শ্ৰীকৃষ্ণ সর্বদাই বর্তমান

0
86

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) এর প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদ

শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, মধ্যলীলা ২০/৩৫৮-৩৯৪, নিউইয়র্ক, ১ জানুয়ারি, ১৯৬৭

নিত্য লীলা, কৃষ্ণের সর্ব শাস্ত্রে কয়।
বুঝিতে না পারে লীলা কেমনে ‘নিত্য’ হয় ॥

নিত্য মানে চিরন্তন। কৃষ্ণের লীলা, আবির্ভাব, তিরোভাব–সবই চলমান সনাতন এবং সত্য। এর কোনো বিরতি নেই। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলছেন, ‘বুঝিতে না পারে লীলা কেমনে নিত্য হয়।’ সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না, কীভাবে কৃষ্ণের লীলা, আবির্ভাব ও তিরোভাব নিত্য হতে পারে। সাধারণত আমরা মনে করি যে, পাঁচ হাজার বছর আগে কৃষ্ণ অবতীর্ণ হয়েছিলেন, এখন তিনি আর নেই। তিনি হয় মরে গেছেন কিংবা চলে গেছেন। ঠিক যেমন সাধারণ মানুষ জন্মগ্রহণ করে, কিছুদিন এই জগতে থাকে এবং তারপর চলে যায়। তারপর সেই বিশেষ লোকটির কার্যকলাপের আর কোনো হদিস থাকে না। সে এই জড় সমুদ্রের ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যায়। ঠিক একই রকম দেহে না হলেও সেই বিশেষ জীবটি পুনরায় ফিরে আসবে। এই যে রূপটি তুমি পেয়েছ, জড় রূপ, এটা ঠিক সমুদ্রের বুদবুদের মতো। আমাদের অতীত কর্মের প্রতিক্রিয়া অনুসারে কোনো না কোনো ভাবে এই দেহটি গঠিত হয়েছে এবং এটি বড় জোর একশো বছর থাকবে। তারপর এটি অদৃশ্য হয়ে যাবে।
সেই বিশেষ জীবাত্মাটি কোথায় চলে গেছে তার আর কোনো হদিস থাকবে না। অবশ্য পরমেশ্বর ভগবানের হিসাব খাতায় সব হিসাব থাকে। বেদাহং সমতীতানি (গীতা ৭/২৬)। তিনি বলেছেন, “আমি সবকিছুই জানি।” এবং তিনি আমাদের নিত্য সাথী। জীবাত্মার পরমাত্মা রূপে তিনি জানেন কিন্তু আমরা, যারা সেই বিশেষ ব্যক্তিটির আত্মীয় স্বজন, বাবা, মা, ভাই, ইত্যাদি, তাদের মধ্যে কে জানে? কেউ কোনো খবর দিতে পারবে না। কিন্তু কৃষ্ণের আবির্ভাব তিরোভাব সেরকম নয়। কারণ তিনি তাঁর দেহ থেকে ভিন্ন নন।
আমরা দেহবদ্ধ অবস্থায় ভিন্ন। কিন্তু কৃষ্ণ এবং তাঁর দেহ একই বস্তু। এটা বুঝতে হবে। ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ। (ব্রহ্মসংহিতা ৫/১) তাঁর রূপ নিত্য, আনন্দময় এবং জ্ঞানময়। এই জড় দেহটি সেরকম নয়। তাই আমরা বুঝতে পারি না কৃষ্ণলীলা কীভাবে নিত্য হয়। এ কথাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু উপদেশ করছেন।

