শ্রীশ্রী গৌরমণ্ডল দর্শন : বঙ্গদেশ (পর্ব-২) চাঁটিগ্রাম

0
118

ছনহরা-জারগ্রাম-বিনাজুরী-বেলেটি

শচীদুলাল প্রেমসাগর দাস


চট্টগ্রামের বৈষ্ণবীয় ইতিহাস (আবির্ভাব ভূমি)

১. চক্রশাল (বিদ্যানিধির শাসনাধীন অঞ্চলের নাম) বা মেখল পুণ্ডরীক ধাম (হাটহাজারি)
= শ্রী পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি (কৃষ্ণলীলায় শ্রীমতী রাধারানির পিতা বৃষভানু মহারাজ) 
২. বেলেটী (বাঁশখালী থানার অন্তর্গত বাণীগ্রাম [কথিত]) = শ্রী গদাধর পণ্ডিত (কৃষ্ণলীলায় শ্রীমতী রাধারানি)
৩. ছনহরা গ্রাম (পটিয়া) = বাসুদেব-মুকুন্দ দত্ত (কৃষ্ণলীলায় মধুব্রত ও মধুকণ্ঠ), (বাসুদেব দত্ত সত্যযুগে প্রহ্লাদ মহারাজের প্রকাশ)
৪. বিনাজুরী (রাউজান) = শ্রী জগৎ চন্দ্র গোস্বামী [চৈতন্য লীলায় মহাপ্রভুর মন্ত্ৰ শিষ্য (গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধানের ভাষ্যানুসারে)]
৫. জারগ্রাম (পথেরহাট, নোয়াপাড়া, রাউজান) = শ্রী ধনঞ্জয় পণ্ডিত কৃষ্ণ লীলায় বলরাম পার্ষদ দ্বাদশ গোপালের অন্যতম বসুধাম সখা)

 
শ্রীশ্রী গৌরমণ্ডল দর্শন : বঙ্গদেশ, পর্ব-১এ চাঁটিগ্রামের অন্তর্গত শ্রীশ্রী পুণ্ড্ররীক ধাম সম্পর্কে বিশদ বর্ণিত হয়েছে। এ সংখ্যায় আমরা চাটিগ্রামের অন্যান্য চৈতন্য পার্ষদের আবির্ভাব ভূমি ও শ্রীপাট সম্পর্কে জানব।

