শ্রীরাধাকুণ্ড ও শ্রীশ্যামকুণ্ডের উৎপত্তি

0
22

শ্রীরাধাকুণ্ড এবং শ্রীশ্যামকুণ্ড সম্বন্ধে আলোচনা করার পূর্বে, প্রথমে অরিষ্টাসুর সম্বন্ধে কিছু জানা প্রয়োজন। সেই জন্য শ্রীগর্গ-সংহিতা গ্রন্থের মাধুর্য্য খণ্ডে হয়েছে-  অরিষ্টাসুরের পূর্ব্বনাম দ্বিজসত্তমবরতন্তু। তিনি গুরুবৃহস্পতির নিকট বিদ্যাভ্যাস করতেন। কোন একদিন পড়তে গিয়ে গুরুর সমীপে পাদ-প্রসারিত করলে, গুরু তা দর্শন করে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে যে, হে দুর্ষ্মতে তুমি বৃষের ন্যায় আমার সমুখে অবস্থান করছে, অতএব বৃষ হও। সেই অভিশাপে বরতন্তু বৃষ হয়। অসুরদের সংসর্গে অসুরত্ব প্রাপ্ত হয়েছে। কোন একসময় বৃষরূপ ধারী অরিষ্টাসুর কংসের দ্বারা প্রেরিত হয় সখা ও গো-গণের মধ্যে গোচারণ লীলা প্রবেশে করে। তার নিষ্ঠুর নিনাদে গোপ-গোপীগণ ভয়ে ত্রস্ত হয়েছেন এবং “হা কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ, রক্ষাকর” বলেন চিৎকার করতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণ “তোমাদের ভয় নাই” বলে আশ্বস্ত প্রদান করেন।
সেই অসুর শ্রীকৃষ্ণের প্রতি মহাক্রোধে ধাবিত হয়, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শৃঙ্গের অগ্রভাগ ধারণ পূর্ব্বক মূহুর্ষ্মহু ভ্রামিত করে ভূমিতে পতিত করলেন এবং বিষণ উৎপাটন করে তাকে নিহত করলেন। অসুর শ্রীকৃষ্ণের হস্থে নিহত হয়েই মুক্তিপদ লাভ করেছেন।স্বয়ং ভগবান নন্দনন্দন শ্রীকৃষ্ণ যেদিন অরিষ্টাসুরেক বধ করে ব্রজবাসীগণের পরমানন্দ বন্দনা করেছিলেন, সেইদিন রাত্রে শ্রীকৃষ্ণ ব্রজরমাগণের সমভিব্যবহারে রাসস্থলীতে রাসলীলার প্রার্থনা করলে গোপীগণ মৃদুমন্দ হাস্য সহকারে বলেন- হে বৃষাসুর মর্দ্দন! আজ আমাদেরকে স্পর্শ করিও না, আজ তুমি গোবধ পাপে লিপ্ত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ বলেন হে সুন্দরীগণ! সে তো বৃষ নয় ভয়ঙ্কর অসুর। গোপীগণ বলেন, শোন! বৃত্রাসুরের ব্রাহ্মণ শরীর হওয়ায় তাকে বধের নিমিত্ত ইন্দ্রকে ব্রহ্মহত্যার পাপস্পর্শ করেছিল। তদ্রুপ এর তো বৃষেররূপ ছিল! গোপীগণের যুক্তিপূর্ণ বচন শ্রবণ করে গোবিন্দ বলেন, হে প্রিয়ে! তাহলে বল? আমি এখন এই পাপ থেকে কিভাবে মুক্তিলাভ করতে পারি?
