শ্রীমদ্ভগবদগীতা ও শ্রীমদ্ভাগবতের আলোকে ত্রিগুণের প্রভাব ও লক্ষণসমূহ

0
61
সাধারণ প্রকৃতি (ভ.গী-১৪/৬-৮)

সত্ত্বগুণ : এ জড় জগতে সবচেয়ে নির্মল (নির্মলত্বাৎ), প্রকাশকারী (প্রকাশকম্), পাপশূন্য (অনায়ম্) (৬)
রজোগুণ : অনুরাগাত্মক এবং তা তৃষ্ণা ও আসক্তি থেকে উৎপন্ন হয়। (৭)
তমোগুণ : অজ্ঞানজাত (অজ্ঞানজম্) সমস্ত জীবের মোহনকারী (মোহনম্ সর্বদেহিনাম্) (৮)

জড় জগতে বদ্ধাবস্থা (ভ.গী-১৪/৬-৮)

সত্ত্বগুণ : জ্ঞান দ্বারা (জ্ঞানসঙ্গে) সুখের সঙ্গ দ্বারা (সুখসঙ্গেন) (৬)
রজোগুণ : সকাম কর্মের আসক্তির দ্বারা (কর্মসঙ্গেন) (৭)
তমোগুণ : প্রমাদ, আলস্য ও নিদ্রা (নিদ্রাভিঃ) দ্বারা (৮)

মনস্তাত্ত্বিক ধরণ (ভ.গী-১৪/৬ প্রভুপাদ তাৎপর্য)

সত্ত্বগুণ: সুখী                                 রজোগুণ: কর্মঠ                             তমোগুণ: অসহায়

কর্মে সন্তুষ্টি (ভ.গী-১৪/৯ প্রভুপাদ তাৎপর্য)

সত্ত্বগুণ : নিজের সন্তুষ্টি বিধান করে।
রজোগুণ : (নিজেকে নয়) বরং দাতব্য সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্যদের সন্তুষ্টি প্রদান করে।
তমোগুণ : কাউকেই সন্তুষ্টি করে না।

প্রকাশ (ভ.গী-১৪/১১-১৩)

সত্ত্বগুণ : দেহের সব কয়টি দ্বারে যখন জ্ঞানের প্রকাশ হয়। (১১)
রজোগুণ : লোভ, প্রবৃত্তি কর্মে উদ্যম ও দুর্দমনীয় স্পৃহা বৃদ্ধি পায়। (১২)
তমোগুণ : অজ্ঞান অন্ধকার নিষ্ক্রিয়তা, প্রমাদ ও মোহ উৎপন্ন হয়। (১৩)

পরিণতি (ভ.গী-১৪/১৬ প্রভুপাদ তাৎপর্য)

সত্ত্বগুণ : নির্মল সুখ বয়ে আনে
রজোগুণ : কেশদায়ক।
তমোগুণ : অজ্ঞান বা অচেতন ফলদায়ক

উপাদান (ভ. গী- ১৪/১৭)

সত্ত্বগুণ : জ্ঞান
রজোগুণ : লোভ
তমোগুণ : অজ্ঞতা, উন্মাদনা মোহ

জীবাত্মার বিবর্তন (ভ.গী-১৪/১৮ ও ভা.-১১/২৫/২১)

সত্ত্বগুণ : ঊর্ধ্বগতি (উচ্চতর গ্রহসমূহ) উচ্চ থেকে উচ্চতর অবস্থানে উন্নীত হওয়া
রজোগুণ : মধ্য স্তরে অবস্থান (পৃথিবীতে)
তমোগুণ : নিম্ন থেকে নিম্নতর গ্রহলোকগুলোতে অধঃপতিত হওয়া

মৃত্যুর পর জীবাত্মার গতি (ভ.গী-১৪/১৪-১৫) (ভা ১১/২৫/২২)

