সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু

0
28

একটি অতিসুন্দর বন্ধুত্বের পরিসমাপ্তির পর বন্ধুত্বের প্রকৃত অর্থের সন্ধান লাভ
দ্বারকাধীশ দেবী দাসী

জনি, আমার বান্ধবী, পথের ধারে একটি ঘরে বাস করত। তার ছিল লম্বা কোকড়ানো চুল এবং প্রতিবেশীদের কেউই তার চেয়ে ভাল রোলার স্কেট চালাতে পারত না। আমরা আমাদের শৈশব একসাথে কাটিয়েছি। ইস্পাতের রোলার স্কেটগুলো নিয়ে ফুটপাত দিয়ে আমাদের হেঁটে যাওয়া, পুতুলগুলো নিয়ে টানা হেঁচড়া করা, লুকোচুরি খেলা, বাড়ির পেছনে কচ্ছপ দৌড়। আমরা একে অন্যের সাথে এমন গভীরভাবে ক্রীড়ায় মগ্ন থাকতাম যে, মনে হতো যেন পুরো সপ্তাহ অনবরত আমরা খেলে যেতে পারব। গ্রীষ্মকালে জনি এবং আমি বাড়ির পেছনের সরোবরে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাতাম। শীতে আমরা পদব্রজে ভূতের বাড়ি এড়িয়ে বনের মধ্যে দিয়ে সতর্কতার সাথে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যেতাম। আমরা নিয়মিতভাবে আমাদের ছোট বোনদের এড়িয়ে যেতে লাগলাম এবং একে অন্যের সাথে গভীরভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিস্থাপিত হল।
হাই স্কুলে থাকাকালীন সময়ে জনি একটি উজ্জ্বল কমলা রঙের ঘোড়া লাভ করল। এই সময় তাকে আমি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম। আমরা কাপড়ও একে অন্যকে শেয়ার করতাম এবং দুইজনে আইসক্রিম কোম্পানিতে পার্ট টাইম চাকুরিও পেলাম।
জনি ছাড়া আমাকে আর এই পৃথিবীতে কেউ বেশি বুঝতে পারত না। আমাদের বন্ধুত্ব আমার জীবনে এতই বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, আমি কখনো ভাবতে পারিনি যে একসময় এর পরিসমাপ্তি ঘটবে।
কিন্তু এটি খুব দ্রুত পরিসমাপ্তি হয়েছিল যখন আমরা হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করি। সে বিয়ে করল, আমি কলেজে গেলাম এবং আমাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটল। এরপর আমাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার পরিস্থিতি পাল্টালো, আমরা একে অন্যকে ভদ্রোচিত ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা করছিলাম। এমনকি কয়েক বছর আগে যখন তাকে দেখলাম, প্রথমে তাকে চিনতে পারলাম না। এখন যখন সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতি শুনি-“বেস্ট ফ্রেন্ড”, তখন আমি জনির কথা ভাবতে থাকি । এখনো মনে পড়ে আমি আমন্ত্রণ পাই নি বলে সে একটি পার্টিতে গেল না। আমার মনে পড়ে ওর বয়ফ্রেন্ড তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল বলে আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম। একসাথে বসে পপকর্ণ খাওয়া, নিজেদের জীবনের জটিলতা নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। আমাদের কোন অভিজ্ঞতাই পরিপূর্ণ হতো না যদিনা আমরা একে অন্যের সাথে তা আলোচনা না করতাম, এমন কোন ভাবাবেগ ছিল না যা শেয়ার করা আমার জন্য ক্লেশকর হবে। বন্ধুত্বের স্মৃতি এবং সুখ, এই বন্ধুত্বকে বহুদিন বাঁচিয়ে রাখে।