চাঁটিগ্রামে চৈতন্য পার্ষদের ইতিহাস

বাসুদেব-মুকুন্দ দত্ত মহাপ্রভুর সন্ন্যাস লীলার পূর্বে–মহাপ্রভু যেহেতু ক্ষেত্রলীলায় যাবেন অর্থাৎ বৈরাগ্যভাব আশ্রয়ী হয়ে গোপনে ভগবদপ্রেম আস্বাদন করবেন (গম্ভীরা লীলা) তারা যেহেতু অন্তরঙ্গ পার্ষদ তাই তারা এটি জানতেন, সেইটির উপযুক্ততা অর্জনের জন্য নবদ্বীপ থেকে পুনরায় চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। চট্টগ্রামে ফিরে এসে পুণ্ডরীক বিদ্যানিধিকে আশ্রয় করলেন। বাসুদেব মুকুন্দ দত্ত চট্টগ্রামে এসেছিলেন পরমানন্দ পুরীর পরামর্শে। চট্টগ্রামে আসার পর পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি তাঁর অর্থায়নে নিজের ভজন কুঠিরের ন্যায় মুকুন্দ-বাসুদেব দত্তের ভজন কুঠির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন । মেখলা গ্রামে এই ভজন কুঠিরে তারা ভজন করতেন। মুকুন্দ দত্ত তাঁর ভজনস্থলীতে লক্ষ্মী-গোবিন্দ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বাসুদেব দত্ত কোনো বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন নি, তিনি পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি সেবিত লক্ষ্মী-জনার্দনের সেবক ছিলেন। এভাবে তারা এখানে সেবা করলেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির বিস্তার সাধন করলেন। বাসুদেব-মুকুন্দ দত্ত যখন চট্টগ্রামে এলেন তখন বিদ্যানিধি অনেক উচ্ছ্বসিত হলেন। তাঁদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার বেগবান হয়েছে। তখন সমগ্র ভূভারতে প্রভাকর মিশ্র এবং অদ্বৈত আচার্য এই দুই জনের শিষ্য সমগ্রবিশ্বব্যাপী ছিল, এমনকি রাশিয়া থেকে চীন পর্যন্ত, ইরান থেকে মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত রাজন্যবর্গ, মন্ত্রীবর্গ এ দু’জনের একজনেরই শিষ্য ছিল। নবদ্বীপে অদ্বৈত আচার্যের টোলে পড়ার জন্য চট্টগ্রামেরও অনেক শিষ্য গিয়েছিল। অদ্বৈত আচার্যের ৫টি পুত্র ছিল, তাঁর মধ্যে দুই জন ভক্ত।
চৈতন্য লীলায় মহাপ্রভুর অন্যতম পরিকর বাসুদেব দত্ত ও মুকুন্দ দত্ত
যখন মহাপ্রভুর আদেশে অদ্বৈত আচার্য প্রভু পূর্ণরূপে ভক্তিবাদ প্রচার শুরু করলেন, তখন তার বাকি তিনজন পুত্র এর বিরোধিতা করলেন। তখন অদ্বৈত প্রভুর সেই তিনপুত্র এবং চট্টগ্রামের শিষ্যগণ দল বেঁধে চট্টগ্রামে চলে আসেন। তারা চট্টগ্রামে এসে মায়াবাদ প্রচার শুরু করলেন। তখন পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি, বাসুদেব মুকুন্দ দত্তের প্রচারের ফলে যে বৈষ্ণবীয় পরিবেশ বিরাজ করছিল তা বাঁধাগ্রস্ত হল। তাই দেখে বিদ্যানিধি মনোকষ্টে চট্টগ্রাম ছেড়ে নবদ্বীপে চলে যান। তিনি যাওয়ার সময় শ্রীজগৎচন্দ্র গোস্বামীকে লক্ষ্মী জনার্দন বিগ্রহের সেবাভার অর্পণ করে যান।
জগৎচন্দ্র গোস্বামী বহু বছর আড়ম্বরপূর্ণভাবে বিগ্রহের সেবা করেছিলেন, কিন্তু যখন শেষ সময়ে তিনি একদম অক্ষম হয়ে পড়লেন তখন তিনি তাঁর জন্মপীঠে ফিরে যান এবং সেখানেই নিত্যালীলায় প্রবিষ্ট হন।
বিদ্যানিধির সঙ্গিনী রত্নাবতী দেবী যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন জগৎচন্দ্র গোস্বামী এখানে সেবা করেছিলেন। লক্ষ্মী জনার্দনের সেবার চেয়েও
রত্নাবতী মাতার সেবা পরিচর্যাই ছিল জগৎচন্দ্র গোস্বামীর কাছে মুখ্য, ঠিক যেমন ঈশান ঠাকুর শচী মায়ের সেবা করত। অদ্বৈত আচার্যের পুত্ররা যে চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিল এই তথ্য ঈশান নাগর ঠাকুর কৃত “অদ্বৈত প্রকাশ” গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। এরপর পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি নবদ্বীপ লীলায় যুক্ত হলেন, বাসুদেব-মুকুন্দ দত্ত নবদ্বীপে ফিরে গেলেন।