সত্ত্বগুণ : সাধু মহাত্মাদের শুদ্ধ, উচ্চতর লোকগুলোতে। (১৪)
রজোগুণ : সকামকৰ্মী মনুষ্যলোকে জন্ম (নরলোকে) (১৫)
তমোগুণ : প্রাণীদেহে নরক গমন (নিরয়) (১৫)

খাদ্য (ভ.গী-১৭/৮-১০); (ভা.-১১/২৫/২৮)

সত্ত্বগুণ : আয়ু, সত্ত্ব, বল, আরোগ্য, সুখ ও প্রীতি বর্ধনকারী এবং রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থায়ী ও মনোরম স্বাস্থ্যকর, শুদ্ধ ও অনায়াস লব্ধ খাদ্য। (৮)
রজোগুণ : অতি তিক্ত, অম্ল, লবণাক্ত, উষ্ণ, তীক্ষ্ম, শুষ্ক, প্রদাহকর এবং দুঃখ, শোক ও রোগপ্রদ। তাৎক্ষণিক সুখপ্রদ । (৯)
তমোগুণ : নীরস, দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী, অন্যের উচ্ছিষ্ট দ্রব্য ও অমেধ্য দ্রব্য ভক্ষন। অপরিচ্ছন্ন ও দুঃখজনক। (১০)

যজ্ঞ (ভ.গী-১৭/১১-১৩)

সত্ত্বগুণ : ফলের আকাঙ্ক্ষা রহিত ব্যক্তিগণ কর্তৃক শাস্ত্রের বিধি অনুসারে, অনুষ্ঠান করা কর্তব্য এভাবেইমনকে একাগ্র করে যে যজ্ঞ। (১১)
রজোগুণ : ফল কামনা করে দম্ভ প্রকাশের জন্য যে যজ্ঞ। (১২)
তমোগুণ : শাস্ত্রবিধি বর্জিত, প্রসাদান্ন বিতরণহীন, মন্ত্রহীন, দক্ষিণাবিহীন ও শ্রদ্ধারহিত যে যজ্ঞ । (১৩)

কায়, মন ও বাক্যের তপস্যা (ভ.গী ১৭/১৭-১৯)

সত্ত্বগুণ : ফলাকাঙ্ক্ষা রহিত মানুষের দ্বারা পরম শ্রদ্ধা সহকারে অনুষ্ঠিত ত্রিবিধ তপস্যা। (১৭)
রজোগুণ : শ্রদ্ধা, সম্মান ও পূজা লাভের আশায় দম্ভ সহকারে যে তপস্যা। (১৮)
তমোগুণ : মূঢ়োচিত আগ্রহের দ্বারা নিজেকে পীড়া দিয়ে অথবা অপরের বিনাশের জন্য যে তপস্যা। (১৯)

দান (ভ.গী-১৭/২০-২২ প্রভুপাদ তাৎপর্য)

সত্ত্বগুণ : দান করা কর্তব্য মনে করে প্রত্যুপকারের আশা না করে উপযুক্ত স্থানে, সময়ে ও পাত্রে যে দান। (২০)
রজোগুণ : প্রত্যুপকারের আশা করে বা ফলাকাঙ্ক্ষী হয়ে এবং অনুতাপ সহকারে যে দান। (২১)
তমোগুণ : অশুচি স্থানে, অশুভ সময়ে, অযোগ্য পাত্রে, অনাদরে এবং অবজ্ঞা সহকারে যে দান। (২২)

বিশেষ শ্রদ্ধা (ভ.গী-১৭/৩-৬); (ভা.-১১/২৫/২৭)

সত্ত্বগুণ : দেব-দেবীর উপাসনা, পারমার্থিক জীবনের প্রতি পরিচালিত শ্রদ্ধা।
রজোগুণ : অসুরদের উপাসনা, সকাম কর্ম ভিত্তিক শ্রদ্ধা।
তমোগুণ : ভূত-প্রেত উপাসনা, অধার্মিক কর্মে রত শ্রদ্ধা।

ত্যাগ (ভ.গী-১৮/৭-৯)