দৃষ্টান্ত দিয়া কহি তবে লোক যদি জানে।
কৃষ্ণলীলা-নিত্য, জ্যোতিশ্চক্র-প্ৰমাণে ॥

জ্যোতিশ্চক্র প্রমাণে। জ্যোতিশ্চক্র মানে গ্রহগণের কক্ষপথ। একটি গ্রহ তার কক্ষপথে অবিরাম ঘুরতে থাকে। ঠিক সেই রকম, কৃষ্ণলীলাও একটি কক্ষপথের মতো। তিনি খুব সুন্দর দৃষ্টান্ত দিলেন : পৃথিবীর কক্ষপথ, চন্দ্রের কক্ষপথ, সূর্যের কক্ষপথ। সূর্যও স্থির নয়। বৈদিক জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে, সূর্যও ঘুরছে। শ্রীমদ্ভাবগবত, ব্রহ্মসংহিতা ইত্যাদি বৈদিক গ্রন্থ থেকে আমরা এই তথ্য পেয়েছি। ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে যে, যচ্চক্ষুরেষ সবিতা সকলগ্রহাণাং । সূর্যকে পরমেশ্বর ভগবানের চোখ বলে গণ্য করা হয় এবং সূর্য হচ্ছে সমস্ত গ্রহের রাজা। যচ্চক্ষুরেষ সবিতা–সবিতা মানে সূর্য।

যচ্চক্ষুরেষ সবিতা সকলগ্রহাণাং রাজা সমস্তসুরমূর্তিরশেষতেজাঃ সুরমূর্তিঃ।

প্রত্যেক গ্রহেই একজন বিশেষ দেবতা আধিপত্য করেন। একজন প্রধান জীব থাকেন। বিভিন্ন গ্রহের অধিপতিদের পৃথক পৃথক নাম থাকে। যেমন চাঁদকে চন্দ্রলোক বলা হয় এই কারণে যে চাঁদের অধিপতি দেবতার নাম হচ্ছেন চন্দ্রদেব। সূর্যকে সূর্যলোক বলা হয়, কারণ সূর্যগ্রহের অধিপতি হচ্ছেন সূর্যদেব। সূর্য, চন্দ্র এগুলি পদের নাম, ঠিক যেমন রাজ্যপাল। কিন্তু বিশেষ বিশেষ নামও রয়েছে। রাজ্যপাল একজন বিশেষ ব্যক্তি। ঠিক যেমন প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট হচ্ছে একটি সাধারণ নাম, কিন্তু তার ব্যক্তিগত নামও রয়েছে। ঠিক তেমনি, চন্দ্রলোক, সূর্যলোক ইত্যাদি গ্রহের সমস্ত অধিপতি দেবতাদের এই নামগুলি হচ্ছে পদের নাম। যে কেউ সূর্যলোকের অধিপতি হলে তাকে বলে সূর্যদেব, কিন্তু তার ব্যক্তিগত নামও রয়েছে।
ঐ নামটি হচ্ছে বিবস্বান সেকথা ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে। ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবান্ অহম্ অব্যয়ম্ (গীতা ৪/১)। কে সেই বিবস্বান? বিবস্বান হচ্ছেন বর্তমানে সূর্যলোকের অধিপতি দেবতা।
তোমাদের আধুনিক বিজ্ঞান অনুসারে সূর্য হচ্ছে স্থির। কিন্তু সূর্য কেন স্থির হবে, তা আমরা বুঝতে পারি না। প্রত্যেক গ্রহেরই কক্ষপথ রয়েছে। সুতরাং সূর্যও নিশ্চয়ই তার কক্ষপথে ঘুরছে সেকথাই ব্রহ্মসংহিতায় বর্ণনা করা হয়েছে : যচ্চক্ষুরেষ সবিতা সকলগ্রহাণাং রাজা….। তিনি হচ্ছেন সমস্ত গ্রহের রাজা। রাজা সমস্ত-সুর মূর্তিরশেষ তেজাঃ। অশেষ তেজাঃ মানে অন্তহীন উত্তাপ। সূর্যগ্রহের উত্তাপ অন্তহীন। তা আমরা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সূর্য গ্রহটি অন্তহীন তাপ বিকিরণ করছে, তবু তা নিঃশেষিত হচ্ছে না–কেউ বলতে পারে না, সূর্যের মধ্যে কী রয়েছে। এইজন্য তাকে অশেষ তেজাঃ বলা হয়। অ-শেষ, তার কোনো শেষ নেই। ঠিক যেমন আমরা যখন আগুন জ্বালাই, যদি আমরা জ্বালানি সরবরাহ না করি, আগুনের উত্তাপকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। কিন্তু সূর্যের ক্ষেত্রে, জ্বালানী সরবরাহ এতই পর্যাপ্ত যে, উত্তাপের কোনো শেষ নেই। প্রত্যেকটি গ্রহ স্বয়ংসম্পূর্ণ। সে কথা ঈশোপনিষদে বর্ণনা করা হয়েছে।

