সাত নোবেল বিজয়ী

0
580

‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ এ যুদ্ধ বহুকার আগে থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত সাধারণ লোকদের মাঝে চলে আসছে। বলতে গেলে এখনকার যুগে এটি অতি সাধারণ ব্যাপার। অনেক সময় বিজ্ঞঅন ও ধর্মের শ্রেষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। এ প্রশ্নের উত্তরই যতসব দ্বন্দ্ব বিবাদ শুরু করে দেয়। তবে শ্রীল প্রভুপাদের উন্নত দর্শন বরাবরই নাস্তিক বিজ্ঞানীদের পরাস্ত করে আর ফলশ্রুতিতে কোন কোন সময় তিনি তাদেরকে তিরস্কার করতেও কার্পণ্যবোধ করতেন না। তারই প্রতিষ্ঠিত ভক্তিবেদান্ত ইনিষ্টিটিউট এখনো পর্যন্ত লড়ে চলেছেন সেসব নাস্তিক বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। তাই প্রায় সাড়ে পাঁচশরও বেশি বিজ্ঞানীভক্ত এ সংস্থার সফলতার এক বিরাট উদাহরণ। মূলত এটির তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত ছিল ইস্‌কন অন্যতম আচার্য ভক্তিস্বরূপ দামোদর স্বামী (টি.ডি সিংহ) পি.এই.ডি। যিনি নিজেও একজন বিজ্ঞানী মূলত সনাতন ধর্মের উচ্চতর দর্শন দিযে বিজ্ঞানের নাস্তিক দর্শনকে পরাস্ত করাই এ ইনস্টিটিউটের উদ্দেশ্যে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বরূপ দামোদর মহারাজ বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞঅনীদের নিয়ে অনেক সম্মেলনের আয়োজন করেন। ১৯৮৬ এবং ১৯৮৭ সালে প্রথম এবং দ্বিতীয় The Synthesis of Science and religion সম্মেলনে সাতজন নোবেল বিজয়ীদেরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। যারা সবাই ধর্ম এবং বিজ্ঞানের গভীর একাত্মতা সম্বন্ধে বিভিন্ন যুক্তিও প্রমাণ তুলে ধরেন। এদের মধ্যে চিলেন শান্তিতে পুরস্কার প্রাপ্ত নোবেল বিজয়ী দালাইলামা, ফিজিওলোজি ও মেডিসিনে নোবেল বিজয়ী জজ ওয়াল্ড, পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী চার্লস এইচ টাউন, শান্তিতে নোবেল বিজয়ি বেটি ইউলিয়ামস, পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বি.ডি জোসেপসন, রাসয়নে নোবেল বিজয়ী রিচার্ড আর আর্নস্ট এবং ফিজিওলোজি ও মেডিসিন বিভাগে নোবেল বিজয়ী ওয়েরনার আর্বঅরসহ অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীরা এক বিস্তৃত আলোচনার মাধমে এ সমস্ত বিজ্ঞানীরা আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত উক্তিকে “বিজ্ঞান ধর্মবিহীন খোড়া” পূর্ণ সমর্থন জানায়। প্রফেসনর আরবার জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনায় বলেন, “অনেক রসায়ন এবং জীববিজ্ঞানীরা বলে থাকে যে, দেহ হল অনেকগুলো অনূকণার সমন্বয় এবং ল্যাবরেটরীতে জীবন তৈরির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমার অভিমত, কিভাবে এত সুন্দর কিন্তু জটিল কাঠামো তৈরি হয়েছেয় যা আমার কাছে সত্যিই অদ্ভুদ।”
এখানে নিশ্চয়ই একজন সৃষ্টিকর্তা বা ভগবানের হাত রয়েছে ।“নোবেল বিজয়ী জর্জওয়ার্ল্ড এ মতামতকে আরও জোড়ালো করেছেন, যখন তিনি বলেন যে, “বেদান্তের দর্শন থেকে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে ব্যাখ পাওয়া খুব সহজ।” 

অন্যদিকে রজান পেনরসের মত বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব রাখেন যে, “চেতনার উৎস সম্পর্কে জানতে পারমার্থিক পথ হবে নতুন বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনায় সমস্ত বিজ্ঞানীরা একমত হন যে, চেতনা সহ পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তৈরির পেছনে একটি উন্নততর বুদ্ধি কাজ করেছে যিনি হলেন সৃষ্টিকর্তা”