সত্ত্বগুণ : আসক্তি ও ফল ত্যাগ করে কর্তব্যবোধে যে নিত্যকর্ম (৯)
রজোগুণ : নিত্যকর্মকে দুঃখজনক বলে মনে করে দৈহিক ক্লেশের ভয়ে যে ত্যাগ । (৮)
তমোগুণ : মোহবশত যে ত্যাগ । (৭)

জ্ঞান (ভ.গী-১৮/২০-২২); (ভা.-১১/২৫/২৪)

সত্ত্বগুণ : যে জ্ঞান দ্বারা সমস্ত প্রাণীতে এক অবিভক্ত চিন্ময় ভাব দর্শন হয়। দেহেরও ঊর্ধ্বে চিন্ময় আত্মা সংক্রান্ত জ্ঞান । অবিমিশ্র জ্ঞান (কৈবল্যং জ্ঞানং)। (২০)
রজোগুণ : যে জ্ঞান দ্বারা সমস্ত প্রাণীতে ভিন্ন ভিন্ন আত্মা অবস্থিত বলে পৃথকরূপে দর্শন হয়। মনোধর্মী ও জাগতিক যুক্তি তর্কের মাধ্যমে যে সমস্ত মতবাদ ও ধারণা সম্পর্কিত জ্ঞান। দ্বন্দভিত্তিক জ্ঞান (বৈকল্পিকম্) (২১)
তমোগুণ : যে জ্ঞান দ্বারা প্রকৃত তত্ত্ব অবগত না হয়ে, যেকোনো কার্যে পরিপূর্ণের ন্যায় আসক্তির উদয় হয়। কেবলমাত্র দেহসুখের জন্য যে জ্ঞান। মূর্খ জাগতিক জ্ঞান (শিশুসুলভ জ্ঞান)। (২২)

কর্ম (ভ.গী-১৮/২৩-২৫); (ভা.-১১/২৫/২৩)
সত্ত্বগুণ : ফলের কামনাশূন্য ও আসক্তি রহিত হয়ে রাগ ও দ্বেষ বর্জনপূর্বক যে নিত্যকর্ম। ফলাকাঙ্ক্ষা না করে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে নিবেদিত কর্ম। (২৩)
রজোগুণ : ফলের আকাঙ্ক্ষাযুক্ত ও অহঙ্কারযুক্ত হয়ে বহু কষ্টসাধ্য কর্ম। ফলভোগের বাসনা নিয়ে সম্পাদিত কার্য। (২৪)
তমোগুণ : ভাবী বন্ধন, ধর্ম জ্ঞানাদির ক্ষয়, হিংসা ও নিজ সামর্থ্যের পরিণতির কথা না ভেবে মোহবশত যে কর্ম। হিংস্রতা এবং হিংসার দ্বারা তাড়িত হয়ে সম্পাদিত কর্ম। (২৫)
কর্তা (ভ. গী.-১৮/২৬-২৮); (ভা.-১১/২৫-২৬)

সত্ত্বগুণ : সমস্ত জড় আসক্তি থেকে মুক্ত, অহঙ্কারশূন্য, ধৃতি ও উৎসাহ সমন্বিত এবং সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে নির্বিকার। আসক্তি যুক্ত। (২৬)
রজোগুণ : কর্মাসক্ত, কর্মফলে আকাঙ্ক্ষী, লোভী, হিংসাপ্রিয়, অশুচি, হর্ষ ও শোকযুক্ত যে কর্তা। ব্যক্তিগত বাসনার দ্বারা অন্ধ। (২৭)
তমোগুণ : অনুচিত কার্যপ্রিয়, জড় চেষ্টাযুক্ত, অস্ত্র, শঠ, অন্যের অবমাননাকারী, অলস, বিষাদযুক্ত ও দীর্ঘসূত্রী যে কর্তা। (২৮)

বুদ্ধি (ভ.গী-১৮/৩০-৩২)

