সমাজ দেহের রোগ-আরোগ্যের জন্য মহাবিদ্যালয় স্থাপন

0
33
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এবং তাঁর কিছু শিষ্যের মধ্যে, ১৯৭৪ মার্চ মাসে, ভারতের বৃন্দাবনে এই কথোপকথনটি হয়েছিল ।

শ্রীল প্রভুপাদ: এই যুগে রাজনীতিবিদদের কাজ হবে হতভাগ্য নাগরিকদের শোষণ করা, আর নাগরিকেরা এর ফলে অত্যন্ত হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, তারা অত্যন্ত নির্যাতিত হবে। একদিকে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের ফলে খাদ্যসংকট দেখা দেবে, অন্যদিকে থাকবে সরকারের আরোপিত অত্যধিক করের বোঝা। এইভাবে মানুষ এত বেশি বিপর্যস্ত হবে যে, তারা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অরণ্যে গিয়ে আশ্রয় নেবে
আত্রেয় ঋষি দাস: বর্তমানে সরকার কেবল কর সংগ্রহ ছাড়া কিছুই করছে না।
শ্রীল প্রভুপাদ: সরকারের কর্তব্য হচ্ছে প্রত্যেকেই যাতে তার যোগ্যতা অনুসারে কোনো কর্মে নিযুক্ত হয় তা দেখা। বেকারত্ব থাকা উচিত নয়-সমাজে বেকারত্ব হচ্ছে বিপজ্জনক এক পরিস্থিতি। কিন্তু সরকার মানুষকে গ্রাম থেকে টেনে শহরে নিয়ে এসেছে। তারা এরকম চিন্তা করছে, “কৃষিজমিতে এত মানুষের কাজ করার দরকার কি? পরিবর্তে আমরা পশুগুলিকে হত্যা করে খেতে পারি।” এসব তাদের পক্ষে খুবই সহজ-কেননা তারা কর্মের নীতি মানে না, এসব পাপকর্মের জন্য অবশ্যম্ভাবী ফলভোগের নিয়মটিকে গ্রাহ্য করে না। “আমরা যদি নিরীহ পশুদের মাংস ভক্ষণ করতে পারি, তাহলে জমি চাষ করার এক ঝক্কি ঝামেলা ভোগ করার দরকার কি?” সেটাই সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে।
আত্রেয় ঋষি দাস: হ্যাঁ, কৃষকদের ছেলেরা এখন কৃষিকর্ম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে।
শ্রীল প্রভুপাদ: তুমি কি “মাথাহীন মুণ্ডহীন” ব্যাপারটা জানো? নেতারা সেটাই চায়। তারা চায় যে, হোটেলগুলো কলেজ-গার্লদের সংগ্রহ করুক, আর অতিথিরা এসে সেইসব মেয়েদের উপভোগ করুক। সারা পৃথিবীতে সমগ্র জনসমাজ এভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে। তাহলে মানুষ কিভাবে ভাল সরকার আশা করবে? কিছু লোক সরকারের দায়িত্ব নেবে, কিন্তু তারা দূষিত।
সেজন্য যেখানেই আমাদের একটি হরেকৃষ্ণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে, সেখানেই অবিলম্বে মানুষকে প্রশিক্ষণ দানের জন্য আমাদের উচিত একটি কলেজ স্থাপন করা। প্রথমে তাদের স্বাভাবিক প্রতিভা অনুসারে (বৌদ্ধিক, প্রশাসনিক, উৎপাদনমুখী এবং শ্রম সংক্রান্ত) বিভিন্ন বিভাগ থাকবে। আর প্রত্যেকেই আমাদের নির্ধারিত পারমার্থিক কার্যকলাপগুলি অনুশীলনের মাধ্যমে তারা পারমার্থিক চেতনার স্তরে উন্নীত হবে; সেগুলি হচ্ছে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন, ভগবদ্গীতা থেকে আত্মোপলব্ধির বিজ্ঞান শেখা, আর সবকিছু কৃষ্ণের প্রতি সেবা হিসেবে সম্পাদন করা। তার ফলে প্রত্যেকের জীবন পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভক্তিসেবাময় হয়ে উঠবে।
একই সাথে, ব্যবহারিক বিষয়াদির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের বিভিন্ন সামাজিক বর্ণবিভাগের মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, কেননা বিভিন্ন ধরনের মস্তিষ্ক রয়েছে। যাদের অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মস্তিষ্ক রয়েছে তাদের ব্রাহ্মণ হওয়া উচিত, যেমন পুরোহিত, শিক্ষক, উপদেষ্টা। যারা পরিচালন এবং অন্যদের সুরক্ষা দানে সমর্থ তাদের ক্ষত্রিয় হতে হবে-প্রশাসক এবং সামরিক কর্মী। যারা কৃষিকাজ ও গো-রক্ষার জন্য উপযোগী তারা হবে বৈশ্য, ব্যবসায়ী। যারা অন্যদের সহায়তা করবে আর বিভিন্ন রকম পেশা, বৃত্তি, ছোট ব্যবসা ইত্যাদি গ্রহণ করবে তারা হবে শূদ্র, কর্মজীবী শ্রেণি ৷
সমাজ দেহে অবশ্যই কর্মের বিভাজন থাকবে ঠিক যেমন তোমার দেহে রয়েছে। যদি প্রত্যেকেই মস্তিষ্ক (বুদ্ধিজীবী) অথবা বাহু (প্রশাসক) হতে চায়, তাহলে উদর (কৃষক) ও পায়ের (শ্রমজীবীর) কাজ করবে কে? প্রত্যেক পেশারই প্রয়োজন রয়েছে। মস্তিষ্কের প্রয়োজন, বাহুর প্রয়োজন, উদরের প্রয়োজন, পায়ের প্রয়োজন। সেজন্য তোমাকে সমাজ দেহকে তোমার দেহটির মতোই সুসংগঠিত করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক নির্ধারিত চারটি স্বাভাবিক বিভাগ সমাজে রয়েছে-কিছু মানুষ সমাজ দেহের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করবে, কিছু লোক বাহু হিসেবে কাজ করবে, কিছু মানুষ উদরের কাজ করবে এবং কিছু মানুষ পা হিসেবে কাজ করবে। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজদেহকে নিখুঁতভাবে ঠিক রাখা।
তোমাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রত্যেকেই যেন তার যোগ্যতানুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো কর্মে নিযুক্ত হয়। সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রত্যেক কর্মই ভগবানের প্রতি ভক্তিমূলক সেবায় পরিণত হতে পারে।


 

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here