সুধী সমাজে বেশ আলোড়ন তুলেছিল।

১৯৬২ : শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম স্কন্ধের ১ম খণ্ড প্রকাশ

একজন সন্ন্যাসী পৃথিবীর সর্বত্র ভগবানের বাণী প্রচার করার দায়িত্বপ্রাপ্ত। শ্রীল প্রভুপাদও পৃথিবীর সর্বত্র কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য এই গ্রন্থকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি যথারীতি তার ম্যাগাজিনে লেখা ছাপিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি চাইছিলেন ভারতের আধ্যাত্মিক জ্ঞান সম্ভারের সবচেয়ে অত্যুজ্জ্বল গ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবতের সর্বজন স্বীকৃত একটি ভাষ্য রচনা করতে এবং সেই সময়ে শ্রীমদ্ভাগবতের ইংলিশ ভার্সনের অভাব ছিল শ্রীমদ্ভাগবত অমল পুরাণ নামেও পরিচিত। এই গ্রন্থটির সহস্রাধিক শ্লোকে ভগবানের মহিমা ও নির্দেশাবলী বর্ণিত হয়েছে। অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাক টু গডহেড এর মতোই নিজে অনুবাদ করা, টাইপ করা, ভুল সংশোধন করা, অনুদান সংগ্রহ এবং প্রকাশনা করে শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম স্কন্ধে ১ম খণ্ড প্রকাশ করেন। সুধীমহলে তাঁর এ রচনা ভূয়সী প্রশংসিত হয় । ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এর যথেষ্ট প্রশংসা করেন এবং সারা ভারতে ছড়িয়ে থাকা লাইব্রেরিতে এর একটি কপি সংরক্ষণের নির্দেশ প্রদান করেন। পরবর্তী দুই বছরে অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম স্কন্ধের আরো দু’টি ভলিউমের কাজ শেষ করে। পরবর্তী দশকে তিনি তার সারা বিশ্ব পরিভ্রমণের সাথে সাথে তাঁর তাৎপর্যকৃত অনুবাদের কাজও চালিয়ে যান। তিনি অন্তিম শয্যায়ও অনুবাদ করে গেছেন। আর শ্রীমদ্ভাগবতের ১৮টি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। যাতে প্রায় ১০ হাজারেরও অধিক পৃষ্ঠা রয়েছে এবং সারা বিশ্বে ৪০টিরও বেশী ভাষায় অনুদিত লক্ষাধিক কপি বিতরিত হয়েছে।

১৩ আগস্ট, ১৯৬৫ : জলদূত জাহাজে আমেরিকা যাত্রা

অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদ পাশ্চাত্যে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য যে কোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ ছিলেন একাধারে দূরদর্শী, বাস্তববাদী ও স্বপ্নদর্শী। বাস্তববাদী হিসেবে তিনি দেখেছিলেন, ভারতীয়রা ছিল দুর্ভাগা। কেননা তারা তাদের সুমহান আধ্যাত্মিক জ্ঞানকে ত্যাগ করে পাশ্চাত্যর অন্ধ অনুসারী ছিলেন। অপরদিকে স্বপ্নদর্শী হিসেবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যেহেতু ভারতীয়রা পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুসারী সেহেতু পাশ্চাত্যবাসী যদি কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করে তবে ভারতীয়রা তা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবে। তাই তিনি পাশ্চাত্যে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলেন বিশেষ করে আমেরিকাতে। কেননা ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর শক্তিধর জাতি হিসেবে যুক্তরাজ্যের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল আমেরিকা। শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম ক্ষন্ধের অনুবাদ শেষ হওয়ার পর শ্রীল প্রভুপাদ পাশ্চাত্যে যাত্রার জন্য নিজেকে প্রস্তুত বলে মনে করলেন। কিন্তু তাঁর হাতে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থ ছিল না। তিনি এক শুভানুধ্যায়ীর সহায়তায় আমেরিকা যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তার যাত্রার পাথেয় সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ীর অফিসে ধর্না দিতে শুরু করলেন। এমনও দিন গিয়েছে, তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান। কিন্তু সেই ব্যক্তি প্রভুপাদের কথায় সাড়া দেননি। অবশেষে তিনি সিন্ডিয়া স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির সত্ত্বাধিকারী সুমতি মোরারজীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। শ্রীমতী মোরারজি প্রভুপাদকে তার আমেরিকাগামী একটি মালবাহী জাহাজে করে যাত্রার বন্দোবস্ত করে দেন। যখন তিনি এই জাহাজে করে কলকাতা ত্যাগ করছিলেন। সাথে চল্লিশ রুপি ছাড়া আর কোনো অর্থই ছিল না। যা আমেরিকাতে জীবিকা নির্বাহের জন্য অতি নগণ্য। সেই জাহাজটির নাম ছিল ‘জলদূত’ যার অর্থ ‘পানি বার্তা বাহক’।


শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভবিষ্যদ্বাণী

“কখন সে দিন আসবে যখন সাদা চামড়ার বিদেশীরা শ্রীমায়াপুর ধামে আসবে এবং বাঙালী বৈষ্ণবদের সাথে সম্মিলিত হয়ে জয় শচীনন্দন, জয় শচীনন্দন বলে জপ কীর্তন করবে, কখন সেদিন আসবে।”

৭০টি গ্রন্থ!

প্রভুপাদ কৃষ্ণভাবনার বিজ্ঞানের ওপর প্রায় ৭০টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন এবং এজন্য তিনি প্রত্যহ মাত্র কয়েক ঘন্টা ঘুমাতেন। তিনি জীবনের শেষ ২০ বছরের মধ্যে ৬০ খণ্ডেরও বেশী বৈদিক শাস্ত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। যার মধ্যে ছিল, শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত ।


১৯৬৫ : জলদূত জাহাজে কৃষ্ণ কর্তৃক উৎসাহ প্রদান

জলদূত জাহাজে তাঁর এই যাত্রা খুব সুখকর ছিল না। জাহাজটি গভীর সমুদ্রে প্রবেশের কিছুদিন পর তিনি সামুদ্রিক পীড়ায় আক্রান্ত হন। পরপর দুই দিন হৃদরোগে আক্রান্ত হন। জাহাজে এমন কোনো ঔষধ ছিল না যেটা দিয়ে তিনি এই অসুখ থেকে সুস্থ হতে পারেন । তাই তিনি ভাবছিলেন, যদি তৃতীয়বার তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন তবে নির্ঘাত মারা যাবেন। তাই তিনি কৃষ্ণের কাছে কাতর হৃদয়ে প্রার্থনা শুরু করলেন এবং সেই রাত্রে কৃষ্ণ তাঁর হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে আশীর্বাদ প্রদান করে বললেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে এই জাহাজকে সুরক্ষা প্রদান করব”। যাত্রা শেষে জাহাজের নাবিক বললেন, চল্লিশ বছরের জাহাজ পরিচালনাকালীন তিনি প্রশান্ত মহাসাগরের এরকম শান্তরূপ কখনো প্রত্যক্ষ করেননি। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর ডায়রিতে লিখেছিলেন স্বয়ং কৃষ্ণ এই জাহাজের কাণ্ডারী রুপে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