ওঁ পূর্ণমদঃ পূণমিদং পূৰ্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে ।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥ (ঈশ, আবাহন)।

পরমেশ্বর ভগবান পূর্ণ। আর তিনি, যা কিছু সৃষ্টি করেন তাও পূর্ণ, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে উত্তাপ বিকিরণ করার জন্য সূর্যের মধ্যে যে সব ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চলছে–তাও পূর্ণ৷ ভগবানের কৃপায় ভগবানের সৃজনী শক্তির প্রভাবে। এটিও এক নিকৃষ্ট শক্তি। এটি উৎকৃষ্ট শক্তি নয় । তবু তা পূর্ণ।
এভাবে মহাপ্রভু দৃষ্টান্ত দিয়ে বলছেন, ঠিক যেমন সূর্য, চন্দ্র এবং অন্যান্য গ্রহগুলি তাদের কক্ষপথে ঘুরছে, ঠিক সেরকম কৃষ্ণলীলারও একটি কক্ষপথ রয়েছে এবং সেই লীলা চলছে। ঠিক যেভাবে সূর্য, পৃথিবী ঠিক একই সময়ে ঘুরে চলেছে, ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা পর মধ্যাহ্ন হবে, ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা। তেমনি, কৃষ্ণলীলাও কোনো নির্ধারিত সময়ে লক্ষ লক্ষ বছর পরে এই গ্রহে দৃশ্যমান হবে। অনুরূপভাবে, অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে এবং কৃষ্ণলীলাও এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে ঐ ব্রহ্মাণ্ডে, ওখান থেকে সেখানে ঘুরে চলেছে। ঠিক যেমন কৃষ্ণলীলায় কৃষ্ণ কংসের কারাগারে জন্মগ্রহণ করলেন, পিতা বসুদেব এবং মাতা দেবকীর সন্তান হয়ে। সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে, পরবর্তী ব্রহ্মাণ্ডে আবার জন্মলীলা।
সেই একই জন্মলীলা। ঠিক যেমন সৌর গণনা অনুসারে এখন পৌনে আটটা বাজে, একটু পরেই অন্য এক জায়গায় পৌনে আটটা বাজতে দেখবে, পরে পরেই তার পরবর্তী স্থানে আবার পৌনে আট সঙ্গে সঙ্গে। এই পৌনে আটকে তুমি পাল্টাতে পারবে না। সূর্য এবং পৃথিবীর গতির সঙ্গে সঙ্গে এই পৌনে আট সময়টি চলতেই থাকবে। যেকোনো সময়ে। এমন কি রাত বারোটার সময়েও তুমি যদি খোঁজ নাও, “সৌরগতি অনুসারে এখন পৌনে আটটা কোথায় বাজে? তুমি খুঁজে পাবে। ঠিক নয় কী? একে বলা হয় নিত্য লীলা। কী সুন্দরভাবে মহাপ্রভু তা ব্যাখ্যা করেছেন। এইভাবে কৃষ্ণলীলা সর্বদাই চলছে। কৃষ্ণের জন্ম, জন্মাষ্টমী। আমরা জন্মাষ্টমী উদ্‌যাপন করি। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে সেই জন্মাষ্টমী চলছে। কৃষ্ণের লীলা নিত্য-

কৃষ্ণলীলা-নিত্য জ্যোতিশ্চত্ৰু-প্রমাণে।
জ্যোতিশ্চক্রে সূর্য যেন ফিরে রাত্রি দিনে ॥