সত্ত্বগুণ : যে বুদ্ধির দ্বারা প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি, কার্য ও অকার্য, ভয় ও অভয়, বদ্ধন ও মুক্তি এই সকলের পার্থক্য বোঝা যায়। (৩০)
রজোগুণ : যে বুদ্ধির দ্বারা ধর্ম ও অধর্ম, কার্য ও অকার্য আদির পার্থক্য অসম্যক রূপে জানা যায়। (৩১)
তমোগুণ : যে বুদ্ধি অধর্মকে ধর্ম এবং সমস্ত বস্তুকে বিপরীত বলে মনে করে। (৩২)

দৃঢ়তা (ধৃতি) (ভ.গী-১৮/৩৩-৩৫)

সত্ত্বগুণ : যে অব্যভিচারি ধৃতি যোগ অভ্যাস দ্বারা মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াকলাপ সকল ধারণ করে। (৩৩)
রজোগুণ : যে ধৃতি ফলাকাঙ্ক্ষার সহিত ধর্ম, অর্থ ও কামকে ধারণ করে। (৩৪)
তমোগুণ : যে ধৃতি স্বপ্ন, ভয়, শোক, বিষাদ, মদ আদিকে ত্যাগ করে না। (৩৫)

সুখ (ভ.গী-১৮/৩৬-৩৯)

সত্ত্বগুণ : যে সুখ প্রথমে বিষময় শেষে অমৃততুল্য এবং আত্মনিষ্ঠ বুদ্ধির নির্মলতা থেকে জাত। (৩৭)
রজোগুণ : বিষয় ও ইন্দ্রিয়ের সংযোগের ফলে যে সুখ প্রথমে অমৃত পরিণামে বিষের মতো অনুভূত হয়। (৩৮)
তমোগুণ : যে সুখ প্রথম ও শেষে আত্মার মোহজনক এবং যা নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদ থেকে উৎপন্ন। (৩৯)

ব্যক্তির সাধারণ চরিত্র গঠন (ভা.-১১/২৫/১৩-১৫)

সত্ত্বগুণ : সুখ, ন্যায়নীতি, জ্ঞান ও অন্যান্য সদৃ গুণাবলীর দ্বারা ভূষিত হয়।
রজোগুণ : মানুষ সম্মান এবং সৌভাগ্য অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে।
তমোগুণ : চেতনাকে আবৃত করে মানুষকে নিরেট ও মূর্খে পরিণত করে। তখন সে অতিরিক্ত নিদ্রা যায়, মিথ্যা আশা করে চলে এবং অন্যদের প্রতি হিংস্রতা প্রদর্শন করে।

মানসিক ও শারীরিক লক্ষণসমূহ (ভা.-১১/২৫/১৬-১৮)

সত্ত্বগুণ : চেতনা যখন স্বচ্ছ এবং ইন্দ্রিয়গুলি জড়ের প্রতি অনাসক্ত হয়, তখন তিনি জড়দেহে ভয়শূন্যতা এবং মনে অনাসক্তি অনুভব করেন।
রজোগুণ : অতিরিক্ত কার্যের ফলে বুদ্ধির বিকৃতি, জড় বস্তু থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ইন্দ্রিয়ানুভূতির অক্ষমতা দৈহিক কর্মেন্দ্রিয়গুলির অসুস্থ অবস্থা এবং অস্থির মনের বিভ্রান্তি।
তমোগুণ : উচ্চতর চেতনা বিলুপ্ত হয় শেষে অমনোযোগী হয়ে মন বিধ্বস্ত হয়ে অজ্ঞতা এবং হতাশা প্রকাশিত হয়।

গুণাবলী (ভা.-১১/২৫/২-৫)

