শ্রীকৃষ্ণ রাসলীলা করে জগতকে কি শিক্ষা দিলেন?

0
44

সনাতন গোপাল দাস ব্রহ্মচারী: আমার একটা কথা মনে পড়ে- রামছাগলের দাড়ি আছে। রবীন্দ্রনাথেরও দাড়ি আছে, সুতরাং রবীন্দ্রনাথও রামছাগল। এটি হচ্ছে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির নির্বুদ্ধি যুক্তি। লম্পটরা যুবতীদের সাথে নাচে, কৃষ্ণ নেচেছে, অতএব কৃষ্ণও তাই। কিন্তু বিচার করলে এই তুলনা অযৌক্তিক।
প্রথমত, কৃষ্ণের বয়স সাত-আট বছর। আর, গোপকুমারীদের বয়স পাঁচ-ছয় বছর। তারা কেউই যুবক-যুবতী নয়। বালক বালিকা। এই বয়সে ছেলে-মেয়েরা আপনাদের অঞ্চলে নাচলে কেউই তাদের দোষ দেবে না।
দ্বিতীয়ত, কৃষ্ণের সাথে এই পৃথিবীর কোনও সাধারাণ মেয়েরা নাচছে না, তাঁরা ছিলেন বহু যুগযুগান্তরের তপস্বী, মুনি, ঋষি, সাধক, সাধিকা। তাঁরা পরমেশ্বর ভগবানকে স্বামীরূপে লাভের বাসনায় বহু জন্ম ধরে কঠোর তপস্যা করেছিলেন এবং তাঁদেরকে ভগবান ব্রজের গোপিরূপে জন্মগ্রহণের আশীর্বাদ দিয়েছিলেন। তাঁরা সকলে পরম পুরুষার্থ কৃষ্ণপ্রেম সম্পদে পরিপূর্ণা।
তৃতীয়ত, কৃষ্ণ যার-তার সাথেও নাচছেন না। স্বয়ং ব্রহ্মা যে সমস্ত গোপীদের পাদপদ্ম বন্দনা করেন, কৃষ্ণ তাঁদের সাথেই রাসনৃত্য করছেন।
চতুর্থত, কৃষ্ণকে আপনি ‘পুরুষ মানুষ’ বলছেন। কিন্তু কৃষ্ণ এই জড়জাগতিক কোনও পতনোন্মখ পুরুষও নন। তিনি নিত্য পুরুষোত্তম। তিনি কোনও মানুষও নন। তিনি পরমেশ্বর ভগবান।
পঞ্চমত, কৃষ্ণ পরমেশ্বর ভগবান। তিনি স্বাধীন স্বতন্ত্র স্বরাট পুরুষ। তিনি ইচ্ছামাত্রই নিজের থেকেই অনন্ত কোটি সুন্দরী রমনী সৃষ্টি করতে পারেন। অর্থাৎ তিনি কোনও সুন্দরীর মুখাপেক্ষী নন। কিন্তু জড় সংসারবদ্ধ জীব যে পুরুষেরা রয়েছে, তারা কোনও কোনও জড়বদ্ধ নারীকে কেন্দ্র করেই জীবনগঠনের আশায় বেঁচে থাকে।
ষষ্ঠত, গর্গমুনি, নারদ, শুকদেব, শিব, ব্রহ্মা থেকে শুরু করে সমস্ত দেবদেবী, মুনি-ঋষিবর্গ রাসনৃত্য দেখে পরমানন্দে প্রেমানন্দে বিভোর হন, রাসস্থলীর ধুলো মস্তকে লেপন করেন, রাসলীলা গান করেন, রাসনৃত্যকারীগণের উপরে সুগন্ধযুক্ত স্বগীয় পুষ্পরাশি বর্ষণ করেন, প্রণতি নিবেদন করেন। কিন্তু, এই জড়জগতের জীব যদি সেই রাসলীলার অনুকরণ করে, তবে অবশ্যই সব লোক ঘৃণা সহকারে থুৎকার দেবে। বিষকিষণ নামে ভুঁইফোড় ভগবান রাসলীলা করার কারণেই শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাকে জেলবন্দী করে রেখেছিলেন। বুঝতে হবে, ভগবৎ কেন্দ্রিক প্রেমিক জীবন আর জড় ইন্দ্রিয়তর্পনমুখী কামুক জীবন সম্পূর্ণ বিপরীত।সপ্তমত, কৃষ্ণ হচ্ছেন গোপীজনবল্লভ গিরিবরধারী। জড়বদ্ধ লোক কখনও শতকোটি গোপীদের মধ্যে একজনেরও বল্লভ হতে পারবে না। গোবর্ধন গিরিও তুলে ধরতে পারবে না। কেবল মূঢ়তা, অহমিকা ও ঈর্ষাবশত পরমেশ্বরের অপ্রাকৃত আচরণের সমালোচনা করতে থাকবে।
অষ্টমত, কৃষ্ণ আগের থেকেই বলে রেখেছেন, ‘আমার ক্রিয়াকলাপ, আমার জন্ম দিব্য। এই জড়সংসারের কারও সাথে তার তুলনাই চলে না। জন্ম কর্ম চ মে দিব্যম্।’ সেটাই তত্ত্বত বুঝতে হবে।
নবমত, কৃষ্ণ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আমি যখন ধরাতলে মানুরূপে অবতীর্ণ হই, তখন পৃথিবীর মূর্খেরা আমার তত্ত্ব না বুঝে আমাকে তাদের মতোই একটা কিছু চরিত্র বলে মনে করে।’ (গীতা ৯/১১)
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা থেকে শিক্ষনীয় যে, ভগবান তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্তদের আনন্দবর্ধনের জন্য লীলাবিলাস করে থাকেন। যে ভক্তরা তাঁকে কাছে পাওয়ার জন্য বহু সাধনার ফলে ব্রজে গোপীরূপে অপেক্ষা করছিলেন তাঁদেরকে কৃপা দৃষ্টি প্রদানের জন্যই ভগবান রাসলীলা করেছিলেন। গান, কথা, নাচা, হাসা, আনন্দ লাভের ব্যাপারে লোকে আগ্রহী হয়। তাই বহিরঙ্গ ব্যক্তিদেরকে আকর্ষণ করবার জন্যও কখনও কখনও রাসলীলা কথা শ্রবণ করেন বা কীর্তন করেন, তিনি অচিরেই শ্রীভগবানে পরাভক্তি লাভ করবেন এবং তার হৃদরোগ কাম অনতিবিলম্বে দূর করতে সমর্থ হবেন।

হরেকৃষ্ণ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here