চৈতন্য চরিতামৃতেও একথা বলা হয়েছে যে, সূর্যও তার কক্ষপথে ঘুরছে। সপ্তদ্বীপাম্বধি লঙ্ঘি ফিরে ক্রমে ক্রমে। সপ্তদ্বীপ। বৈদিক গণনা অনুসারে এই পৃথিবীতে সাতটি দ্বীপ রয়েছে। ঠিক যেমন ভারত থেকে সমুদ্র পেরিয়ে আমরা তোমাদের দেশে এসেছি। সমুদ্র লঙ্ঘন মানে ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপ রয়েছে। এবার তোমরা শুণে দেখতে পারো–এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা এবং এরকম কয়টি মহাদেশ রয়েছে?
ভক্ত: সাতটি।
শ্রীল প্রভুপাদ : সাতটি রয়েছে ? এটি হচ্ছে বৈদিক গণনা সপ্ত দ্বীপ। সপ্ত মানে সাতখানা ঠিক যেমন সূর্য এইসব সাতখানা দ্বীপ লঙ্ঘন করে তা কক্ষপথে ভ্রমণ করে, ঠিক তেমনি কৃষ্ণও এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে ওই ব্রহ্মাণ্ডে, ঐ ব্রহ্মাণ্ড থেকে ঐ ব্রহ্মাণ্ডে আসছেন। তিনি যখন এই এই ব্রহ্মাণ্ডে আসেন, তখন তিনি বৃন্দাবন নামক ভূখণ্ডে প্রকট হন। এই জন্য এই ভূখণ্ড এত পবিত্র। ভগবান শ্রীচৈতন্য তাঁর আরাধনা সম্পর্কে বর্ণনা করে বলছেন : আরাধ্যো ভগবান ব্রজেশতনয় স্তদ্ধাম বৃন্দাবনম্ । পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছে আরাধ্য দেব এবং তাঁর ধাম, তাঁর রাজধানী হচ্ছে বৃন্দাবন । তাই বৃন্দাবন এত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক যেমন যখন তোমাদের দেশে সূর্য উদিত হয়, একটি নির্দিষ্ট শহর বা স্থান রয়েছে………কোথায় তোমাদের দেশে প্রথম সূর্য দেখা যায়?
ভক্ত : গ্রীনউইচ মেইনে।
শ্রীল প্রভুপাদ : গ্রীণউইচ, মেইনে। ঠিক যেমন মেইনেতে প্রথম সূর্য দেখা যায়, ঠিক তেমনি বৃন্দাবন হচ্ছে সেই স্থান যেখানে কৃষ্ণকে প্রথম দেখা যায়। খুব সুন্দর দৃষ্টান্ত।

সপ্ত দ্বীপাম্বুধি লঙ্ঘি’ ফিরে ক্রমে ক্রমে ।
রাত্রি-দিনে হয় ষষ্টিদণ্ড পরিমাণ।
তিনসহস্র ছয়শত পল তার মান ॥

এখানে চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত জ্ঞান প্রকাশ করছেন। তিনি দিবা রাতকে ষাট দণ্ডে ভাগ করছেন। ঠিক যেমন পাশ্চাত্য বিধান অনুসারে দিন রাতকে চব্বিশ ঘণ্টায় বিভক্ত করা হয়েছে, বৈদিক ব্যবস্থায় তা আরও বেশি করে বিভক্ত করা হয়েছে–ষাট দণ্ড। রাত্রি দিনে হয় ষষ্টি দণ্ড পরিমাণ। দিবা রাত্রকে ষাট ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। তিন সহস্র ছয় শত পল তার মান। আবার এই দণ্ডগুলিকে পুনরায় তিনশত ষাট পলে বিভক্ত করা হয়েছে। সূর্যোদয় হৈতে ষষ্টি পল ক্ৰমোদয় । প্রত্যেক ষাট পলে সূর্যের উদয় হয়। তা হয় ক্রমে ক্রমে। এই ক্রমে ক্রমে উদয় হতে সূর্যের ষাট পল সময় লাগে। সেই এক দণ্ড, অষ্ট দণ্ডে প্রহর হয়। প্রহর মানে তিন ঘণ্টা এবং তা হচ্ছে অষ্ট দণ্ড।