সত্ত্বগুণ : মনঃসংযম, সহিষ্ণুতা, কর্তব্যনিষ্ঠ, সত্যবাদিতা, দয়া, অতীত ও ভবিষ্যতের সতর্ক অনুশীলন, যে কোনো অবস্থায় সন্তুষ্টি, উদারতা, ইন্দ্রিয়তৃপ্তি বর্জন, গুরুভক্তি, খারাপ কাজের জন্য লজ্জাবোধ, দান, সরলতা ও বিনয়।
রজোগুণ : জড়বাসনা, অতিরিক্ত প্রচেষ্টা, স্পর্ধা, লাভ সত্ত্বেও অসন্তুষ্টি, মিথ্যা গর্ব, জড় উন্নয়নের জন্য প্রার্থনা, প্রশংসা শুনতে ভাল লাগা, অন্যকে উপহাস।
তমোগুণ : অসহ্য ক্রোধ, কৃপণতা, হিংসা, খামখেয়ালী, কান্তি, কলহ, অনুশোচনা, মোহ, সন্তুষ্টি, হতাশা, অতিরিক্ত নিদ্ৰা, মিথ্যা আশা, ভয় ও আলস্য।

ত্রিগুণ থেকে মুক্তি

এখানে ত্রিগুণের প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে। তবে একজন ভক্ত কৃষ্ণভাবনায় অগ্রগতির মাধ্যমে এই ত্রিগুণকেই অতিক্রম করতে প্রয়াসী হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে, একজন ভক্ত যিনি সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে তবে তার মহান সাধু-সন্তদের লোক উচ্চতর লোকে গতি হয়। যিনি রজোগুণে স্থিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তবে তিনি সকাম কর্মীদের মাঝে পুণরায় জন্মগ্রহণ করবেন এবং যিনি তমোগুণে স্থিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তবে তার পশু যোনীতে জন্ম হয়। একজন ভক্তের কখনো এরকম জন্মগ্রহণ করার বাসনা থাকে না। তিনি চান তার নিত্য আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে। একজন অনুশীলনরত ভক্ত সর্বদা বাসনা করেন গুরু পরম্পরা ধারায় অধিষ্ঠিত কোনো তত্ত্বজ্ঞ গুরুদেবের অধীনে ভক্তিমূলক সেবা অবিরতভাবে সম্পাদন করার মধ্যে ত্রিগুণকে অতিক্রম করা।
ত্রিগুণ সম্পর্কে বিস্তারিত শ্রবণের পর শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার ১৪/২১ নং শ্লোকে অর্জুন তিনটি প্রশ্ন ভগবানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যা এই ত্রিগুণ অতিক্রম করার জন্য প্রয়াসী ভক্তদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্জুন বললেন: তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করলেন পরবর্তী ২২-২৫ নং শ্লোকে, যার মাধ্যমে কেউ জড়া প্রকৃতির এই ত্রিগুণ অতিক্রম করে চিন্নয়লোক ভগবদ্ধামে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর ভাষ্যে এ সম্পর্কে খুব দক্ষতার সহিত তুলে ধরেছেন, “গুণাতীত স্তরে অধিষ্ঠিত হয়ে ভগবদ্ভুক্ত আপনা থেকেই মুক্ত হন। জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তাঁকে কোনো রকম চেষ্টা করতে হয় না। জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ দেহ সম্বন্ধীয় তথাকথিত সম্মান ও অসম্মানের দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু গুণাতীত স্তরে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি এই ধরনের মিথ্যা সম্মান ও অসম্মানের দ্বারা প্রভাবিত হন না। কৃষ্ণভাবনায় বিভোর হয়ে তিনি তাঁর কর্ম করে যান এবং মানুষ তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করল না অসম্মান করল, তার প্রতি তিনি ভ্রুক্ষেপ করেন না। কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনে তাঁর কর্তব্য সম্পাদন করার পক্ষে যা অনুকূল, তা তিনি গ্রহণ করেন। তা ছাড়া পাথর বা সোনা হোক, তাঁর কোনো জড় বস্তুর দরকার হয় না। কৃষ্ণভক্তির অনুশীলনে যাঁরা তাঁকে সাহায্য করেন, তাঁদের সকলকেই তিনি প্রিয় বন্ধু বলে মনে করেন এবং তাঁর তথাকথিত শত্রুকেও তিনি ঘৃণা করেন না। তিনি সকলের প্রতি সম-ভাবাপন্ন এবং সব কিছুই সমদৃষ্টিতে দর্শন করেন। কারণ, তিনি ভাল মতোই জানেন যে, জড়-জাগতিক জীবনে তাঁর কিছুই করার নেই। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলি তাকে প্রভাবিত করে না। কারণ, তিনি সামাজিক উত্থান ও গোলযোগের অনিত্যতা সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত। শ্রীকৃষ্ণের জন্য তিনি সব কিছু করতে পারেন, কিন্তু তাঁর নিজের জন্য তিনি কোনো কিছু করেন না। এই রকম আচরণ দ্বারাই প্রকৃতপক্ষে গুণাতীত স্তরে অধিষ্ঠিত হওয়া যায়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের তিনিটি প্রশ্নের উত্তর দেন;