১৯৬৫ : জলদূত জাহাজে কৃষ্ণ কর্তৃক উৎসাহ প্রদান

জলদূত জাহাজে তাঁর এই যাত্রা খুব সুখকর ছিল না। জাহাজটি গভীর সমুদ্রে প্রবেশের কিছুদিন পর তিনি সামুদ্রিক পীড়ায় আক্রান্ত হন। পরপর দুই দিন হৃদরোগে আক্রান্ত হন। জাহাজে এমন কোনো ঔষধ ছিল না যেটা দিয়ে তিনি এই অসুখ থেকে সুস্থ হতে পারেন। তাই তিনি ভাবছিলেন, যদি তৃতীয়বার তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন তবে নির্ঘাত মারা যাবেন। তাই তিনি কৃষ্ণের কাছে কাতর হৃদয়ে প্রার্থনা শুরু করলেন এবং সেই রাত্রে কৃষ্ণ তাঁর হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে আশীর্বাদ প্রদান করে বললেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে এই জাহাজকে সুরক্ষা প্ৰদান করব”। যাত্রা শেষে জাহাজের নাবিক বললেন, চল্লিশ বছরের জাহাজ পরিচালনাকালীন তিনি প্রশান্ত মহাসাগরের এরকম শান্তরূপ কখনো প্রত্যক্ষ করেননি। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর ডায়রিতে লিখেছিলেন স্বয়ং কৃষ্ণ এই জাহাজের কাণ্ডারী রুপে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

১৯৬৬ : হিপ্পি ভূমিতে পদার্পণ

যখন অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী আমেরিকার উপকূলে প্রথম উপস্থিত হলেন, তিনি দেখলেন সমগ্র আমেরিকা বিশাল বিশাল অট্টালিকায় বিভূষিত এবং সেখানকার মানুষরা যন্ত্রের মতো ব্যস্ত। আধ্যাত্মিকতার লেশমাত্রও নেই। তখন তিনি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলেন এবং তাকে তার যেরূপ ইচ্ছা সেরূপে পুতুলের মতো নাচানোর আবেদন করলেন। তিনি আরাম আয়েশ উপভোগ করার জন্য যাননি। তিনি গিয়েছেন পাশ্চাত্যে ভগবানের অপার প্রেম বিতরণের জন্য । তিনি প্রথমে আমেরিকায় বাটলায় একমাত্র শুভানুধ্যায়ীর বাসা উঠলেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর একদিন তিনি আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ এমন এক এলাকার সন্ধান পেলেন এবং সেখানে যাওয়ার মনস্থ করলেন। জায়গাটি জাগতিক দিক থেকে অনগ্রসর ও বিপদজনকও বটে।

সে জায়গাটি নিউইয়র্কের পূর্বে যেখানে আমেরিকার সকল হিপ্পিরা আশ্রয় নিয়েছিল তথাকথিত প্রচলিত সংস্কৃতিকে বর্জন করে বিপরীত ধর্মী এক সংস্কৃতি চর্চা করার জন্য। শ্রীল প্রভুপাদ এমন এক সময় আমেরিকায় উপস্থিত হয়েছিলেন, যে সময়টি আমেরিকার ইতিহাসে এক ক্রান্তিকালীন সময়। যখন আমেরিকা ভিয়েতনামের সাথে যুদ্ধরত এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার আমেরিকার অনেক যুবককে জোড়পূর্বক ভিয়েতনামের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য বাধ্য করছিল। এর প্রতিবাদে আমেরিকার যুব গোষ্ঠীর বিশাল অংশ হিপ্পিতে পরিণত এমন হয়েছিল। হিপ্পিরা সন্ধান করছিল যা তাদের অশান্ত হৃদয় কে প্রশান্ত করতে পারে। তাদের অ নে কে ই মাদকাসক্তির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক আনন্দের সন্ধান করছিল। আবার অনেকেই শুধুমাত্র জাগতিক আনন্দ লাভের জন্য নেশায় মত্ত হয়ে গিয়েছিল। সর্বোপরি হিপ্পি সংস্কৃতির প্রধান অংশ হয়ে গিয়েছিল এই নেশা। এই নেশার অর্থের যোগানের জন্য তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল চৌর্যবৃত্তি। এলাকাটি ছিল চৌর্যবৃত্তি ও নেশার স্বর্গরাজ্য। যে ব্যক্তিটি ছিলেন এক মহান ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে, তিনি এসে পড়লেন তার ঐতিহ্য বিরোধী পরিবেশে। যে ব্যক্তি জীবনে কখনো এক পেয়ালা চা ও এক ফোটা মদ গ্রহণ করেননি আজ তাকে বাস করতে হচ্ছে যৌনতা ও মাদকের আখড়ায়। তার এই স্থানে বসবাসের কারণ ছিল ভগবানের দিব্যবাণী ও দিব্য সঙ্গীতের মাধ্যমে এই মানুষগুলোর চেতনার আমূল পরিবর্তন করা।করুণার বশবর্তী হয়ে স্বামীজি সেই উদভ্রান্ত যুবকদের মাদকের পরিবর্তে ভগবানের দিব্য নামে অবগাহনের জন্য আহ্বান করলেন। তাঁর এই আহ্বানটি বাস্তবিকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। তবুও প্রথম একটি হিপ্পি যুবক তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার সাথে এসে বসবাস শুরু করল। কিন্তু একদিন নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে যুবকটি স্বামীজিকে তাড়া করলেন। তাড়া খেয়ে স্বামীজি তার বাসস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হল। কিন্তু তিনি দমে গেলেন না । শীঘ্রই তিনি ম্যাচলেস গিফট নামে রাস্তার পাশে এক দোকানঘরে তাঁর প্রচারকেন্দ্র স্থাপন করলেন। সেখানে তিনি হিপ্পিসহ সকল মানুষকে নিমন্ত্রণ জানাতেন। সেখানে সপ্তাহে তিনদিন সান্ধ্য অনুষ্ঠান হতো। অনুষ্ঠানে তিনি ভগবদ্‌গীতা থেকে আলোচনা করতেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কীর্তন হতো। সেই কীর্তনে অংশগ্রহণকারীরা নৃত্য করতেন। সেই কীর্তন মহামন্ত্র (হরে কৃষ্ণ… হরে হরে) নামে পরিচিত ছিল। হিপ্পিরা এই সঙ্গীতটি পছন্দ করেছিল এবং তারা অচিরেই স্বামীজির এই দিব্য সঙ্গীতের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল।


৩৫ দিন ভ্রমণ

জলদূত ভ্রমণের সময় তার সঙ্গে ছিল ভারতীয় মুদ্রায় ৪০ রুপি এবং কয়েকটি গ্রন্থ। তাঁর সেসময় দুদিনে দু’বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল । অবশেষে দীর্ঘ ৩৫ দিনের দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে তিনি | সর্বপ্রথম আমেরিকার ব্রুকলিন জেটিতে পৌঁছান।

একটি স্বপ্ন

ত্রিবিক্রম : তারপর আপনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন?
প্রভুপাদ : হ্যাঁ
হরিসৌরি : সেটি কি ছিল প্রভুপাদ?
প্রভুপাদ : সেটি…(হাসি) স্বপ্নটি ছিল, আমাকে অবশ্যই এখানে আসতে হবে।
হরিসৌরি : আপনি কি কোনো নির্দেশনা পেয়েছিলেন
প্রভুপাদ : স্বপ্নটি ছিল যে, কৃষ্ণ তাঁর অনেক রূপে জলদূত জাহাজকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ।


