শিবধাম কৈলাসে দুঃসাহসিক অভিযান

0
100

একদল ভক্তকে সাথে নিয়ে দুর্গম, সুউচ্চ ও পবিত্র পর্বতে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তীর্থ ভ্রমণের সাম্প্রতিক কাহিনি

শ্রীমৎ ইন্দ্ৰদ্যুম্ন স্বামী


তিব্বতের প্রতি আমি আকর্ষিত হয়েছিলাম ১৯৬০ এর দিকে। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। আমি তখন সানফ্রান্সিসকোর হেইট এ্যাসবেড়ির বিকল্প বইয়ের দোকানগুলো প্রায়ই পরিদর্শন করতাম, সেখানে একদিন প্রাচ্য পারমার্থিকতা বিভাগে দ্য তিব্বতিয়ান বুক অফ ডেড গ্রন্থটি পাই। আমি পারমার্থিক দর্শন গভীরভাবে উপলদ্ধির জন্য যখন শ্রীল প্রভুপাদের শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা যথাযথ গ্রন্থটি পেলাম, তার পূর্বে অবশ্য অনেক বছর পর্যন্ত আমি সেই গ্রন্থটি পড়েছিলাম।
তিন বছর পূর্বে একটা সুযোগ এসেছিল তিব্বত ভ্রমণের জন্য। সেখানে কয়েকজন ভক্ত আমাকে আমন্ত্রণ জানাল কৈলাস পর্বতে তীর্থ পরিদর্শনের জন্য। কৈলাস পর্বত দেবাদিদেব মহাদেবের নিবাসস্থল। কিন্তু, আমাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছিল যখন চীন সরকার আমাদের ভিসা দিল না। তবুও তিব্বতের প্রতি আমার আগ্রহ পুনঃরুজ্জীবিত হল যখন গত বছর নিউ দিল্লিতে তিব্বতের এক বৌদ্ধ সাধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি ভারতের বৌদ্ধ গয়া পরিদর্শনে এসেছিলেন। খুব কম সময়ের মধ্যে আমরা একে অপরের সাথে অন্তরঙ্গ হয়ে পড়লাম।
তিনি প্রস্থান করার সময় বলছিলেন তিব্বতে তিনি আমার একটি পারমার্থিক আকর্ষণ রেখে এসেছেন। আমি ভাবছিলাম কি সেই পারমার্থিক আকর্ষণ? তবে তার চেয়েও বেশি ভাবছিলাম কিভাবে আমি তা প্রাপ্ত হতে পারি? যদিও তিব্বত ভ্রমণের ব্যাপারটি আমার সাম্প্রতিক ভাবনারাজ্যে কখনোই ছিল না।
এরপর একসময় আমি ভক্তদের একটি দলের কাছ থেকে তিব্বত ভ্রমণের একটি আমন্ত্রণ পাই। চীন সরকার পুনঃরায় কৈলাস পর্বতের জন্য ভিসা ইস্যু করছিল। অবশেষে একটি তিব্বতিয়ান ট্র্যাভেল এজেন্সী আমাদের ১৩ জনের ভিসা মঞ্জুর করল।

একটি পবিত্র পর্বত

তিব্বত ভ্রমণের যে উৎসাহ তা কৈশোরের সেই কল্পনারও ঊর্ধ্বে ছিল। আমার উদ্দেশ্য ছিল, কৈলাস পর্বতের শিখরে অবস্থানরত দেবী পার্বতী ও শিবের কৃপা প্রাপ্ত হব। বৈষ্ণব শিক্ষানুসারে আমরা জানি ভগবানের কাছে প্রত্যক্ষভাবে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে, তার শুদ্ধ ভক্তদের কৃপার মাধ্যমে অগ্রসর হতে হয়। আদি পুরাণে অর্জুনকে উদ্দেশ্য করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “আমার প্রিয় পার্থ, যে আমার ভক্ত সে আমার ভক্ত নয়। যে আমার ভক্তের ভক্ত সে আমার ভক্ত।”
কৃষ্ণের সমস্ত ভক্তের মধ্যে, শিবকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হয় ।

নিম্নগানাং যথা গঙ্গা দেবানামচ্যুতো যথা ।
বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভুঃ পুরাণানামিদং তথা ॥