এরপরই আসে বিশ্বাস প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে অনেকেই বলে থাকেন ‘ধর্ম’ হল বিশ্বাস আর বিজ্ঞানই হল ‘জ্ঞান’। প্রফেসর টাউন এই বিশ্বাস প্রসঙ্গেই উচিত জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বিজ্ঞান নিজেই বিশ্বাসের উপর দাড়িয়ে। আমরা জানি না আমাদের যুক্তি সঠিক। আমি জানি না আপনি সেখানে । আপনি জনেন না আমি এখানে। আমরা শুধুমাত্র সমস্ত বিষয়টি কল্পনা করি। আমার একটি বিশ্বাস আছে যে, এ বিশ্বটি দেখতে এরকম এবং সেভাবে আমি বিশ্বাস করি আপনি সেখানে । আমি এটি কোন দর্শনের উপর ভিত্তি করে প্রমাণ করতে অক্ষম। আমি মনে করি ‘ধর্ম বিশ্বাস,বিজ্ঞান হল জ্ঞান’ এটি সম্পূর্ণ ভুল। এটি বিজ্ঞানের প্রকৃত ভিত্তিকে হারিয়ে ফেলে যেটি হল বিশ্বাস। আমরা বিজ্ঞানীরা বহির্জগতের অস্থিত্বে বিশ্বাস করি এবং আমাদের যুক্তির বৈধতাও বিশ্বাস করি। আমরা এটাতেই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট অনুভব করি। তথাপিও এসমস্ত কিছুই হল বিশ্বাস । আমরা সেগুলো প্রমাণ করতে পারি না”। এদিকে দালাইলামা মনের উন্নতি সাধনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “যদি মন ও বুদ্ধিমত্তা উন্নত হত তবে সেই মন জগতের নেতিবাচক ভাবনা দিয়ে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা এত অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-বিবাদ লাগাতো না। তাই পারমার্থিকতা অর্থাৎ ধর্মের মাধ্যমে মন ও বুদ্ধিমত্তা উন্নত হলে তখন বিজ্ঞান খুব সুন্দরভাবে এগুবে। কিন্তু আধুনিক কালে এটি বড়ই দুর্লভ। তাই আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি ধর্ম এবং বিজ্ঞান যদি একসাথে কাজ করে তবে ভবিষ্যত প্রজন্ম খুবই সুন্দর এবং সুখীতর সমাজ পাবে।” বিডি জোসেফসন নতুন বিজ্ঞানের ধারণা দিতে গিয়ে বলেন, “যদি আমরা ভগবানকে বিজ্ঞানের সঙ্গে রাখি তখন বিজ্ঞানের নিবিড় তত্ত্ব সম্পর্কে আমরা অবগত হতে পারি, আমরা ভগবানের বুদ্ধিমত্তা এবং ভগবান একজন দিব্য পুরুষ সে সম্পর্কে অবগত হতে পারি। সে সঙ্গে অতি উচ্চতর স্তরের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও আমরা জানতে পারব।” বেটি উইলিয়ামসও এ বিষয়ে তার সাথে একমত। পক্ষান্তরে তিনি এ জগতের সবাইকে একটি  “ক্ষুদ্র মানব পরিবার” হিসেবে বিবেচনা করেছেন যেখানে ভগবানকে তিনি প্রকৃত পরিচালক অর্থাৎ পিতার আসনে বসিয়েছে এবং তিনি মনে করেন এ ধরনের দর্শন সত্যিই এ জগতকে পরিবর্তন করতে পারে। এভাবে এ সাত নোবেল বিজ্ঞানীরা ধর্মেকে একটি মহৎ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন যেখানে গুরুত্ব পেয়েছে, বেদান্তের অতি উচ্চতর দর্শনসমূহ।

যেখানে স্বরূপ দামোদর মহারাজের সাথে বিভিন্ন সময় এসব বিজ্ঞানিদের সাথে ধর্ম ও বিজ্ঞান বিষয়ে মত বিনিময় সভায় এসব নোবেল বিজয়ীরা বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি হিসেবে ধর্মকে দাঁড় করিয়েছেন, সেখানে নিঃসন্দেহেই সবাইকে মনগত জল্পনা কল্পনা বা অবিশ্বাসকে দূরে ঠেলে দিয়ে সনাতন ধর্মের এ সমৃদ্ধময় উচ্চস্তরের দর্শন গ্রহণ করা উচিত। তবেই বিজ্ঞান এবং ধর্ম নামক এ যুদ্ধের অবসান অচিরেই ঘটবে সেদিন হয়ত আর বেশি দূরে নয় যার প্রমাণ এ সাত নোবেল বিজয়ীরাই। হরেকৃষ্ণ।

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ নভেম্বর ২০০৯ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here