সক্রেটিস এবং তাঁর শিক্ষা

0
960

Dialectical Spritualism হতে উদ্ধৃতি : বৈদিক দৃষ্টিকোণ হতে পাশ্চাত্যের দর্শন
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি অভয়চরণারবিন্দ শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
প্রতিষ্টাতা আচার্য: আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন)
Dialectical Spritualism হতে (একটি হস্ত লিখিত গ্রন্ত) শ্রীল প্রভুপাদ তার শিষ্যের সাথে অন্তরঙ্গ আলোচনায় পাশ্চাত্রের বিখ্যাত দার্শনিকদের চিন্তা ও ধারণাসমূহ নিরীক্ষণ করছিলেন। প্রভুপাদ এবং তাঁর শিষ্যের কথোপকথন থেকে আমরা যে শিক্ষা নিতে পারি।

ভক্ত: সক্রেটিস অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে Shopist (এক শ্রেণির গ্রীক চিন্তাবিদ) মতবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন, Shopist (শপিস্ট) রা মনে করত সঠিক ও ভুল এবং সত্য ও মিথ্যা এগুলো একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ আজকে যা মিথ্যা, কালকে তা সত্য এবং আজকে যা সত্য, কালকে তা মিথঢ্যাও হতে পারে। কিন্তু সাধারণ জনগণকে ব্যক্তিগতভাবে অথবা ছোট ছোট সমাবেশের মাধ্যমে সক্রেটিস্ সপিস্টদের এই ধারণার পরিপন্থী একটি ভিন্নমত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, সকল ক্ষেত্রেই একটি প্রকৃত ও চিরন্তন সত্য আছে যা সকল মতামত ও জল্পনা কল্পনার ঊর্ধ্বে, স্বচ্ছ এবং সন্দেহাতীত।
প্রভুপাদ: তিনি (সক্রেটিস) সঠিক ছিলেন। যখন হতে আমরা কৃষ্ণভাবনা গ্রহণ করেছি তখন হতে কৃষ্ণই আমাদের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ, তিনিই প্রকৃত সত্য। আমরা তাঁর আদেশ ভুল প্রতিপন্ন করতে পারিনা। কেননা কৃষ্ণ অথবা ঈশ্বর এর অর্থই হচ্ছে পরম পূর্ণ এবং তার দর্শন হচ্ছে অপ্রাকত ও সর্বোত্তম। আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের দর্শন একটি ধর্মীয় দর্শন কেননা এটি কৃষ্ণ বা ঈশ্বরের আদেশ পালনের সাথে সম্পর্কিত। আর এটি হচ্ছে ধর্মের নীতি ও আদর্শ। কখনো জল্পনা কল্পনা করে ধর্ম সৃষ্টি করা যায় না। ভগবদ্‌গীতা ও ভাগবতমে এই ধরনের ধর্মকে ‘কৈতব’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। যার অর্থ ‘প্রতারণা’। আমাদের মূলনীতি হচ্ছে ‘ধর্মং তু সাক্ষাদ ভগবৎপ্রণীতম’ ধর্ম ঈশ্বরের প্রদত্ত নির্দেশ। আমরা যদি তার নির্দেশ প্রতিপালন করি তাহলে আমরা ধর্মানুসরণ করছি। একজন নাগরিক ব্যক্তিগতভাবে আইন তৈরি করতে পারে না। সরকারই আইন প্রণয়ন করতে পারেন। আমাদের পূর্ণতা নিহিত রয়েছে তাঁর আইন পূর্ণরূপে অনুসরণ করার মধ্যেই। যাদের ঈশ্বর সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, তাদের আদেশ নির্দেশ ধর্মীয় নীতির মত মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের পদ্ধতি আলাদা।
ভক্ত: সক্রেটিস যুক্তিতর্ক করতেন, শুধুমাত্র জনগণকে জনগণকে কিছু বিশেষ মূল্যবোধ সম্পর্কে অবহিত করতে। যেমন-আত্মনিয়ন্ত্রণ, সাহস, সহানুভূতি অথবা বিশ্লেষণ অর্থাৎ কোন প্রস্তাবের পূর্ণতা ও ধারাবাহিকতা আছে কিনা তা নিরীক্ষণ করা।