তদুত্তরে- হে প্রিয়তম! তুমি যদি ত্রিভুবনের সমস্ত তীর্থে অবগাহন করতে পার তবেই তুমি পাপমুক্ত হবে। শ্রীকৃষ্ণ বলেন- আমি এই ব্রজভূমি ত্যাগ করে এখন ত্রিভুবনের তীর্থস্নানের জন্য কোথায় যাইব? সম্প্রতি আমি ত্রিভুবনের সমস্ত তীর্থকে আহ্বান করে তোমাদের সম্মুখে স্নান করব। এই বলে শ্রীকৃষ্ণ ঐ স্থানে সজোরে চরণের পার্ষ্ণি আঘাত করে সঙ্গে সঙ্গে পাতাল হতে ভগবতী গঙ্গা এবং নিখিল তীর্থ আসে উপস্থিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, তোমরা আমার কুণ্ডে বিরাজমান হও। শ্রীকৃষ্ণের বাক্য শ্রবণ করে সমস্ত তীর্থ কুণ্ডমধ্যে উপস্থিত হলেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ বলেন- হে প্রিয়ে! দেখ সমস্ত তীর্থ এখানে উপস্থিত হয়েছে, গোপীগণ বলেন আহ! হরে, কেবল তোমার কথাতেই আমার বিশ্বাস করব না। তখন সমস্ত তীর্থ নিজ নিজ মূর্ত্তি ধারণ করে এবং হাত জোড় করে আপন আপন নাম উচ্চারণ করেছেন আমি লবণ সমুদ্র, আমি ক্ষীর সমুদ্র, আমি অমর দীর্ঘিকা, আমি শোন নদী, আমি ভাদ্রপর্ণী, আমি পুষ্কররাজ, আমি সরস্বতী, আমি গোদাবরী, আমি গঙ্গা, আমি যমুনা, আমি সরষু, আমি প্রয়াগরাজ, আমি রোবাতীর্থ ইত্যাদি সমস্ত তীর্থের জল পৃথক দর্শন করুন এবং আমাদেরকে বিশ্বাস করুন। শ্রীকৃষ্ণ সেই তীর্থে স্নান করে পবিত্র হয়ে দাম্ভিকতা প্রকাশ করে বলেন, আমি সর্ব্বতীর্থময় এই কুণ্ড প্রকাশ করলাম।
তোমরা সকলে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে এবং কোন ধর্ম পূর্ণ কর নাই, সম্প্রতি এইকুণ্ডে স্নান করে সর্ব্বতীর্থ স্নানের মাহাত্ম্য অর্জন কর। এই কথা শ্রবণে শ্রীরাধিকা স্বীয় সখীগণকে বললেন- হে সখীগণ! আমারও এই প্রকার এক কুণ্ড নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতএব তোমরা সকলে মিলে কার্য্য আরম্ভ কর। স্বামিনীজীউর আজ্ঞা পেয়ে সখীগণ শ্রীকৃষ্ণকুণ্ডে পশ্চিমে বৃষাসুরে খুরের এক বিরাট গহ্বর ছিল ঐ গহ্বরে নম মৃর্ত্তিকা স্ব-স্ব হস্ত দ্বারা খনন করে সামান্য দূরে ফেলতে লাগলেন এবং দেখতে দেখতে সেখানে এক মনোরম কুণ্ড উৎপন্ন হল।
শ্রীকৃষ্ণ সেই মনোরম কুণ্ড অবলোকন করে চিন্তা করতে শ্রীরাধিকাকে বললেন, তোমার কুণ্ড অতীব সুন্দর কিন্তু এতে তো জল বের হয় না, এতএব তুমি সখীগণকে সঙ্গী নিয়ে আমার কুণ্ডের তীর্থ জল বহন করে তোমার কুণ্ড জলে পূর্ণ কর। শ্রীরাধিকা বললেনÑ না তা কখনো নই, কারণ তোমার অবগাহনে তার জল গোবধ পাতকযুক্ত হয়েছে।
