সমগ্র ভারতবাসীর জন্য ভগবান শ্রীচৈতন্যের নির্দেশ

0
169

ভদ্র মহোদয়গণ, আমি আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি এই মহা আন্দোলনে আপনাদের মহৎ যোগদানের জন্য। এই আন্দোলন আমার দ্বারা শুরু হয় নি। এই আন্দোলন বহু বহু পূর্বে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ দ্বারা সূচিত হয়েছিল। সর্বপ্রথমে তিনি ভগবদ্গীতার দর্শন সূর্যদেবকে প্রদান করেছিলেন, এটি ভগবদ্‌গীতাতে (৪/১) বর্ণনা করা আছে।

ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্ ।
বিবস্বান্মবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীৎ ॥
“পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন- আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবস্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ বলেছিলাম। বিবস্বান মানবজাতির জনক মনুকে বলেছিলেন এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন।’ আমরা যদি মনুর আয়ুষ্কাল হিসাব করি তাহলে আমরা জানতে পারবো যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সূর্যদেব বিবস্বানকে অন্ততঃ চল্লিশ কোটি বৎসর পূর্বে গীতার এই জ্ঞান দান করেছিলেন। সূর্যদেব বিবস্বান সূর্যগ্রহকে পরিচালনা করছেন, তার পুত্র হলেন বৈবস্বত মনু এবং মনুর পুত্র ইক্ষ্বাকু, তিনিই হলেন সূর্যবংশের প্রতিষ্ঠাতা যে বংশে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র আবির্ভূত হন।
সুতরাং এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সুদূর অতীত থেকে চলে আসছে। কিন্তু কৃষ্ণ বলেছেন, ’এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ। ‘এভাবেই পরম্পরা ধারার মাধ্যমে প্রাপ্ত এই পরম বিজ্ঞান রাজর্ষিরা লাভ করেছিলেন।’ (গীতা ৪/২)
এই ছিল ভগবদ্‌গীতার তার জ্ঞান লাভের উপায়। বর্তমানে পাঁচ হাজার বছর আগে যখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন যুদ্ধ করবেন কি না সেই বিষয়ে হতবুদ্ধি তখন শুধুমাত্র অর্জুনকে যুদ্ধে নিয়োজিত করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে গীতার জ্ঞান প্রদান করেন এবং তিনি বলেন, পরম্পরা ধারা বর্তমানে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সেই জন্য আমি তোমাকে বলছি যাতে তোমার মাধ্যমে লোকে কৃষ্ণভাবনামৃতে দর্শনের তাৎপর্য শিক্ষালাভ করতে পারে। পাঁচ হাজার বৎসর পূর্বে এই দর্শন অর্জুনকে বলা হয়েছিল এবং আমরা এখনো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ পেতে পারি।

দুর্ভাগ্যবশতঃ এটি পুনরায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, কারণ আমরা পরম্পরা ধারার মাধ্যমে এই জ্ঞান লাভ করি না। পরিবর্তে আমরা নিজেদের মতো করে এর ব্যাখ্যা করি এবং তাই এটি পুনরায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সেই জন্য পাঁচশত বৎসর পূর্বে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বয়ং অবতার। পাঁচ হাজার বৎসর পূর্বে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশ প্রদানকারী প্রভু রূপে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। সর্বধর্মান্ পরিত্যজ মামেকং শরণং ব্রজ; ‘সবপ্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও,’ (গীতা ১৮/৬৬) কিন্তু লোকে ভুল বুঝেছিল। সেইজন্য এবার পাঁচশত বৎসর পূর্বে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের একজন ভক্তরূপে আবির্ভূত হন। ভাগবত (১১/৫/৩২) বর্ণিত রয়েছে।
কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্।
যজ্ঞৈঃ সংকীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ॥
‘কলিযুগে যেসব বুদ্ধিমান মানুষেরা ভগবৎ আরাধনার উদ্দেশ্যে সংকীর্তন যজ্ঞানুষ্ঠান করেন, তাঁরা অবিরাম শ্রীকৃষ্ণের নামগানের মাধ্যমে ভগবৎ অবতারের আরাধনা করে থাকেন। যদিও তাঁর দেহ কৃষ্ণবর্ণ নয়। তা হলেও তিনিই স্বয়ং কৃষ্ণ। তাঁর সঙ্গে পার্ষদরূপে রয়েছেন তাঁর অন্তরঙ্গ সঙ্গীরা, সেবকগণ, অস্ত্র এবং সহযোগীবৃন্দ।’
এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন হলো ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলন এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। বদ্ধ জীবাত্মাদের প্রতি শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত দয়ালু। তিনি পুনঃ পুনঃ তাদেরকে কৃষ্ণভাবনামৃতে প্রকৃত স্তরে উন্নীত করতে প্রয়াসী থাকেন। কিন্তু আমরা এতই বিমূঢ় যে, আমরা পুনঃ পুনঃ কৃষ্ণকে ভুলে যেতে চাই।