প্রভুপাদ: সক্রেটিস্ সাধারণ নীতি নৈতিকতার চেয়ে আরো বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। যদি কেউ তা গভীরভাবে বুঝতে, তবে সে জানতে পারত যে, সক্রেটিসের সিদ্ধান্ত ও অন্য সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। সকল মূল্যবোধগুলোকে একত্র কললে একটি প্রকৃত ভাল বা সত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে সেই বুদ্ধিমত্তার উদয় ঘটানো যার মাধ্যমে প্রকৃত (ভাল) সত্যেকে হৃদয়ঙ্গম করে জীবনকে উদ্ভাসিত করা যায়। যখন কোনো ব্যক্তি নিজেকে উপলব্ধি করার মত জ্ঞানে উত্তীর্ণ হবে তখন সে যাই করবে সর্বদাই ভাল হবে এবং সে কখনো ব্যর্থ হবে না। কোনো আত্মা, যার এই ধরনের উপলব্ধি রয়েছে তাকে বলা হয় সুখী ও পূর্ণতাস্তর। তখন সে জ্ঞানীস্তরে উত্তীর্ণ হয়। একটি প্রকত সত্য উদ্‌ঘাটনের প্রচেষ্টার কারণে সক্রেটিসের আরেক নাম ‘জ্ঞান’।
ভক্ত: সক্রেটিসকে কি জ্ঞানযোগী বলা যায়?
প্রভুপাদ: সক্রেটিস একজন মুনি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ। বহু বহু জন্মের পর একজন মুনির কাছে প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হয়। কৃষ্ণ গীতায় (৭/৪২) শ্লোকে বলেছেন,

যে চৈব সাত্ত্বিকা ভাবা রাজসাস্তামসাশ্চ যে।
মত্ত এবেতে তান্ বিদ্ধি ন ত্বহং তেষু তে ময়ি॥

“সমস্ত সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক ভাবসমূহ আমার থেকেই উৎপন্ন বলে জানবে। আমি সেই সকলের অধীন নই, কিন্তু তারা আমার শক্তির অধীন।”
এই ধরনের ব্যক্তিরা ‘জ্ঞানবান, জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত এবং বহু বহু জন্মের পর তারা কৃষ্ণের শরণাগত হয়। তারা অন্ধের মত কৃষ্ণের শরণাগতি গ্রহণ করে না। বরং কৃষ্ণ যে সত্যিকার অর্থেই পরমেশ্ব র ভগবান এবং সমস্ত কিছুর উৎস এই প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করে। অতঃপর তারা কৃষ্ণের শরণ নেয়। যাই হোক জ্ঞানের মাধ্যমে আত্ম অনুসন্ধানের এই পথের জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন। যদি আমরা প্রত্যক্ষভাবে কৃষ্ণের আদেশ পালন করি এবং তার শরণাগত হই তবে আমরা নিজেদেরকে বহু জন্ম ও সময় বৃথা নষ্ট করা হতে বাঁচাতে পারব।
ভক্ত: সক্রেটিস তার মায়োটিক (Maieutic) পদ্ধতি প্রয়োগ করতেন। এটি অনেকটা ধাত্রীর (সন্তান প্রসবে সাহায্যকারী নারী) কাজের মত। তিনি মনে করতেন একটি আত্মা কখনো বাহ্যিক (জড় জাগতিক) জ্ঞান বা তথ্যের দ্বারা প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। আত্মার নিজের অভ্যন্তরে বা হৃদয়ে প্রকাশিত হয়। একজন শিক্ষকের কাজ হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত সেই আত্মাটি হৃদয় হতে প্রকৃত সত্যটি প্রকাশ করতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে পরিচালনা করা, উৎসাহ প্রদান করা এবং প্রেষিত করা। সুতরাং মায়োটিক পদ্ধতি উপদেশ করতে সক্ষম না হচ্ছে, তার জন্য জ্ঞান হচ্ছে পুনসংগ্রাহক বা স্মারকবস্তু। যদি তাই হয় তাহলে আত্মার একটি পূর্বজন্ম রয়েছে যেখান হতে জন্ম-মৃত্যুর প্রক্রিয়ার আত্মা সেই জ্ঞান ভুলে গেছে। অতঃপর, আত্মাট (স্মৃতি ও বুদ্ধির সাহায্যে বুঝতে সমর্থ হয়) আত্মানুসন্ধান ক্রমাগতভাবে বহু বহু জন্ম-মৃত্যু চক্রে আবর্তন করতে করতে বুঝতে পারে, সে চিন্ময় বস্তু।


