শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর

0
101

শ্রীতারকব্রহ্ম দাস ব্রহ্মচারী : শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর ১৪১৯ শকাব্দে বৈশাখী কৃষ্ণাদ্বাদশী তিথিতে হালিশহর নতিগ্রামে আবির্ভূত হন। তাঁর পিতৃদেব ছিলেন নতিগ্রাম নিবাসী শ্রীবৈকুণ্ঠনাথ বিপ্র। মাতা ছিলেন শ্রীবাস পণ্ডিতের জ্যেষ্ঠভ্রাতা নলিন পণ্ডিতের কন্যা শ্রীমতী নারায়ণী দেবী। বর্দ্ধমান জেলার দেনুড় গ্রামে শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুরের শ্রীপাট।
‘শ্রীপাট পর্য্যটন” গ্রন্থে বলা হয়েছে-

হালিসহর নতি গ্রামে নারায়ণী সুত।
ঠাকুর বৃন্দাবন নাম ভুবন বিদিত।।
নতিগ্রামে জন্ম স্থান স্থিতি দেন্দুড়াতে।
শ্রীচৈতন্য ভাগবত কৈল প্রচারিতে।।

শ্রীগৌর-গণোদ্দেশ দীপিকায় (১০৯) বলা হয়েছে-

বেদব্যাসে য এবাসীদ্দাসো বৃন্দাবনোহধুনা।
সখা যঃ কুসুমাপীড়ঃ কার্য্যস্তÍং সমাবিশৎ।।

“পূর্বে যিনি বেদব্যাস ছিলেন, তিনিই এক্ষণে শ্রীবৃন্দাবন দাস। ব্রজের কুসুমাপীড়-নামক সখা কার্যবশতঃ শ্রীবৃন্দাবন দাসে প্রবেশ করেছেন।
শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর শ্রীবাস পণ্ডিতের ভ্রাতৃকন্যা নারায়ণীদেবীর গর্ভে আবির্ভূত হন। প্রেম বিলাসের মতে তাঁর পিতার নাম বিপ্র বৈকুণ্ঠ দাস। শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর যখন তাঁর মাতৃগর্ভে তখন তার পিতার মৃত্যু হয়। পতি বিয়োগের পরে নারায়ণীদেবী মামগাছি গ্রামে বাসুদেব দত্তের প্রতিষ্ঠিত শ্রীবিগ্রহ সেবার ভার প্রাপ্ত হয়েছিলেন। বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের শৈশবকাল মামগাছিতেই অতিবাহিত হয়েছিল। তিনি বহু শাস্ত্রে পণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন, তাঁর রচিত শ্রীচৈতন্যভাগবতই তার প্রমাণ। তিনি শ্রীপাদ নিত্যানন্দ প্রভুর সর্বশেষ শিষ্য ছিলেন। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর নির্দেশে শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর দেনুরে অবস্থান করে শ্রীচৈতন্য ভাগবত গ্রন্থ রচনা করেন। এখানে তিনি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে শ্রীগৌর-নিত্যানন্দের সেবা প্রকাশ করেন। বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের রচিত গীতিপদও পদকল্পতরু আদি পদসংগ্রহ গ্রন্থে দৃষ্ট হয়। শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুরের শ্রীচৈতন্য ভাগবত যেন শ্রীশ্রীগৌর-নিত্যানন্দের লীলা রসের এক অপূর্ব অমৃত ভাণ্ডার।
তিনি গৌর-নিত্যানন্দের লীলারস স্রোতে উন্মর্জিত-নিমজ্জিত হয়ে যা আস্বাদন করেছেন, তা-ই যেন ভক্তগণের জন্য এই গ্রন্থে পরিবেশন করেছেন।
শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর সবিনয়ে স্বীকার করেছেন, যে সমস্ত বিবরণ তিনি তার গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন সেগুলি গুরুদেব শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন। তিনি আরো তথ্য নিয়েছেন। শ্রীমুরারি গুপ্তের কড়চা থেকে। শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুরের এই মহাগ্রন্থ তিনটি খণ্ডে বিভক্ত – আদিখণ্ড, মধ্যখণ্ড ও অন্ত্যখণ্ড। পূর্ণ বিবরণ সহ শ্রীমন্মহাপ্রভুর সমগ্র নবদ্বীপ লীলা এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং এই বর্ণনা এতই প্রাঞ্জল যে কেহ পাঠ করলে ভক্তির ভাবাবেগে নয়নাশ্রু প্রবাহিত হয়। এই গ্রন্থের প্রতিপত্রে প্রতিছত্রে অলৌকিক মহাশক্তি বিরাজ করছে। যাঁরা শ্রদ্ধা বিনম্র অন্তঃকরণে এই মহাগ্রন্থের অনুশীলন করেছেনÑতারাই একথার যথার্থতা অনুভব করতে পেরেছেন। মহাপ্রভু মুখরিত এই মহাগ্রন্থের অক্ষরে অক্ষরে প্রেমেরই ভাষা ব্যক্ত হয়েছে। বস্তুতঃ প্রেমের নিগূঢ় মহিমা, ভক্তিতত্ত্বের সৎসিদ্ধান্ত এই মহাগ্রন্থে সরল ও সুন্দরভাবে আলোচিত হয়েছে। বাংলার তৎকালীন সমাজের বিচিত্র চিত্র এই গ্রন্থে বিচিত্র বর্ণেই চিত্রিত হয়েছে। এই গ্রন্থের নাম প্রথমে শ্রীচৈতন্য মঙ্গল ছিল, কিন্তু বৃন্দাবনবাসী বৈষ্ণবগণ এই মহাগ্রন্থকে “শ্রীচৈতন্য ভাগবত” আখ্যা প্রদান করেছেন। শ্রীমদ্ভাগবতের ন্যায় শ্রীবৃন্দাবনে রীতি মতো এই গ্রন্থ পঠন-পাঠন হতো। শ্রীগোবিন্দের সেবাধিকারী শ্রীহরিদাস পণ্ডিত বহু ভক্ত সমক্ষে এই মহাগ্রন্থ নিয়মিত পাঠ করতেন। ব্যাসাবতার বৃন্দাবন দাস ঠাকুর মহাশয় তাঁর গ্রন্থের পদে পদে যে অপূর্ব কবিত্ব ও সর্বতঃ প্রসারিণী প্রতিভার পরিচয় দান করেছেনÑতা বাস্তবিকই মানবীয় আলোচনার অতীত।
শ্রীচৈতন্য ভাগবতে বেদানুগ শাস্ত্র সমূহে কথিত ভক্তি সিদ্ধান্ত, বিশেষতঃ লীলা বর্ণন প্রসঙ্গে অতি সুন্দরভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। শ্রীমন্মহাপ্রভুর প্রচারিত ধর্মের রহস্য এবং শ্রীশ্রীগৌর-নিত্যানন্দের তত্ত্বও লীলা বর্ণনের ব্যপদেশে অতি সুন্দর ভাবে প্রকটিত হয়েছে। শ্রীগৌড়ীয় বৈষ্ণবাচার্যগণের মধ্যে শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুরই তাঁর গ্রন্থে সর্বপ্রথম জানিয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীগৌরাঙ্গ উভয়ই সম্বন্ধ তত্ত্ব, উভয়েই উপাস্য, উভয়ের ধাম ও সেবা প্রাপ্তিই জীবের কাম্য। সেই সেবা প্রাপ্তির নিমিত্ত প্রেমই হলো একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তু। আর এই প্রেম লাভের জন্যই গৌর-কৃষ্ণের সুখের নিমিত্ত রাগমার্গের সাধন ভক্তির অনুষ্ঠান কর্তব্য। প্রেমই হলো পরম পুরুষার্থ। বৃন্দাবন দাস ঠাকুরই সর্বপ্রথম এ সংবাদ জানিয়েছেন। অতএব শ্রীগৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে, ভাবে, ভাষায়, ভক্তিসাধনের ক্ষেত্রে বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের অবদান অতি উচ্চস্থানীয়।

