শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম “দর্পহারী”

0
102

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এমন একটি দিন আসে,যখন অর্জুন ও কর্ণ পরস্পরের সামনা সামনি হয়।
যুদ্ধ চলাকালীন, অর্জুনের একটা তীর লেগে কর্ণের রথ ২৫/৩০ হাত পিছনে ছিটকে পড়ে। আর এদিকে কর্ণের একটা তীরের আঘাতে অর্জুনের রথ কেবল ২/৩ হাত পিছনে যায়।
আর তা দেখে শ্রীকৃষ্ণ দুহাত তুলে, “বাহ্ কর্ণ বাহ্” বলে কর্ণের লক্ষ্যভেদের প্রশংসা করতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণের এরূপ আচরণে অর্জুনের মধ্যে জেদ চলে আসে। তিনি আরও দূর্বার বেগে আঘাত করতে থাকেন। আঘাত করে করে কর্ণের রথকে পিছে নিতে থাকেন। কিন্তু তাঁর এই পরাক্রম দেখা সত্ত্বেও শ্রীকৃষ্ণ চুপ করে থাকেন। কিন্তু যেই কর্ণের তীর ছুঁড়ে অর্জুনের রথকে ২/৩ হাত পিছনে সরিয়ে দেয়, ঠিক তখনই শ্রীকৃষ্ণ অতি উৎসাহের সাথে বলে উঠেন, বাহ্ কর্ণ বাহ্, তোমার লক্ষ্যভেদের তুলনা নেই”।
এভাবে বার বার শ্রীকৃষ্ণকে কর্ণের পক্ষে প্রশংসা করতে শুনে অর্জুন অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করেন, “হে কেশব! তুমি আমার এমন পরাক্রম দেখা সত্ত্বেও আমার প্রহারের প্রশংসা না করে কর্ণের ওই দুর্বল প্রহারের প্রশংসা করে চলেছ। কেন কেশব? কেন এমন পক্ষপাত করছ তুমি? তোমার এমন আচরণ আমার হৃদয়কে বড় ব্যথিত করে তুলেছে।”
শ্রীকৃষ্ণ মুচকি হেসে বললেন, “হে পার্থ! তোমার রথকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, রথের ধ্বজায় হনুমান, চক্র তথা চাকায় শেষনাগ আর সারথি রূপে স্বয়ং নারায়ণ আছে। তা সত্ত্বেও যদি কারও প্রহারের ফলে এই রথ এক চুল পরিমাণও নড়ে ওঠে, তবে তা কিন্তু কোন সাধারণ বিষয় নয়। আর এখানে তো কর্ণের একটি প্রহারের চোটে তা ২/৩ হাত পিছনে চলে যাচ্ছে, তবে কি কর্ণের প্রশংসা পাওয়া উচিত নয়? এমন বীরের তো প্রশংসা করতেই হয়।”
শ্রীকৃষ্ণের কথা শুনে তখনকার মত অর্জুন চুপ হয়ে গেলেও মন থেকে তা মেনে নিতে পারেননি। আর এদিকে অন্তর্যামী শ্রীকৃষ্ণ তা বুঝতে পেরেও চুপ করেছিলেন।
যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর যখন রথ থেকে নামার সময় হয় তখন শ্রীকৃষ্ণ সর্বপ্রথম অর্জুনকে রথ থেকে নামতে বলেন। অর্জুন নেমে যাওয়ার পর শ্রীকৃষ্ণ রথের ঘোড়াগুলিকে মুক্ত করে সর্বশেষ নিজে রথ থেকে অবতরণ করেন।
শ্রীকৃষ্ণ রথ থেকে নামার সাথে সাথেই রথে আগুন জ্বলে উঠে। তারপর মুহুর্তের মধ্যেই তা ভষ্ম হয়ে যায়।
প্রকৃতপক্ষে রথটি কিন্তু কর্ণের প্রহারে অনেক আগেই ভষ্ম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু রথের উপরে স্বয়ং নারায়ণ বিরাজমান ছিলেন, তাই ভষ্ম হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও রথটি চলমান ছিল।
এই দৃশ্য দেখার পর অর্জুন সমস্ত বিষয়টি বুঝতে পারেন, এবং তাঁর মনের সকল অহংকার মুহুর্তের মধ্যে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। অর্জুনের দর্প হরণ করেছিলেন বলে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম রাখেন “দর্পহারী”।
এভাবে আমাদের দর্পহারী শ্রীহরি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কেবল বাইরের দৃশ্যমান শত্রুকেই নয় বরং অর্জুনের মনে দখল করে থাকা “দর্প” নামক শত্রুকেও বিনাশ করেন। তাই জীবনে কখনও সফলতা প্রাপ্ত হলেও মনে কোন ধরনের অহংকারকে স্থান দেওয়া উচিত নয়। কেননা, কর্ম তোমার ঠিকই, কিন্তু চালক কেবলই শ্রীহরি।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here