প্রভুপাদ: হ্যাঁ। আত্মা হচ্ছে চিন্ময় এবং যেহেতু আত্মা চিন্ময় তাই মন, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়গুলোও চিন্ময়। কিন্তু এগুলো জড় আবরণের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেই অবশ্যই পরিস্কার করতে হবে। এক সময় এি জড় আবরণ হতে আমরা মুক্ত হব, তখন প্রকৃত জ্ঞান, বুদ্ধি ও ইন্দ্রয়গুলো প্রকাশিত হবে। নারদ পঞ্চরাত্রে বলা হয়েছে তৎপরাতেন নির্মলম। এই আত্মা পরিশোধন প্রক্রিয়া তখনই শুরু হয় যখন কেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত প্রেমময় সেবার সংস্পর্শে আসে এবং হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, চেতোদর্পণ মার্জনম অর্থাৎ হৃদয়কে মাজন (পরিশোধিত) করতে হবে। সমস্ত বিভ্রান্তির উৎপত্তি হচ্ছে, প্রকৃত জ্ঞানকে ভুলভাবে গ্রহণ করার কারণে। আমরা হচ্ছি পরমেশ্বর ভগবানের অংশ। যে কোন ভাবে হোক না কেন আমরা সেটি ভুলে গিছি। আগে আমরা অবিরত কৃষ্ণের সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। আর এখন অজ্ঞতা বা মায়ার সেবা করছি। মুক্ত অবস্থায় থাকি বা বদ্ধ অবস্থায় থাকি আমাদের কাজ হচ্ছে সেবা করা। এই জড় জগতে সকলেই তার সামর্থ্যানুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পদে সেবা করছে। কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ বা কবি, কেউ বুদ্ধিজীবি যেই হোক না কেন যখন তার কর্মটি কৃষ্ণ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সেটি মায়া। সুতরাং, যখন কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে আমরা কৃষ্ণসেবা বৃদ্ধি করব তখন আমরা বদ্ধদশা হতে মুক্ত হব।
ভক্ত: সবচেয়ে মজার ব্যাপার যে, বর্তমানে সপিস্টদের মত একটি শ্রেণির প্রদত্ত সম্পর্ক তত্ত্বের শিক্ষা এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। সেটি হচ্ছে ‘তুমি যদি বিশ্বাস কর এটি সঠিক, তবে সেটি তোমার জন্য সঠিক।’ সক্রিটিস এই ধরনের তত্ত্বের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দ্বারা প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলেন যে, অবশ্যই একটি প্রকৃত সত্য রয়েছে। যেটি আপেক্ষিক সম্পর্কে হতে ভিন্ন, যেটি শ্রেণিগতভাবে সকলের কাছে স্বীকৃত।
প্রভুপাদ: সেটি আমরাও করছি। প্রকৃত সত্য সকলের জন্য এবং আপেক্ষিক সত্য একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, একটি বিশেষ অবস্থার জন্য সত্র। আপেক্ষিক সত্য সবসময় প্রকৃত সত্যের অনুগামী। ঈশ্বর হচ্ছে প্রকৃত সত্য এবং এই জড় জগত হচ্ছে আপেক্ষিক সত্য। যেমন, জলে সূর্যের প্রতিবিম্ব দেখা যায় এবং সেই সূর্যটিও (প্রতিবিম্বটি) কিছু আলো প্রদর্শন করে। কিন্তু সেই প্রতিবিম্ব সূর্যটি প্রকৃত সত্যবস্তু নয়। যখনি সূর্য অস্ত যাবে তখন সেটি দেখা যাবে না। অর্থাৎ আপেক্ষিক সত্য হচ্ছে প্রকৃত সত্যের প্রতিবিম্ব মাত্র। কৃষ্ণ হচ্ছেন প্রকৃত সত্য এবং এই জড় জগত হচ্ছে আপেক্ষিক সত্যের প্রকাশ। এটি কৃষ্ণের বহিরঙ্গা শক্তির প্রকাশ। কৃষ্ণ যদি তার শক্তির প্রত্যাহার করে নেন, তবে জড় জগতের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকবে না। আবার অন্যদিকে কৃষ্ণ এবং তার শক্তির মধ্যে কোনো ভিন্নতা নেই। যেমন আমরা আগুন হতে তাপ আলাদা করতে পারি না। যদিও তাপ কোন আগুন নয়। তাই আপেক্ষিক সত্য হচ্ছে তাপের মত। কেননা এটি প্রকৃত সত্যের শক্তিতেই অবস্থান করে। যেমনি প্রকৃত সত্য ঠিক, তেমনি আপেক্ষিক সত্যও ঠিক। যদিও আপেক্ষিক সত্যের কোন স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। কেন জলে সূর্যের প্রতিবিম্ব দেখা যায়? কারণ সূর্য নামক একটি বস্তু রয়েছে তাই। একইভাবে এই জড় জগৎ আমাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়, কেননা সত্যিকার অর্থে সর্বোচ্চ আকর্ষণীয় একটি অপ্রাকৃত জগৎ রয়েছে বলে।