মানব জীবনের উদ্দেশ্য

মনুষ্যেতর প্রাণীর পক্ষে ভগবানের সঙ্গে পুরাতন সম্পর্ক পুনর্জাগরিত করা সম্ভব নয়, সেই জন্য মানুষের এটি একটি মহৎ সুযোগ। প্রকৃতপক্ষে আমরা জড় প্রকৃতির নিয়মের বশবর্তী। এটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে: তথা দেহান্তরপ্রাপ্তি (গীতা ২/১৩)। আমাদের অভিলাষ অনুযায়ী দেহের মৃত্যুর পর আমরা অন্য দেহে প্রবেশ করি। শিশু বালক হয়, বালক যুবক হয়, যুবক মধ্যবর্ষীয় মানুষ বৃদ্ধ হয়। বৃদ্ধ দেহের পর কি? এরপর হলো তথা দেহান্তর প্রাপ্তি। প্রত্যেককেই অন্য দেহ গ্রহণ করতে হবে। একেই বলা হয় জন্ম-মৃত্যুর চক্র অথবা আত্মার দেহান্তর। এই রূপেই চলতে থাকে, কেউ মরতে চায় না। কেউ এই দেহ পরিবর্তিত করতে চায় না। এই হলো সমস্যা। প্রত্যেককেই এটি জানতে হবে। তাই আমরা যে পরিবর্তিত হচ্ছি সেটিই হলো অর্জুনের প্রতি কৃষ্ণ দেওয়া প্রথম নির্দেশ।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বিশেষভাবে ভারতীয়দের বলেছেন, -‘যিনি ভারতবর্ষের এই ভূমিতে মনুষ্যরূপে জন্ম গ্রহণ করেছেন তার নিজের জীবনকে সার্থক করা উচিত এবং সকল মানুষের উপকারের জন্য কর্ম করা উচিত।’

