শ্রীকৃষ্ণের বিশাল সাম্রাজ্য

0
23

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইস্‌কন) প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
১৯৭৩ সনের ১৭ আগস্ট লন্ডনে প্রদত্ত ভাগবত প্রবচনের অংশবিশেষ

শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকটির প্রথম পংক্তিতেই বলা হয়েছে যে-ধর্ম প্রোজি্ঝিতকৈতবোহত্ৰ জড় বাসনাযুক্ত সব রকমের ধর্ম সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে এই ভাগবত পুরাণ পরম সত্যকে প্রকাশ করেছে, যা কেবল সর্বতোভাবে নির্মৎসর ভক্তরাই হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ’ এই চারটি জিনিস সভ্যতায় অগ্রণী বা পারমার্থিকতায় অগ্রণী মানুষদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে বলেই স্বীকার করা হয়। কেবল পারমার্থিক বিষয়ে অগ্রণী নয়, সভ্যতায় অগ্রণী যারা, তাদেরও এইগুলি চর্চার প্রয়োজন।
প্রথমটি হলো ‘ধর্ম’। ধর্ম হলো সভ্যতার মূল নীতি। ধর্মেন হীনাঃ পশুভিঃ সমানাঃ। ধর্ম যদি না থাকে তবে সেটা হবে পশুদের সমাজ। আর এটাই হল মানব সমাজ ও পশু সমাজের মধ্যে পার্থক্য। মানব সমাজের অধঃস্তন পর্যায়ে আশি লক্ষ বিভিন্ন প্রজাতি আছে। কিন্তু সেখানে ভগবৎ চেতনার কোনো ব্যাপার নেই। মানব সমাজে সঠিক কিংবা ভুল যে কোনোভাবেই হোক, তারা কিছু ধর্মনীতি মেনে চলে, সভ্য সমাজে ধর্মের একটা প্রতীক অন্তত সামনে থাকে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ এবং আরও কত মানুষের কত ধর্ম বিশ্বাস রয়েছে। তা হবেই। কারণ এটা হলো মানব সমাজ, এখানে ভগবৎ উপলব্ধির কোনো না কোনো ধারণা বা কিছু একটা নীতিবোধ অবশ্যই থাকবে। একেই বলে ধর্ম।
কিন্তু ধর্মের নামে আবার কিছু অপধর্ম চলছে তাকে বলে কৈতব বা প্রবঞ্চনা। বর্তমান যুগে অল্পবিস্তর সকলেই তা তিনি যেকোনো ধর্মের দলেই থাকুক, কেউই ধর্মের নীতিনিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলছেন না। সেটাই বাস্তব সত্য। একেই বলা হয় কৈতব।
আরেক ধরনের কৈতব’ হলো, মানুষ জানে না ধর্মের উদ্দেশ্যটি কি? ধর্মের অর্থ, যা আমরা বারে বারে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলে থাকি, সেটি হলো ভগবান প্রদত্ত বিধিনিয়ম বা নীতিসূত্র। তাকেই ধর্ম বলে মানতে হয়। শুধুমাত্র তত্ত্বকথা আর সূত্র নয়। সূত্র তো থাকবেই, তবে যথার্থ ধর্মের মূল নীতি হলো ভগবান প্রদত্ত বিধিনিয়ম, যা মেনে চলতে হয়।
ঠিক যেমন আমরা যে দেশে বাস করি, সে সব স্থানে রাষ্ট্রের কতকগুলি নিয়মকানুন আছে। সুনাগরিক তাঁরাই, যারা রাষ্ট্রের নিয়মকানুন বা আইনগুলি সব ঠিক ঠিক মেনে চলেন।