ভক্ত: সক্রেটিস একটি বড় দায়িত্ব পালন করে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করেছেন যে, ‘আত্মার যত্ন নিতে’ তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন আত্মাকে সত্য জ্ঞানের স্তরে উপনীত করার জন্য এবং আত্ম-অনুসন্ধান করার জন্য। যখন ব্যক্তি সেই অবস্থায় উপনীত হয় তখন সে অবশ্যই সকর ক্ষেত্রে সৎ ও সঠিক থাকে। সে সমস্ত ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। তখন সে সকল অবস্থাতে শান্ত ও স্তিতপ্রজ্ঞ থাকে। আমার মনে হয় সক্রেটিস নিজেকে সেই পর্যায়ে উপনীত করেছিলেন, যেমনটি তার মৃত্যুর সময়কার চিত্রগুলোতে দেখা যায়। তা দেখে মনে হয়, তিনি ন্যূনতম হলেও প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। যদিও তিনি কখনো একথা কাউকে বলেননি।
শ্রীল প্রভুপাদ: এটিই হচ্ছে প্রকৃত বস্তুকে জানার প্রাথমিক অবস্থা। এটিকে ব্রহ্মউপলব্ধি বলে। নিরাকার তত্ত্বের উপলব্ধি। যখন কেউ এ অবস্থা হতে আরেকটু উন্নতি সাধন করে তখন তার পরমাত্মা উপলব্ধি হয় অর্থাৎ সবকিছুতে পরমাত্মার দর্শন। যেমন, ঈশ্বর সব জায়গায় অবস্থান করেন একই সাথে তিনি তার নিজ ধামেও অবস্থান করেন একই সাথে তিনি তার নিজ ধামেও অবস্থান করেন। গোলকের নিবাসতে অখিলাত্মাভুত। ঈশ্বর একজন ব্যক্তি বিশেষ। তার গৃহ ও সহচর রয়েছে। যদিও তিনি তার ধামে অবস্থান করেন তথাপিও তিনি সব জায়গায় বিরাজমান। তিনি সকল পরমাণুর মধ্যে অবস্থান করেন। ‘অন্তরস্থ পরমাণু চয়তর শতম’। অন্যান্য নিরাকারবাদীদের মত সক্রেটিসও জানতে পারেননি ঈশ্বর কেমন। তার শক্তিমত্তা কি রকম? তার ধামে বাস করেও কিভাবে তিনি পরমাণুতেও অবস্থান করেন? জড় জগৎ হচ্ছে তারই প্রকাশ। তার শক্তি (ভূমিরাপোনলো বায়ুঃ খং মনো বুদ্ধিরেব চ), তার শক্তির প্রকাশের কারণে যেখানেই হোক তিনি সর্বত্র অবস্থান করেন। যদিও শক্তিও শক্তিমানের মধ্যে কোন ভিন্নতা নেই, তাই বলে আমরা উভয়কে এক বলতে পারি না। তারা একই সাথে এক এবং ভিন্ন। এটিই হচ্ছে সর্বোত্ম দর্শন বা অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্ব।
ভক্ত: সক্রেটিস বলেছিলেন, সকল মূল্যবোধই হচ্ছে একটি বস্তুর প্রকাশ, তা হচ্ছে জ্ঞান। তিনি সৎসকর্ম ও জ্ঞান এই দুটি অভিন্ন, এই মত পোষণ করেছিলেন। এই দুটি সমন্বয় করলে আমরা দেখতে পাই তিনি ভগবদ্্গীতায় বর্ণিত সত্ত্বগুণগুলির কথাই উদ্ধৃত্ত করেছিলেন।
শ্রীল প্রভুপাদ: সত্ত্বগুণ হচ্ছে ব্যক্তির সৎ অবস্থা। যে অবস্থায় ব্যক্তি জ্ঞান গ্রহণের জন্য যোগ্য হয়।
ভাবাবেগ বা অজ্ঞতার স্তরে থেকে কেউ জ্ঞান গ্রহণ করতে পারে না। যখন আমরা ভাবাবেগের অবস্থা ও অজ্ঞতা বা অন্ধকারময় অবস্থার আবরণ ছেদ করতে সক্ষম হই তখন আমরা সত্ত্বগুণে উপনীত হই এবং যখন আমরা পরিপূর্ণভাবে সেই অবস্থায় অবস্থান করি তখন নিম্ন গুণগুলি আমাদের আর স্পর্শ করতে পারে না।