১৯৬৬ : টম্পকিন্স স্কয়ার পার্কে প্রথম গণকীর্তন

স্বামীজি রাজপথে কীর্তনের প্রতি আমেরিকাবাসীর ইতিবাচক আগ্রহ দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন জনাকীর্ন স্থানে কীর্তন করার । তিনি এই রকমই একটি স্থানীয় জনাকীর্ণ এক উদ্যান বেছে নিলেন। যার নাম ছিল টম্পকিন্স স্কয়ার পার্ক। সেই পার্কের এক বৃক্ষতলে বসে তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা নৃত্যকীর্তন শুরু করলেন। ক্রমে ক্রমে সেই সংখ্যা ২শ’র ওপরে ছাড়িয়ে গেল। এটা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে প্রথম কোনো জনাকীর্ণ স্থানে কীর্তন। যা স্বামীজি প্রথম প্রবর্তন করেছিলেন। আজ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই নগর সংকীর্তন খুব জনপ্রিয় এবং কীর্তনমেলা সারাবিশ্বে উদ্‌যাপিত একটি অনুষ্ঠান। ক্রমে ক্রমে এই কীর্তন সারা বিশ্বে খুব জনপ্রিয়তা লাভ করছে। স্বামীজি টম্পকিন্স পার্কের যে বৃক্ষতলে বসে কীর্তন করতেন সেটির নামকরণ করা হয়েছে হরেকৃষ্ণ বৃক্ষ।

১৯৬৬ : ইস্‌কন প্রতিষ্ঠা

স্বামীজি অনেক লোককে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। তিনি লোয়ার ইস্ট সাইডের সেই মন্দিরে প্রতি সপ্তাহে আমন্ত্রণ জানাতেন এবং নিত্যনৈমিত্তিক অনুষ্ঠানগুলো চালিয়ে যাচ্ছিলেন। রাস্তার ধারে সেই মন্দিরটি একটি ঐতিহাসিক স্থানে পরিণত হল। কিন্তু স্বামীজির লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি শুধু এই ছোট্ট মন্দিরে তার প্রচারকার্য সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তিনি সারা পৃথিবীতে এই প্রচার কার্য ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বদ্ধ পরিকর ছিলেন। তার এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠা করলেন আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন)। যদিও প্রথম দিকে এর সদস্য ও শুভানুধ্যায়ী ছিল অল্প। স্বামীজি দেখেছিলেন, রাস্তার ধারের মন্দিরের এই সাফল্য ছিল তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রথম ধাপের কৃতকার্যতা। তাকে পাড়ি দিতে হবে আরো অনেক পথ।


কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

“এরকম অনুষ্ঠানগুলোকে আমি অত্যন্ত স্বাগত জানাই।—যেগুলো আমাদেরকে নানান বৈচিত্র্যের সুফল ও মূল্যবোধ উদ্‌যাপনে সহায়তা করে…তদুপরি ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রকাশও প্রদর্শন করে থাকে, যেটি হলো কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ।” টনি ব্লেয়ার, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, যুক্তরাজ্য

হরেকৃষ্ণ বৃক্ষ

ভক্তদের জন্য যোগপীঠের নিমবৃক্ষ এবং জগন্নাথ পুরীর সিদ্ধবকুল যেরকম অতীব তাৎপর্যপূর্ণ তেমনি টম্পকিন্স স্কয়ার পার্কে elm বা বেদারু জাতীয় বৃক্ষটিও সম তাৎপর্যপূর্ণ। যেরকম মহাপ্রভু নিমবৃক্ষের নীচে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তেমনি এই হরেকৃষ্ণ বৃক্ষটির নীচে আবির্ভূত হয়েছিল ইস্‌কন । সিদ্ধবকুলতলে যেরকম হরিদাস ঠাকুর হরিনাম জপ করেছিলেন তেমনি শ্রীল প্রভুপাদ এই বৃক্ষতলে হরিনাম জপ কীর্তন করেছিলেন।


৯ জুলাই ১৯৬৭ : সানফ্রান্সিসকোতে পাশ্চাত্যের প্রথম রথযাত্রা

স্বামীজি সর্বদা চিন্তা করতেন কিভাবে পাশ্চাত্যবাসীকে ভক্তির মধুময়তায় বিমোহিত করে জাগতিক মোহ থেকে দূরে সরিয়ে আনা যায়। -একদিন যখন তিনি রাস্তায় একটি চাদোয়া দেওয়া ট্রাক দেখলেন, তখন তার মাথায় এই ট্রাক দেখে ভগবানের রথযাত্রার কথা মনে পড়ে গেল। সেই সময়ে ঘটল আরেক ঘটনা। তাঁর এক শিষ্যা একদিন ঐতিহ্যবাহী পুরানো জিনিসপত্র বিক্রি করে এরকম একটি দোকান থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অভিন্ন রূপ জগন্নাথদেবকে তাঁর ভাই বলদেব ও বোন সুভদ্রাদেবীসহ নিয়ে হাজির হলেন। স্বামীজি তাঁদের এই আবির্ভাবকে এক দিব্য প্রেরণা বলে মনে করলেন। তিনি তাঁর উপস্থিত শিষ্যদের জিজ্ঞাসা করলেন কারো বিগ্রহ খোদাইয়ের অভিজ্ঞতা আছে কিনা? তাঁর এক শিষ্য জানালেন তার এই বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা আছে। তিনি তাকে এই ছোট বিগ্রহগুলোর অনুরূপ বড় বিগ্রহ খোদাই করার জন্য নির্দেশ দিলেন। বিগ্রহ তৈরি হয়ে যাওয়ার পর রথোপরি জগন্নাথ রাস্তায় নামলেন । এটাই ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে প্রথম জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। সানফ্রান্সিসকোর বহু লোক জগন্নাথদেবের সাথে একত্রে রাস্তায় ভ্রমণ, কীর্তন, নৃত্য ও প্রসাদ গ্রহণ করেছিল এবং সর্বোপরি তার কৃপা আশীর্বাদ লাভ করেছিল। এভাবে রথযাত্রা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল । একসময় যে হিপ্পিদের রাস্তায় নৃত্য করার অপরাধে পুলিশ গ্রেপ্তার করত এখন সেই হিপ্পিরাই পুলিশ প্রহরায় রাস্তায় নৃত্য কীর্তন করছে। সানফ্রান্সিসকোতে শুরু হওয়া রথযাত্রা সারা পৃথিবীর রথযাত্রার পথিকৃৎ। এটি এখন সারা বিশ্বের হাজারো দেশের বড় বড় নগরীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বোস্টন থেকে বেলফাস্ট হয়ে ব্রিসবেন । ডুব্লিন থেকে দুবাই হয়ে নিপ্রোপেট্রোবস্ক

১৯৬৮ : ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় ইস্‌কনের প্রথম পরিবেশ বান্ধব বৈদিক সম্প্রদায়ের অগ্রযাত্রা

সরল জীবন উচ্চ চিন্তা- ছিল শ্রীল প্রভুপাদের দর্শন। এরই নিরিখে তাঁর অনুপ্রেরণা ও তত্ত্বাবধানে কিছু অনুসারী পরিবেশবান্ধব স্বনির্ভর একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করতে প্রয়াসী হলেন। তাঁর কিছু শিষ্য একত্রিত হয়ে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় এরকমই একটি স্বনির্ভর পরিবেশ বান্ধব জনগোষ্ঠী গঠন করল। শ্রীল প্রভুপাদ এর নাম দিলেন ‘নব বৃন্দাবন’। সেখানে তিনি মাসাধিককাল অবস্থান করে তাঁর শিষ্যদের এই জীবনযাত্রা সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলতেন ভারতবর্ষের কোটি কোটি মানুষ এই পদ্ধতিতে জীবন যাপন করে এবং কৃষ্ণ স্বয়ং যখন এই পৃথিবীতে অবতরণ করেছিলেন তখন তিনি বৃন্দাবনে অবস্থান করে এই পদ্ধতিতে জীবনযাত্রা অতিবাহিত করার শিক্ষা মানুষকে দিয়েছেন। নব বৃন্দাবন এখন পাশ্চাত্যের ভক্তদের কাছে তীর্থস্থান এবং দর্শনার্থীদের কাছে এক অতি মনোরম জায়গা। যেখানে শ্রীল প্রভুপাদের ভক্তরা তাদের গুরুদেব প্রভুপাদের সোনার প্রাসাদ তৈরি করেছে। দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার ভাষায় এটি ‘পাশ্চাত্যের তাজমহল’। এক দশক পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এরকম সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে। তারা যে শুধুমাত্র নিজেরাই আধ্যাত্মিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে তা নয়, পরিবেশকেও করছে পরিশুদ্ধ। পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে পরস্পর সহাবস্থানে থেকে এই জনগোষ্ঠীরা নতুন পৃথিবীর অগ্রপথিক হিসেবে স্বীকৃত।