আমি সখীগণকে সঙ্গে নিয়ে কলসি দ্বারা মানস গঙ্গা পবিত্র জলে এখুনি কুণ্ড পূর্ণ করব। তথাপি তোমার কুণ্ডের একবিন্দু জলও নিব না। এইরূপে জগতে আমি অতুলনীয় যশোরাশি বিস্তার করব। স্বামিনীজীউর এইরূপ বাক্য শ্রবণ ও তাঁর অভিপ্রায় অবগত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ মৃদুমন্দ হাসতে হাসতে তীর্থগণকে ইঙ্গিত করলে হঠাৎ সমস্ত তীর্থ দিব্যমূর্ত্তি ধারণ করত” শ্রীশ্রীশ্যামকুণ্ডে বাহিরে এসে সভক্তি বিনয়াবনত সাশ্রুপূর্ণ শ্রীবৃষ্ণভানুনন্দিনীর শ্রীচরণারবিন্দে সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ প্রণাম করে করজোড়ে স্তুতি করতে করতে বললেন-হে দেবী সর্ব্বশাস্ত্র অর্থবেত্তা ব্রহ্মা তথা মহাদেব এবং শ্রীলক্ষ্মীদেবীও আপনার মহিমা অবগত নয়, সর্ব্বপুরুষার্থ শিরোমণি আপনার স্বেদবিন্দু অপনোদনকারী শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র অবগত আছেন।
অহো! শ্রীকৃষ্ণ আপনার শ্রীচরণ কমলে মনোহর যাবকদ্বারা সুসজ্জিত করে প্রতিদিন নুপুর পরিধান করে থাকেন এবং আপনার কৃপা কটাক্ষ প্রাপ্তিতে পরমানন্দিত হয়ে আপনাকে ধন্যতম মনে করে থাকেন। তাঁরই আজ্ঞায় আমরা সাহসা এখানে সমুপস্থি হয়ে তাঁরই শ্রীচরণ আঘাত হতে নির্মিত এই কুণ্ডে বাস করব। এতএব, হে দেবী, যদি আপনি আমাদের প্রতি কৃপাপূর্ণদৃষ্টিতে অবলোকন করেন তাহলে আমাদের তৃষ্ণারূপী বৃক্ষ ফল-ফুলে পরিপূর্ণ হবে। নিখিল তীর্থের সবিনয় স্তুতি নতি শ্রবণে পরমানন্দে শ্রীরাধিকা তীর্থগণকে বলেন হে তীর্থগণ! তোমাদের কি অভিলাষ তা আমাকে বল।
তখন তীর্থগণ সহর্ষে স্পষ্টরূপে বলেন, আমরা সকলে আপনার কুণ্ডে যাব, এতে আমাদের মনোরথ সফল হবে। এতে আমাদের সকাতর প্রার্থনা। তখন শ্রীবৃষভানুনন্দিনীর সখীগণকে জিজ্ঞাসা করে সর্বসম্মতিক্রমে প্রাণবল্লভের বদন কমলে স্বীয় নয়ন প্রাপ্ত সংলগ্ন করত মন্দ মন্দ হাসতে হাসতে বললেন- হে তীর্থগণ তোমরা সকলে আমার কুণ্ডে আগমণ কর। শ্রীস্বামিনিজীউর শ্রীমুখের কৃপামৃতপূর্ণ আজ্ঞা শ্রবণে তীর্থগণের সাথে স্থাবর জঙ্গম পর্যন্ত সকলেই সুখসাগরে নিমজ্জিত হয়ে গেল। শ্রীবৃষভানুনন্দিনীর আজ্ঞা-করুণা প্রাপ্ত হয়ে তীর্থগণ উভয় কুণ্ড মধ্যস্থলের আবরণ সজোরে ভেদ করে নিজেদের জলে শ্রীকুণ্ড পরিপূর্ণ করে দিলো। সেদিন ছিল কার্তিক মাসে কৃষ্ণাষ্টমী তিথি, তখন শ্রীকৃষ্ণ বললেন, হে প্রিয়তম! জগতে আমার কুণ্ড অপেক্ষা তোমার কুণ্ডের মহিমা সমাধিকরূপে খ্যাতি লাভ করবে এবং আমিও তোমার কুণ্ডে প্রতিদিন স্নান ও জলবিহার করব।
অধিক কি হে রাধে! তুমি যেমন আমার প্রিয়া তদ্রুপ তোমার কুণ্ডও আমার প্রিয়া। প্রাণকোটিতম শ্রীকৃষ্ণের রচনামৃত শ্রবণ করে শ্রীরাধিকা বললেন, হে প্রিয়মতম! আমিও সখীগণের সাথে প্রতিদিন তোমার কুণ্ডে স্নান এবং যে ব্যক্তি ভক্তি সহকারে এই স্নান করবে ও তীরে বাস করবে তার শত বাধাবিঘ্ন বিনাশ হবে এবং সে ব্যক্তি আমার অবশ্যই অত্যন্ত প্রিয় হবে। এরূপ বলে সে রাত্রে শ্রীরাধা কুণ্ডে তটে শ্রীশ্যাম নবজলধরে সাথে থির বিজুরী অলঙ্কৃত হয়ে মহারসময় হর্ষবর্ষণ করতে করতে রাসোৎসব সম্পন্ন করে ত্রিলোকের মধ্যে এক অলৌকি যশোরাশি বিস্তার করলেন। হরেকৃষ্ণ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here