শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করব কেন? (পর্ব-০১)

0
84

ড. নিতাই সেবিনী দেবী দাসী: শ্রীল প্রভুপাদ প্রায়ই দুঃখ প্রকাশ করে বলতেন, “আমার গ্রন্থ বিতরণ করা হচ্ছে, কিন্ত আমার শিষ্যরা তা পাঠ করছে না।” কাউকে দেখলে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন,“তুমি কি আমার গ্রন্থ পাঠ করছো, না অধ্যয়ন করছ? গ্রন্থ পাঠ করার অর্থ হচ্ছে, ‘মুখস্থ করা’। আর গ্রন্থ অধ্যয়ন করার অর্থ হচ্ছে, ‘তা উপলদ্ধি করা এবং নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করা’। শ্রীল প্রভুপাদ শুধু গ্রন্থ বিতরণ করতেই উৎসাহিত করেননি, তা অধ্যয়ন করতেও অনুপ্রাণিত করতেন।

করাতে শান দিন

এক কাঠুরে ছিল, যিনি নতুন করাত (SAW) ক্রয় করে গাছ কাটতে শুরু করলেন, প্রথমে তিনি অনেক গাছ অতি অল্প সময়ে কেটে ফেলতেন এবং বাজারে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। কিছুদিন পর তিনি পূর্বের মতো গাছ কাটতে না পারায় তার অর্থ উপার্জন কমে গেল এবং তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন, এরপর তার এক বন্ধু এসে তাকে বুঝাতে লাগলো, তোমার যে করাত রয়েছে তার শান কমে গেছে, তাতে নতুন করে শান দিতে হবে। শান দেওয়ার পর পূর্বের ন্যায় অনেক গাছ কাটতে লাগল এবং তার উপার্জনও আগের মতো বৃদ্ধি হতে লাগল। ঠিক সেভাবেই আমাদের আধ্যাত্মিক সাধনা যেমন- গ্রন্থ অধ্যয়ন, হরিনাম কীর্তন, জপ প্রভৃৃতি যখন সুন্দরভাবে চলবে তখন গ্রন্থ বিতরণও ভালমতো চলবে। তাহলেই সারাবছরব্যাপী গ্রন্থ বিতরণ করা যাবে, ভক্ত সংখ্যাও বাড়বে। জনৈক এক ব্যক্তি একবার শ্রীল প্রভুপাদকে বলেছিলেন,
জনৈক ব্যক্তি: এক কথায় “ইস্‌কন” শব্দটি বর্ণনা করুন।
শ্রীল প্রভুপাদ: “হরিনাম কীর্তন করুন এবং তাঁর প্রচার করুন”।
এজন্য হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র ঠিকমত জপ করলেই আমাদের আধ্যাত্মিক সাধনা করার শক্তি পাওয়া যাবে এবং বাকি সবকিছু ঠিকমত চলবে। শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করার ফলে আমাদের সঠিক একটি দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। আমরা যখন কোনো আধ্যাত্মিক গ্রন্থ অধ্যয়ন করি, তখন আমাদের চার প্রকার কল্যাণ হয় যেমন-
১. অজানা তথ্য জানা যায়
২. আত্মশুদ্ধি সাধিত হয়
৩. ভগবানের প্রতি বিশ্বাস বর্ধিত হয়
৪. সন্তুষ্টি

প্রতি পদক্ষেপে উৎসাহ ও উদ্দীপনার প্রয়োজন

এজন্য পুনঃ পুনঃ গ্রন্থ অধ্যয়ন করতে হবে এবং উৎসাহ বৃদ্ধি যায়। মনে করুন, অন্ধকার গৃহে কোনো ব্যক্তির চরণ স্পর্শ করার জন্য বলা হল। সেজন্য জনসাধারণ লাইন ধরে ঐ ব্যক্তির চরণ স্পর্শ করতে লাগলো। কিন্ত যখন বলা হল অন্ধকার গৃহে শ্রীল প্রভুপাদ বসে আছেন তখন লোকজনের উৎসাহ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি, জ্ঞানের মাধ্যমে উৎসাহ বৃদ্ধি হয়। আমাদের প্রতি পদক্ষেপে উৎসাহ ও উদ্দীপনার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ আমরা প্রথমত ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি জড় জগতে পতিত হয়েছি।
তার উপর বিভিন্ন প্রতিকূলতা তো আছেই। এজন্য উৎসাহ রাখতেই হবে। যেমন- টিভিতে কোলগেট টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। একই বিজ্ঞাপন প্রতিনিয়ত চলতেই থাকে এর কারণ হল যাতে সবাই এই টুথপেস্টের কথা স্মরণ রাখে এবং ভুলে না যায়।
এজন্য শাস্ত্রও আমাদের পুনঃ পুনঃ পড়তে হবে। যখন পুনঃ পুনঃ শ্রবণে বিরতি দেওয়া হয় তখন উৎসাহ কমতে থাকে। অনেকে আমাকে বলে, মাতাজী আমরা আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে অনেক ভীতসন্ত্রস্ত, তখন আমি তাদের উপদেশ দিই- “গীতা, ভাগবত নিয়ে বসে অধ্যয়ন কর এবং ভয় চলে যাবে এবং তৎক্ষণাৎ এর ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা যাবে।”

কিভাবে আমরা শক্তি পাব?

