হেলিওডোরাস স্তম্ভ:

0
720

পাঠক, ভাবুন আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগের কথা। যখন হেলিওডোরাস নামে এক গ্রীক ব্যক্তি বাস করতেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল পাশ্চাত্যদেশীয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একজন কৃষ্ণভক্ত বৈষ্ণব। খ্রীষ্টের জন্মের বহু পূর্বে জন্ম নেওয়া হেলিওডোরাস সম্পর্কে তথ্য জানা সম্ভব হত না যদি না সাম্প্রতিককালে এক যুগান্তরকারী   প্রত্নতাত্তিক আবিষ্কার না হত।
হেলিওডোরাস খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দিতে ভারতে আসেন গ্রীক রাষ্ট্রদূত হয়ে। তৎকালীন সময়কার গ্রীক এবং ভারতীয় উপমহাদেশের কি ধরণের যোগাযোগ বা সম্পর্ক ছিল সেই সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যাইনি, এমনকি হেলিওডোরাস সম্পর্কিত তথ্যও আবিষ্কৃত হতো না, যদি না মধ্য ভারতের বেসনগর নামক স্থানে ১১৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের একটি স্তম্ভ আবিষ্কৃত না হত। বর্তমানে এই স্তম্ভ আবিষ্কারকে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্তিক আবিষ্কার বলে মনে করা হচ্ছে। কৃষ্ণভাবনামৃত দর্শন এবং তৎকালীন পৃথিবী সম্পর্কে জানতে এই স্তম্ভটি যথেষ্ট। কেননা দুই হাজার দু’শত বছর পূর্বে কিভাবে একজন পাশ্চাত্যবাসীর মনে কৃষ্ণভাবনামৃত দর্শন গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল, এটি তার দৃষ্টান্তস্বরূপ। গ্রীক দেশীয় তৎকালীন ভারতীয় টেক্সিলা রাজ্যের রাজা এ্যানশিয়েলকিডস; হেলিওডোরাসকে তৎকালীন ভারতীয় রাজা ভগভদ্রের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। ৩২৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট টেক্সিলা রাজ্যের অংশবিশেষ হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম অংশ বিজয় করেন। এ্যানশিয়েলকিডসের শাসনামলে উক্ত যে অঞ্চলসমূহ গ্রীকরা শাসন করত তা বর্তমান আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং পাঞ্জাব নিয়ে গঠিত। হেলিওডোরাসের এই স্তম্ভটি সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যদেশীয়দের নজরে আসে ১৮৭৭ সালে, যখন জেনারেল আলেকজান্ডার কানিংহাম এই স্থানে একটি প্রত্নতাত্তিক জরিপ সম্পাদন করেন। তবে সেই সময় এই স্তম্ভে বিদ্যমান শাস্ত্রলিপিগুলো নজর এড়িয়ে যায়। কেননা সেই সময় পিলারের উপর লাল সীসার আবরণ বিদ্যমান ছিল। তৎকালীন সময়ে একটি ঐতিহ্য ছিল যে, তীর্থযাত্রীরা যেকোন স্তম্ভকে তাদের আরাধনার অংশ হিসেবে সিঁধুর লাগিয়ে দিত। কানিংহাম যখন এই স্তম্ভটি পর্যবেক্ষণ করেন তখন তিনি এটির স্থাপত্যকাল নির্ণয় করেছিলেন গুপ্তযুগের অর্থাৎ ৩০০ থেকে ৫৫০ খ্রীষ্টাব্দের। ৩২ বছর পর যখন (১৯০৯ সালে) এই স্তম্ভের গায়ে লিখিত শাস্ত্রলিপিগুলো আবিষ্কৃত হল, তখন বোঝা গেল যে, এই স্তম্ভ তৎকালীন ধারণার চেয়েও অধিক পূর্বে নির্মাণ করা হয়েছিল।
১৯০১ সালের জানুয়ারি মাসে মিস্টার লেক নামক ব্যক্তি উপলব্দি করেন যে, এই স্তম্ভের নিচের দিকে কিছু একটা লেখা আছে। এরপর তার ধারণা সত্য হয় যখন তিনি স্তম্ভের কিছু সিঁধুরের রং পরিষ্কার করেন। মি. লেকের সঙ্গী ড. জ. স. মার্শাল ১৯০৯ সালে জার্নাল অব দ্যা রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের তথ্য বর্ণনা করেন। মার্শাল এবং লেকের বর্ণনা অনুসারে এই স্তম্ভের নিমার্ণকাল গুপ্তযুগেরও কয়েক শতাব্দীর পূর্বে। এই সময়কাল নির্ণয় করা গেলেও সেখানের শিলালিপি সম্পর্কিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। জার্নাল অব দ্যা রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রকাশিত এই কলামের লেখাগুলো পড়ে বোঝা যায় যে এগুলো ছিল প্রাচীন ব্রাহ্মিলিপিতে লেখা। ব্যাক টু গডহেড অবলম্বনে হেলিওডোরাস স্তম্ভে লিখিত ব্রাহ্মিলিপিঃ