ঠিক তেমনি, ভগবদ্ভক্ত মানে হলো, যিনি ভগবানের নির্ধারিত আইনকানুনগুলি মেনে চলেন। এটা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। ঠিক একজন সুনাগরিক যেমন দেশের আইন মেনে ভালমতে চলেন, তেমনি ভগবদ্ভক্তও ভগবানের আইন মেনে চলেন। রাস্তায় যেখানে লাল আলো জ্বলে ওঠে, সেখানে আপনাকে তৎক্ষণাৎ গাড়ি থামিয়ে দিতে হয়, কারণ আপনি দেশের আইন মেনে চলতে বাধ্য। নচেৎ আপনি হবেন অপরাধী। যদিও কেউ হয়তো সেখানে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছে না, তা সত্ত্বেও আপনি নিয়ম মেনে লাল বাতির সামনের গাড়ি থামিয়ে দিলেন। “লাল আলো জ্বলছে” সেটা মানা হলো অনুগত হয়ে চলার লক্ষণ। আবার যখন সবুজ আলো জ্বলে ওঠে, আপনি গাড়ি চালাতে শুরু করেন।
ধর্মও হল ঠিক এ রকম। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের বিশালতার তুলনায় লন্ডন শহরটি একটি ছোট্ট জায়গা-নগণ্য ক্ষুদ্র একটি বিন্দুর মতো। এখানেই এত রকমের আইনকানুন সব গড়ে তোলা হয়েছে, আর পরমেশ্বর ভগবান, যিনি এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি করেছেন, পালন করছেন, তার কোনো নিয়মকানুন থাকবে না? আপনারা সেটা কি করে ভাবতে পারেন?
একটা নগণ্য শহর। আমাদের ও পৃথিবীর মানুষদের হিসেবে এটা নগন্য নয়, কিন্তু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালতার তুলনায় একটা লন্ডন শহর কিংবা নিউ ইয়র্ক শহরের কি মূল্য আছে? যখনই আপনি ভূমি থেকে ওপরের দিকে উঠতে থাকবেন ক্রমে ক্রমে আপনার শহরটিকে চোখে দেখতেই পাবেন না।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তেত্রিশ কোটি কর্মচারী রয়েছেন। থাকতেই হবে, কেননা কী বিশাল তাঁর কাণ্ড-এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। একটা দোকান বা ব্যবসা চালাতে গেলেই আমাদের কত কিছু লাগে-ম্যানেজার, সহকারি ম্যানেজার, ইত্যাদি।
তেমনই মহাকাশের ওপরে অনেক কিছু রয়েছে। কত রকমের ব্রহ্মাণ্ড, সমুদ্র, মহাসমুদ্র, পাহাড় পর্বত আমরা সেই সমস্ত কিছুই দেখতে পাই না। কারণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু রয়েছে, তা সবই নিতান্ত নগণ্য বস্তুকণা মাত্র। তাই, যদি এই সমস্ত অতি নগণ্য বস্তুকণার মধ্যে এত রকমের রাষ্ট্রের আইন কানুন থাকতে পারে, তাহলে ভেবে দেখুন তো, এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তত্ত্বাবধানের জন্য পরমেশ্বর ভগবানকে কত না আইন কানুন ও বিধিনিয়ম তৈরী করতে হয়েছে। কেউ কি তা অস্বীকার করতে পারে? যে অস্বীকার করবে, তার মানে সে একজন মহা মূর্খ। কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রেই বুঝতে পারবেন যে, একটা ছোট্ট শহরের মতো জায়গায় যদি এত নিয়ম কানুন থাকতে পারে, আর তাহলে অত বিশাল ক্ষেত্রে, অমন বিপুল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অত্তান্তরস্থ পরমাণু সেখানে কতই না অসংখ্য সূক্ষ্ম জটিল নিয়মকানুন অবশ্যই রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে, প্রকৃতির নিয়ম অত্যন্ত বিধিবদ্ধভাবে চলে। এমনকি, অধ্যাপক আইনস্টাইনও স্বীকার করেছিলেন, “আমি যত এগিয়ে চলেছি, ততই দেখছি, নিশ্চয়ই এক আশ্চর্য শক্তিশালী বুদ্ধি কাজ করছে, একজন ভগবান অবশ্যই রয়েছেন।” তাই নয় কি? তিনি কি তাই বলেননি?