অনুরাগী মন

এটি একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা যে, এই ধরনের অনুরাগ আমাদের মনকে হারানো বন্ধুত্বের জন্য কষ্ট দেয়। বিভিন্ন কারণে বন্ধুত্ব হারাতে পারে, কিন্তু তার পরিস্থিতি অনিশ্চিত। যখন বন্ধুরা দূরে কোথাও চলে যায় কিংবা আমাদের আগ্রহ আমাদের দূরে সরিয়ে দেয় কিংবা আমাদের মধ্যে যখন ভুলবোঝাবুঝি হয় তখন আমাদের হৃদয়ের সংযোগে বিশ্বাসঘাতকতারূপ বাঁধা সৃষ্টি হয়, তখন আমরা বন্ধুত্ব হারাই। এছাড়াও মৃত্যু হচ্ছে নির্ধারিত বিচ্ছেদ। কিন্তু বন্ধুত্বের মধ্যে এতই গভীর এবং পুনঃউদ্ধার করার ক্ষমতা আছে যে আমরা দুঃখ-বেদনার মাঝেও বারংবার সেই বন্ধুত্বের সম্পর্কের পেছনে ধাবিত হই।
শ্রীল প্রভুপাদ এই জড়জগতে বন্ধুত্বকে তুলনা করেছেন মরুভূমির বুকে এক ফোঁটা জলের ন্যায়। বন্ধুত্ব হল এমন বিষয় যা লাভের জন্য আকাঙ্ক্ষি হই। এই জগতে বন্ধুত্ব এত ক্ষুদ্র পরিমাণে বিদ্যমান যে, এটি আমাদের তৃষ্ণা মেটাতে পারে না।
শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন, “সমাজ, বন্ধুত্ব এবং ভালবাসা কিন্তু আদৌ মিথ্যা নয়, কিন্তু আমরা যেই স্থানে তার খোঁজ করছি সেটি মিথ্যা।”
হ্যাঁ, তবে আমাদের গভীরতম আবেগসমূহ উপলব্ধি করার মত কেউ নিশ্চয় রয়েছেন, যিনি গভীরভাবে আমাদের ব্যাপারে যত্নবান, যিনি আপনার অতিদুঃখের সময়েও আপনার সহজাত আন্তসৌন্দর্যকে অবলোকন করে, যিনি কখনোই আপনাকে ছেড়ে যাবে না। তিনি হলেন কৃষ্ণ।
আমরা যারা পরমেশ্বর ভগবানের সাথে আমাদের সম্বন্ধকে ভুলে গিয়েছি তাদের হতাশাবোধ করা স্বাভাবিক । আমাদের স্মৃতিবিভ্রমের অবস্থানে আমরা কৃষ্ণের প্রীতিময় উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারি না, আর তাই কৃষ্ণ আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু এই উপলব্ধির বিচারটি হয় অন্তসারশূন্য। যখন মদের বোতল আর সিগারেটের ফুকের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কে মেশানো হয়, তখন সৃষ্টিকর্তার সাথে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বুঝতে পারা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়। কিন্তু যখন আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হব যে, কৃষ্ণ আমাদের হৃদয়ে অবস্থান করছেন জন্মের পর জন্ম ধরে, তখন আমরা প্রকৃত বন্ধুত্ব কি তার উপলব্ধি করতে পারব। আমরা যদি রাজা হই কিংবা একটি কুকুরও হই তবুও তিনি বন্ধুরূপে সবর্দাই আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। তিনি কখনোই আশা পরিত্যাগ করেন না, কিংবা আমাদের প্রতি বিতৃষ্ণায় আমাদের ত্যাগ করেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা এই জগতে আনন্দের খোঁজে বিরক্ত হয়ে না পড়ছি ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি স্থিরভাবে অপেক্ষা করেন। তিনি আমাদের একগুয়েমি, এমনকি ভগবানের নিন্দাও সহ্য করেন। তিনি আমাদের ত্রুটি মার্জনা করেন। আমাদের প্রতি ভগবানের ভালোবাসা অহৈতুকি। কে এই ধরনের বন্ধুত্ব লাভের জন্য উৎসাহী নয়?