“ঠিক যেমন সমস্ত নদীর মধ্যে গঙ্গা শ্রেষ্ঠতমা, সমস্ত আরাধ্য বিগ্রহের মধ্যে অচ্যুতই পরম, বৈষ্ণবদের মধ্যে শিবই শ্রেষ্ঠতম, তেমনি এই শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে পুরাণসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।
কৈলাস পর্বত সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২২ হাজার ফুট (৬,৭০৫ মিটার) ওপরে অবস্থিত এবং এটি একটি বিশেষ পবিত্র ধাম কেননা এখানে শিব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গভীর ধ্যানে নিয়োজিত এবং তিনি নারদমুনির মতো মহান সাধুদের সঙ্গে এখানে অবস্থান করেন। এই সেই কৈলাস পর্বত যেখানে চিন্ময় জগৎ থেকে গঙ্গা এই জড়জগতে পূর্ণ বেগে অবতরণ করেছিলেন এবং শিব তাকে তার মস্তকে ধারণ করেছিলেন।
“দেবতারা শিবকে তাঁর পত্নী ভবানীসহ কৈলাস পর্বতের শিখরে ত্রিভুবনের সমৃদ্ধির জন্য তপস্যারত অবস্থায় দর্শন করেছিলেন। মহান ঋষিরা মুক্তি লাভের বাসনায় তাঁর আরাধনা করছিলেন। দেবতারা তাঁকে তাঁদের প্রণতি নিবেদন করেছিলেন এবং গভীর শ্রদ্ধা সহকারে তাঁর বন্দনা করেছিলেন।” [ভাগবত ৮/৭/২০]
কৈলাস সুমেরু পর্বত নামেও পরিচিত, যেটি হল এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র। যুগযুগান্তরে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন রত্নচূড়া, পদ্ম পর্বত ও রৌপ্য পর্বত।
এখানকার স্থানীয় বৌদ্ধগণ এই পর্বতের পারমার্থিক গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত এবং তাদের কাছে এটি পবিত্র তীর্থস্থান। সতের শতকে বৌদ্ধধর্মের আগমনের পূর্বে তিব্বতের ধর্ম বনধর্মের অনুসারীদের জন্য এটি আরাধ্য।
তিব্বতিয়ানরা বলেন, এখানে একটি অদৃশ্য সিঁড়ি আছে যেটি কৈলাস থেকে স্বর্গের সঙ্গে সংযুক্ত এবং প্রাচীন তিব্বতের শাসকদের বলা হয় আলোকসূত্রের (the ropes of light) সঙ্গে সংযুক্ত স্বর্গ থেকে অবতরণ করেছেন এমন ব্যক্তি।
বিশ্বের খ্যাতিমান ধর্মবিদদের চোখে পর্বতটির পবিত্রতার কারণে কেউ কখনো এটি আরোহন করার উদ্যোগ নেয়নি। বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনার বিশ্বের ৮০০০ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট ১৪টি পর্বত আরোহন করেছিলেন, তাকে ১৯৮০ সালের দিকে চীন সরকার অনুমতি দিয়েছিলেন এই পর্বত আরোহণের জন্য। এর প্রত্যুত্তরে তিনি লিখেছিলেন, “অবশ্যই আমি তা করতে অপারগ। এটি করাটা বুদ্ধিদীপ্ত হবে না। কারো ভগবানের ওপর পদদলন করা উচিত নয়।” এক বৌদ্ধ সাধু বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি পাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়েছেন তিনিই এই কৈলাস পর্বত আরোহন করতে পারেন। তার এরকম বরফের দেয়াল ধরে উঠতে হবে না বরং নিজেকে একটি পাখিতে পরিণত করে সেখানে উড়ে যেতে পারেন।”
অবশেষে আমাদের দলটি গিয়ে পৌঁছে তিব্বতের রাজধানী লাসাতে। সেখানে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১,৪৫০ ফুট উঁচুতে অবস্থান করায় অধিকাংশ ব্যক্তিই অসুস্থতায় ভোগে। বাতাসের চাপ হ্রাস পাওয়ায় অনেকেই অসুস্থতার শিকার হয়। আমি অবশ্য তিব্বত ভ্রমনের পূর্বে কাশ্মিরের পর্বতগুলোতে ১২ দিন অবস্থান করায় এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। লাসাতে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে অবস্থান করার পর সেখান থেকে ৩০০ কি.মি দূরে কৈলাস পর্বতের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে কৈলাস পর্বত থেকে ১০০ কি.মি দূরে অবস্থিত এনগড়িতে পৌঁছার কথা ছিল কিন্তু নর্থ কোরিয়ার মিসাইল পরীক্ষার কারণে চাইনার নিরাপত্তায় রেড এলার্ট জারি হয় এজন্য আমাদের পিছু হটতে হয়। অর্থাৎ, কৈলাস পর্বতে পৌঁছানোর জন্য বিকল্প চার দিনের একটি ড্রাইভের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এজন্যে এক হাজার ৩০০ কি.মি পর্বতের রাস্তা পাড়ি দিতে হবে।