তথা দেহান্তরপ্রাপ্তি। এই হলো সুযোগ, মানব জীবন। যদি আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং বিভিন্ন কারণে ঘটিত জন্ম-মৃত্যুর এই পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে চাই তাহলে আমাদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ গ্রহণ করা উচিত, শ্রীকৃষ্ণকে জানার চেষ্টা করা উচিত, তাহলেই আমাদের জীবনকে সার্থক করতে পারব। আমরা ভগবানের কাছ থেকে এসেছি, ভগবানের কাছে ফিরে যাবো যদি আমরা শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারি। এই হলো ভগবদ্‌গীতার নির্দেশ।
সমগ্র ভারতবাসীদের জন্য ভগবান শ্রীচৈতন্যের নির্দেশ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বঙ্গদেশে কোলকাতা থেকে চৌষট্টি মাইল উত্তরে নদীয়া জেলাতে আবির্ভূত হন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা সম্বন্ধে আমাদের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা এবং চৈতন্য চরিতামৃত যা সতেরো খন্ড সমন্বিত গ্রন্থ থেকে জানতে পারবেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বিশেষভাবে ভারতীয়দের বলেছেন ( চৈ.চ আদি ৯/৪১)
ভারত-ভূমিতে হৈল মনুষ্য-জন্ম যার।
জন্ম সার্থক করি’ কর পর-উপকার॥
‘যিনি ভারতবর্ষের এই ভূমিতে মনুষ্যরূপে জন্ম গ্রহণ করেছেন তার নিজের জীবনকে সার্থক করা উচিত এবং সকল মানুষের উপকারের জন্য কর্ম করা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘যেই ভারতে জন্মগ্রহণ করেছে…’ ভারত-ভূমি অথবা ভারত হলো পূণ্যভূমি ও পবিত্র ভূমি। শাস্ত্রে আমরা দেখতে পাই স্বর্গের দেবতারাও ভারতে জন্মগ্রহণ করার অভিলাষী; ভারত এত মহিমাময়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লক্ষ্য হলো, যে ব্যক্তি ভারতবর্ষে মনুষ্য জন্ম গ্রহণ করেছেন তার প্রথম উদ্দেশ্যই হলো বৈদিক জ্ঞান যা ভারতে সুলভ তার শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের জীবন সার্থক করা।
সুতরাং প্রতিটি ভারতীয়, বিশেষতঃ উচ্চবর্ণীয়, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য-বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ-এটি তাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বৈদিক জ্ঞান অর্জন করে নিজেদের জীবন সার্থক করা এবং তারপর সমগ্র বিশ্বে সেই জ্ঞান বিতরণ করা। কারণ শাস্ত্রীয় জ্ঞানের নিরিখে ভারতবর্ষের বাইরের মানুষের এই সম্পর্কিত জ্ঞান খুবই স্বল্প। সেই জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রতিটি ভারতবাসীকে বৈদিক জ্ঞান অধ্যয়ন করে তা সমগ্র বিশ্বে বিতরণ করার জন্য অনুরোধ করেছেন। ‘পর-উপকার’ অর্থাৎ উপকারী কার্য। কৃষ্ণভাবনামৃতই হলো এই পৃথিবীতে সর্বোত্তম উপকারী কার্য। কারণ মানুষ অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। প্রত্যেকে বাস্তবিক পক্ষে শতকরা নিরানব্বই ভাগ বর্তমানে এই দেহাত্ম বুদ্ধিতে রয়েছেন, ‘আমি ভারতীয়, আমি আমেরিকান, আমি হিন্দু, আমি মুসলমান।’ এই হলো অজ্ঞতা।
সুতরাং প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘কিভাবে আমি এই সমগ্র জগতের কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারি?’ চৈতন্য মহাপ্রভু উৎসাহ দিচ্ছেন-
যারে দেখ তারে কহ কৃষ্ণ-উপদেশ।
আমার আজ্ঞায় গুরু হঞা তার এই দেশ॥
‘যেখানেই থাকো আমার আদেশে তুমি অবশ্যই একজন গুরু হও।’(চৈ.চ.মধ্য ৭/ ১২৮)
‘কিন্তু আমার কোন শিক্ষা নেই। কিভাবে আমি একজন গুরু হতে পারি? কিভাবে আমি অন্যকে নির্দেশ দিতে পারি। চৈতন্য মহাপ্রভু বলছেন, ‘হ্যাঁ আমি তা জানি। কিন্তু আমার নির্দেশ গ্রহণ কর’, তারপর আমি কি করব’?
‘গুরু হও। তোমাকে কোন দর্শন তৈরী করতে হবে না, যা কিছু শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন শুধুমাত্র তাই শিক্ষা দাও। সেই সব, তাহলেই তুমি একজন গুরু হবে।’
আমাদের অনুরোধ হলো আপনারা এত ভারতীয়রা এই বিদেশে বংশানুক্রমে রয়েছেন আপনারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ গ্রহণ করুন। যেহেতু আপনারা ভারতবর্ষ থেকে এসেছেন তাই আপনাদের প্রতি এটি বিশেষ অনুরোধ ‘শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশে আপনারা প্রত্যেকে একজন গুরু হোন’।
আপনি দক্ষিণ আমেরিকায় থাকেন, সুতরাং একজন গুরু রূপে প্রচার করুন। আপনি কি প্রচার করবেন? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলছেন, আপনাকে কিছু উদ্ভাবন করতে হবে না। ভগবদ্‌গীতায় শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ রয়েছে। একে বিকৃত করবেন না, এটি যথাযথভাবে বিতরণ করুন। সেটিই আপনার কর্তব্য। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লক্ষ্য গ্রহণ করা কঠিন নয়, ভগবদ্্গীতার নির্দেশ গ্রহণ করে যাকে দেখবেন তাকে প্রচার করার চেষ্টা করবেন। আপনি একজন ব্যবসায়ী হতে পারেন, আপনি তাই থাকুন, আপনি একজন পরিবারের প্রধান হতে পারেন কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ প্রদান করুন। এই আমাদের লক্ষ্য।

জানুয়ারি-মার্চ ২০১৯ সালে প্রকাশিত ।। ৭ম বর্ষ ।। সংখ্যা ১।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here