১৯৬৮ : বিখ্যাত ম্যাকমিলন কোম্পানি’র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ প্রকাশ

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা ভারতীয় বৈদিক জ্ঞানসম্ভারের এক বহুল প্রচলিত এবং সর্বজনস্বীকৃত এক দার্শনিক গ্রন্থ। যদিও বহুভাষ্যকার এর বহুভাষ্য লিখেছেন তবে এর খুব কম সংখ্যক ভাষ্যেই কৃষ্ণভক্তির কথা বিদৃত হয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার প্রাণপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ হওয়া সত্ত্বেও বহু ভাষ্যে শ্রীকৃষ্ণের মহিমা অনুপস্থিত ছিল। একমাত্র প্রভুপাদই তাঁর ভাষ্যে পরাম্পরা ধারায় যে জ্ঞান তিনি প্রাপ্ত হয়েছিলেন তা – অবিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি এটি ১৯৬৭ সালে আমেরিকায় রচনা সমাপ্ত করেন এবং তার নাম দেন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ। যেহেতু তিনি আমেরিকায় অপরিচিত ছিলেন এবং তাঁর গ্রন্থটি ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। সেহেতু তাঁর পাঠক সংখ্যা কম হবে ভেবে কোনো প্রকাশনা সংস্থাই তা প্রকাশ করতে চাইছিল না। সৌভাগ্যক্রমে ইতিহাসের পাতায় স্থানলাভের জন্য এগিয়ে আসলেন ম্যাকমিলন কোম্পানি। যদিও ইংরেজিতে ভগবদ্‌গীতার অনেকগুলো সংস্করণ তখন আমেরিকাতে প্রচলিত ছিল তবুও অল্প কিছুদিনের মধ্যে এই গ্রন্থটি সর্বজন মহলে বহুলভাবে সমাদৃত হলো। পরবর্তীতে শ্রীল প্রভুপাদ তার নিজের প্রকাশনা সংস্থা ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট এর মাধ্যমে এর প্রকাশ শুরু করলেন। এর পাঁচ দশক পর ভগবদ্গীতা যথাযথ সারা বিশ্বের সবচেয়ে বেশী পঠিত এবং প্রচারিত ইংরেজি শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় পরিণত হলো। বিশ্বের ৬০টিরও বেশী ভাষায় অনূদিত লক্ষ লক্ষ কপি ভগবদ্‌গীতা প্রকাশিত ও বিতরিত হয়েছে ।

১৯৬৯ : লসএঞ্জেলসে ইস্‌কনের প্রথম মন্দির প্রতিষ্ঠা

শ্রীল প্রভুপাদের অনুগামীরা কৃষ্ণভক্তির পথে উত্তরোত্তর এগিয়ে যাচ্ছিল। শ্রীল প্রভুপাদ সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের ভক্তির পরবর্তী ধাপ ভগবানের বিগ্রহ অর্চন পদ্ধতির শিক্ষা দিয়ে তাদেরকে বিগ্রহ অর্চনে নিয়োজিত করার। যে স্থানে শ্রীল প্রভুপাদ তার প্রচারের শুভ সূচনা করেছিলেন সেখানেই তিনি পশ্চিমা বিশ্বের তাঁর আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্ৰ স্থাপন করতে চাইলেন। সেখানেই ইস্কনের প্রথম রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহের স্থাপনা হলো। শ্রীল প্রভুপাদ স্বয়ং এই বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি তার কিছু যুবক ও যুবতী আমেরিকানকে বিগ্রহ অর্চনার খুটিনাটি বিষয় শিক্ষা দিয়ে পূজারীতে পরিণত করলেন। ইস্‌কন ভক্তরা বর্তমানে সারা বিশ্বে শতশত মন্দিরে বিগ্রহ অর্চন করছে। আর এই বিগ্রহ অর্চনের প্রথম সূচনাকারী স্থান হিসেবে সানফ্রান্সিসকো ইতিহাসের অংশ হয়ে রইল।

১৯৬৯ : লন্ডনে রাধা লন্ডনেশ্বর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা

শ্রীল প্রভুপাদ তার তিনজন ভক্ত দম্পতিকে ইংল্যান্ডে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। প্রথম দিকে তারা কিছুটা বিপত্তির সম্মুখীন হন। কিন্তু প্রভুপাদের প্রেরণা এবং তত্ত্বাবধানে তারা সেই বিপদকে সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করেন। সেখানে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা জর্জ হ্যারিসনের সাথে সাক্ষাৎ লন্ডন ইস্‌কনের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। জর্জ হ্যারিসন যিনি লন্ডনের যুব সম্প্রদায়ের হৃদয় সম্রাট তিনি শ্রীল প্রভুপাদের গাওয়া হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র শুনে এই দিব্য শব্দতরঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন । ভক্তসঙ্গের প্রভাবে তিনিও কৃষ্ণভক্তে পরিণত হন এবং লন্ডনে ইস্‌কন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। শিষ্যদের আমন্ত্রণে শ্রীল প্রভুপাদ লন্ডনে গিয়েছিলেন এবং রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। পাঁচ দশক পূর্বে শ্রীল প্রভুপাদ বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার কূট রাজনৈতিক বেড়াজালে আবদ্ধ ছিলেন। আজ তিনিই লন্ডনের মানুষের কাছে একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষক। তিনি সেই ঔপনিবেশ সাম্রাজ্যের মানুষকে তার শিষ্যে পরিণত করেছিলেন এবং লন্ডনে মন্দির স্থাপনের মাধ্যমে বৃটিশ ও ভারতীয় দুই দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন করলেন। যদিও ভৌগলিক দিক থেকে দুই দেশ ভিন্ন। তবুও এই দুটি দেশ আধ্যাত্মিক ভাবধারায় একত্রিত হল। দুই দেশের ভিন্ন সংস্কৃতিকে আধ্যাত্মিক ভাবধারায় একত্রিত করার মানসে তিনি লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহের নামকরণ করলেন ‘রাধা লন্ডনেশ্বর’। লন্ডনেশ্বর শব্দের অর্থ হল যিনি লন্ডনের প্রধান।


১০৮টিরও বেশী স্থান

১৯৬৬-১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রভুপাদ বিশ্বের প্রায় ১০৮টিরও বেশী স্থান পরিদর্শন করেন ।

৬৫৭৯টিরও বেশী পত্র

শ্রীল প্রভুপাদ সারা বিশ্বে ইস্‌কনকে দক্ষতার সাথে ব্যবস্থাপনা করেছিলেন শুধুমাত্র পত্র আদান প্রদান, ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ এবং প্রায় টেলিফোন ব্যবহার ছাড়াই। তিনি ১৯৪৭-১৯৭৭ পর্যন্ত ৬.৫৭৯টিরও বেশী পত্র লিখেন।

৯০৭টি কথোপকথন

১৯৬৭-১৯৭৭ সাল পর্যন্ত শ্রীল প্রভুপাদ শিষ্যসহ বিভিন্ন জনের সাথে ৯০৭টি কথোপকথন করেন।

মাসে প্রায় ৩টি মন্দির!

