শ্রীশ্রী রাধা শ্যামসুন্দর মন্দির

0
129

শ্রীবৃন্দাবন ধাম অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ স্থান যেহেতু তা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণকমলের স্পর্শে ধন্য। বৃন্দাবনের প্রধান ৭টি মন্দিরের একটি হচ্ছে রাধা শ্যামসুন্দর মন্দির। এই মাহাত্ম্যপূর্ণ স্থানটি সকল ভক্তদের হৃদয়ে নিয়ত অবস্থান করছে কারণ এখানে রয়েছে অপূর্ব শ্রীমতী রাধারাণী ও শ্রীশ্যামসুন্দরদেব বিগ্রহ। স্বয়ং রাধারাণীর হৃদয়মঞ্জরী হতে আগত শ্যামসুন্দর বিগ্রহ সকল ভক্তবৃন্দের হৃদয়ে অনাবিল আনন্দের জাগরণ ঘটায়। এই স্থানটি এমনকি পূর্বতন মহান মহান বৈষ্ণবদের পদচারণায়—-। শ্রীল জীব গোস্বামী, শ্রী গোপাল ভট্ট গোস্বামী, শ্রীল লোকনাথ গোস্বামী, শ্রীভূগর্ভ গোস্বামী প্রতিদিন এই বিগ্রহদ্বয় দর্শন করে গভীর প্রেমে মগ্ন হতেন। এছাড়া শ্রীল রঘুনাথ গোস্বামী এবং শ্রীল কৃষ্ণদাস গোস্বামী যারা রাধাকুণ্ড ছেড়ে কোথাও যেতেন না, তাঁরাও প্রৌঢ় অবস্থায় এই বিগ্রহদ্বয় দর্শন করতে ছুটে আসতেন। শ্রীল বলদেব বিদ্যাভূষন বহু বছর রাধা শ্যামসুন্দরের সেবা করেছিলেন। এছাড়া গৌড়ীয় মঠের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত স্বরসতী গোস্বামী ঠাকুর এই বিগ্রহদ্বয় অপ্রাকৃত দর্শনে নিজেকে ভুলে যেতেন। ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদও এই বিগ্রহ দর্শনের পর আনন্দে অশ্রুপাত করেছিলেন।
একবার কৃষ্ণদাস বৃন্দাবন থেকে শ্রীল জীব গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে ভক্তি-শাস্ত্র শিক্ষা করতে লাগলেন। হৃদয়চৈতন্য কৃষ্ণদাসকে একটি পত্র লিখে পাঠালেন–এই আজ্ঞা দিয়ে যে তিনি যেন জীব গোস্বামীর শরণাগত হন এবং সর্বতোভাবে তাঁর উপদেশ মেনে চলেন। শ্রীনিবাস আচার্য নরোত্তম দাস ঠাকুর উভয়ে ইতিপূর্বেই বৃন্দাবন পৌঁছিয়ে ষড় গোস্বামীগণের সঙ্গে ভক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন করছিলেন। শ্রীনিবাস আচার্য এবং নরোত্তম দাস ঠাকুরের সান্নিধ্যে কৃষ্ণদাস সুখে শাস্ত্র অধ্যয়ন করে সময় অতিবাহিত করতে লাগলেন। শ্রীমদ্ভাগবত হতে নিরন্তর ভক্তিযুক্ত সেবার মহিমা শ্রবণ করতে করতে কৃষ্ণদাসের অন্তরে কোনো নিভৃত কুঞ্জে শ্রীশ্রীরাধা-গোপীনাথের সেবা করার জন্য তীব্র লালসার উদয় হল। তিনি শ্রীল জীব গোস্বামীর নিকট তাঁর এই অভিলাষ ব্যক্ত করলেন। তিনি তাঁকে শ্রীমতী রাধারাণীর কৃপা লাভের জন্য প্রতিদিনে শেষরাত্রে কুঞ্জ ঝাট দিতে বললেন। সন্ধ্যায় কৃষ্ণদাস বিগ্রহের সামনে নৃত্য কীর্তন করতেন এবং তীব্র ভক্তি সহকারে রোদন করতেন। এইভাবে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর তিনি শ্রীমতী রাধারাণীর কৃপাদৃষ্টি লাভ করলেন। সেই রাত্রের শেষে তিনি যখন নিকুঞ্জবন ঝাট দিচ্ছিলেন, সে সময় কুঞ্জ-প্রাঙ্গণে তিনি একটি নূপুর পড়ে থাকতে দেখলেন। মহাসুখে তিনি সেটি তুললেন। যেই মাত্র তিনি নূপুরটি স্পর্শ করলেন তৎক্ষণাৎ তিনি ভাবাবেগ ও আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়লেন। আনন্দাশ্রু মোচন করতে করতে তিনি নৃপুরটি তাঁর বক্ষে ধারণ করলেন, কখনো কখনো তিনি সেটিকে কপালে স্পর্শ করতে লাগলেন, কখনো বা তাঁর মনমাতানো সুগন্ধ আঘ্রাণ করতে লাগলেন। সেই সময়ে শ্রীমতী রাধারাণী হঠাৎ অনুধাবন করলেন যে তিনি তাঁর নূপুরটি কোথাও হারিয়েছেন। অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি ললিতা দেবীকে নিধুবনে নূপুর খুজতে পাঠালেন। ললিতা দেবী বুঝতে পারলেন যে শ্রীরাধিকা অবশ্যই তাঁর নূপুরটি সেখানে স্বেচ্ছায় ফেলে গিয়েছেন কোনো বিশেষ লীলা প্রকাশের জন্য। কোনো মন্তব্য না করে তিনি নিধুবনের কুঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তখন প্রায় সকাল হয়ে গিয়েছিল। ললিতাদেবী একজন সাধারণ দাসীর বেশে কৃষ্ণদাসের সামনে আবির্ভূতা হলেন। তিনি কৃষ্ণদাসকে নূপুরটির সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন। কৃষ্ণদাস বললেন, “হ্যাঁ, আমি একটি সোনার নূপুর পেয়েছি। ঐ নূপুরটি কি তোমার?” ললিতা উত্তর দিলেন, “না, এটি আমার নয়। এটি আমার প্রিয় সখীর।”
কৃষ্ণদাস জিজ্ঞাসা করলেন, “কিভাবে এই নূপুর ওখানে এল?” ললিতা বললেন, “আমার সখী কাল রাত্রে এখানে পুষ্প চয়ন করতে এসেছিল। অন্ধকারে সে এটা হারিয়ে ফেলেছে। ”
কৃষ্ণদাস জিজ্ঞাসা করলেন, “তাহলে সে নিজে নূপুরটি নিতে আসেনি কেন? ললিতা বললেন, “সে একটি সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে। এখন প্রায় সকাল হয়ে গছে। লজ্জাবশত সে এই সময়ে প্রকাশ্যে আসবে না। সেজন্য সে আমাকে পাঠিয়েছে নূপুরটি খুঁজে নিয়ে যেতে।
কৃষ্ণদাস বুঝতে পারলেন যে এর মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু রহস্য আছে। তিনি বললেন, “এটি অত্যন্ত মূল্যবান নূপুর। আমি এটি তোমাকে দিয়ে দিতে পারিনা–একটু বোঝার চেষ্টা কর। তোমার সখীকে এখানে এসে নূপুর নিয়ে যেতে বল। আমি মেপে দেখব নূপুরটি তাঁর পায়ে খাটছে কিনা– নূপুরটি সত্যিই তাঁর কিনা।” ললিতা দেবী বুঝতে পারলেন যে, এটি আসলে রাধিকার নূতন কোন লীলার লক্ষণ। তিনি শ্রীমতী রাধিকার কাছে ফিরে এসে কৃষ্ণদাস যা বললেন তাঁকে তা জানালেন। তখন রাধারাণী ললিতা সখীকে তাঁর কুঞ্জের দিকে নিয়ে গেলেন। কৃষ্ণদাসের কাছে গিয়ে রাধারাণী তাঁর শ্রীহস্ত প্রসারিত করে কৃষ্ণদাসের কাছে নূপুর চাইলেন। মহা বিস্ময়ে কৃষ্ণদাস বললেন, “তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে। তাহলে তোমার নূপুর এখানে এই কুঞ্জে চলে এল কিভাবে-এটি কেমন করে সম্ভব?
শ্রীমতী রাধারাণী উত্তর দিলেন, “কৃষ্ণদাস! এটি হচ্ছে আমার নিকুঞ্জ মন্দির। প্রতি রাত্রে আমি লীলা করার জন্য এখানে আগমন করি। মহাসম্ভ্রম ও প্রেমানন্দে অভিভূত হয়ে কৃষ্ণদাস বললেন, “এখন আমি বুঝতে পারছি যে আপনি অবশ্যই নিকুঞ্জেশ্বরী! যদি এটা সত্যি হয় তাহলে হে নিকুঞ্জেশ্বরী! হে দেবী! আপনার সুন্দর অপ্রাকৃত স্বরূপ মূর্তিতে আমায় দর্শন দিন। এই জীবনে আপনাকে স্বরূপে দর্শন করার আমার অভিলাষ কৃপা করে চরিতার্থ করুন!”
