সন্তুষ্টির গোপন রহস্য!

0
61
প্রত্যেকে মনে করে অন্যেরা তার চেয়ে ভাল অবস্থানে রয়েছে। আর এভাবে প্রত্যেকেই অসন্তুষ্ট।
তবে অসন্তুষ্টির এই চলমান অবস্থার সমাধান কি?

যুগাবতার দাস


আমার পরীক্ষার ১ম বছর খুব সন্নিকটে অগ্রসর হচ্ছে এবং আমিও উত্তরোত্তর শান্তির পরশ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। এখন মানসিক উদ্বিগ্নতার বা অসুস্থতার লক্ষণসমূহ যেমন-হাত কাঁপা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া এবং অনিদ্রা হচ্ছে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণের জন্য একটি সফল ক্যারিয়ার গঠনের লক্ষ্যে কঠোর সংগ্রাম আমার মানসিক অবস্থাকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। আমি হোস্টেলের কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অনুভব করলাম, আমি একটি কঠিন পরিস্থিতির শিকার। মনে হচ্ছিল, এই জগতে একমাত্র আমি ছাড়া আর সবাই সুখী। নৈরাশ্য ও ভয় আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। মনে হচ্ছিল আমার কারো সাহায্যের প্রয়োজন যাতে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে পারি।
কাকের গল্প সমস্যার সমাধানের জন্য এক মামার শরণাপন্ন হলাম। তিনি পারমার্থিকভাবে মানসিক সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যক্তি। আমি তাঁকে হৃদয় খুলে সমস্যার কথা বলি। সব শুনে মামা একটি কাকের কাহিনি বলল। একসময় একটি কাক সুখ-শান্তিতে বাস করছিল। একদিন সে সাদা পালকের একটি রাজ হংসকে দেখে বলল, “তুমি এত সাদা আর আমি কালো। তুমি খুব সুন্দর এবং সুখী পাখী” তখন রাজহংস বলল, “আমিও ভাবতাম আমিই একমাত্র সুখী পাখী। কিন্তু টিয়া পাখিকে দেখে আমার ধারণা পাল্টে গেল। সে আমার থেকেও সুন্দর, তার দু’টি সুন্দর রং আছে। সে আমার চেয়ে সুখী।” কাক তখন টিয়াকে দেখতে পেল, কিন্তু কাকের সব কথা শুনে টিয়া পাখীটি বলল, “আমিও সুখী ছিলাম, কিন্তু যখন একটি ময়ূরকে দেখলাম, তখন আমার সে ধারণাটি বদলে গেল। আমার মাত্র দু’টি রং রয়েছে, কিন্তু ময়ূর বহু রং বিশিষ্ট।” কাকটি তখন উড়ে গিয়ে সে ময়ূরটিকে খুঁজতে লাগল। অনেক অনুসন্ধানের পর, সে একটি খাঁচার ভিতরে বদ্ধ অবস্থায় সে ময়ূরটিকে দেখতে পেল। খাঁচাটির আশে-পাশে অনেক লোক ময়ূরটির সৌন্দর্য দর্শন করছিল। লোকেরা চলে গেল কাকটি ময়ূরকে বলল “তুমি কত সুন্দর, প্রতিদিন তোমার সৌন্দর্য দর্শনের জন্য বহু লোক আসে। অথচ তারা আমাকে দেখলেই তাড়িয়ে দেয়। আমি নিশ্চিত, তুমিই পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী পাখী ।”
ময়ূরটি তখন উত্তর দিল, “আমিও ভেবেছিলাম আমিই সবচেয়ে সুখী। কারণ কোনো পাখী আমার সৌন্দর্যকে অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, সৌন্দর্যের কারণেই আমি খাঁচা বন্দী। আমি মুক্ত আকাশে উড়ার স্বাদ থেকে বঞ্চিত এবং দিনের অধিকাংশ সময় আমাকে নিসঙ্গ কাটাতে হয়। কাকেরা মুক্তভাবে আকাশে উড়তে পারে। বিশ্বাস করো তুমিই আমার চেয়ে সুখী।” আমার মামা তখন বলল, আমাদের জীবনের গল্পও এই কাকের গল্পটির মতো।
আমি নার্সারিতে পড়ার সময় স্বপ্ন দেখতাম কখন উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ব। তারপর যখন উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শুরু করলাম তখন দেখতাম কিভাবে সেকেন্ডারি স্কুলের ছাত্ররা ট্রাউজার পড়ত। এরপর যখন সেকেন্ডারি স্কুলে সেই আশা পূর্ণ হলো তখন ভাবতাম কখন কলেজ জীবন শুরু হবে, যেখানে আমি যা খুশী তা পড়তে পড়ব। কিন্তু যখন কলেজ জীবন শুরু হলো তখন যারা গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে তাদের দেখে ভাবতাম, তারা চাকুরি করে অর্থ উপার্জন করছে। একজন যুবক অর্থের মাধ্যমে যা খুশি তা করতে পারে। যা হোক, একসময় আমার গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হলে আমি চাকুরি করি, সেই সাথে সংসার জীবনও শুরু করি। পিছনে তাকালে আমি এখন বুঝতে পারি, শৈশবের সেই দিনগুলো ছিল জীবনের স্বর্ণালী সময়। কেননা আমি তখন মুক্ত ছিলাম। সারাদিন খেলতাম, কাঁধে ছিল না দায়িত্বের বোঝা। এই হল জাগতিক অস্তিত্বের প্রকৃতি।
প্রত্যেকে ভাবে অন্যেরা তার চেয়ে ভাল অবস্থানে রয়েছে। কাক ভেবেছিল রাজ হংসটি সুখী। রাজহংস ভেবেছিল টিয়া সুখী; টিয়া ভেবেছিল ময়ূর সুখী আর ময়ূর ভেবেছিল কাক সুখী ।