নষ্টপ্রায়েস্বভদ্রেষু নিত্যং ভাগবতসেবয়া।
ভগবত্যুত্তমশ্লোকে ভক্তির্ভবতি নৈষ্ঠিকী॥ (ভা.১/২/১৮)

“যখন হৃদয়ে নৈষ্ঠিকী ভক্তির উদয় হয়, তখন রজ ও তমোগুণের প্রভাবজাত কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি রিপুসমূহ হৃদয় থেকে বিদূরিত হয়ে যায়। তখন ভক্ত সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত হয়ে সম্পূর্ণরপে প্রসন্ন হন।”
যদিও এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে উপনীত হতে হয়, কিন্তু এটিই প্রকৃত অবস্থা। আমরা যত কৃষ্ণকথা শ্রবণ করব তত পরিশুদ্ধ হব। পরিশুদ্ধ হব। পরিশুদ্ধ হওয়া মানে লোভ এবং ভাবাবেগ (ইন্দ্রিয়ভোগের ইচ্ছা) হতে মুক্ত হব। তাহলেই আমরা সুখী হব। ব্রহ্মভূত অবস্থায় আমরা নিজেকে এবং ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে পারব। তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জানার পূর্বে আমাদের অবশ্যই সত্ত্বগুণ স্তরে উপনীত হতে হবে। তাই আমাদের সংঘের নিয়ম হচ্ছে, অবৈধ যৌনসঙ্গ পরিত্যাগ, মাংসাহার, নেশা ও জুয়াখেলা বর্জন। এভাবে অবশ্যই আমরা ভক্তির মাধ্যমে সত্ত্বগুণে অবস্থান করতে পারব। তখন আমরা মুক্ত হব। ধীরে ধীরে ভগবানের প্রতি ভালবাসার উন্নয়ন ঘটাতে পারব এবং আমাদের প্রকৃত অবস্থা ফিরে পাব। মুক্তির হিত্যনত্বরূপম। এর অর্থ সকল জড় আসক্তি পতিরত্যাগ করে অবিরত কৃষ্ণসেবায় নিয়োজিত হওয়া। তখন আমরা এমন এক অবস্থায় উর্ত্তীণ হব যেখানে মায়া আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। যদি আমরা কৃষ্ণের স্পর্শে থাকি সেখানে মায়ার কোন স্থান নেই। মায়ামিতং তরন্তি তে। এই হচ্ছে বিশুদ্ধ অবস্থা।
ভক্ত: সক্রেটিস সেই দৈববাণী গ্রহণ করেছিলেন্ “নিজেকে জ্ঞান” তিনি আত্মার যত্ন নিতে সকলেকে আদেশ করেছিলেন, এটি এক প্রকার ধ্যানের মত। যেটি ধীরে ধীরে নিজেকে বিশুদ্ধ করে। ইন্দ্রিয়ের ভোগ ও ভাবাবেগ থেকে ধীরে ধীরে নিবৃত্ত করে। এভাবে প্রচেষ্টার ফলে নিজেকে জানতে পারে এবং সেই ব্যক্তি জ্ঞান ও আত্মনিয়ন্ত্রনের স্তরে অবস্থান করে। সেই সাথে সে সুখী হয়।
শ্রীল প্রভুপাদ: হ্যাঁ, এটিই হচ্ছে ঘটনা। ‘ধ্যান’ অর্থ হচ্ছে নিজেকে বিশ্লেষণ করা এবং প্রকৃত সত্যকে অনুসন্ধান করা। এটি বৈদিক শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘ধ্যানাবস্তিতদৃগতেন মানস পশয়ন্তি যংযোগিন।’ ধ্যানের মাধ্যমে যোগী অপ্রাকৃত সত্য (কৃষ্ণকে) নিজে নিজে জানতে পারেন। কৃষ্ণ সেখানে থাকেন, যোগী তাঁর সাথে আলোচনা করতে পারে এবং কৃষ্ণ তাকে উপদেশ দেন। এটিই হচ্ছে কৃষ্ণের সাথে সম্পর্ক। দদামি বুদ্ধিযোগং তং। যখন কেউ পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ হয় তখন সে সবসময় কৃষ্ণকে দেখতে পায়।

প্রেমাঞ্জনচ্ছুরিতভক্তিবিলোচনেন
সন্তঃ সদৈব হৃদয়েষু বিলোকয়ন্তি।
যং শ্যামসুন্দরমচিন্ত্যগুণস্বরূপং
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি॥