প্রভু শিবের ওপর নির্ভরশীলতা

সরকারি ট্র্যাভেল এজেন্সী এজন্যে পূর্ণ সহায়তা প্রদান করে। অবশেষে লাসা প্রস্থানের পর সতের ঘণ্টা ও পরবর্তীতে ১ ঘণ্টা পথ পাড়ি দেওয়ার তপস্যা করতে হয়েছিল। অবসরে ভাবছিলাম এই তপস্যার মাধ্যমে আমরা শিবের আশির্বাদ প্রাপ্ত হতে পারি যাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তার প্রতিনিধি আমার প্রিয় গুরুদেব শ্রীল প্রভুপাদের একজন উত্তম ভক্ত হতে পারি।
এরকম দীর্ঘ ভ্রমণের সময় আমি শিবষ্টকম পড়ছিলাম। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শিবের মহিমা বর্ণনা করে ৮টি প্রার্থনা বলেছিলেন যা মুরারী গুপ্তের গ্রন্থ শ্রীচৈতন্যচরিত মহাকাব্যে উল্লেখ রয়েছে।
শ্রীপাদ শঙ্করাচার্যও একটি সুন্দর শিবষ্টকম লিখেছিলেন, তবে এর চেয়েও অধিক জনপ্রিয় হল প্রভু শিবকে উদ্দেশ্য করে রাবনের প্রার্থনা, যেটি তিনি কৈলাস পর্বতের সন্নিকটে রাবন-তালে (সরোবর) অবস্থানের সময় রচনা করেছিলেন।
প্রভু শিবের ভক্ত অসুর রাজ রাবণ কৈলাস পর্বত উত্তোলনের শক্তি লাভের বাসনায় এর তীরে বসে কঠোর তপস্যায় ব্রতী হয়েছিলেন। শিব ও পার্বতীকে সাথে নিয়ে কৈলাস পর্বতকে তিনি লঙ্কায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অসফল হয়েছিলেন কেননা প্রভু শিব কৈলাসের ওজন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যাতে কোন ভিন্ন গ্রহের মানব, দেবতা, অসুর কৈলাস পর্বতকে কখনো উত্তোলন করতে না পারে।
শিব তন্ত্রস্তোত্রমে রাবণ প্রার্থনা করেছেন, করজোড়ে মস্তক স্পর্শ করে, কুচিন্তা ত্যাগ করে, শিব মন্ত্র উচ্চারণ করে এবং কপোল ও কম্পিত আঁখি সম্বলিত শিবের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করে কখন আমি গঙ্গাতটে অবস্থিত গুহায় বাস করে আমি সুখী হব? (শ্লোক ১৩)।
দুই দিনের দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে আমরা রাবণ তলে এসে পৌঁছালাম এবং সেই সাথে আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান মন সরোবরে এসে উপস্থিত হই। প্রত্যেক তীর্থ যাত্রীকে কৈলাস পর্বতের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে প্রথমে এই মন সরোবরের দর্শন লাভ করতে হয়। এই সরোবর তিন কারণে খ্যাত “এর রং পরিবর্তনের জন্য, কোন কিছুর প্রতিফলনের অনেক ভিন্নতার জন্য এবং এর ভয়ানক ঝড়ের জন্য।”
কৈলাস পর্বত শিখরে একদা শিব এবং পার্বতী বসে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। তারা দেবতাদের গণনানুসারে ১২ বছর ধ্যান করেছিলেন। এ সময়ের মধ্যে ঐ অঞ্চলে কোন বৃষ্টিপাত হয় নি। তাই প্রভু শিব ব্রহ্মাকে আহ্বান করেন একটি পবিত্র সরোবর সৃষ্টি করার জন্য, যেখানে তিনি আর পার্বতী স্নান করতে পারেন। তখন ব্রহ্মা তাঁর মন থেকে এই সরোবরটি সৃষ্টি করেন। তাঁদের স্নানের পর একটি স্বপ্রকাশিত স্বর্ণময় শিবলিঙ্গ ঐ সরোবরের কেন্দ্রে আবির্ভূত হয়। আমরা মন সরোবর দর্শন করে ঐ দিনই দরচেন নামে একটি ছোট্ট গ্রামে পৌঁছি। গ্রামটি কৈলাস পর্বত থেকে কয়েক কি.মি দূরে এবং যেটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৫ হাজার ১০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পবিত্র পর্বতের চতুর্দিকে ভ্রমণের শুরুতে প্রত্যেক তীর্থ যাত্রীদের এই স্থানে আসতে হয়। সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা জানতাম এই তীর্থ শেষ করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর ভক্ত প্রভু শিবের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া।