শ্রীল প্রভুপাদ ৬টি মহাদেশে ১০৮টি কৃষ্ণমন্দির। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিটি কেন্দ্রে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে তিনি শিষ্যদেরকে বিগ্রহ। অর্চন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র ১৯৭০-৭১ এর মধ্যে অর্থাৎ ১ বছরে ৩২টি নতুন মন্দির (মাসে প্রায় ৩টি) স্থাপন করেন।

টপচার্টে হরেকৃষ্ণ মন্ত্র

১৯৬৯ সালে প্রভুপাদ তার শিষ্যদেরকে লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসনের সাথে হরেকৃষ্ণ মন্ত্র নামে একটি রেকর্ডিংয়ের জন্য। এই রেকর্ডটি অ্যাপল কর্পোরেশনের সবচেয়ে দ্রুততম বিক্রির রেকর্ড গড়ে। চেকোশ্লোভাকিয়াতে এটি টপচার্টের ৩ নম্বর, বৃটেনে ৯নম্বর এবং জার্মানি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুগোস্লাভিয়াসহ আরো বিভিন্ন দেশে এটি সেরা দশের মধ্যে অবস্থান করে।

২০টিরও বেশী এলবাম

শ্রীল প্রভুপাদ সমগ্র জীবনে ভক্তিমূলক গানের ওপর ২০টিরও বেশী এলবাম রেকর্ড করেন।


১৯৬৯ : জর্জ হ্যারিসন তার সুললিত কণ্ঠকে আধ্যাত্মিক সেবায় নিয়োজিত করার জন্য অনুপ্রাণিত হলেন

শ্রীল প্রভুপাদ যখন লন্ডনে অবস্থান করছিলেন তখন জর্জ হ্যারিসন শ্রীল প্রভুপাদের সাথে বহুবার সাক্ষাৎ করেন। শ্রীল প্রভুপাদ তার সঙ্গীতকে আধ্যাত্মিক সেবায় লাগাতে পরামর্শ দেন এবং বিভিন্ন ভক্তিমূলক গানগুলোকে তার নিজস্ব সুরে গাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। প্রভুপাদের অনুপ্রেরণায় বহু ভক্তিমূলক সঙ্গীত নিয়ে মাই সুইট লর্ড নামে একটি এলবাম বের করেন। সেই এলবামে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রও অন্তর্ভূক্ত ছিল। তৎকালীন শ্রোতা জরিপে শত শত রক সঙ্গীতের মধ্যে এই সঙ্গীতগুলো শীর্ষস্থান লাভ করে। জর্জ হ্যারিসন রাধাকৃষ্ণের মন্দিরের ভক্তদের নিয়ে আরো বেশ কয়েকটি এলবামও বের করেন। তার ‘হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র’ নামক এলবামটি সারা বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রিত এলবামে স্থান লাভ করে। ভক্তরা তার সহযোগিতায় বিবিসি টিভিতে ‘টপ অফ দ্যা পপস্’ নামে একটি এলবাম বের করেন। সেই এলবামে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রও অন্তর্ভূক্ত ছিল। তৎকালীন শ্রোতা জরিপে শত শত রক সঙ্গীতের মধ্যে এই সঙ্গীতগুলো শীর্ষস্থান লাভ করে। জর্জ হ্যারিসন রাধাকৃষ্ণের মন্দিরের ভক্তদের নিয়ে আরো বেশ কয়েকটি এলবামও বের করেন। তার ‘হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র’ নামক এলবামটি সারা বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রিত এলবামে স্থান লাভ করে। ভক্তরা তার সহযোগিতায় বিবিসি টিভিতে ‘টপ অফ দ্যা পপস’ নামে একটি অনুষ্ঠানে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র পরিবশেন করার সুযোগ পান । যা সারা ইউরোপে আলোড়ন তোলে ।

১৯৭০ : পাশ্চাত্যের শিষ্যদের নিয়ে আধ্যাত্মিক ভূমি ভারত ভ্রম

এই ভ্রমন শ্রীল প্রভুপাদের পাশ্চাত্যের শিষ্যদের ভক্তি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে সহায়তা করেছিল এবং ভারতবাসীকে প্রদর্শন করেছিল, যে ভগবৎ ভক্তি তাদের ঐতিহ্যের অংশ এবং যা তারা তাচ্ছিল্য করে সেই সংস্কৃতিকে পাশ্চাত্যবাসীরা সাদরে গ্রহণ করেছে। সেই সময় ভারতবাসী অবাক হয়েছিল এটি দেখে যে, পাশ্চাত্যের যুবক যুবতীরা কিভাবে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রহণ করেছে। পাশ্চাত্যের যুবতীরা শাড়ী পড়ছে এবং যুবকরা মুণ্ডিত মস্তকে ধুতি ও ফতুয়া পরিধান করছে। তার এই ভ্রমণ ভারতীয়দের হৃদয় জয় করেছিল।

২৯ জুলাই ১৯৭০ ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা

সারা বিশ্বে আধ্যাত্মিক জ্ঞান আরো দ্রুত ব্যাপকভাবে প্রচারের নিমিত্তে শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট (বিবিটি) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে তিনি জাগতিক শক্তিকে পারমার্থিক শক্তির সেবায় লাগাতে প্রয়াসী হন। সমগ্র বিশ্ব যখন নিদ্রাচ্ছন্ন তখন শ্রীল প্রভুপাদ কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে সারা রাত ডিক্টোফোনে তাঁর অনুবাদ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর শিষ্যরা সেই রেকর্ডিংকৃত অনুবাদ সম্পাদনা করতো এবং পুস্তক আকারে প্রকাশ করতো। দিবাভাগে যে সমস্ত মানুষ তার সাথে সাক্ষাতের জন্য আসতো তাদের সাথে কৃষ্ণকথা বলতে ব্যস্ত থাকতেন এবং রাত্রে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়তো তখন তিনি অনুবাদে ব্যস্ত। বর্তমানে ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট বিশ্বের সর্ববৃহৎ বৈদিক জ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ। এটি বর্তমানে ৫০০ মিলিয়নেরও বেশী গ্রন্থ ৭০টিরও বেশী ভাষায় প্রকাশ করেছে। যা ১০০টি দেশে সদর্পে প্রচারিত হচ্ছে। যা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

১৯৭১ : কলকাতায় ভারতের প্রথম ইস্‌কন মন্দির প্রতিষ্ঠা

যখন শ্রীল প্রভুপাদ কলকাতায় তার পাশ্চাত্য শিষ্যদের নিয়ে গমন করেন তখন তিনি দশটিরও বেশী প্যান্ডেল প্রোগ্রামের মাধ্যমে ২০-৩০ হাজার মানুষের সমাগম করতে সক্ষম হন। যা সেই শহরের ইতিহাসে বিরল। কলকাতাও তার আদরের দুলালকে পেয়ে উল্লসিত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে অবস্থানের কোনো জায়গা ছিল না। সমাজবিরোধীরা শ্রীল প্রভুপাদকে হুমকি দিচ্ছিল পালাও নতুবা মর। কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ অকুতোভয় চিত্তে তাঁর প্রচার কার্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একদিন সন্ধ্যায় কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক দ্বারা তাঁর প্যান্ডেল প্রোগ্রাম আক্রান্ত হয়। তিনি এবং তাঁর শিষ্যরা সাহসিকতার সহিত তা মোকাবেলা করেন। কলকাতায় শ্রীল প্রভুপাদ ভারতের প্রথম মন্দির স্থাপন করেন। যেখানে সেই ছোট্ট শিশুটি তার পাশের কোনো মন্দিরে রাধাগোবিন্দ বিগ্রহের সেবা করতেন সেখানেই শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তি ঐতিহ্যকে আরো ব্যাপক ভাবে প্রচলন করার জন্য রাধাগোবিন্দ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন।