প্রেমাঞ্জন দ্বারা রঞ্জিত ভক্তিচক্ষুবিশিষ্ট সাধুগণ যে অচিন্ত্যগুণবিশিষ্ট শ্যামসুন্দর-কৃষ্ণকে হৃদয়েও অবলোকন করেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজন করি। এভাবে অগ্রজ ভক্তরা সর্বদা কৃষ্ণকে দর্শন করেন। এই শ্লোকে ‘শ্যাম’ শব্দটির অর্থ ‘কালো’। কিন্তু এই কালো অপূর্ব মনোহর। পরমেশ্বর ভগবান হওয়ার কারণে কৃষ্ণ সকলে সৌন্দর্যের উৎস এবং ‘অচিন্ত্য’ শব্দের অর্থ, যা ধারণা করা যায় না, অসীম গুণ। যদিও তিনি সর্বত্র অবস্থান করেন, যেহেতু তিনি গোবিন্দ, তিনি সর্বদা গোপীদের সাথে বৃন্দাবনে নৃত্য করছেন। সেখানে সখাদের সাথে খেলা করছেন। দুষ্ট বালকের মত তার মায়ের সাথে ছলনা করছেন। কৃষ্ণের এই অপ্রাকৃত লীলার বর্ণনা ভাগবতে রয়েছে।
ভক্ত: যতদূর আমরা জানি সক্রেটিস তার এই দর্শন কোন গুরুর কাছ থেকে গ্রহণ করেননি। তার কোন শিক্ষক ছিল না। তিনি নিজেকে আত্মজ্ঞানী বলে ঘোষণা দিতেন। আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, একজন ব্যক্তি নিজে নিজে শিক্ষিত হতে পারে। আত্মজ্ঞান কি ধ্যানের মাধ্যমে প্রাপ্ত হওয়া সম্ভব?
শ্রীল প্রভুপাদ: হ্যাঁ, সাধারণতভাবে কেউ যদি চিন্তা করে, যদি সে শরীরের যেকোন একটি অংশ নিয়েও দৃঢ়ভাবে অনুন্ধান করতে থাকে তাহলেও সে আত্মা বিষয়ক শিক্ষায় উপনীত হতে পারে। যদি আমি আমাকে প্রশ্ন করি ‘আমি কি এই হাত’? উত্তর আসবে ‘না’, আমি এই হাত নই।’ বরং এটি আমার হাত, এভাবে আমি যদি সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো নিয়ে অনুসন্ধান করি তাহলে দেখতে পাব, সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিই আমার, কিন্তু আমি ভিন্ন কোন বস্তু। এই ধরনের আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যমে বুদ্ধিমান ব্যক্তি দেখতে পায় যে, সে এই শরীর নয়। এটিই হচ্ছে ভগবদ্‌গীতা তার প্রথম শিক্ষা।

দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি॥ ২/১৩

“দেহীর দেহ যেভাবে কৌমার, যৌবনও জরার মাধ্যমে তার রূপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ঐ দেহী (আত্মা) এক দেহ থেকে অন্য দেহে দেহান্তরিত হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনও এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না।”
একসময় আমি একটি শিশু শরীরে ছিলাম। কিন্তু এখন আমার সেই শরীরটি নেই। মানুষ তা শরীর পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। অতএব এটি হতে আমি শিক্ষা নিতে পারি যে, আমি শরীর হতে ভিন্ন কিছু। আমি হয়ত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করতে পারি। কিন্তু আমি সেই অ্যাপার্টমেন্ট, এই বলে কাউকে নিজের পরিচয় দিতে পারি না। এই ধরনের অনুসন্ধানের মাধ্যমে মানুষ নিজেকে শরীর এবং আত্মার পার্থক্য সম্পর্কে শিক্ষা দিতে পারে। যতদূর সম্ভব আত্মজ্ঞানী হওয়ার প্রচেষ্টা করা উচিত। বৈদিক শাস্ত্র ও ভগবদ্‌গীতা অনুসারে জীবন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেহেতু আমরা প্রতিদিনই অভিজ্ঞতা অর্জন করছি সেহেতু আমরা সত্যিকার অর্থে বলতে পারিনা যে, তিনি পূর্ণরূপে আত্মজ্ঞানী ছিলেন বরং আমরা বলতে পারি পূর্বজন্মে তিনি আত্মজ্ঞানের চর্চা করেছিলেন এবং সেই জ্ঞান পরবর্তী জন্মে বর্তমান ছিল। এই হচ্ছে ঘটনা। তা নাহলে কেন একজন ব্রক্তি বুদ্ধিমান এবং অন্য একজন অজ্ঞ? এটি তার পূর্বস্মৃতি কতটুকু বর্তমান থাকে, তার উপর নির্ভর করছে।
ভক্ত: সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, একটি বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে (ধ্যান) একজন ব্যক্তি জ্ঞানের স্তরে উত্তীর্ণ হতে পারে। যেটি অন্যকিছুই নয়, কিন্তু কতগুলি মূল্যবোধের সমন্বয় মাত্র। কোন ব্যক্তি মূলবোধ সহাকারে সঠিকভাবে জীবন যাপন করলে সে সুখী হবে। অতএব সেই আলোকিত ব্যক্তিটি চিন্তাশীল, জ্ঞানময় এবং মূল্যবোধ সম্পন্ন হবে। সে সবসময় সুখী হবে, কেননা সে সুচারুভাবে তার কর্ম সম্পাদন করছে।
শ্রীল প্রভুপাদ: হ্যাঁ এটি ভগবদ্‌গীতায় প্রতিপন্ন করা হয়েছে-