এক দুই তিন চারি প্রহরে অষ্টদণ্ড হয়।
চারি প্রহর রাত্রি গেলে পুনঃ সুর্যোদয় ৷৷

সমগ্র দিবসকে চার প্রহরে ভাগ করা হয়েছে। দিবসের শেষে, চার প্রহর পর সূর্য অস্ত যায়। আবার একই ভাবে চার প্রহর রাত্রি অতিক্রান্ত হলে পুনরায় সূর্যের দর্শন হয়।

ঐছে কৃষ্ণের লীলা-মণ্ডল চৌদ্দ মন্বন্তরে।
ব্ৰহ্মাণ্ড মণ্ডল ব্যাপি’ ক্রমে ক্রমে ফিরে ॥

চৌদ্দ মন্বন্তরে। ব্রহ্মার একদিনে চৌদ্দজন মনু আসেন। কৃষ্ণের লীলা-মণ্ডল চৌদ্দ মন্বন্তরে। অর্থাৎ কৃষ্ণলীলার কক্ষপথ পরিক্রমা করছে। চৌদ্দজন মনুর জীবদ্দশায় তিনি প্রকট হন। প্রত্যেক মনুর জীবনে একাত্তরটি চতুর্যুগ রয়েছে। আঠাশ তম চতুর্যুগের দ্বাপরে কৃষ্ণ আবির্ভূত হন। এর গাণিতিক গণনা রয়েছে। সোয়াশত বছর কৃষ্ণের প্রকট প্রকাশ এবং কৃষ্ণ যখন এই ধরাধামে প্রকট হন, তিনি এখানে ১২৫ বছর থাকেন। কৃষ্ণ যখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ১০০ বছর। কেননা কুরুক্ষেত্রের ঠিক পরেই তিনি দ্বারকায় গিয়েছিলেন এবং এর কিছুদিন পরেই তিনি অপ্রকট হয়েছিলেন। তাই আমার মনে হয় তিনি যখন অর্জুনের রথের সারথি হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স ১০০ বছরেরও বেশি হয়েছিল। এবার ভেবে দেখ, যার শত শত পুত্ৰ, পৌত্র এবং প্রপৌত্র ছিল………… তৎকালীন সময়ে ছেলেদের অল্প বয়সে বিয়ে হত। এখনো ভারতে ছেলেরা অল্প বয়সে বিয়ে করে। ছেলে মেয়েরা মাত্র ষোল বছর বয়স হলেই বিয়ে করত, বিশেষ করে ক্ষত্রিয় পরিবারে তাদের স্বাস্থ্য খুব বিকশিত, কেননা তারা খুব ভাল খেতে পারত, খুব সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে পেত। তাই তাদের দৈহিক বিকাশ ছিল উন্নতমানের। বিশেষ করে তখনকার দিনে তারা পনেরো বছর বয়সেও সন্তান উৎপাদন করতে পারত। তাই যখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তখন তাঁর নাতি নাতনীরাও ছিলেন। তিনি বিশেষত তাঁর বন্ধু অর্জুনকে সাহায্য করতে এসেছিলেন। তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। তিনি ছিলেন রথের সারথি। তোমরা কৃষ্ণের সেই ছবি দেখেছ। তাঁকে দেখতে তখন কুড়ি বছর বয়সের বালকের মতো দেখাচ্ছিল। অদ্বৈতম্ অচ্যুতম্ অনাদিম্ অনন্তরূপম্ আর্দম্ পুরাণপুরুষং নব যৌবনম্ চ। (ব্রহ্মসংহিতা ৫/৩৩) নব যৌবনম্– ঠিক যেন নবীন যুবক। যৌবনের পূর্ণ লাবণ্য। খুব সুন্দর, চমৎকার । তাকে দেখতে সেরকম কিশোরের মতো দেখাচ্ছিল। ঠিক যেন এক ষোল বছর বয়সের যুবক।

তাহা যৈছে ব্রজপুরে করিলা বিলাস।
সোয়াশত বৎসর কৃষ্ণের প্রকট প্রকাশ ॥

এইভাবে, এই ১২৫ বছর সময়ের মধ্যে কৃষ্ণ তাঁর সমস্ত প্রকট লীলা প্রকাশ করেছিলেন। ঐ সমস্ত লীলাই প্রত্যেক ব্রহ্মাণ্ডে চলছে, ঠিক যেমন সূর্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে। এই হচ্ছে কৃষ্ণলীলার ধারণা।