মাং চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে ।
স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্ৰহ্মভূয়ায় কল্পতে ৷। গীতা ১৪/২৬

অনুবাদ : যিনি ঐকান্তিক ভক্তিযোগ সহকারে আমার সেবা করেন, তিনি প্রকৃতির সমস্ত গুণকে অতিক্রম করে ব্রহ্মভূত স্তরে উন্নীত হন।
এই ত্রিগুণকে অতিক্রম করতে হলে, ভক্তিযোগ অনুশীলনের মাধ্যমে চেতনাকে জড় প্রভাব থেকে পরিবর্তন করে কৃষ্ণ চেতনায় অধিষ্ঠিত করতে হবে। একজন ভক্ত মিথ্যা অহংকার বর্জন করা ছাড়াও উৎসাহের সাথে সফলতা ও ব্যর্থতার প্রভাব দ্বারা বিচলিত না হয়ে কৃষ্ণসেবা চালিয়ে যান। যখন ভক্ত সম্পূর্ণরূপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হন তখন ত্রিগুণের প্রভাবে বিচলিত হন না। তাঁর চেতনাকে এই সমস্ত কার্যকলাপে মনোনিবেশ না করে শ্রীকৃষ্ণের সেবামূলক কাজকে বলা হয় ভক্তিযোগ-“শ্রীকৃষ্ণের জন্য সর্বদাই কর্ম করা।” ১৪/২৭ নং শ্লোকে শ্রীল প্রভুপাদ এই কৃষ্ণভাবনাময় কার্যকলাপ সম্পর্কে ব্যক্ত করেছেন: “কেবল সর্বদা ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হতে হয়, শ্রীবিগ্রহকে নিবেদিত প্রসাদ গ্রহণ করতে হয়, ভগবানের চরণে অর্পিত ফুলের ঘ্রাণ গ্রহণ করতে হয়, ভগবান যে সমস্ত স্থানে তাঁর অপ্রাকৃত লীলা বিলাস করেছেন, সেই স্থানগুলি দর্শন করতে হয়, ভগবানের ভিন্ন ভিন্ন লীলাসমূহ পাঠ করতে হয়, ভগবদ্ভক্তের সঙ্গে প্রীতিমূলক ভাবের আদান-প্রদান করতে হয়, সর্বক্ষণ ভগবানের দিব্যনাম সমন্বিত হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র— হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে । হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে- জপ-কীর্তন করতে হয় এবং ভগবান ও তাঁর ভক্তের আবির্ভাব ও তিরোভাব তিথিগুলিতে উপবাস পালন করতে হয়। এই পন্থা অনুশীলন করার ফলে জড় কার্যকলাপের বন্ধন থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত হওয়া যায়। এভাবেই যিনি ব্রহ্মজ্যোতিতে অধিষ্ঠিত হতে পারেন, তিনি গুণগতভাবে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের সমপর্যায়ভুক্ত।


 

জানুয়ারী -মার্চ ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here