মে ১৯৭১ : প্রথম অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ

সারা বিশ্বে কৃষ্ণভক্তি প্রচারের অংশ হিসেবে শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রেরণ করেন। প্রথম দিকে তারা প্রচুর বাধার সম্মুখীন হলেন। রাজপথে কীর্তন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। কিন্তু তারা দমে যাননি। কিছু লোক এই কীর্তনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। যখন শ্রীল প্রভুপাদ তাদের আমন্ত্রণে সিডনিতে আসেন তখন বহু লোক তাঁর কথা ও কাজে আকৃষ্ট হয়। প্রভুপাদ জানতেন তাঁর কাছে যথেষ্ট সময় নেই অস্ট্রেলিয়ায় এই ভক্তি আন্দোলনকে সুদৃঢ়ভাবে স্থাপন করার জন্য । তিনি যখন অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে আসছিলেন তখন আসার সময় কিছু ভক্তের মাঝে ভক্তির বীজ রোপন করে আসেন। যদিও অস্ট্রেলিয়ার ভক্তরা বয়সে নবীন ও স্বল্প প্রশিক্ষিত ছিল তবুও তিনি অস্ট্রেলিয়ায় রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিগ্রহদ্বয়ের কাছে প্রার্থনা করেন, “হে প্রভু, কিভাবে আপনার যথাযথ সেবা করতে হয় তা আপনি ওদের হৃদয়ে প্রতিভাত করুন।” ভক্তদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল তাঁর চরিত্রের একটি অনন্য গুণ। তিনি শিষ্যদের খুব বিশ্বাস করতেন। অস্ট্রেলিয়ার ভক্তরা তাঁর এই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছিল। এক বছর পর যখন তিনি পুণরায় অস্ট্রেলিয়া যান তখন তিনি বিগ্রহ সেবার মান এবং ভক্তদের পারমার্থিক অগ্রগতি দেখে খুব সন্তুষ্ট হন।


৫,৫০,০০,০০০!

১৯৭৬ সালে ২৫টি ভাষায় ৫ কোটি ৫০ লক্ষেরও অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয় এবং প্রায় প্রতিটি দেশে সেগুলো বিতরিত হয়। ফলে বিবিটি হলো ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনমূলক গ্রন্থের বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রকাশক।

৭৬টি ট্রেন কার!

শুধুমাত্র ভগবদ্‌গীতা যথাযথ গ্রন্থটি একবার ছাপাতে প্রয়োজন হয় ৭৬ টি ট্রেন কার (মালবাহী ট্রেনের বগি) সমপরিমাণ কাগজ।

মাত্র ২ মাস

১৯৭৪ সালে প্রভুপাদ বিবিটিকে নির্দেশ দেন মাত্র ২ মাসের মধ্যে ৭০ খণ্ডের প্রকাশের জন্য।


জুন ১৯৭১ : মস্কো ভ্রমণ

পাশ্চাত্যের মহাশক্তি আমেরিকায় সফলতার সহিত কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের পর শ্রীল প্রভুপাদ সিদ্ধান্ত নিলেন অপর মহাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নে কৃষ্ণভক্তি প্রচারের। কিন্তু এই দেশের সরকার ছিল নাস্তিক এবং সেই দেশে প্রকাশ্যে ধর্ম প্রচার খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অকুতোভয় শ্রীল প্রভুপাদ এরকম জায়গায় কৃষ্ণভক্তি প্রচারকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন। তিনি রাশিয়ান ইন্দোলজি প্রফেসরের সাথে সাক্ষাতের জন্য তৎকালীন সোভিয়ত ইউনিয়নে পাঁচদিনের ভ্রমণে যান। তিনি সেখানে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রকাশ্যে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের অনুমতি পাননি। সেখানে একটি হোটেলে পাঁচদিন অতিবাহিত করেছিলেন। এই সময়ে একজন রাশিয়ান যুবক বাদে কেউ তাঁর সাথে দেখা করতে আসেনি। শ্রীল প্রভুপাদ সেই রাশিয়ান যুবকের মাঝে কৃষ্ণভক্তির বীজ বপন করেন। অবশেষে তিনি সেই যুবককে আশীর্বাদ করেন এবং তার মধ্যে অপরিসীম মাধ্যাত্মিক শক্তি সংক্রমিত করে দীক্ষা দিয়ে তার নাম রাখলেন অনন্ত শান্তি দাস । তিনিই ছিলেন প্রথম রাশিয়ান কৃষ্ণভক্ত। এই সুযোগ্য ভক্তের মাধ্যমেই সমগ্র রাশিয়ায় কৃষ্ণভক্তির ঝড় ওঠে। ধীরে ধীরে বহু লোক এই ভক্তিমার্গে আকৃষ্ট হয়। কিন্তু তা রাশিয়ান আন্তঃগোয়েন্দাবাহিনি কেজিবি’র দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বহু ভক্ত কেজিবি কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু প্রভুপাদের বীর সৈনিকরা অপরিসীম ধৈর্যের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। তারা শত নির্যাতন ও প্রলোভন সত্ত্বেও কৃষ্ণভক্তির পথ থেকে চ্যুত হননি। কেজিবি তিনটি জিনিসকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্বের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করত। ১) হরিনাম ২) পপ সঙ্গীত ৩) পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। অনেক ভক্তের ত্যাগ তীতিক্ষার বিনিময়ে ১৯৯৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ভক্তরা প্রকাশ্যে কৃষ্ণভক্তি প্রচারের অনুমতি পায়। নিউজ উইক ম্যাগাজিনের পরিসংখ্যান মতে রাশিয়ায় হরে কৃষ্ণ সবচেয়ে দ্রুত প্রসারমান একটি ধর্ম।

নভেম্বর ১৯৭১ : প্রথম আফ্রিকা ভ্রমণ

শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর ভক্তদের আফ্রিকায় প্রেরণ করলেও তারা তৎকালীন বর্ণবাদ সমস্যার কারণে আফ্রিকায় সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হন। যেহেতু ভারতেও বর্ণপ্রথা প্রচলিত ছিল আফ্রিকানরা ভগবদ্বক্তিকেও ঐরকম কিছু বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সার্বজনীন। তাঁর কর্মকাণ্ড পৃথিবীর সকল মানুষকে নিয়ে তাই তিনি যখন নাইরোবিতে যান তখন তিনি তাঁর অনুসারীদের স্থানীয় হিন্দু মন্দিরে কীর্তনের আয়োজন করতে বললেন। তার এই পরিকল্পনা সফল হয়েছিল। সেই কীর্তনে সকল শ্রেণীর মানুষ অংশগ্রহণ করে একত্রে নৃত্যকীর্তন করে দিব্য আনন্দ লাভ করেছিল। সমস্ত আফ্রিকা ভেসেছিল ভক্তির জোয়ারে। এরপরে তিনি নাইরোবি ইউনিভার্সিটিতে প্রায় দু’শ শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে প্রবচন প্রদান করেন। তিনি তাদের পাশ্চাত্য অগ্রগতি বাদ দিতে বললেন, কেননা তা মানুষের মাঝে হতাশা সৃষ্টি করে মানুষকে হিপ্পিতে পরিণত করে। তাদের আধ্যাত্মিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জাগতিক অগ্রগতি ও পারমার্থিক অগ্রগতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করার প্রয়াসী হতে বললেন। তার সে অনুপ্রেরণা আজ আফ্রিকাবাসীকে ভক্তিজগতে অনেক দূর নিয়ে গেছে। বর্তমানে হরে কৃষ্ণ ঘানায় দ্রুত প্রসারমান ধর্মের একটি।