কৃষ্ণের বন্ধুত্বের ঝলক

আমার কিছু অসাধারণ অভিজ্ঞতা রয়েছে যার মাধ্যমে আমি কৃষ্ণের নিত্য বন্ধুত্বের ঝলক উপলব্ধি করতে পেরেছি। তার মধ্যে কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে একান্ত নিজস্ব, অনেক সময় যখন আমি দুঃখকষ্টে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, তা সত্ত্বেও যেকোনোভাবে আমার হৃদয়ে অবস্থানকারী আমার প্রিয়তম বন্ধুর উপস্থিতি এবং সহমর্মিতা উপলব্ধি করতে পারি। তার মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তিগত মুহূর্ত রয়েছে, যা কেবলমাত্র তার কাছেই বলা যায় যে আমার প্রতিটি উপলব্ধি সম্পর্কে অবগত। মাঝে মাঝে আমি দেখেছি যে, যখন আমার জীবনের চাকা রূদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন কৃষ্ণ জীবন গাড়ির চাবি আমাকে দিয়েছিলেন, এছাড়াও তিনি অনেকসময় আমাকে পূর্ব অভিজ্ঞতার শিক্ষা নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন যা একজন সত্যিকার বন্ধুর সর্বোচ্চ সহানুভূতি স্বরূপ।
কৃষ্ণকে সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু হিসেবে জানার অর্থ এই নয় যে, আমরা আর এই জগতের কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে পারব না। বরং যখন আমরা জানব যে আমাদের প্রিয়তম বন্ধু সকলকে গভীরভাবে ভালোবাসে তখন আমরা একে অন্যর প্রতিও ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারব। ঠিক যেমন এই জগতে শ্রীল প্রভুপাদের মত যত্নবান এবং প্রেমময় সমমর্মি কেউ নেই, যা পূর্ণ উপলব্ধি সম্পন্ন আত্মার একটি পরিপূর্ণ উদাহরণ। এমনকি যেসমস্ত ব্যক্তির ভগবানের প্রতি কোনো আকৃষ্টতা ছিল না তারা শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, কেননা তিনি তাদের ওপর প্রকৃত উষ্ণতা ও সৌহার্দ্যতা প্রদর্শন করেছিলেন। এটি শুদ্ধ ভক্তের একটি স্বাভাবিক গুণাবলী।
তাই আমরা যখন বৈদিক শাস্ত্র থেকে জানতে পারি যে, এই জগতে কোনো প্রেম নেই, এটি আমাদের বিলাপের কারণ নয় কিন্তু এটির মাধ্যমে আমরা আশ্বস্থ হতে পারি যে, আমাদের হৃদয়ে অবস্থানকারী কৃষ্ণ পরম বন্ধু। ভালোবাসা এবং বন্ধুত্ব সহনশীল হবে না যদিনা পরমেশ্বর ভগবান আমাদের প্রতি কেন্দ্রিয়ভাবে ভালোবাসার শক্তি প্রয়োগ করে না থাকেন। ঠিক যেমন একটি ক্ষুদ্র মোমবাতির শক্তি বিশাল সূর্যের তুলনায় তুচ্ছতর মনে হয়, তেমনি ভগবানের প্রতি আমাদের সত্যিকারের ভালোবাসার সম্পর্কের তুলনায় আমাদের জাগতিক সর্বোচ্চ বন্ধুত্বের সুখকে তুচ্ছতর মনে হয়। যেহেতু শ্রীল প্রভুপাদ প্রতিজ্ঞা করেছেন, “যদি আমরা কৃষ্ণের সাথে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করি, এটি কখনোই ভঙ্গ হবে না।”

(দ্বারকাধীশ দেবী দাসী নিয়মিতভাবে ব্যাক টু গডহেড এ অবদান রেখে চলেছেন। তিনি এবং তাঁর পরিবার ফ্লোরিডার আলাচুয়ার হরেকৃষ্ণ কমিউনিটির সদস্য।) 


 

এপ্রিল-জুন ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here