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্কতি।
সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম॥ (গীতা ১৮/৫৪)

“ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তি কোনো কিছুর জন্য শোক করেন না বা আকাক্সক্ষা করেন না। তিনি সমস্ত প্রাণীর প্রতি সমদর্শী হয়ে আমার পরা ভক্তি লাভ করেন।”
যখন কেউ আত্মোপলব্ধির স্তরে উত্তীর্ণ হয় তখন তৎক্ষণাৎ সে সুখী হয়। এটি হয়, কেননা সে ঔ স্তরে পূর্ণমাত্রায় অবস্থান করছে। একজন ব্যক্তি ভুল সিদ্ধান্তের উপর বহু শ্রম ও পরিশ্রম করতে করতে যখন সে একটি ভাল সমাপ্তির দিকে আসে তখন স্বাভাবিকভাবেই সে সুখী হয়। সে চিন্তা করে “ওহ আমি কত বোকা ছিলাম, কতদিন ধরেই না আমি ভুল পথে হাঁটছিলাম”, এভাবে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি সুখী হয়। সুখ হচ্ছে, সেই অবস্থা, যে অবস্থা নিয়ে কাউকে দুশ্চিন্তা করতে হয়না। ধ্রুব মহারাজ বলেছিলেন ‘হে প্রভু আমি এই জড় রাজত্ব সুখ চাই না’। প্রহ্লাদ মহারাজও বলেছিলেন, ‘হে প্রভু আমি কোনো প্রকার জড় আশা করি না। আমি আমার পিতাকে দেখেছি। যনি বিশাল জড় ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেন কিন্তু আপনি এক মুহূর্তেই তা ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছেন সুতরাং, আমি এই জড় বিষয়ে আকৃষ্ট হতে চাই না।’ সত্যিকার জ্ঞান হচ্ছে কোন কিছুর জন্য আসক্ত না হওয়া। জাগতিক কর্মী, জ্ঞানী, যোগীরা কিছু পাওয়ার জন্য লালায়িত। কর্মীরা চায় ঐশ্বর্য। এরা চায় সুন্দরী রমনী অথবা প্রতিষ্ঠা। সুতরাং যে কোন কিছুর আশা করে না, তারা হারাবার দুঃখ থাকে না। জ্ঞানীরাও প্রাপ্তির আশায় লালয়িত। তারা পরমাত্মার সাথে লীন হওয়ার প্রচেষ্ঠায় বিভোর। যোগীরা কিছু যাদুকরি শক্তি আশা করে, যাতে সে তা অন্যদের কাছে প্রদর্শন করে নিজেকে ভগবান প্রতিপন্ন করতে পারে। ভারতে কিছু যোগী যাদু দেখিয়ে বলে যে, তারা স্বর্ণ তৈরি করতে পারে। আকাশে উড়তে পারে। অজ্ঞ ব্যক্তিরা তার কথায় বিশ্বাসও করছে এবং অনেকেই তাদের ভগবান মনে করে। এমনকি, একজন যোগী যদি ওড়ে, তবে অনেক পাখিও ওড়ছে। এর মধ্যে পার্থক্য কোথায়? যদি একজন লোক বলে আমি জলে হাঁটতে পারব, হাজারো অজ্ঞ লোক আসবে তাকে ওখার জন্র। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে লোকেরা লালায়িত এবং এর ফলে তারা কষ্টও পাচ্ছে। কিন্তু ভক্ত কৃষ্ণসেবা করে পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট।
ভক্ত: এ জ্ঞান ও ধ্যানের মাধ্যমে সক্রেটিসের কি ব্রহ্ম উপলব্ধি হয়েছি? তিনি কি পরমাত্মার উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন?
শ্রীল প্রভুপাদ: হ্যাঁ।
ভক্ত: কিন্তু ভগবানের উপলব্ধি মানে কি? আমি মনে করেছিলাম কৃষ্ণ উপলব্ধি ভক্তির মাধ্যমেই করা সম্ভব।