ভক্তগণ: হ্যাঁ।
শ্রীল প্রভুপাদ: এই হল জ্ঞান। সবকিছু এমন চমৎকারভাবে চালিত হচ্ছে আর সেখানে কোনো বুদ্ধিমত্তা কাজ করবে না, দেখাশুনা করার কেউ নেই, সেটি কি হয়? যে বলে ভগবান মারা গেছেন, ভগবান নেই” সে হল এক নম্বরের মূর্খ। আর কিছুই নয়। সে যতই লেখাপড়া শিখে বিদ্বান হোক, সে যথার্থ মনস্তত্ত্ব জানে না যে, কিভাবে আমরা পরমেশ্বররের তত্ত্ব মেনে নিয়েছি। মনে করুন, একটি শিশু লন্ডন শহরে এসেছে। সে রাণীকে দেখতে পারছে না। কিংবা ধরুন, শিশুটির পিতাও রাণীকে দেখতে পারছে না। কত লোকই তো লন্ডনে বেড়াতে আসে। এমন তো হয় না যে, তারা প্রত্যেকেই রাণীকে দেখতে পায়। কিন্তু সেজন্য যদি সে বলে, “ওঃ রাণী তাহলে নেই” কিংবা “রাণী মরে গেছে,” তাহলে তার কথা কি মেনে নেওয়া হবে?
তেমনই, বেশকিছু মহামূর্খ আছে যারা জানে না কিভাবে এই বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তারা বলতে পারে, “ভগবান মরে গেছে, ভগবান নেই।” কিন্তু সেকথা কোনো স্থির মস্তিষ্কের মানুষ মেনে নেবেন না। সুস্থির মানুষ বলবেন, “নিশ্চয়ই কেউ রয়েছেন, যাঁর থেকে প্রতিটি জিনিসের উৎপত্তি হচ্ছে।” জন্মাদস্য যতঃ । সেইটিই ভাগবতের জ্ঞান। বেদান্ত সূত্রের প্রথম স্মরণীয় সূত্রটি হল “পরমতত্ত্ব কি?” অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। “পরমতত্ত্ব সম্পর্কে আমাদের আলোচনা করতে হবে, জানতে হবে।” তার উত্তরে পাই সেই ব্রহ্মতত্ত্ব পরমজ্ঞান-যাঁর থেকে সবকিছু উৎসারিত হয়ে আসছে, তিনি হলেন সবকিছুর আদি উৎস। অতিসহজ সরল বর্ণনা। জন্মাদস্য যতঃ।
এই হল ধর্ম, আসলে যার অর্থ হল সেই আদি উৎস, পরমতত্ত্বের উপলব্ধি। একেই বলা হয় ধর্ম। সুতরাং, সেই ধর্ম, ভগবৎ উপলব্ধির তত্ত্ব, প্রত্যেক দেশের মানব সমাজেই রয়েছে। কিছু না কিছু আছেই। মানব সত্তার সেইটাই হল বৈশিষ্ট্য। সেটিই হলো গভীর তাৎপর্য। সমাজটা যদি মানুষের সমাজ হয়, তাহলে তার মধ্যে ধর্মের নীতি কিছুটা থাকবেই। যদি সমাজে কোনো ধর্ম না থাকে, তবে সেটা হলো পশুর সমাজ। ব্যাপারটি বুঝবার চেষ্টা করুন।
ধর্মের উদ্দেশ্য কি? ধর্মের উদ্দেশ্য হলো-ধর্ম যেহেতু ভগবানের দেওয়া আইন, তাই আমাদের তা অবশ্যই জানতে ও মানতে হবে। ঠিক শিশুর মতোই। শিশুও অনেক নিয়ম কানুন মেনে চলে। কিন্তু সে জানে না সেই নিয়মগুলি কে গড়েছে, কেমন করে পথ চলার নিয়ম গড়ে তোলা হয়েছে, কি কি নিয়ম আছে, ইত্যাদি। শিশুকে তাই অজ্ঞ বলে মেনে নিতে হয়। স্কুলে বা কলেজে তাই শিক্ষার্থীরা দেশের আইনকানুন নিয়ে পড়ে। এমনকি আইনজ্ঞরাও তা পড়েন। সেই সব আইন অনেকে না জানতে পারে কিন্তু সেটা তো ভালো নয়। যে জানে, তারই ভালো।