২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২ : মায়াপুরে বিশাল মন্দির স্থাপনের শিলান্যাস অনুষ্ঠান

শ্রীল প্রভুপাদ সারা বিশ্বে যে ভাগবত ধর্মের প্রচার করছিলেন তা চৈতন্য মহাপ্রভু কর্তৃক প্রবর্তিত। চৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অভিন্ন রূপ। যিনি ভারতবর্ষে ১৫০০ বঙ্গাব্দে আবির্ভূত হয়ে গোলকের গুপ্তপ্রেমধন হরিনাম ভারতবাসীর মাঝে যুগধর্ম হিসেবে প্রবর্তন করেছিলেন। যেহেতু ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পশ্চিমবঙ্গের মায়াপুরে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেহেতু শ্রীল প্রভুপাদের ইচ্ছা ছিল মায়াপুরে আধ্যাত্মিক রাজধানী স্থাপন করার। এই প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল কিছু ধানি জমি আর পরিত্যক্ত জঙ্গল নিয়ে। বর্তমানে তা বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে পরিণত হয়েছে। তা সারা বিশ্বের আধ্যাত্মিক শহরগুলোর কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ তার ভক্তির উৎকর্ষ সাধনের জন্য সমবেত হয়। একটি অত্যাশ্চর্য মন্দির পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে আকৃষ্ট করে। এটি হবে ভারতের হিন্দু মন্দিরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় মন্দির। যার উচ্চতা হবে ৩৪০ ফিট। ৬ লক্ষ ৭৫ হাজার বর্গফুট এবং তার গম্বুজ হবে ৭৫ ফুট উঁচু যা সৌরজগতের প্রতিভূ।

১৯৭৪ : ফুড ফর লাইফ প্রতিষ্ঠা

মায়াপুর ১৯৭৪ সালে শ্রীল প্রভুপাদ একদিন দেখলেন কিছু স্থানীয় গ্ৰাম্যশিশু খাদ্য নিয়ে রাস্তার পশুদের সাথে কাড়াকাড়ি করছে। তা দেখে শ্রীল প্রভুপাদের হৃদয় বিদীর্ণ হল । অশ্রুসজল নয়নে তিনি তাঁর অনুসারীদের ডেকে বললেন, আজ থেকে মন্দিরের দশ মাইলের মধ্যে যাতে কেউ অভুক্ত না থাকে। মন্দিরগুলোর শুধুমাত্র মানুষকে আধ্যাত্মিক পরিপুষ্টি প্রদান করবে না শারীরিকভাবেও পুষ্টি প্রদান করবে। এই ধারণা থেকেই ইস্কন ফুড ফর লাইফের শুভযাত্রা শুরু । যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিনামূল্যে নিরামিষ খাদ্য বিতরণকারী সংস্থার একটি। এই সংস্থার সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে দুর্যোগপ্রবণ, মহামারীগ্রস্থ এবং দুর্ভিক্ষপ্রবণ এলাকায় বিনামূল্যে সুস্বাদু কৃষ্ণপ্রসাদ বিতরণ করে যাচ্ছে। দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস্ (১২ ডিসেম্বর ১৯৯৫) তথ্যমতে, চেন্নাই ফুড ফর লাইফের সদস্যরা বর্তমানে কলিকাতার মাদার তেরেসার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। হয়তোবা প্রচুর কঠিন হৃদয়ের সাধারণ মানুষরা এর গুরুত্ব এখন উপলব্ধি করতে পারছে না। ইস্‌কন ফুড ফর লাইফের কার্যক্রম বিশ্বের ৬০টিরও বেশী দেশে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন দুই বিলিয়নেরও থালা প্রসাদ বিতরণ হচ্ছে। যা প্রতি সেকেন্ডে ২৩ থালা। শুধুমাত্র ইস্‌কন ফুড ফর লাইফের ভারত শাখা প্রতিদিন স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১.২ মিলিয়ন থালা প্রসাদ বিতরণ করে।


বার্ষিক ১০ লক্ষ ডলার!

১৯৬৭ সালে তিনি শিষ্যদের মন্দিরে অর্থ সহায়তার জন্য ১ম বারের মতো ধূপকাটির ব্যবসা শুরু করতে নির্দেশনা দেন। জার বঝনেন মধ্যে স্পিরিচুয়্যাল স্কাই ইনসেন্স নামে এই ব্যবসাটি বার্ষিক দশ লক্ষ ডলার করে আয় করে (যা ২০০৪-এ ৪৬ লক্ষ ডলারের সমান)।

ফুড ফর লাইফ

বর্তমানে ফুড ফর লাইফের ২১০টি প্রজেক্ট দৈনিক ২ মিলিয়ন থালা প্রসাদ সরবরাহ করছে। এটি এখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ফুড রিলিফ কার্যক্রম যেটি এমনকি জাতিসংঘের বিশ্বখাদ্য কর্মসূচীকেও অতিক্রম করছে।

মাত্র ১৮ মাস

প্রভুপাদ সমগ্র চৈতন্য চরিতামৃতের পাণ্ডুলিপি (১৭ খণ্ডের) সম্পন্ন করেছিলেন মাত্র ১৮ মাসে।


১৯৭৪ : শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের ১৭টি খণ্ড প্রকাশ

চৈতন্য চরিতামৃত হলো বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী গ্রন্থ যা ভগবদ্ভক্তির আকর হিসেবে অবহিত করা যায়। তা শুধু জীবনী গ্রন্থ নয় তার সাথে আছে মহাপ্রভুর শিক্ষা । শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছিলেন এই আধ্যাত্মিক সম্পদ সারা বিশ্বে প্রচার করতে । এই লক্ষ্যে শ্রীল প্রভুপাদ দিনরাত কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন।

ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ : শ্রীল প্রভুপাদের প্রথম দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণ

শ্রীল প্রভুপাদ চারটি মহাদেশে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করেছিলেন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকাও বিজয়ের সংকল্প করেন। এই উপমহাদেশে আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ দুটি দেশ কারিকাস ও ভেনিজুয়েলায় শ্রীল প্রভুপাদ ভ্রমণ করেন। যেখানে তাঁর অনুসারীরা তার আগেই অনেক বড় কেন্দ্র স্থাপন করেছে। তিনি সেখানে তার ভক্তদের উদ্দাম নৃত্য কীর্তন দ্বারা অভ্যর্থিত হন। ভক্তদের উন্নত আধ্যাত্মিক স্থিতি যা ছিল কৃষ্ণের করুণা তা দেখে শ্রীল প্রভুপাদ খুব খুশি হন। এত বেশি সংখ্যক ভক্তদের উপস্থিতি ও তাদের আধ্যাত্মিক প্রগতি দর্শন করে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। তিনি সজল নয়নে তাদের জন্য কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি তাঁর শিষ্য ও অনাগত সমস্ত ভক্তদের জন্য প্রার্থনা করে তাদের জন্য রেখে আসেন কৃষ্ণভাবনামৃতের অমিয় সুধা। তাঁর বাক্য আজ সত্যে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা ভক্তির বন্যায় ভাসছে।