অসন্তুষ্টির কারণ

তাহলে চলমান অসন্তুষ্টির সমাধান কি? আমাদেরকে আত্মতৃপ্তির প্রকৃত অবস্থায় উপনীত হতে হবে, যেখানে আমরা বাইরের চেয়ে বরং নিজেদের মধ্যে সুখের অনুসন্ধান করতে পারি।
এর মানে এই নয় যে, একটি সফল পেশাধারী ব্যক্তি হওয়ার সব লক্ষ্য পরিত্যাগ করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিশ্রম অবশ্যই করতে হবে, তবে সেই সাথে জাগতিক সফলতার মাধ্যমে যে সুখ প্রাপ্তি ঘটে, এই প্রকার গভীর কলুষময় বা মোহময় ধারণা পরিত্যাগ করতে হবে। জাগতিক সফলতা অস্থায়ী ও চপল সুখ নিয়ে আসে। তা আমাদেরকে প্রকৃত আত্মতৃপ্তির স্তরে উপনীত করতে পারে না। তাই যখন আমরা জাগতিক সফলতার প্রচেষ্টা করি, তখন আমাদের উচিত সমান্তরালভাবে পারমার্থিকতা অনুশীলনের মাধ্যমে স্থায়ী সুখ লাভ করার প্রচেষ্টা করা। এই প্রকার মিশ্র প্রচেষ্টা চিরস্থায়ী আনন্দ লাভের যথার্থ সূত্র।
চিরস্থায়ী সুখ লাভের প্রধান প্রতিবন্ধকতা শুধু মাত্র জাগতিক ইন্দ্রিয়তৃপ্তির পথ অনুসন্ধান করা। পার্থিব বাসনা সাধারণত আমাদের পারমার্থিক লক্ষ্য থেকে পদচ্যুত করে। যদি আমরা বিষয়টিকে প্রশ্রয় দিই তখন আরো অধিক ইন্দ্ৰিয় তৃপ্তিতে নিয়োজিত হব। অবশেষে আমরা দেখি চিরস্থায়ী সুখ লাভের যে লক্ষ্য তা অনেক দূরে রয়ে গেছে। এভাবে প্রশ্রয়ের ফলে মন ও ইন্দ্রিয়গুলো চরম উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পারমার্থিকতা আমাদেরকে সন্তুষ্টির বা পরিতৃপ্তির চরম স্তরে উপনীত করে।

পূর্ণ পরিতৃপ্তি অর্জন

ভক্তিযোগে নিয়োজিত হওয়া বা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নাম জপ কীর্তনের মাধ্যমে মন ও ইন্দ্রিয়কে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যে ইন্দ্রিয়গুলো সর্বদা জাগতিক ইন্দ্রিয় ভোগের পিছনে ছুটে থাকে। ইন্দ্রিয় তৃপ্তি হল একটি চোরের মানসিকতা যে কারো সম্পদ উপভোগ করার চেষ্টা করে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে এই চৌর্য মনোবৃত্তি রয়েছে। আমরা সর্বদা ভগবানকে বাদ দিয়ে তার সম্পদ ভোগ করতে চাই। চোরেরা সর্বদাই অসুখী। একজন ভক্ত ভগবানের সম্পদকে নিজের জন্য নয় বরং ভগবানের সেবার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন। ভগবানের প্রতি সবকিছু নিবেদনের এই পন্থাটি জীবনকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে। ভগবানের সন্তান হিসেবে তার সম্পদ ব্যবহারের অধিকার আমাদের রয়েছে, তবে তা সম্ভব সেটি যদি তার ইচ্ছায় সাধিত হয়। ভগবদ্গীতায় (৫/২৯) ভগবান শান্তির সূত্র প্রদান করেছেন—

ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্ ।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিচ্ছতি ॥

অর্থাৎ, আমাকে সমস্ত যজ্ঞ ও তপস্যার পরম ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং সমস্ত জীবের সুহৃদরূপে জেনে যোগীরা জড় জগতের দুঃখ দুর্দশা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করেন।
লেখক পরিচিতি: শ্রীমান যুগাবতার দাস, সহযোগী অধ্যাপক, অ্যানাটমি বিভাগ, মুম্বাই মেডিকেল কলেজ ও নিয়মিত প্রাবন্ধিক, ব্যাক টু গডহেড।


 

জানুয়ারী-মার্চ ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here