৩টি মাহাত্ম্যপূর্ণ দিবস পুনরায়

২ দিন পর আমাদের ১৩ জনের দলটি কৈলাস পর্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। সেখানে পৌঁছাতে আমাদের ৩দিন সময় লেগেছিল।
প্রথম দিবসটি হল পরিশুদ্ধতার দিবস দ্বিতীয়টি হল প্রস্থানের দিবস, (কলুষিত চেতনা বা মিথ্যা অহঙ্কার থেকে প্রস্থান)।
তৃতীয়টি হলো নব জীবন প্রদান দিবস। অনেক তিব্বতীয়ান একদিনেই তীর্থ যাত্রা শেষ করেন। প্রথম পর্বে যখন সবাই অগ্রসর হচ্ছিল তখন আমার মনে পড়ল যে আজকে ৩ লিটার জল পান করতে হবে, কেননা এখানে খুব সহজেই ডি হাইড্রেশন হওয়ার আশঙ্কা আছে।
পথিমধ্যে একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তার শুশ্রুষার জন্য তাকে রেখেই সামনের দিকে যেতে হয়। রাস্তাটি ক্রমাগত খাড়া থেকে আরো খাড়া হতে লাগল। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়া ও ধরে রাখার আগ পর্যন্ত একই সাথে মাত্র দশ পদক্ষেপ ধরে এগোচ্ছিলাম। এভাবে ৪ ঘণ্টা ভ্রমনের পর চকতসেল গ্যাঙে এসে পৌঁছলাম।
এটি কোরা অঞ্চলের চারটি স্থানের মধ্যে অন্যতম। এখানে পাথরের ওপর অনেক ছবি রয়েছে এবং যেগুলো রাখা হয়েছে সেই বিখ্যাত স্থানে যেখানে ভগবান বুদ্ধ তার পদচিহ্ন রেখেছিলেন। তিনি খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দিতে অলৌকিকভাবে কৈলাস পর্বত পরিদর্শন করেছিলেন। এই চকসেল গ্যাঙ থেকে কৈলাস পর্বতের খুব সুন্দর ছবি ফুটে উঠে । ভক্তরা কয়েক মিনিটের জন্য এখানে বিশ্রাম নেয়। সেখান থেকে পরবর্তীতে আমরা ১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিই। তবে শুরুর দিকে এক ঘণ্টা হাঁটার পর বুঝতে পারলাম শারীরিক ও মানসিকভাবে আমি সম্পূর্ণ অচল। তাই আমার জন্য একটি ঘোড়া নিই। আমাদের দলের বড় হরিদাস ও রাম বিজয় দাসও অন্য দু’টি ঘোড়ায় উঠে। ঘোড়ার ওপর উঠে জপ করতে করতে আমরা অগ্রসর হচ্ছিলাম। সেসাথে পর্বতের অপূর্ব সৌন্দর্য দর্শন করছিলাম। এ পর্বতগুলোর সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। তৎক্ষণাৎ রামায়ণের একটি উদ্ধৃতি আমার মনে পড়ে। “হিমালয়ের মতো আর কোনো পর্বত নেই, কেননা এই অঞ্চলে রয়েছে কৈলাস ও মন সরোবর। যেরকম ভোরের সূর্যের শিশির শুকিয়ে যায় সে রকম আমাদের পাপগুলোও শুকিয়ে যায় যখন আমরা হিমালয়ের দর্শন লাভ করি।”
আমরা যখন উপত্যকার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিলাম তখন একটি অদ্ভুত দৃশ্য আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে : এটি একটি সমতল অঞ্চল, যেখানে অনেক তিব্বতিয়ান পতাকা উড়ছিল এবং সেসাথে চারপাশে অনেক বড় বড় শকুন উড়ছে আর কিছু বসে আছে। আমি পথ প্রদর্শককে জিজ্ঞাসা করলাম, ওটা কি একটি বিশেষ মন্দির? তিনি উত্তর দিলেন, “না। এটি একটি আকাশ গোরস্থান। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে আমরা মৃতদেহকে কবর দিই না, বা দাহ করি না। আমরা মৃতদেহকে উন্মুক্ত স্থানে রেখে দিলে শকুনরা এসে এগুলো ভক্ষন করে। এটি একটু ব্যতিক্রম। অর্থাৎ পরিবারের সদস্যরা শকুন কর্তৃক প্রিয়জনদের মৃতদেহ ভক্ষনের দৃশ্যটি দর্শন করে এবং সেসাথে ভান্তেরা পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করে।”