ভক্তগোষ্ঠী-সহিত গৌরাঙ্গ জয় জয়।
শুনিলে চৈতন্য-কথা ভক্তি লভ্য হয় ॥
ধনে, কুলে, পান্ডিত্যে চৈতন্য নাহি পাই।
কেবল ভক্তির বশ চৈতন্য গোসাঞি ॥

ঠাকুর বৃন্দাবন দাস সম্বন্ধে আমাদের পূর্বতন আচার্য্য শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় বলেছেনÑ“ঠাকুর বৃন্দাবন দাস কেবল বৈষ্ণব জগতের রত্ন নন, তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সমাজের একটি অলংকার স্বরূপ। ইংরেজীর ভাষায় যেরূপ চসার (Chaucer) নামক কবির সম্মান আছে, বঙ্গীয় ভাষায় ঠাকুর বৃন্দাবন দাসেরও তদ্রুপ হওয়া প্রয়োজন। প্রকৃত প্রস্তাবে ঠাকুর বৃন্দাবনের পূর্বে আর কেহ শুদ্ধ ভক্তির পদ্য গ্রন্থ রচনা করেন নাই। বৃন্দাবন দাস ঠাকুর যে ব্যাসদেবের অবতার তাহাতে কিছু মাত্র সন্দেহ নাই। তাঁহার সাধ্বী জননী সমস্ত বৈষ্ণবেরই পূজনীয়া।” শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর শ্রীচৈতন্যভাগবত ছাড়াও শ্রীনিত্যানন্দ অষ্টকম্ এবং মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দ প্রভুর গুণ, রূপ ও মহিমাসূচক বিভিন্ন পদও রচনা করেছেন। তিনি জাহ্নবা মাতার সঙ্গে খেতুরী গ্রামে মহোৎসবে গিয়েছিলেন। তিনি চৈত্র কৃষ্ণা দশমী তিথিতে তিরোধান লীলা করেন। কেউ কেউ বলেন ১৫১১ শকাব্দে। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেবের পরম পবিত্র লীলাকথায় মুখরিত এই মহাগ্রন্থের অক্ষরে অক্ষরে প্রেমেরই ভাষা ব্যক্ত হয়েছে।


চৈতন্য সন্দেশ এপ্রিল-২০২২ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here