অতএব শুধু জানতে হবে যে “কেউ একজন নিয়ন্তা রয়েছেন এবং তিনিই ভগবান। তিনিই আমাদের কিছু বিধিনিয়ম মানতে দিয়েছেন। ঠিক আছে, বেশতো এবার আমরা সেগুলি মেনে চলি ঠিক যেমন সাধারণ মানুষ মেনে চলে।”
তবে, ঐ সমস্ত বিধিনিয়মগুলি সম্পর্কে জানতে হলে অনুসন্ধিৎসু হতে হয় এবং তাকে বলে ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। সেটা খুবই জরুরী। মানব সমাজে, প্রতিটি মানুষকে পরমতত্ত্ব জানবার জন্য উৎসুক হওয়া চাই, কেননা আমাদের জীবনের যা কিছু বিধি নিয়ম তা সেই পরমতত্ত্বই প্রদান করেছেন।
ভগবদ্‌গীতাতে বর্ণিত হয়েছে, এই সমস্ত বিধিনিয়ম, প্রকৃতির এইসব নিয়মকানুনগুলি অতি কঠোর। সেগুলি পরমেশ্বর ভগবানের দ্বারা নির্দিষ্ট হয়েছে। সেই সম্পর্কে স্বয়ং ভগবান গীতায় বলেছেন- ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্। ভগবান বলছেন “আমার অধ্যক্ষতায়”-ময়াধ্যক্ষেণ। সব দেশেরই আইন বিভাগ আছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আইন বিভাগ রয়েছে। সেখানে তেত্রিশ কোটি দেবতা বিভিন্ন আইন বিভাগের দেখাশোনা করছেন। তাহলে ভেবে দেখুন, ভগবানের শাসিত সাম্রাজ্যের পরিধি কি বিশাল!
হ্যাঁ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তেত্রিশ কোটি কর্মচারী রয়েছেন। থাকতেই হবে, কেননা কী বিশাল তাঁর কাণ্ড-এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। একটা দোকান বা ব্যবসা চালাতে গেলেই আমাদের কত কিছু লাগে-ম্যানেজার, সহকারি ম্যানেজার, ইত্যাদি। তাহলে এমন বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড পরিচালনার কাজে তো শ্রীকৃষ্ণের বহুসংখ্যক সহকারি লাগবেই। আর ভেবে দেখুন, ঐ তেত্রিশ কোটি কর্মী বা সহকারি কেবল একটি মাত্র ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে রয়েছে। এরকম অগণিত ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে ভগবানের সৃষ্টিকার্যে। আর প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডেই নিশ্চয়ই এরকম তেত্রিশ কোটি সহকারি বা কর্মীর প্রয়োজন! এই সহকারীদেরই বলা হয়ে থাকে দেব-দেবী ।
দেব-দেবীগণ বাস্তবিকভাবেই ভগবানের অধীন। ঠিক যেমন এখানে রাজ্যপাল আছেন। তাঁর অধীনেই আছেন বিভিন্ন সচিবেরা। তেমনি এই সকল দেব-দেবীরা হলেন বিভিন্ন সচিব, কর্মচারী, কর্মাধ্যক্ষ ইত্যাদি-সকলেই পরমেশ্বর ভগবানের অধীন।
দেব-দেবীর অস্তিত্ব অবশ্যই স্বীকার্য, তবে তাঁদের আমরা পরমেশ্বর ভগবান রূপে আরাধনা করি না। আমরা ভগবানকেই সমস্ত রকমের শ্রদ্ধা অর্পণ করি, পূজাও করি কেবলমাত্র তাঁকেই।