১. দেবাদিব্যাস বাসুদেবস্য গরুধ্বজ্য অথম
২. করিতো অ হেলিওডোরিনা ভগ
৩. ভতিনা দিয়াসা পুত্রিনা টাখসিলাক্সনা
৪. যনদতিনা অগতিনা মহারাজস
৫. অমতলিকিতাস উপমতা শঙ্খসম রানো
৬. কাশিপুতরস ভগবাদ্রস তর্তরস
৭. ব্যাসিনা চর্তুদসিনা রাজেন ভধামানস
অনুবাদঃ দেবতারও দেবতা পরমেশ্বর বাসুদেবের (বিষ্ণু) এই গরুড় স্তম্ভটি স্থাপিত হয়েছে বিষ্ণুভক্ত হেলিওডোরাস কর্তৃক যিনি হচ্ছেন ডিওনের পুত্র এবং টেক্সিলার অধিবাসী। যিনি রাজা এ্যানশিয়ালডসের আদেশে গ্রীক রাষ্ট্রদূত হিসেবে ত্রাতা রাজা কাশিপুত্র ভগভদ্রের নিকট এসেছিলেন, যিনি ১৪ বছর যাবৎ সফলভাবে রাজত্ব করছেন।
১. ত্রিনি অমূতাপদানি – সু অনূথিতানি
২. নয়মতি সগ দম ছগো অপরামাদো
অনুবাদঃ তিনটি অমর পন্থা….যা স্বর্গ গমনে সহায়ক আত্মনিয়ন্ত্রণ, সদয়তা, বিবেকিতা।
হেলিওডোরাসের স্তম্ভে লিখিত ব্রাহ্মিলিপি থেকে স্পষ্টত বোঝা যায় যে, হেলিওডোরাস ছিলেন একজন বৈষ্ণব, বিষ্ণুভক্ত। বাসুদেব এবং বিষ্ণু উভয় নামই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিখ্যাত নাম হিসেবে পরিচিত। এছাড়া হেলিওডোরাসের প্রত্যয়ন তথা আত্মনিয়ন্ত্রণ (দম্), আত্মউৎসর্গ (ছাগো) এবং সতর্কতা (অপারমাদো) গুণসমূহ দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করছে যে, তিনি একজন কৃষ্ণভক্ত ছিলেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কুঞ্জগোবিন্দ গোস্বামী হেলিওডোরাস সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি ভাগবত ধর্ম তথা বৈষ্ণব ধর্মের সকল শাস্ত্র সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
এখন পর্যন্ত থাকা রেকর্ডমতে, হেলিওডোরাস হচ্ছেন বৈষ্ণবধর্মে পরিবর্তিত হওয়া প্রাচীন পাশ্চাত্যবাসী। কিন্তু এ. এল. ব্যাসাম, টমাস হোপকিন্স সহ আরো বিখ্যাত ঐতিহাসিকদের মতে শুধুমাত্র হেলিওডোরাস নন আরো অনেকেই বৈষ্ণব ধর্ম তৎকালীন সময়ে গ্রহণ করেছিলেন। ‘ফ্রাঙ্কলিন ও মার্শাল’ কলেজের ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হোপকিন্স বলেন যে, যেহেতু হেলিওডোরাসের অস্তিত্ব সম্বলিত একটি স্তম্ভ আবিষ্কৃত হয়েছে সেহেতু ধারণা করা সহজ যে এই ধরণের আরো অধিক স্থাপত্য তখন ছিল এবং আরো অনেকে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিল।
আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে স্তম্ভ সমূহের একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে বৈষ্ণব দর্শনে কৃষ্ণের প্রতি বিশুদ্ধ ভক্তি এবং খ্রীষ্টিয় বিশ্বাসের মধ্যে মিল রয়েছে। ওরিভার ম্যাকনিকল সহ অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন যে, কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ধর্র্মই পরবর্তীতে বিকৃতভাবে শাখাপ্রশাখা ব্যাপ্ত হয়ে খ্রীষ্টিয় ধারা এসেছে, আর এজন্যই কৃষ্ণ এবং খ্রীষ্ট শব্দের সাদৃশ্য লক্ষ্য করার মত। এছাড়া এই আবিষ্কারের মাধ্যমে বৈষ্ণব ঐতিহ্য যে খ্রীষ্টিয় ধারার পূর্বে দুই হাজার বছর আগে বর্তমান ছিল তা প্রমাণিত হয়।
হেলিওডোরাসের এই স্তম্ভ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আর্বিভাবের সঙ্গে একটি সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই হয় যে, যদি কৃষ্ণ দ্বাপর যুগে আর্বিভূত হয় তবে পশ্চিমা দেশগুলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে কি অবগত ছিলেন না? ২৫০০ বছর পূর্বে এই হেলিওডোরাস স্তম্ভ বা কৃষ্ণভক্ত হেলিওডোরাস হল তার প্রমাণ অর্থাৎ আজকের পশ্চিমা দেশগুলো শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা সম্পর্কে তখনো অবগত ছিলেন। ॥ হরে কৃষ্ণ ॥

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ  এপ্রিল ২০১১ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here