ছনহরা : বাসুদেব দত্ত ও মুকুন্দ দত্তের আবির্ভাবস্থলী

পথ নির্দেশ : ছনহরা গ্রাম বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার অন্তর্গত। চট্টগ্রাম শহর থেকে (কক্সবাজার গামী) বাসে পটিয়া নেমে সেখান থেকে টেম্পোতে সাত কিলোমিটার দূরে ছনহরাগ্রাম শ্রীপাটে আসা যায়।
পরিচয় : শ্রীমন্ মহাপ্রভুর দুইজন অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীল বাসুদেব দত্ত ঠাকুর এবং শ্রীল মুকুন্দ দত্ত ঠাকুর। ব্রজলীলায় বাসুদেব দত্ত মধুব্রত এবং মুকুন্দ দত্ত মধুকণ্ঠ ছিলেন। দুই ভাই সুকণ্ঠ সঙ্গীত শাস্ত্র বিশারদ এবং মহাপ্রভুর কীর্তনসঙ্গী ছিলেন। ছনহরা গ্রামে এখনও তাঁদের জরাজীর্ণ গৃহ রয়েছে। এখানে বাসুদেব দত্ত ও মুকুন্দ দত্তের সেবিত তেরোটি শালগ্রাম শিলা সেবিত হচ্ছে। চৈতন্য চরিতামৃতে বাসুদেব দত্তকে সত্যযুগের প্রহ্লাদ মহারাজের প্রকাশ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তীকালে তাঁরা মেখলগ্রামে গিয়ে বাস করেন। সেখানে তাঁদের ভজনকুটির রয়েছে। তার পরবর্তী সময়ে মুকুন্দ দত্ত নবদ্বীপে গিয়ে বাস করেন এবং মহাপ্রভুর হরিনাম সংকীর্তনে সঙ্গী হন। বাসুদেব দত্ত পরবর্তীকালে মেখলগ্রাম থেকে কাঁচরাপাড়ায় গিয়ে বাস করেন। তারপরে নবদ্বীপ ধামের মোদদ্রুম দ্বীপের মামগাছি গ্রামে বাস করেন এবং সেখানে তাঁর সেবিত বিগ্রহ এবং তাঁর বসতভিটা এখনো আছে। তাঁর সেবিত মদনগোপাল বিগ্রহ সারঙ্গ মুরারি পাটে সেবিত হচ্ছে। বাসুদেব দত্ত হচ্ছে প্রহ্লাদ মহারাজ। আবার যিনি কৃষ্ণলীলায় মধুব্রত তিনি কলিকালে বাসুদেব দত্ত। ভগবানের স্তব স্তুতি করার যে প্রয়াস সে প্রয়াসই হচ্ছে মধুকণ্ঠ। কৃষ্ণলীলায় মধুকণ্ঠ এবং কলিকালে মুকুন্দ । ভগবান শুধু মুকুন্দের কণ্ঠের গান ছাড়া অন্য কারো কণ্ঠের গান শুনতেন না। মুকুন্দের কীর্তন শুনলেই উনার আনন্দ ৷
অন্যদিকে বাসুদেব দত্ত ছিল প্রহ্লাদ মহারাজের অবতার। প্রহ্লাদ মহারাজের সাথে ভগবানের সম্পর্ক ছিল দাস্য স্বভাবের, সখ্য স্বভাবের নয়। তাই তিনি মহাপ্রভুর সাথে তেমন ঘনিষ্ট হতে পারেননি। তিনি একটু সম্ভ্রমাত্মিকা ভাব নিয়ে দূরে দূরে থাকতেন। এদিকে মুকুন্দকে মহাপ্রভু বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে লাগলে বাসুদেব দত্ত বলতে লাগলেন প্রভু আমি কি অপরাধ করলাম? আমাকে তুমি ভালবাসো না। তুমি মুকুন্দকে বেশি ভালবাসো। যদিও বাসুদেব দত্ত এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর সহপাঠী ছিল।
এখানে উল্লেখ্য যে, সন্ন্যাস নেওয়ার পরে অদ্বৈতের গৃহে যখন পুনরায় মহাপ্রভুর আগমন ঘটেছিল এবং মহাপ্রভুকে শেষ বিদায় দেওয়ার সময় শচীমাতা পুত্রকে দেখার দায়িত্ব চারজনকে দিলেন। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন মুকুন্দ দত্ত। এজন্যই মুকুন্দ দত্ত মহাপ্রভুর সাথে বেশি সময় থাকতেন। এটি দেখে বাসুদেব দত্ত অভিযোগ করতে লাগলেন মহাপ্রভুকে, “মুকুন্দ তোমার সঙ্গ বেশি পায়।” তখন মহাপ্রভু বলতে লাগল, “দেখ বাসুদেব আমার এই দেহটা হচ্ছে তোমার। তুমি যাকে বিলাবে আমি তার হয়ে যাব।” বাসুদেব দত্ত ছিলেন বড় উদার। বাসুদেব দত্ত একবার মহাপ্রভুকে বলেছিলেন, “প্রভু জগতের সবার পাপ আমাকে দিয়ে তুমি তাদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে 66 যাও।” এতে প্রমাণিত হয়, ভগবান যার সম্পত্তি সেই বাসুদেব দত্তের হৃদয়টা কত বড় মাপের হতে পারে। বাসুদেবের সেবিত মদন গোপাল বিগ্রহ এখনো নবদ্বীপে আছে। মুকুন্দ দত্তের সেবিত লক্ষ্মী-গোবিন্দ বিগ্রহ পুণ্ডরীক ধামে আছে একটু ভগ্ন অবস্থায়। সেই বিগ্রহ সংস্কারের প্রচেষ্টা চলছে। চৈতন্য লীলা সংগঠন করার জন্য বিভিন্ন ভক্ত (মহাপ্রভুর লীলায় কারা কারা উপযুক্ত যাতে মহাপ্রভুর কার্যক্রম বিস্তার করা যায়) সংগ্রহ কাজটি বাসুদেব দত্ত করতেন।