শ্রীল প্রভুপাদ: হ্যাঁ। বিশুদ্ধ ভক্তি ছাড়া কেউই কৃষ্ণের ধামে প্রবেশ করতে পারে না। এটি ভগবদ্‌গীতাতেই প্রতিপন্ন করা হয়েছে। “ভক্তির দ্বারা কেবল স্বরূপত আমি যে রকম হই, সেরূপে আমাকে কেউ তত্ত্বত জানতে পারেন। এই প্রকার ভক্তির দ্বারা আমাকে তত্ত্বত জেনে, তারপরে তিনি আমার ধামে প্রবেশ করতে পারেন।” (গীতা-১৮/১৫) কৃষ্ণ কখনো বলেননি জ্ঞানী, কর্মী, যোগীরা তাকে জানতে পারে। কৃষ্ণের স্বধাম শুধুমাত্র ভক্তদের জন্যই সংরক্ষিত। জ্ঞানী, কর্মী, যোগীরা সেখানে যেতে পারে না।
ভক্ত: ‘কৃষ্ণভাবনামৃতই জীবনের চরম লক্ষ্য’ এর অর্থ আপনি কি বোঝাতে চান? তার অর্থ সবসময় কৃষ্ণকে মনে রাখতে হবে?
শ্রীল প্রভুপাদ: হ্যাঁ। আমাদের সবসময় কৃষ্ণকে মনে রাখা উচিত। আমাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে সবসময় কৃষ্ণকে স্মরণ থাকে। যেমন, আমরা সক্রেটিসের দর্শন আলোচনা করছি, যাতে করে আমাদের কৃষ্ণভাবনা সুদৃঢ় হয়। অতএব আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কৃষ্ণ। অনাথায় আমরা কারো দর্শন গ্রহণ কিংবা সমালোচনা করতে আগ্রহী নই। আমরা স্বাভাবিক।
ভক্ত: সুতরাং বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে সবকিছুকে এমনভাবে পরিচালিত করা যাতে করে আমরা কৃষ্ণভাবনাময় হতে পারি।
শ্রীল প্রভুপাদ: হ্যাঁ। এটিই। কৃষ্ণভাবনা ছাড়া আমরা এক ধরনের মানসিক স্তরে অবস্থান করব, যেটিকে বলা হয় বিভ্রান্তির স্তর। এটিকে সংকল্প বিকল্প স্তরও বলা হয়। মনের কাজ হল কোনো কিছুকে গ্রহণ করা আবার প্রত্যাখান করা। যখন আমরা কৃষ্ণভাবনায় দৃঢ় হব তখন মন আর বেশিক্ষণ গ্রহণ আর প্রত্যাখান করার স্তরে থাকতে পারে না। ফলে বিভ্রান্তিও থাকে না।
ভক্ত: প্রথমে সঠিক পন্থা অবলম্বন করা অতঃপর স্বাভাবিক হওয়া?
শ্রীল প্রভুপাদ: হ্যাঁ। যখন মন বিচলিত হয় এবং অন্যত্র চলে যায়। তখন সেটি খুব দ্রুত জপের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে এবং দৃঢ়ভাবে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রের শব্দতরঙ্গ শ্রবণ করতে হবে। একেই বলে যোগাভ্যাস। আমাদের মনকে বিভ্রান্ত হতে দেয়া উচিত নয়। আমাদের উচিত সরলভাবে জপ করা এবং এটি শ্রবণ করা।
ভক্ত: সক্রেটিস যদি তার নীতির সাথে আপোষ করতেন, তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি তার বিশ্বাসের জন্যই প্রাণত্যাগ করেছিলেন।
শ্রীল প্রভুপাদ: এটি সঠিক ছিল যে, তিনি তার বিশ্বাসে দৃঢ় ছিলেন। কিন্তু অনুতাপের বিষয় হচ্ছে, তিনি যে সমাজে বাস করতেন সে সমাজে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের কোন সুযোগ ছিল না। তাই তিনি মৃত্যুকেই গ্রহণ করেছিলেন। সেদিক থেকে বিচার করলে সক্রেটিস একজন মহান আত্মা কারণ তিনি যে সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটি তেমন উন্নত সমাজ ছিল না কিন্তু তারপরও তিনি ছিলেন এক মহান দার্শনিক। হরেকৃষ্ণ!

(ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন ‘ব্যাক টু গডহেড’ জানুয়ারি-মার্চ-২০১৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here