শেষ বিকেলে আমরা ধীরাফুক নামে একটি স্থানে পৌছি। যেটি ৫,০০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। সেখান থেকে কৈলাসের বরফ আবরণ দর্শন করে প্রার্থনা করতে থাকি, যেটি শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণনা করেছেন একটি দিব্যস্থান হিসেবে।
“দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ যক্ষেশ্বর কুবের নামেও পরিচিত। কৈলাস কুবেরের বাসস্থানের নিকটেই অবস্থিত। এখানে এই কথাও বলা হয়েছে যে, সেই বনটি ছিল কল্পবৃক্ষে পূর্ণ। ব্রহ্মসংহিতা থেকে জানা যায়, কল্পবৃক্ষ বৈকুণ্ঠলোকে, বিশেষ করে কৃষ্ণলোকে পাওয়া যায়। এখানে আমরা জানতে পারি যে, শ্রীকৃষ্ণের কৃপায়, শিবের আলয় কৈলাসেও তেমন কল্পবৃক্ষ দেখা যায়। তা দেখে বোঝা যায় যে, কৈলাস একটি বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ স্থান; তা প্রায় শ্রীকৃষ্ণের ধামেরই মতো।” (শ্রীমদ্ভাগবত ৪/৬/২৮ তাৎপর্য)
পরদিন আমাদের যাত্রা আবার শুরু হয়। এ দিবসটির নাম প্রস্থান দিবস (মিথ্যা অহংকার থেকে প্রস্থান)। সকালের দিকে কেউ কিছু খায়নি। কেননা এরকম উঁচু স্থানে হজম শক্তি কমে যায়। এই দিবসটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। কেননা আমাদেরকে কোরা অঞ্চলের সর্বোচ্চ পয়েন্টে উঠতে হলে আরো ১০ কিলোমিটারেরও বেশী পথ পাড়ি দিতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৭ ঘণ্টা। প্রস্থানের পূর্বে এক জায়গায় বসে অপূর্ব কৈলাস পর্বতের ওপর আমি ধ্যান করি। নোট বুক খুলে শ্রীমদ্ভাগবতের কয়েকটি শ্লোক অধ্যয়নের মাধ্যমে এই পবিত্র পর্বতকে শাস্ত্রচক্ষু দিয়ে দর্শনের পুনঃপ্রচেষ্টা করিঃ
“কৈলাস নামক ধাম বিভিন্ন ঔষধি এবং বনস্পতিতে পূর্ণ, তা বৈদিক মন্ত্র এবং যোগ অভ্যাসের দ্বারা পবিত্র। তাই সেই ধামের অধিবাসীরা জন্মসূত্রে দেবতা এবং তাঁরা সমস্ত যোগশক্তি সমন্বিত। তা ছাড়া সেখানে অন্য মানুষেরা রয়েছেন, যাদের বলা হয় কিন্নর এবং গন্ধর্ব, সেখানে তাঁরা তাঁদের অপ্সরা নামক সুন্দরী স্ত্রীদের সঙ্গে বিরাজ করেন।” (শ্রীমদ্ভাগবত ৪/৬/৯)
মধ্য সকালে একটু বৃষ্টি শুরু হয়। আমরা কিছুটা ঝড়ো হাওয়ার কারণে ভয় পাই। কয়েক ঘণ্টা পর ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে থাকে। বৃষ্টি তখন শিলা ও বরফে পরিণত হয়। আমরা সবাই অত্যন্ত ধীর গতিতে কষ্ট করে এগুচ্ছিলাম। প্রতি পদক্ষেপের জন্য প্রচুর শক্তি প্রয়োগ করতে হচ্ছিল। আমি দেখলাম সবাই অক্সিজেনের অভাবে ভুগলেও তিব্বতিয়ান তীর্থযাত্রীরা ছিল তার ব্যতিক্রম। তারা মোটামুটি দ্রুতই এগুচ্ছিল। আমি কয়েক স্তরের কাপড় পড়েছিলাম।

