রোড A টু Z: এক বিধ্বস্ত জুয়াড়ীর কাহিনী (শেষ পর্ব)

0
111

Vibeke Venema: সারাদিন কাজ আর কাজ। স্বভূমির খবর সামান্য করে জানতে পেরেছিলেন টেড। কোনটিই সুসংবাদ ছিল না। ফেলে আসা পরিজনদের জন্য তারা কেবল প্রার্থনা করত আর চোখের পানি ফেলত। কারণ, তখন কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা, খেমর রগ, কম্বোডিয়ার অক্ষর-নিরক্ষর, ধনী-গরিব, নির্বিশেষে সবাইকে ক্ষেত-খামারে, কলকারখানায় কাজ করতে বাধ্য করছিলেন। চার বছর অতিক্রান্ত হবে, সরকার ও কমিউনিষ্টদের মধ্যে গৃহযুদ্ধে প্রায় ২০ লক্ষ লোককে হয় দেশছাড়া করা হয়েছে, না হয় বাড়তি কর্মে অথবা অনাহারে রেখে মারা হয়েছে। পুনরায় ১৯৭৮ সালে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হলে টেডের পিতা-মাতা এ কেনেরা পালিয়ে থাইল্যাণ্ডের বর্ডারে অবস্থান করে। মার্কিন দূতাবাস হতে ডাক আসে, টেড তার পরিবারকে আমেরিকায় নিয়ে আসতে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করবে কি না। অবশেষে টেড তাদেরকে তার নিয়ে আসে। টেডের পৃষ্টপোষকতায় আরো অনেক জ্ঞাতী-গোষ্ঠী আসল। অনেকেই এর বাইরে। তারা হয় আমাদের একই গ্রামে বাস করত না হয় আমার নাম শুনে এসেছে। দূতাবাসে অনেকেই অসত্যভাবে আমার রেফারেন্স দিয়ে এসেছে। যাই হোক নিজেদের বাচাতে গিয়ে এভাবে মিথ্যা বলায় আমি অপরাধ দেখাছি না।


বছরের পর বছর ধরে, টেড একশ’রও অধিক পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করার পাশাপাশি তাদেরকে থাকার জন্য ঘর, গৃহঋণ ও ব্যবসার করার জন্য দোকানে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসার দশ বছর পার হতেই টেড এখন ধনকুবের। বর্তমানে প্রায় ৬০ টি মতো দোকানের মালিক সেই। ক্যালিফোর্নিয়ায় টেড এখন ‘ডোনাট কিং’ নামে সুপরিচিত। এর কারণ, শত শত শরণার্থীকে আশ্রয় দান বিলাশবহুল বাড়ি আর ডজন খানেক আয়েশি গাড়ি। বেশ স্বাচ্ছন্দেই কাটাচ্ছিলেন দম্পতিযুগল। হঠাৎ জুয়াখেলা তার জীবনটাকেই তছনছ করে দেয়। এটা ছিল তার জীবনে বিষমখণ্ড।

টেডের পতন শুরু

ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আমি বেশ কয়েকবার ‘ম্যাজিক শো’ দেখতে যাই। যাদুকলা আমার মন কাড়ে। পরবর্তীতে আমি আবার সেখানে যাই, এবার জুয়াখেলা আসরে আমি মজে যাই। প্রথমে ১০ ডলার, তারপরে ২০ ডলারে কুপণের বাজি ধরি। বাজির নেশা আমার দেহের শিরা-উপশিরায় চলে গেলে আমি আর সেখান হতে ফিরে আসতে পারিনি। ক্যাসিনোতে আমি ছিলাম ভিআইপি কাস্টমার কারণ এক রাতে আমি সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার ঘুরিয়েছিলাম(ক্যাসিনোর ভাষায় স্পিন করা)। এরপর হতে প্রতি খেলায় আমি ৫ হাজার, ৭ হাজার ডলার করে হারাতাম। অর্থ হারানোর নেশায় শেষ পর্যন্ত আমি আমার পরিবার এমনকি বেকারি সাম্রাজ্যকে তুচ্ছজ্ঞান করতে থাকি। তিনি আরও জানান “ব্যবসা বর্ধন করার প্রতি আমি খামখেয়ালি হয়ে পড়ি সময় না দেওয়াই ব্যবসা অন্ধকারে পথে হাটতে থাকে। এটাই দূর্যোগ।”