শ্রীমতী রাধারাণী মৃদু হেসে বললেন, “এ পর্যন্ত আমার স্বরূপ দর্শনের অপ্রাকৃত দৃষ্টি তোমার ছিল না। কিন্তু এখন আমি তোমার সেবার জন্য একটি মহা আশীষ প্রদান করব।” শ্রীমতী তখন কৃষ্ণদাসের হাত থেকে নূপুরটি নিয়ে প্রথমে ব্রজের ধূলিতে তা স্পর্শ করে তারপর কৃষ্ণদাসের হাত থেকে নূপুরটি নিয়ে প্রথমে ব্রজের ধূলিতে তা স্পর্শ করে তারপর কৃষ্ণদাসের কপালে সেই নূপুরটি স্পর্শ করলেন। তিনি বললেন,“কৃষ্ণদাস! তুমি নিষ্কপট অন্তরে গভীর যত্ন সহকারে আমার অত্যন্ত প্রিয়কারী নিকুঞ্জ সেবায় নিরত থেকেছ। এইভাবে তোমার হৃদয় কুঞ্জের মতোই পবিত্র হয়ে গিয়েছে। তোমার এই শুদ্ধ সেবার সূচক হিসেবে ব্রজধূলিতে অঙ্কিত এই তিলক তোমার ললাটে সর্বদাই থাকবে। আমার সেবা করে তুমি কেমন আনন্দ প্রদান কর। সেজন্য আমি আজ থেকে তোমার নাম দিচ্ছি শ্যামানন্দ।” এরপর শ্রীমতি রাধারাণী তাঁর হৃদয়কমল হতে শ্রীশ্যামসুন্দর বিগ্রহ নিয়ে শ্যামানন্দকে প্রদান করেন। ললিতা সখী এগিয়ে এসে শ্যামানন্দকে একটি গোপন মন্ত্র দিলেন। তিনি শ্রীমতীকে বললেন, “হে সখী তুমি কৃষ্ণদাসকে কত কৃপা করেছ। এখন কৃপা করে একবার তোমার স্বরূপ মূর্তি তাঁকে দর্শন করাও। এটি তাঁর তীব্র বাসনা। কৃপা করে তা পূর্ণ করো!” তখন, ক্ষণিকের বিদ্যুৎ চমকের মতো শ্রীমতী রাধারাণী শ্যামানন্দকে তাঁর স্বরূপ দর্শন করালেন। সেই তড়িৎ-প্রভার ন্যায় মহাদ্যুতিময় চিন্ময় রূপ দর্শন করে শ্যামানন্দ মূর্ছিত হয়ে ভূমিতে পড়ে গেলেন।
কিভাবে মন্দিরে পৌছাবঃ বৃন্দাবনের লৌহ বাজার নামক এলাকা থেকে ৫০মি. দূরত্ব হেঁটে যাবেন। তাঁরপর বাসে একটি প্রবেশদ্বার দেখতে পাবেন। সেখান থেকে ডানে ১৫মি. গেলেই মন্দিরের প্রবেশদ্বার। এবার মন্দিরের পাশের রাস্তা দিয়ে সোজা নীচে নেমে একটি আঙ্গিনা দেখতে পাবেন। এখানে শ্যামানন্দ প্রভুর পুষ্প সমাধী মন্দির রয়েছে। এখান থেকে তুমি. সামনে গেলেই “শ্যামানন্দ তিলক স্থান” মন্দির দেখতে পাবেন যেখানে শ্যামানন্দ প্রভু রাধারাণীর নূপুর খুঁজে পেয়েছিলেন।
বিগ্রহ দর্শনঃ সকাল ৬.১৫ মিঃ হতে ১১.৪৫ টা পর্যন্ত এর বিকাল ৫টা হতে ৯.৩০ মি. পর্যন্ত এছাড়া ব্রাহ্মমূহুর্তে মঙ্গলারতি হয়ে থাকে। বসন্ত পঞ্চমী, হোলি, ঝুলন যাত্রা, জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, প্রভৃতি বিশেষ উৎসবে বিগ্রহদ্বয় অতি সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে ভক্তদের অশেষ কৃপা প্রদান করেন।
শ্রীমতী রাধারাণী ঘোষণা করেছিলেন যে, যারা প্রতিনিয়ত বৃন্দাবনে এই রাধাশ্যামসুন্দর বিগ্রহ প্রেমোচ্ছাসে দর্শন করবে, তাঁর পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী দশ প্রজন্ম মৃত্যুর পর গোলক বৃন্দাবনে গমনপূর্বক রাধাকৃষ্ণের নিত্যসেবা লাভ করবে। অতএব, আপনি কেন রাধাশ্যামসুন্দরের কৃপা থেকে বঞ্চিত হবেন, রাধাশ্যামসুন্দরের অপ্রাকৃত সৌন্দর্য দর্শন করে কে না তাঁর এই দূর্লভ মানবজীবনকে সার্থক করতে না চায়? হরে কৃষ্ণ।


 

চৈতন্য সন্দেশ মার্চ – ২০০৯ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here