যেমন ইংল্যান্ডের রাণীর সচিব লন্ডনের মন্দিরে এলে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাব, কারণ তিনি রাণীর সচিব। কিন্তু আমরা কখনো তাঁকে রাণী বলে স্বীকার করে নেব না। সেটি সম্ভব নয়। সেটি করলে পাগলামি করা হবে। বৈষ্ণবেরা একটি পিঁপড়াকেও মর্যাদা দিতে প্রস্তুত। তাহলে রাজা রাণীর সচিবকে কেন মর্যাদা। জানাব না? যখন কোনো জ্যেষ্ঠ অফিসারকে বা পদাধিকারীকে কুর্ণিশ করি, তার মানে এই নয় যে, তাঁকে আমরা তোষামোদ করছি। এটা হল শিষ্টাচার, এটা একটা কর্তব্যকর্ম, বিশিষ্ট শ্রদ্ধাবান মানুষদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা।
তাই দেব-দেবীদের আমরা সর্বদাই শ্রদ্ধা জানাই। সেটাই হল বৈষ্ণব দর্শন। তেত্রিশ কোটি দেব-দেবী বা তেত্রিশ কোটি সচিব থাকতে পারেন। কিন্তু ‘শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে’ যেরকম বলা হয়েছে আমরা সেরকম বলি-একলে ঈশ্বর কৃষ্ণ আর সব ভৃত্য। ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ। একমাত্র প্রভু বা পরম নিয়ন্তা হলেন শ্রীকৃষ্ণ। আর সবাই ভৃত্য। অন্য সব দেব-দেবী ঠিক যেমন ব্রহ্মা, শিব এবং ইন্দ্র, চন্দ্র, বরুন তেত্রিশ কোটি জন। আমরা কতজনকে মনে রাখতে পারি? কিন্তু তাঁরা আছেন। আর তারা সবাই ভৃত্য মাত্র।

একলে ঈশ্বর কৃষ্ণ, আর সব ভৃত্য ।
যারে যৈছে নাচায়, তৈছে করে নৃত্য ॥

তিনিই মূল রশি টানছেন। ঠিক যেমন পুতুল নাছে একটা লোক রশিতে টান দিতে থাকে। শাস্ত্রসমূহে অর্থাৎ বৈদিক সাহিত্যে এই সমস্ত বিবরণ রয়েছে। সুতরাং দেব-দেবীদের সঙ্গে পরমশ্বের ভগবানকে সমপর্যায়ভুক্ত করা কিংবা সমমর্যাদাসম্পন্ন মনে করা একেবারেই অনুচিত। সেটা মহা অপরাধ।
মায়াবাদীরা মনে করে, “ভগবান নিরাকার, নির্বিশেষ তাই আমি নিরাকার কোনো কিছু নিয়ে ধ্যানমগ্ন হতে পারি না বলে কিছু একটা কল্পনা করে নিই।” ওটা তাদের মনগড়া তত্ত্ব। ওরা বলে, “ভগবানের একটা রূপ মনে মনে কল্পনা করে নেওয়া যায়।” সাধকানাং হিতার্থায় ব্রহ্মণো রূপকল্পনঃ। ‘কল্পন’-অর্থাৎ মনগড়া চিন্তা ।
কিন্তু আমরা বলি “না, ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ। তাঁর রূপ রয়েছে, তবে সেটি আমার মতো রূপ নয়।” সেটা আমরা ভালোভাবেই জানি। তাঁর রূপ ভিন্ন ধরনের, ভিন্ন উপাদানের। কিংবা উপাদান না বলে ভিন্ন এক সত্তা বলা যেতে পারে-চিন্ময় সেই রূপ। আমাদের দর্শনের তত্ত্ব সেটাই। ভগবানকে আপনার আমার মতোই একজন পুরুষ, এক ব্যক্তিত্ব। যেমন আমরা এখানে একসাথে বসে আছি, আপনারা আমাকে দেখছেন, আমিও দেখছি আপনাদের। তেমনই, আপনি যদি যোগ্য হন, আপনি যদি ভগবদ্ভক্তিতে সিদ্ধিলাভের স্তরে উন্নীত হন, তাহলে ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করবেন এবং আমাকে যেমন দেখতে পাচ্ছেন, তেমনি তাঁকেও দর্শন লাভ করবেন।