অনেক সময় ভক্তিতে চিত্ত আবিষ্ট হয় না, তখন ভক্তিতে শক্তির যোগান দিতে হয়। সেই শক্তিই হল শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন। শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজ দেহ ত্যাগের সময় শ্রীমৎ শচীনন্দন স্বামী মহারাজের সাথে সাক্ষাত করেন। মহারাজ শ্রীমৎ শচীনন্দন স্বামী মহরাজকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন-
শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী : ধরুন, দুটি কুকুর পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করলে কোন কুকুরটি জয়ী হবে?
শ্রীমৎ শচীনন্দন স্বামী : যে কুকুরটিকে ভালভাবে খাবার দেওয়া হবে সেই কুকুরটি শারীরিকভাবে সুস্থ ও শক্তিশালী থাকবে এবং জয়ী হবে।
শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী : আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেও দুটি কুকুর আছে। একটি কুকুর বলে, চল সাধুসঙ্গ, কীর্তন ও জপ করি ইত্যাদি। অন্য কুকুরটি বলে, না না সাধুসঙ্গ ও জপ করার প্রয়োজন নেই, অসৎসঙ্গে চল। এভাবে এই দুই কুকুরের মধ্যে যে শক্তিশালী সেই জয় লাভ করবে। কারণ, এই দুই কুকুরের মধ্যে অবিরামভাবে যুদ্ধ চলতে থাকে। যে কুকুরটিকে আমরা প্রতিদিন আহার দিব ও যত্ন করব, সেই কুকুরটিই শক্তিশালী হবে। বিষয়টা হল এমন প্রতিদিন আমাদের ইচ্ছা হোক বা না হোক জপ, ভাগবত পাঠ শ্রবণ ও শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে হবে। তাহলেই আমরা শক্তি পাব।

জ্ঞান বিনা ভক্তি অন্ধ,
ভক্তি বিনা জ্ঞান পঙ্গু

ভাগবত কোন সাধারণ গ্রন্থ নয়। ‘ভ’-অর্থ ‘ভক্তি’, ‘গ’-‘জ্ঞান’, ‘ব’-‘বৈরাগ্য’ এবং ‘ত’- অর্থ ‘তত্ত্ব জ্ঞান’। এজন্য নিয়মিত ভাগবত পাঠ করতে হয়। শ্রীমদ্ভাগবত হল ব্যক্তিরূপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীকৃষ্ণ থেকে অভিন্ন। ভাগবতের দ্বাদশ স্কন্ধ হল ভগবানের দ্বাদশ অঙ্গ স্বরূপ। শাস্ত্রে আছে, যে গৃহে ভাগবত থাকে কিন্তু সেই ভাগবত পাঠ করা হয় না, সেটিও একটি অপরাধ। বিষয়টা হল এমন আপনি কোন অতিথিকে বাসায় আমন্ত্রণ করে এনেছেন এবং ওনার সাথে কথা বলছেন না। শ্রীমদ্ভাগবত শ্রীকৃষ্ণ থেকে অভিন্ন।
এজন্য আমরা যখন শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন করি তখন ভগবানের ওপর আমাদের বিশ্বাস বর্ধিত হবে। জ্ঞান বিনা ভক্তি অন্ধ, ভক্তি বিনা জ্ঞান পঙ্গু। এই দুইটিই জরুরী, আবেগ দিয়ে ভক্তি হয় না, যেমন- ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার পছন্দ এজন্য আমি ভক্তি করব, এটা আবেগ। যদি সত্যিই কৃষ্ণকে আপনি ভালোবাসেন তাহলে ওনার সম্বন্ধে আপনাকে অধ্যয়ন করতেই হবে। আপনার যদি কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে ভালো লাগে তাহলে উনার সম্বন্ধে জানতে আপনি সমস্ত ম্যাগাজিন পড়বেন।
যদি আপনি কৃষ্ণকে ভালোবাসেন তাহলে ওনার সম্বন্ধে কেন পড়বেন না? কোন ব্যক্তি সম্পর্কে যদি আপনার আসক্তি বৃদ্ধি করতে চান তাহলে ওনার সম্পর্কে অধিক থেকে অধিকতর জ্ঞান অর্জন করা জরুরী। আমি যদি আপনাকে বলি, আপনি ব্রাসেলেস সম্পর্কে বেশী বেশী ভাবুন, আপনার যদি ব্রাসেলেস সম্পর্কে যদি কোন জ্ঞান না থাকে, তাহলে কি ভাববেন ঐ দেশ সম্পর্কে?
ভগবান গীতাতে ৯/৩৪ শ্লোকে বলেছেন, “তোমার মনকে আমার ভাবনায় নিযুক্ত কর, আমার ভক্ত হও, আমাকে প্রণাম কর এবং আমার পূজা কর। এভাবেই মৎপরায়ণ হয়ে সম্পূর্ণরূপে আমাতে অভিনিবিষ্ট হলে, নিঃসন্দেহে তুমি আমাকে লাভ করবে।”
ভগবদ্গীতাতে ৭০০ শ্লোকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এই শ্লোকটি। কেউ যদি ভগবদ্গীতাকে এক কথায় বর্ণনা করতে চায় তাহলে এই শ্লোকটিই যথেষ্ট। এই শ্লোকের চারটি অমৃত উপদেশ জীবনে পালন করতে পারলেই ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়া যাবে। (চলমান)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here