প্রকৃত অ্যাডভেঞ্চার

বড় হরিদাস ও রামবিজয় ঘোড়ার পিঠে চড়ছিল। ঘোড়াগুলোও ধীর গতিতে এগোচ্ছিল। একসময় আমার ঘোড়াটি সবাইকে পেছনে ফেলে অনেক দূরে চলে যায়। যেখানে আমি পৌছি সেটি অনেক খাড়া ছিল। আমি এমনকি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম। অবশেষে ঘোড়াকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বিখ্যাত শিবতসল (মৃত ব্যক্তিদের অস্থি রাখার স্থল) স্থলে পৌছালাম, যেটি ভারতের বুদ্ধ গয়ার শ্মশানস্থানের নামে নামকরণ করা হয়েছে। তীর্থযাত্রীরা এই স্থানে কাপড় চোপড় কিংবা তাদের শরীরের কোনো একটি অংশ যেমন চুল, দাঁত কিংবা রক্ত রেখে যায়, যেটি বৈরাগ্যের একটি নিদর্শন হিসেবে প্রতিপাদিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে এখানে যেটি রেখে আসা হয় সেটি হলো মিথ্যা অহংকার-জড় শরীরকে মিথ্যা পরিচয়ে পরিচিত করা এবং তখন প্রকৃত চিন্ময় পরিচয় প্রকাশিত হয়। বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারীদের কাছে এই প্রকার ত্যাগ মানে হলো সমস্ত অস্থায়ী জাগতিক পদবী ও আসক্তি ত্যাগ করা এবং তার মাধ্যমে উপলব্ধি করা যে, আমরা হলাম শুদ্ধ চিন্ময় আত্মা ভগবানের নিত্য দাস।
আমি সেই স্থানে ত্যাগের নিদর্শন স্বরূপ আমার একটি প্রিয় টুপি রেখে দিয়ে শিবের কাছে প্রার্থনা করলাম, যাতে তিনি আমাকে এটি উপলব্ধিতে সহায়তা করেন যে, আমি হলাম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একজন নিত্য সেবক।
এরপর আরো দুই ঘণ্টা ধরে আমি ঘোড়া নিয়ে অগ্রসর হতে থাকি। একটা পয়েন্টে এসে পথ প্রদর্শক ও ঘোড়া উভয়ই খাড়া পাহাড়ের কারণে থেমে পড়ি, কেননা তারা উভয়ই একপ্রকার দূর্বল হয়ে পড়েছিল।
পথ প্রদর্শক বলল, আপনি যদি সৌভাগ্যবান হন তবে, ‘যেতিকে দেখতে পাবেন। আমি প্রশ্ন করলাম ‘এটি কি?
তিনি বললেন, “পশ্চিমারা এদেরকে বরফ মানব হিসেবেও ডাকে। কিন্তু এ সম্পর্কে আপনাদের তেমন বিশ্বাস নেই। আপনারা বাস করেন এমন স্থানে যেখানে যোগী, সাধু, ঋষি নেই। কিন্তু আমরা পবিত্র পর্বতে থাকি। আমি দেখিনি, তবে আমার পিতা ও মামারা বহুবার তাদেরকে দেখেছে। তারা অনেক উঁচুতে থাকে এবং দেখতেও অনেক বিশাল। এডমন হিলারি ও তার পথ প্রদর্শক, তেনজিং নরগে উল্লেখ করেছিল, মাউন্ট এভারেস্টের ২২,০০০ ফুট উঁচুতে তারা বিশাল মানব সদৃশ পায়ের ছাপ দেখেছে। এই পায়ের ছাপগুলো একজন সাধারণ মানুষের পা থেকে কয়েক ইঞ্চি ছোট, কিন্তু অন্তত চার ইঞ্চি প্রশস্ত হয়ে থাকে। অনেক পর্বতারোহী হিমালয়ে এরকম পায়ের ছাপের ছবি তুলেছে। হাজার হাজার বছর আগে এখানে নিকটেই যেতিদের একটি গ্রাম ছিল।
প্রচলিত আছে, এক ভোজনের সময় অনেকেই নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং তারা একে অপরকে হত্যা করতে থাকে। মাত্র কয়েকটি পরিবার এই বিশাল পর্বতগুলো ও হিমালয়ের উপত্যকাগুলোতে গুপ্তভাবে রয়েছে। তাদের রয়েছে দীর্ঘজীবন, কেননা উপত্যকাগুলো থেকে তারা ঔষধি গুলা ব্যবহার করে।” আমার কাছে এটি অদ্ভুত মনে হয়েছে। আমি পথ প্রদর্শককে হেসে বললাম, “যদি আপনি সৌভাগ্যবান হন তবে হয়তো প্রভু শিবেরও দর্শন করতে পারেন। কিন্তু যদি আপনি আরো সৌভাগ্যবান হন তবে তিনি আপনাকে দর্শন করতে আসবেন।” আমরা আরো অনেক দূর অগ্রসর হলাম। সেখানে একটি সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘৫৬৩০ মিটার’। এরকম উঁচু স্থানের কারণে তীর্থযাত্রীদেরকে সতর্ক করা হয় তারা যেন এখানে দশ মিনিটের অধিক না থাকে।
