শ্রীজগন্নাথের ব্রিটিশ অভিভাবক

0
629

 আনন্দমূর্তি দাস: আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মনে হলেও ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের নীতি ছিল এখানে পাশ্চাত্যবাসীরা এবং অচ্যুত ব্যক্তিগণ প্রবেশাধিকার পাবেন না। ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে, নিম্ম বর্ণের মানুষ, যবন, পাশ্চাত্যবাসী এবং হিন্দু নয় এমন ব্যক্তিদের প্রবেশ অধিকার ছিল না। যাই হোক, মন্দিরের এই প্রকারের নীতি হল বেসরকারী, বর্ণপ্রথার সামাজিক ঐহিত্য অনুসারে গঠিত। তবে সরকারীভাবে নিয়মনীতি চালু হয় ১৮০৩ শতকে যখন উড়িষ্যা মারাঠা শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রাক্কালে ব্রিটিশরা জানত উড়িষ্যার সামাজিক জীবনে এই শ্রীজগন্নাথ মন্দির কতটা প্রভাব বিস্তার করছে। যেদিন ব্রিটিশরা মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল সেদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর গর্ভনর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি, উড়িষ্যায় নিয়োজিত ব্রিটিশ অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ক্যাম্পবেলকে একটি বিশেষ কার্যসম্পাদনের একটি সামরিক আদেশ সম্বলিত চিঠি প্রদান করলেন। যদিও তিনি একজন কঠোর খ্রিস্টান ধর্মীয় অনুসারি ছিলেন তথাপিও তার সেই আদেশটি ছিল অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর:
“জগন্নাথপুরীতে পৌছানোর পর আপনি সদাসর্বদাই সর্বোচ্চ সর্তক থাকবেন যেন মন্দিরের প্রতি কোন প্রকারের অসম্মান প্রদর্শন না হয়, সেই সাথে সাথে ব্রাহ্মণ এবং তীর্থ দর্শনার্থীদের যেন কোন অসুবিধা না হয়। ব্রাহ্মণদের যথেষ্ট পরিমাণ রক্ষী প্রদান করুন যেন তারা যথেষ্ট নিরাপত্তার সাথে তাদের নিত্যপূজা ও অন্যান্য কর্মাদি নির্বাহ করতে সক্ষম হয়। এই ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা রক্ষা করতে আপনার আদেশের অধিন যারা রয়েছেন তাদের কঠোর নিদের্শ প্রদান করুন-অবশ্যই পূর্ণ সতর্কতার সাথে সঠিকভাবে যেন এই দায়িত্ব পালন করা হয়।”
ব্রিটিশরা মাত্র ১৪ দিনে উড়িষ্যা জয় করে। এরপর যখন তারা পুরীর সন্নিকটে পিপলিতে ক্যাম্পিং করছিল, তখন জগন্নাথ মন্দিরের সেবক পাণ্ডাদের একটি দল ক্যাম্পবেলের কাছে আসেন। তারা তাকে জানান:
“পুরী মন্দিরের সকল পাণ্ডাগণ স্বয়ং ভগবান জগন্নাথের কাছে প্রার্থনা জানান সেই মুহুর্তে মন্দিরের সুরক্ষা ও পরিচালনার নিমিত্তে কারা দায়িত্ব পালন করবেন? তখন ভগবান জগন্নাথ প্রতিউত্তরে বলেন, ইংরেজ সরকার হবে ভবিষ্যতে জগন্নাথের অভিভাবক।”
যখন ব্রিটিশ সেনাগণ ১৮ সেপ্টেম্বর পুরীতে প্রবেশ করল তখন তারা সেখানে কোন বাঁধা বা প্রতিআক্রমণ পেলেন না। পরের দিন তৎকালীন উড়িষ্যার কমিশনার জন মেলভিলি, গর্ভনর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলিকে চিঠিতে জানালেন, “জগন্নাথের উত্তর সম্বলিত চিঠিটি সবার নজরে আসায় কোন রাজাই আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে সম্মত হলেন না। সকলেই জগন্নাথের ইচ্ছাকে তাদের উপর আদেশরূপে মনে করলেন। তাই আমরা বিনা যুদ্ধেই এই সমগ্র রাজ্য অধিকার করতে সক্ষম হলাম। ” শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের প্রভাব ও পুরীর স্থানীয় জনগণের সহায়তায় ব্রিটিশগণ উড়িষ্যায় শাসনভার গ্রহণ করলেন। লর্ড ওয়েলেসলি পরে আরও একটি চিঠিতে আদেশ দিলেন, “পুরীর জগন্নাথের সেবকদের যেন কোনভাবেই অসম্মান করা না হয়। হিন্দুদের সংস্কার ও ঐহিত্য অনুযায়ী যেন অত্যন্ত সম্মানের সাথে জগন্নাথ মন্দিরের সকল সম্পত্তি ব্যবহার করা হয়। তিনি আদেশ করেন, মন্দিরের ব্রাহ্মণের ইচ্ছা বা অনুমতি ছাড়া কেউ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে না।”
এভাবে জগন্নাথ মন্দিরের যথার্থ সম্মান প্রদর্শন ব্রিটিশদের একটি নীতি হয়ে দাঁড়ালো। ১৮০৯ সালে ব্রিটিশগণ একটি আইন প্রনয়ন করলেন (রেগুলেশন ৪ ধারা ৭)। এতে জগন্নাথ মন্দিরে ১৬ বর্ণের ব্যক্তিগণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হয়:
“কুশবী (পতিতা), কুলাল (মদ্যপায়ী), মাছুয়া (জেলে), নমুসুদার (নৌকার মাঝি), গুসকী (পতিতা মহিলা), গাজুর (ঋণের বোঝাগ্রস্থ ব্যক্তি), বাগডি (জেলে, শ্রমিক), যুগী (তাঁতি), কাহার বাউরী (পেশাদার বাহক), রাজবংশী (মাঝিদের বিভিন্ন বর্ণ), চামার (জুতা তৈরিকারক), ধোপা, পন (ঝুড়ি প্রস্তুতকারক), তিয়র (একটি বর্ণের মাঝি), বৈমালী (মালি), হাডেক (ভৃত্য)। এই ১৬ বর্ণের মানুষ জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে না।”
মন্দিরের এই নীতি ব্রিটিশ শাসনে বলবৎ ছিল ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অবধী। স্বাধীনতা লাভের কিছু পূর্বে মহাত্মা গান্ধি ও অন্যান্যদের অনুরোধে নিম্মবর্ণের হিন্দুদের প্রবেশ অধিকার প্রদান করা হয়। বিশেষত ১৯৪৮ সালে সর্বপ্রথম নিম্ম বর্ণের মানুষ জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করে। বর্তমানে অহিন্দু, বিদেশী, নাস্তিক এবং যারা শুধুমাত্র দালান কৌঠা দর্শনের জন্য মন্দিরে আসতে চায় তাদের প্রবেশ অধিকার খর্ব করা হয়েছে।হরেকৃষ্ণ।

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ জুলাই ২০১৮ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here