জারগ্রাম : ধনঞ্জয় পণ্ডিতের আবির্ভাবস্থলী

পথ নির্দেশ : জারগ্রাম বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানায় অবস্থিত। হাটহাজারি থেকে নোয়াপাড়াগামী বাসে নোয়াপাড়া পথেরহাট নামতে হবে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে নোয়াপাড়া কলেজের সামনে এই শ্রীপাটে আসা যায় অথবা পুণ্ডরীক ধাম এসে সেখান থেকেও এই শ্রীপাটে আসা যায় ।
ধনঞ্জয় পণ্ডিতের আবিভাব স্থলী
পরিচয় : নিত্যানন্দ প্রভুর পার্ষদ দ্বাদশ গোপালের অন্যতম শ্রীধনঞ্জয় পণ্ডিত। গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান অনুসারে চট্টগ্রাম জেলার জারগ্রামে ১৩০৬ সালে চৈত্রী শুক্লা-পঞ্চমী তিথিতে তিনি আবির্ভূত হন। তাঁর পিতার নাম শ্রীপতি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতার নাম কালিন্দী দেবী। কৃষ্ণলীলায় তিনি বলদেবের প্রিয় দ্বাদশ গোপালের অন্যতম বসুদাম সখা ছিলেন।
তথাহি গৌরগণোদ্দেশ দীপিকায় (১২৭)
“বসুদাম সখায়শ্চ পণ্ডিতঃ শ্রীধনঞ্জয়।”
ধনঞ্জয় পণ্ডিতের উপবেশনস্থান। ইনসেটে ভূগভস্থ গুহাসদৃশ গোপন ভজনস্থলীর দ্বার।
ধনঞ্জয় পণ্ডিত বাল্যকাল থেকেই তুলসী দেবীকে ত্রি-সন্ধ্যা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করতেন। অল্প বয়সেই তাঁর পিতা তাঁকে হরিপ্রিয়া নামক এক সুন্দরী কন্যার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে। তথাপিও তিনি অল্প কিছুদিনের মধ্যে তীর্থ পর্যটনে গমন করেন। তাঁর ধনাঢ্য পিতা তাঁকে পথ খরচের জন্য যে অর্থ দিয়েছিলেন তা সম্পূর্ণ তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পাদপদ্মে সমর্পণ করে ভাণ্ড হাতে নিয়েছিলেন । তাই বৈষ্ণব বন্দনা গীতিতে উল্লেখ আছে—
“বিলাসী বৈরাগী বন্দো পণ্ডিত ধনঞ্জয় । সৰ্ব্বস্য প্রভুরে দিয়া ভাণ্ড হাতে লয় ॥”
শ্রীধনঞ্জয় পণ্ডিত নিত্যানন্দ প্রভুর অত্যন্ত প্রিয় পার্ষদ ছিলেন। তথাহি শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে (আদি লীলা ১১/৩১)-
“নিত্যানন্দ প্রিয় ভৃত্য পণ্ডিত ধনঞ্জয়। অত্যন্ত বিরক্ত, সদা কৃষ্ণপ্ৰেমময় ॥”
তথাহি চৈতন্য ভাগবত (অন্ত্য খণ্ড, ৫/৭৭৩)-
“ধনঞ্জয় পণ্ডিত-মহান্ত-বিলক্ষণ। যাঁহার হৃদয়ে নিত্যানন্দ সর্ব্বক্ষণ ॥”
নিত্যানন্দ প্রভুর আদেশে ধনঞ্জয় পণ্ডিত নামপ্রেম প্রচারের উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার শীতলগ্রামে শ্রীপাট স্থাপন করেন। তাঁর সেবিত শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীগোপীনাথ শীতল গ্রামে সেবিত হচ্ছে এবং সেখানে তাঁর সমাধি রয়েছে।
বর্তমানে ধনঞ্জয় পণ্ডিতের জন্মস্থান জারগ্রামের মন্দিরে ১০৮টি শিবলিঙ্গ সেবিত হচ্ছেন। সেখানে জড়াজীর্ণ একটি টিনের চালা ঘরে শ্রীধনঞ্জয় পণ্ডিতের উপবেশন স্থান রয়েছে। সেখানে একটি গুহাসদৃশ গোপন ভজনস্থলী রয়েছে। কথিত আছে যে, শ্রীধনঞ্জয় পণ্ডিত সেই গুহায় প্রবেশ করে লোকচক্ষুর আড়ালে ভজন সাধনে রত ছিলেন। এছাড়া সেখানে রয়েছে একটি মনোরম দিঘি ও দুর্গামন্দির ।

বিনাজুরী : গৌরভক্ত শ্রীজগৎ চন্দ্র গোস্বামীর শ্রীপাট

পথ নির্দেশ : বিনাজুরী বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানায় অবস্থিত। রাউজান নোয়াপাড়া সড়কের সেক্সন-১ ভাঙাপুর নেমে পূর্বদিকে ৮ কিলোমিটার হেঁটে এই স্থানে আসা যায়। অথবা চট্টগ্রাম শহর থেকে ট্যাক্সি করে এই শ্রীপাটে আসা যায়। এছাড়া পুণ্ডরীক ধাম থেকেও এই স্থানে আসা যায় ।
পরিচয় : গৌরভক্ত শ্রীজগৎ চন্দ্র গোস্বামী মহাপ্রভুর সমসাময়িক কালের ভক্ত ছিলেন। তিনি বার্মার (মায়ানমার) আকিয়াবে শ্রীগৌরভাণ্ডার নামক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা করেন এবং মহাপ্রভুর প্রেমধর্ম ঐ দেশে প্রচার করেন। বর্তমানে চট্টগ্রামের বিনাজুরিতে তাঁর আবির্ভাবস্থলীতে গ্রামবাসীরা একটি ছোট টিনের মন্দির করেছেন। এখানে দোল উৎসব এবং অন্যান্য বৈষ্ণবীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
পঞ্চতত্ত্বের অন্যতম ও চৈতন্য লীলায় শ্রীমতি রাধারাণীর প্রকাশ শ্রী গদাধর পণ্ডিত।
মন্দিরের সামনে একটা তমাল বৃক্ষ আছে। এটি একটি বড় গ্রাম। এই গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি গ্রামে এককভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করছেন । গ্রামবাসীদের ইচ্ছা গ্রামে একটি বড় মন্দির তৈরি করার। গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান মতে এই জগৎচন্দ্র গোস্বামী শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর মন্ত্রশিষ্য ছিলেন । বিনাজুরী গ্রামে তাঁর সমাধি আছে।  সেখানে কার্তিকী কৃষ্ণা নবমীতে তিরোভাব উৎসব উদযাপিত হয়।

বেলেটি: শ্রীগদাধর পণ্ডিতের আবির্ভার্ব ভূমি

শ্রীগদাধর পণ্ডিত গোস্বামী পঞ্চতত্ত্বের অন্যতম-শক্তিতত্ত্ব, শ্রীগৌরলীলার সহায়তা সম্পাদনের জন্য ১৪০৮ শকাব্দে বৈশাখী অমাবস্যা তিথিতে চট্টগ্রাম জেলার বেলেটি গ্রামে আবির্ভূত হন। বেলেটি বর্তমান চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানায় অবস্থিত (মতান্তরে বর্তমান বাঁশখালীর বাণীগ্রাম)। চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে বাঁশখালী গামী বাসে বাণীগ্রাম স্টপেজে নেমে পায়ে হেঁটে এই শ্রীপাটে আসা যায়। এখানে শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর নিজ শক্তি পণ্ডিত গদাধরের পিতা শ্রীমাধব মিশ্রেরও জন্মস্থান। মাধব মিশ্র পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির সমধ্যায়ী ও বন্ধু ছিলেন (শ্রীল মাধব মিশ্র পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির এক কলা অবতার)। শ্রীপ্রেমবিলাস গ্রন্থের দ্বাবিংশ বিলাসে বর্ণিত রয়েছে-
“তাঁর প্রিয়সখা শ্রীমাধব মিশ্র হয়। চট্টগ্রামে বেলেটি গ্রাম তাঁহার আলয় ॥”
পূর্ব থেকে চিহ্নিত না হওয়াতে কালের গর্ভে মূল আবির্ভাব স্থানটি হারিয়ে গেছে।
উপরোক্ত সমস্ত পবিত্র স্থানগুলি কেবলমাত্র দর্শন করার মাধ্যমে যে কেউ আধ্যাত্মিক স্তরের অতি উচ্চ আনন্দের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত (মধ্য, ১৫/৩৯, ৪২)-
“তবে মহাপ্রভু সব ভক্ত বোলাইল। “গৌড়দেশে যাহ সবে” বিদায় করিল ॥”
নিত্যানন্দে আজ্ঞা দিল যাহ গৌড়দেশে । অনর্গল প্রেমভক্তি করিহ প্রকাশে ॥”
অতএব মহাপ্রভূর নির্দেশ অনুসারে আমরাও করে অপ্রাকৃত কৃপা লাভের জন্য সচেষ্ট হবো। এই গৌরমণ্ডল ভূমিসমূহ দর্শন করে অপ্রাকৃত কৃপা লাভের জন্য সচেষ্ট হবো ।

অপরিসীম কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন : শ্রীমৎ গৌরাঙ্গ প্রেম স্বামী মহারাজ ও শ্রী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী, অধ্যক্ষ, শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধাম

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৩

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here