একসময় পথ প্রদর্শক বলেন, “আপনাকে এবার ঘোড়া থেকে নেমে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। পর্বত অধিক খাড়া হওয়ায় ঘোড়া আপনাকে বহন করবে না। আমরা আপনার সাথে দেখা করব পর্বতের পাদদেশে।”
স্থানটির নাম ছিল দ্রোলমা-লা, সেখানে শীর্ষস্থানে আমি একাকী দাড়িয়ে ভাবছি, আমি কি সামনে নাকি পেছনে যাব? হৃৎস্পন্দনও দ্রুত হচ্ছে, বমি বমি ভাবও হচ্ছে এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। হঠাৎ পাশ দিয়ে একটি বরফের আবরণ ধ্বসে পড়লে মনে হলো, বোধহয় কৈলাসেই দেহত্যাগ করতে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর সেখানে বড় হরিদাস এসে উপস্থিত হয়। একসময় হাঁটতে হাঁটতে আমি পেছনে পড়ে যাই এবং বড় হরিদাসকে হারিয়ে ফেলি। সেখান থেকে কোনোমতে পঞ্চাশ মিটার হাঁটলাম এবং এরপর একটু শুয়ে সংক্ষিপ্ত একটি নিদ্রার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু কিছু একটা আমার ভিতর থেকে তা করতে বাধা দিল। চতুরাম দাস পরবর্তীতে বলেছিল, কয়েক ঘণ্টা পূর্বে তিনি যখন পিছনে ছিলেন তখন তিনি কিছুক্ষণের জন্য শুয়েছিলেন। সেসময় এক তিব্বতিয়ান তীর্থযাত্রী প্রচণ্ড বেগে ঝাঁকুনি দিয়ে আমাকে তুলে দিয়ে বলে, “এটা করবেন না”। তিনি চিৎকার করে বলেন, “যদি আপনি ঘুমান তবে, আর কখনো জেগে উঠতে পারবেন না।”
একসময় আমি গৌরীকুণ্ডের দর্শন লাভ করি। এই সরোবরটি শিবপত্নী পার্বতীর স্নানস্থান এবং এ স্থানে অনেক লীলা সংঘটিত হয়। এই স্থানেই বসে পার্বতী তপস্যা করেছিলেন, শিবকে তার পতি হিসেবে লাভ করার জন্য। বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে এখানে স্নান করলে পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়।
আমার অনুভূত হয় যে, প্রকৃত এডভেঞ্চার হলো ভগবান ও তার প্রতিনিধিদের সেবার অনুসন্ধান। এজন্যই আমরা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। যাতে প্রভু শিবের কৃপা পেতে পারি। সেই সুন্দর ও পবিত্র গৌরীকুণ্ড দর্শন করে আমি দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করে কয়েকটি দৃঢ়ব্রত গ্রহণ করলাম। সাধারণত একজন বৈষ্ণবরা সাধারণত তাদের ব্রত প্রকাশ করে না কিন্তু আমার শিষ্যদের কল্যাণার্থে আমি ঐদিন যা ব্রত গ্রহণ করেছিলাম তা প্রকাশ করি। ব্রতগুলো হলো : আমি আর কখনো জাগতিক মিডিয়া দর্শন, অধ্যয়ন ও শ্রবণ করবো না।
একজন সন্ন্যাসী হিসেবে বহু পূর্বেই আমার এই দৃঢ়ব্রত অবলম্বন করা উচিত ছিল। কেননা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রঘুনাথ দাস গোস্বামীকে বলেছিলেন, “জড় জাগতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং শ্রবণ করবে না। ভাল খাবার খাবে না এবং ভাল কাপড় পরবে না। নিজে কোন রকম সম্মানের প্রত্যাশা না করে অন্য সকলকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করে সর্বদা কৃষ্ণনাম গ্রহণ করবে, এবং মানসে বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণের সেবা করবে।” (চৈতন্য চরিতামৃত, অন্ত্যলীলা, অধ্যায়-৬/২৩৬-২৩৭)