অলাতচক্রপ্রায় সেই লীলাচক্র ফিরে ।
সব লীলা সব ব্রহ্মাণ্ডে ক্রমে উদয় করে ॥

এই সকল লীলা, এগুলি বহু ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোনো না কোনো একটি ব্রহ্মাণ্ডে প্রকাশিত হয়। এই ভাবে প্রতি সেকেন্ড লীলা চলছে। শুধু ১২৫ বছর সময়কে সেকেন্ড ভাগ, সেকেন্ড থেকে ক্ষুদ্র সময়–সেটি আমার জানা নেই। এইভাবে যদি ভাগ কর তাহলে গণনা করতে পারবে কতগুলি ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে। এক ঘণ্টা সময়ের মধ্যে কয়টি সেকেন্ড রয়েছে?
ভক্ত : তিন হাজার, ছয় শত।
শ্রীল প্রভুপাদ : এক মধ্যে তিন হাজার ছয় শত সেকেন্ড। তাহলে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কতগুলি সেকেন্ড রয়েছে? (হাসি) এবার ভেবে দেখ।
ভক্ত : কাগজ কলম আনব?
শ্রীল প্রভুপাদ : না, না, শুধু ভেবে দেখ এক ঘণ্টার মধ্যে তিন হাজার ছয় শত সেকেন্ড । চব্বিশ ঘণ্টায় একদিন। সুতরাং ৩৬০০ × ২৪। গুণফল হবে এক দিনের সেকেন্ড এবং ৩০ দিয়ে গুণ কর। এর মানে এক মাসের সেকেন্ড। তারপর ১২ দিয়ে গুণ কর। তাহলে এক বছরের সেকেন্ড পাবে । সেরকম ১২৫ বছর। এভাবে গুণতে পার। অন্ততপক্ষে ধারণা করতে পারবে কতগুলি ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে। শুধু সেকেন্ড গণনা করে।
তাই ভগবানের সৃষ্টি হচ্ছে বিচিত্র। তিনি অসীম। তাঁর সৃষ্টি অসীম। তাঁর লীলা অসীম। তাঁর রূপ অসীম। তাঁর অবতার অসীম। সব কিছুই অসীম। এমনকি তোমার দেহের মধ্যেম মাথার কতগুলি লোম বা চুল আছে, গুণতে পার কী? তারা অসংখ্য। আমি দাবি করছি, “এটি আমার দেহ, কিন্তু আমি জানি না আমার দেহের মধ্যে কতগুলো লোম বা চুল রয়েছে। কিন্তু কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস কর তিনি সব বলে দেবেন। বিশেষ করে হাওয়ার্ড তো বলতেই পারবে না তার দেহে কয়টা লোম বা চুল রয়েছে। (হাসি) কে বলতে পারবে? এই হচ্ছে কৃষ্ণের সৃষ্টিশক্তি। শুধু ভেবে দেখ। আর তিনি নির্লিপ্ত। ন অহং তেম্ব অবস্থিতঃ।

ময়া ততমিদং সর্বং জগদব্যক্তমূর্তিনা।
মৎস্থানি সর্বভূতানি নাহং তেম্ব অবস্থিতাঃ ॥ (গীতা ৯/৪)

এগুলি হচ্ছে অচিন্ত্য শক্তি। আর গণ্ডমূর্খেরা দাবি করে যে “আমি ভগবান”। দেখ ব্যাপারটা। ভগবান অত সস্তা নয়। মানুষকে অবশ্যই ভগবৎ তত্ত্ব বিজ্ঞান জানতে হবে । ভগবান কত মহান। আমরা তা গণনা করতে পারি না। যারা ভগবানকে সস্তা বলে মনে করে, তারা ভাবে : ভগবান হয়তো আমাদের মতো। সেই একই ব্যাঙের দর্শন। কূয়োতে বাস করে ব্যাঙ আটলান্টিক মহাসাগরের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপার চেষ্টা করছে। দেখ ব্যাপারটা। ঠিক একইভাবে এইসব মূর্খরা, এরা হচ্ছে কূয়োর ব্যাঙ। আর তারা আটলান্টিক মহাসাগরের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপছে আর নিজেদেরকে ভগবান বলে দাবি করছে।