অনেক অনেক ধর্মমত রয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে “ভগবান নিরাকার, তাঁর কোনো রূপ নেই ৷” একটা কিছু কল্পনা করে নেওয়া যাক।” এই ধরনের সব ধর্মমতগুলি ধর্মকে প্রবঞ্চনা করে চলেছে। তাই শ্রীমদ্ভাগবতে (১/১/২) বলা হয়েছে ধর্মঃ প্রোজঝিত কৈতবোহত্র। ধর্ম নিয়ে প্রবঞ্চনা চলছে। কারণ তাদের যথার্থ তত্ত্বজ্ঞান জানা নেই। যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানটি হল ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ- পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিন্ময় শরীর রয়েছে এবং তাঁর অস্তিত্ব বর্তমান। খ্রিষ্টানদের বাইবেলেও বলা হয়েছে “ভগবানের আদলে মানুষের সৃষ্টি।” তাই নয় কি? তাই, ভগবানের যদি রূপ বা আকৃতি না থাকে, দুটি হাত, দুটি পা, না থাকে তবে মানুষ কেমন করে, দুটি হাত, দুটি পা পেল? আমরা যদি ভগবানেরই প্রতিরূপ হয়ে থাকি, তাহলে ভগবান অবশ্যই একজন ব্যক্তি। সেটাই স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
অতএব, ভগবানের নির্বিশেষ তত্ত্বের ধারণাটি ভগবান সম্পর্কে অপূর্ণ ও অসিদ্ধ ধারণা মাত্র। ওরা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। ওরা কল্পনাই করতে পারে না যে, সচ্চিদানন্দ রূপ বলে কিছু হতে পারে। সেটা তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা। কিন্তু আমরা বৈদিক শাস্ত্রাদি থেকে জেনেছি যে, ভগবানের রূপ রয়েছে। সেই রূপ সম্পূর্ণভাবে ঠিক আমাদেরই মতো। ঠিক শ্রীকৃষ্ণকে আপনারা যেমন দেখেছেন। তাঁর দু’খানি বাহু আছে। তাঁর নিত্য সঙ্গিনী শ্রীমতী রাধারাণীর সঙ্গে তিনি মুরলী বাদন করছেন। সুন্দর মুখচন্দ্র, চমৎকার তাঁর মধ্যে রয়েছে। কেবল উপাদানগুলির পার্থক্য। চিন্ময় ও জড়।
আমাদেরও চিন্ময় রূপ রয়েছে। সেই চিন্ময় রূপটিকে আচ্ছাদন করে আছে জড় আবরণ। ঠিক যেমন আমার এই দেহটিকে আচ্ছাদন করে রেখেছে এই শরীরটি। আপনারা আমার চিন্ময় শরীর আত্মাকে দেখতে পাচ্ছেন না। তেমনই আমাদের চিন্ময় শরীরটিকে ঢেকে রেখেছে এই জড় দেহ। তাই আমরা সেটি দেখতে পাই না। তাছাড়া আমাদের এখন যে চোখ দু’খানি রয়েছে সেগুলিও জড় শরীরের উপাদান থেকেই তৈরী হয়েছে। তাই আমাদের জড় চক্ষু দিয়ে চিন্ময় ভগবানকে আমরা দেখতে পাই না।
ভগবানের রূপ রয়েছে। সেটা সত্য। কিন্তু এখন আমরা তাঁকে দেখতে পাচ্ছি না। অতএব আমাদের চোখ, হাত, পা সবকিছু এমনভাবে পরিশুদ্ধ করে তুলতে হবে, যাতে আমরা তাঁর সেবা করতে পারি। তাই আমাদের জড় জাগতিক শরীর থাকা সত্ত্বেও, গুরুর নির্দেশ অনুযায়ী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিয়োজিত হবার প্রয়াসী হতে পারি। একেই বলে ভগবদ্ভক্তি বা ভগবৎ সেবা। এই ভগবৎ সেবা চিৎ জগতে সেবার মতোই ফলপ্রসূ। কোনো প্রভেদ নেই। ঠিক যেমন কাঁচা আমের মতো। কাঁচা আম টক, কিন্তু তা পাকলে সুস্বাদু হয়। আমের মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। একই আম কাঁচা অবস্থায় টক, পাকলে মিষ্টি। যতক্ষণ না পাকে, ততক্ষণ প্রতীক্ষা করা উচিত। তখন স্বাদ মধুর মনে হবে। তেমনি, ভক্তিচর্চার কনিষ্ঠ পর্যায়ে, যেমন আমরা বলি “অবশ্যই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে মঙ্গল আরতি করবে।” এমনি নানা উপাচার মানতে হয়। কনিষ্ঠ পর্যায়ে এগুলিতে বিব্রত বোধ করে অনেকে, মধুর আস্বাদন হয় না। কিন্তু শাস্ত্র ও গুরুদেবের নির্দেশে তা করতেই হয়। কেননা অনুশীলন না করলে ভক্তিপথে কেমন করে অভ্যস্ত হওয়া যাবে? সুতরাং অনুশীলনের মাধ্যমে ভগবৎ প্রেমের বিকাশ সাধন প্রয়োজন। তারপর যখন তার ভগবৎ-প্রেমের উন্মেষ ঘটবে, তখন ঐসব বিধি-নিয়ম ব্যতিরেকেই ভক্তভাব উপলব্ধি করতে পারবে। আপনা হতেই ভোরে ঘুম ভাঙ্গবে, আপনা হতেই সহজ সরলভাবে স্বচ্ছন্দ গতিতে সে সব কিছু করবে। কেবলমাত্র সময়ের দরকার সেই পরিপক্ক পর্যায়ে উপনীত হওয়ার জন্য।
এতএব এই হল পদ্ধতি। আমরা শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে চাইছি। শ্রীকৃষ্ণ অতীব দয়াময়। যেহেতু তিনি চিন্ময় রূপবিশিষ্ট, তাই তিনি বিগ্রহরূপে আমাদের সামনে উপস্থিত রয়েছেন। অবশ্য, এই বিগ্রহ আর সেই চিন্ময় রূপে কোনো প্রভেদ নেই। কেননা অন্তিমে সবকিছু হল চিন্ময়। তবে ঠিক এই মুহূর্তে কোনো রূপ আমাদের কারও পক্ষেই দৃষ্টিগোচর না হলেও অতঃ শ্রীকৃষ্ণ নামাদি ন ভবেদ্ গ্রাহ্যম্ ইন্দ্ৰিয়ৈঃ আমাদের ইন্দ্রিয়াদি যথাযথভাবে প্রখর না হলেও, শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং আমাদের সামনে বিরাজিত হয়েছেন যাতে আমরা তাঁকে দেখতে পারি, স্পর্শ করতে পারি। এই হলেন শ্রীকৃষ্ণ। তিনি দৃষ্টির অগোচর হলেও দৃষ্টিগোচর হয়ে উঠতে পারেন। এমনই সর্বশক্তিমান তিনি।
পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন কোনো প্রস্তরনির্মিত মূর্তিতে অর্চাবিগ্রহ রূপ নিয়ে আমাদের চর্মচক্ষুর সামনে প্রকটিত হন, তখন তার অর্থ এই নয় যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পাথর হয়ে গেছেন। শ্রীকৃষ্ণ সেই শ্রীকৃষ্ণই থাকেন, কিন্তু তিনি আমার সামনে ঠিক পাথরের মূর্তির মতো আবির্ভূত হন। তার কারণ পাথর ছাড়া তাঁর অন্য চিন্ময় রূপ বা আকৃতিকে আমরা স্পর্শ বা দর্শন করতে পারি না তিনি তো আমাদের জড় ইন্দ্রিয়াদির অনুভূতির অতীত। তাই এটি হল তাঁর কৃপা। তাঁরা এই রূপকে বলা হয় অর্চা অবতার অর্থাৎ অর্চনার উপযোগী বিগ্রহ রূপে ভগবানের অবতার।


 

এপ্রিল – জুন ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here