এক সময় রামবিজয় এসে উপস্থিত হয়। কয়েক ঘণ্টা পর আমরা তিনজন পর্বতের পাদদেশের উপত্যকায় পৌঁছে ভাবছিলাম, আর চলা অসম্ভব। পথ প্রদর্শক বলল, আরো ১০ কি.মি. পাড়ি দিতে হবে। সেখানে আধ ঘণ্টা বিশ্রামের পর আবার অগ্রসর হলাম। অবশেষে সন্ধ্যায় প্রভু শিবের কাছে প্রার্থনা করলাম, ‘আমার সমস্ত জাগতিক আসক্তি যেন ধ্বংস হয়ে যায় এবং সেসাথে আমি যেন শ্রীবৃন্দাবন ধামে নিত্য বাস করতে পারি।’
পরদিন প্রত্যুষে অর্থাৎ শেষ দিবসে আমি মনযোগ সহকারে হরিনাম জপ করছিলাম। পুণরায় যখন অগ্রসর হই, তখন একসময় একটি বিশেষ স্থানে এসে উপস্থিত হলে আরো একবার আকাশে কালো মেঘের আবরণ দেখি। আমি সেটিকে শিবের কৃপা হিসেবে দর্শন করে উপলব্ধি করেছিলাম প্রভু শিব আমাদের প্রচেষ্টা পরিলক্ষণ করেছে। পর্বতের এক পাশে কিছু বিশেষ আকৃতির ও ছাপ সম্বলিত পাথর দেখি। পথ প্রদর্শক বলেন, “এখানে তীর্থযাত্রীদের তীর্থ সম্পূর্ণ হলে তাদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য শিব ও তার বাহন নন্দী অবতরণ করেন। এই চিহ্নগুলো হলো নন্দীর খুড় ও শিবের চরণচিহ্ন।” আমি যখন সেই ছাপগুলো স্পর্শ করার জন্য অগ্রসর হলাম আকাশ মুহূর্তেই স্বচ্ছ হয়ে গেল। এবং সূর্য তার কিরণ বিতরণ করছিল। তখন সমগ্র পরিবেশটি মুহূর্তেই স্বর্ণালী বর্ণ ধারণ করে। যখন আমি সেই পাথরগুলি স্পর্শ করা শেষ করি তখন পুণরায় আকাশে মেঘের আবরণে ঢেকে যায়। আমার মনে হয়, হয়তো এটি ওপর থেকে প্রভু শিবের কৃপা লাভ করার একটি নিদর্শনও হতে পারে। পরবর্তীতে অর্থাৎ মধ্য বিকেলে আমরা এই অভিযান সমাপ্তি করে দার্চেন গ্রামে ফিরে আসি। আমরা ফিরে আসার পর কৈলাস পর্বতের দিকে পুণরায় আমাদের প্রণতি নিবেদন করি। ভূমির ওপর অবস্থান করে কিছুক্ষণের জন্য পুরো অভিযানটি স্মরণ করি। এটি একটি অভিযান ছিল, কিন্তু আমরা তা সম্পূর্ণ করেছি। আমি কোনো বৈষ্ণব ভক্তকে এরকম অভিযান করার জন্য সুপারিশ করবো না। কেননা, এখানে অনেক অনেক ঝুঁকি রয়েছে। তবে এ অভিযানের পর আমি নিজেকে একজন ভিন্ন ব্যক্তি হিসেবে অনুভব করলাম, যার কিনা পূনর্জন্ম হয়েছে ও পরিশুদ্ধ হয়েছে। আমার এই ভ্রমণের সময় অনুভব করেছিলাম, আমি যেন ভক্তিপথে অগ্রসর হচ্ছিলাম। সেখান থেকে প্রস্থানের পূর্বে আরো একবার পেছন ফিরে সেই অভিযানের পথের দিকে এক পলক তাকালাম। এরপর সামনের দিকে অগ্রসর হলাম অর্থাৎ, আমার গুরুদেবের সেবা সম্পাদনের উদ্দেশ্যে। যেখানেই গুরুদেবের সেবা আমাকে নিয়ে যাক না কেন, আমার হৃদয়ে সর্বদা অবস্থান করবে কৈলাস পর্বতের পর্বতরাজি ও উপত্যকাতে।
আমি প্রার্থনা করি যে, যে সমস্ত যোগী, সাধু, ঋষিগণ এই অদ্ভুত ও পবিত্র স্থানে অবস্থান করেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভগবান শিব স্বয়ং অবস্থান করেন তারা যেন সবাই প্রকৃতই আমাকে একজন কৈলাসবাসী হিসেবে গ্রহণ করেন।


 

জানুয়ারী-মার্চ ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here