জন্ম, বাল্য, পৌগণ্ড, কৈশোর প্রকাশ।
পূতনা বধাদি করি মৌষলান্ত বিলাস ॥
কোন ব্রহ্মাণ্ডে কোন লীলার হয় অবস্থান।
তাতে লীলা ‘ নিত্য’ কহে আগম-পুরাণ ॥

তাই ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলছেন : “ঠিক যেমন পৃথিবী গ্রহের কক্ষপথে সৌর কালের গণনা সর্বদাই বর্তমান, সবকিছুই কোনো না কোনো ব্রহ্মাণ্ডে ঘটে চলেছে।” একেই বলে নিত্যলীলা। কেননা অবিরাম, নিত্যকাল অসংখ্য গ্রহ নক্ষত্রের কোথাও না কোথাও ঘটে চলেছে, যা আমরা গণনাও করতে পারব না। তাই তাঁর লীলা, আবির্ভাব এবং তিরোভাব সবই নিত্য। আমরা মৃত বস্তুর উপাসক নই । ঠিক যেমন একটা বোকা লোক রাত্রি বেলায় বলে উঠল “ও, সূর্য ধ্বংস হয়ে গেছে।” কীভাবে? “কারণ আমি আকাশে সূর্য দেখতে পাচ্ছি না, তা ধ্বংস হয়ে গেছে।” ঠিক সেইভাবে বোকারা মনে করে “ও, কৃষ্ণকে আমি দেখতে পাচ্ছি না, তাই তিনি ধ্বংস হয়ে গেছেন।” এই হচ্ছে বোকাদের গণনা। এখন চৈতন্য মহাপ্রভুর এই বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, কৃষ্ণ গত হন নি, মরে যান নি। তিনি সর্বদাই বর্তমান, প্রতি মুহূর্তে। সর্বত্র। আর আমরা যদি আন্তরিকভাবে কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত থাকি, সেই কৃষ্ণ সর্বদাই আমাদের সঙ্গে থাকেন। তিনি আমাদের সুরক্ষা দান করেন। তাঁর কৃপা রয়েছে, সবকিছুই রয়েছে। এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আমাদের কৃষ্ণভাবনা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এটা মনগড়া কিছু নয়, মিথ্যা ধারণা নয়, কিন্তু সত্য বিষয়। এবং আমাদের ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতো মহান ব্যক্তিদের অনুসরণ করতে হবে, যিনি বস্তুতপক্ষে শ্রীকৃষ্ণবিজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি প্রার্থনা নিবেদন করতে গিয়ে রূপ গোস্বামী যা বলেছেন :

নমো মহাবদান্যায় কৃষ্ণপ্রেমপ্রদায় তে।
কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্য নাম্নে গৌরত্বিষে নমঃ ॥

(চৈ. চ. মধ্য ১৯/৫৩)

“ওহে, আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করছি কেননা আপনি এতই মহাবদান্য যে আপনি কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ করছেন। কৃষ্ণও তা চেয়েছেন, তিনি যখন উপস্থিত ছিলেন, তিনি বলেছেন, সর্বধর্মান পরিত্যজ্য.. (গীতা ১৮/৬৬) ““আমাকে ভালবাস, আমার কাছে আত্মসমর্পণ কর। মানুষ তাকে ভুল বুঝল। কিন্তু আপনার প্রচার পদ্ধতি এতই সুন্দর যে, এই সংকীর্তন আন্দোলনের দ্বারা প্রত্যেকেই কৃষ্ণ তত্ত্ব দর্শন উপলব্ধি করতে পারে; অতি সহজে। তাই আপনিই হচ্ছেন মহাবদান্য অবতার। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করছি।” অসংখ্য ধন্যবাদ।


 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জুলাই – সেপ্টেম্বর ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here