২০ এপ্রিল, ১৯৭৫ : বৃন্দাবনে কৃষ্ণ বলরাম মন্দিরের শুভ সূচনা

শ্রীল প্রভুপাদের বহু কাঙ্ক্ষিত একটি অভিলাষ ছিল বৃন্দাবনে একটি বিশাল মন্দির নির্মাণ করা। যেখানে শ্রীকৃষ্ণ তার বাল্যলীলা কাটিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের রাম নবমী তিথিতে শ্রীল প্রভুপাদ কৃষ্ণ বলরাম মন্দিরের শুভ উদ্বোধন করেন। কৃষ্ণ বলরাম মন্দিরটি সেই জায়গায় অবস্থিত যেখানে শ্রীল প্রভুপাদ বাস করতেন, প্রার্থনা করতেন এবং লিখতেন। বৃন্দাবনে বহু রাধাকৃষ্ণ মন্দির রয়েছে। কিন্তু এই মন্দিরের প্রধান বিগ্রহ কৃষ্ণ বলরাম। যখন কৃষ্ণ এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এই স্থানেই কৃষ্ণ তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরামের সাথে ক্রীড়া করতেন, গাভী চড়াতেন ও সেসাথে বহু লীলা বিলাসও করেছেন।

১৯৭৫ : ইস্‌কনের বিজ্ঞান শাখার উদ্বোধন

শ্রীল প্রভুপাদ বুঝেছিলেন আধুনিক বিশ্বের মানুষের মন সবকিছুতেই বৈজ্ঞানিক যুক্তি খুঁজে। যা বিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত নয় তা মেনে নেওয়া যায় না। তাই শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর বৈজ্ঞানিক শিষ্যদের ইস্কনের একটি বিশেষ বিজ্ঞান শাখা খোলার জন্য অনুপ্রাণিত করেন। যা মূলত হবে গবেষণা কেন্দ্র । যেখানে বৈদিক জ্ঞানের আলোকে সবকিছুকে ব্যাখ্যা করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ভক্তিবেদান্ত ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু। এই সংস্থা বিশ্বের জগদ্বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের আমন্ত্রণ জানায় এবং তাদের সাথে বিজ্ঞান ও বৈদিক জ্ঞানের সমন্বয় সাধন করার প্রয়াস করে। বর্তমানে এই সংস্থাটির বহু সদস্যরা বিজ্ঞানের আলোকে বিভিন্ন গবেষণামূলক নিবন্ধ ও গ্রন্থ প্রকাশ করছে ।

১৯৭৭ : কৃষ্ণের কাছে প্রত্যাবর্তন

শ্রীল প্রভুপাদ মানুষ যা স্বপ্নে কল্পনা করতে পারে না তার চেয়েও বেশী কিছু অর্জন করেছিলেন। তার জীবনের অন্তিম মুহূর্তের অর্জনও সাধারণ মানুষের কাছে অসাধ্য। প্রতিটি কৃষ্ণভক্তের অন্তিম লক্ষ্য থাকে কৃষ্ণের দিব্য লীলাস্থলী বৃন্দাবনে কৃষ্ণ নাম করতে করতে এই জড় শরীর পরিত্যাগ করা। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর ভক্তদের জীবিত কালীন সময়ে শিখিয়েছিলেন কিভাবে ভক্তির সাথে বেঁচে থাকতে হয় । মৃত্যুর সময় শেখালেন কিভাবে ভক্তির সাথে মরতে হয়। তিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্ত ভাগবতের তাৎপর্য প্রদান করেছেন। যখন তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যাচ্ছিল সেই সময় তাঁর মুখ থেকে বেরিয়েছিল তা ছিল কৃষ্ণ। সমস্ত তাঁর অন্তরঙ্গ শিষ্যরা তাঁকে পরিবেষ্টন করে কৃষ্ণনাম কীর্তন করছিল। ১৯৭৭ সালের ১৭ নভেম্বর কৃষ্ণনাম উচ্চারণ করে তিনি ফিরে যান তাঁর চিরকাঙ্ক্ষিত আরাধ্যদেব শ্রীকৃষ্ণের নিত্যালয়ে ।

অর্জন ও উত্তরসুরীদের জন্য রেখে যাওয়া সম্পদ :

শ্রীল প্রভুপাদ ১৯৭৭ সালে এই ধরাধাম ত্যাগ করেন। ধরাধাম ত্যাগ করার পূর্বে উত্তরসুরীদের জন্য যা রেখে যান তা আজকের বিশ্বের মানুষ প্রতিদিন তাদের আধ্যাত্মিক জ্ঞান শাণিত করার কাজে ব্যবহার করছে । তাঁর গুরুত্বপূর্ণ উপহারগুলো হলো গ্রন্থাবলী, মন্দির ও তাঁর অনুসারীরা। যখন তিনি নিউইয়র্কের রাস্তায় একজন অপরিচিত স্বামী হিসেবে হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন তিনি মন্তব্য করেছিলেন একদিন সময় তাকে ঐ সময়ের সকল মানুষের চেয়ে আলাদা হিসেবে ইতিহাসে স্থান দিবে। তাঁর এই কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৬৫-১৯৭৭ এই বার বছরের মধ্যে তিনি ১৪ বার বিশ্ব ভ্রমণ করে ১০৮টি মন্দির এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে কৃষ্ণভাবনার অমিয় ধারায় স্নাত করেছিলেন। তিনি ভারতীয় বৈদিক সভ্যতার ভিত্তিস্বরূপ আশিটি গ্রন্থও রচনা করেন। অর্থাৎ প্রতি বছর তার সাতটিরও অধিক গ্রন্থ এবং প্রতি দু’মাসে একটি করে গ্রন্থ এই বার বছরে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর জ্ঞানের প্রজ্ঞা প্রকাশ করতে গিয়ে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা গ্রন্থের ১৯৭৬ সালের সংস্করণে জানা যায়, ভক্তিবেদান্ত স্বামী একজন অত্যাশ্চর্য বৈদিক বিজ্ঞানি ও বৈদিক সাহিত্যিক ছিলেন। অনুরূপভাবে সিএনএন ২০১০ সালের ১৬ মে এক নিবন্ধে ঘোষণা করে যে, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ দশ জন ব্যক্তি যারা পঞ্চাশ বছর পর সফলতা লাভ করেছিলেন, তাদের মধ্যে অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদ সর্বশ্রেষ্ঠ। এ এল ভেসাম তার দ্যা ওয়ান্ডার গ্রেট ওয়াচ ইন্ডিয়া গ্রন্থে লিখেন হরেকৃষ্ণ আন্দোলন পাশ্চাত্যে এমন কিছু দিয়েছিল যা গত বিশ বছরে কেউ দিতে পারেনি।


৬২টি ইন্টারভিউ

১৯৬৮-৭৭ পর্যন্ত প্রভুপাদ মিডিয়াসহ বিভিন্নজনের কাছে মোট ৬২টি ইন্টারভিউ দেন।

৩৬টি প্রবন্ধ

১৯৩৬-৭২ পর্যন্ত প্রভুপাদ বিবিধ বিষয়ের ওপর মোট ৩৬টি প্রবন্ধ লেখেন।

ছবি ও ডকুমেন্টারি

প্রভুপাদের বিভিন্ন মুহূর্ত নিয়ে প্রায় ৩০ হাজার ছবি এবং ৭০ ঘন্টার অধিক ডকুমেন্টারি ফিল্ম ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে।

১৯১৪টি প্রবচন

প্রভুপাদ সারা বিশ্বের বিভিন্ন মন্দির, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, জনসমাবেশসহ বিভিন্ন স্থানে মোট ১,৯১৮টি প্রবচন প্রদান করেন।


 

Hore Krishna Thanks For Reading

ব্যাক টু গডহেড জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৬ হতে প্রকাশিত

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।