ক্রিস্টি প্রায় টেডকে না পেয়ে ক্যাসিনোতে খুঁজতে যেতো কিন্তু টেড সেখানে থেকেও তাকে ধরা দিতেন না। বাজিতে টেড জিতলে পরিবারের সকলে একসাথে উল্লাসে মতোয়ারা হত, আর হেরে গেলে ঘরে থাকা আসবাবপত্র-ভাংচুর করত, সন্তানদের মারমুখী ভাবও দেখাত। এরপর হারানো অর্থ ফিরিয়ে আনার আশায় অবার বাজি ধরতে যেতেন। “যত বারই বাজির চাল আসে, ততবারই অর্থ চলে যেতে থাকে” বলে তিনিও ব্যক্ত করেন।

“আমি খুব বাজে হয়ে গেছি। সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে অবশেষে আমি এজনের কাছে, ঐ জনের কাছ থেকে অর্থ ধার করতে থাকি।”
ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে টেড কোরির জায়গা ঋণদাতাদের নামে লিখে দিতেন। ব্যাপারটি পরিবারকে জানাতেন না। বাজি ধরার বদাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে। তা সত্ত্বেও আবার ছুটে যেথেন। জুয়ার টেবিলে বসেই অর্থ হারাতেন। আর নিজেও কাঁদতেন পরিবারকেও কাঁদাতেন। কান্নাকাটি থামিয়ে, আবারও ক্যাসিনোতে ফিরতেন বলে তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানান।
সাক্ষাৎকারে তিনি অকথিত জীব কাহিনী তুলে ধরে বলেন, “আমি দু-দুবার বৌদ্ধবিহারে যোগ দিই। মাথামুণ্ডন করি। পদ ভ্রমণ করে থাইল্যাণ্ডে অবস্থান করি। সেখান থেকে ফিরে এসে আমি এত বেশী রোগা শুকনা হয়েগেছি যে, আমি নিজেকে চিনতে পারচ্ছিনা।”
সপ্তাহ কয়েক যেতে না যেতেই টেড প্লেনে করে ভেগাসে ফিরে আসে। তিনি তার আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন যে, “জুয়াখেলা এত বেশি আসক্ত হয়ে পড়লাম যা অর্থ দিয়ে সুই কিনে তা শরীরে প্রবেশ করানোর মতো।” 
তাদের শেষ সম্বল হিসেবে আর একটি মাত্র বেকারি বাকি রইল। এটি বিক্রির নির্ণয়ও অবশেষে নিয়ে নিলেন তিনি। বিক্রিত অর্থ নিয়ে আসার জন্য গেলে সেখানে আরেকটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটে যায়।
গাড়ি চালিয়ে ৮৫ হাজার ডলার নিয়ে আসায় পথে পুলিশ তাদের থামিয়ে দিল। পুলিশের কাছে গাড়িটি চুরি করা মনে হলে পুলিশ গাড়িসহ টেড ও ক্রিটিকে থানায় নিয়ে যায়। গাড়িতে থাকা দোকানে বিক্রয়লব্ধ অর্থের বিষয়টি ভয়ে গোপন রেখেছিলেন। পরে তারা জামিন পেলেও প্রাপ্য অর্থ হারালেন। এটা খুবই মর্মান্তিক ঘটনা।
১৯৯৩ সালে বিলাশবহুল প্রাসাদ ত্যাগ ব্যবসা সাম্রাজ্য হারিয়ে কম্বোডিয়ায় আবার ফিরে এলেন তারা। তারপরেও স্বাচ্ছন্দ্যভাবে জীবন-যাপন করার জন্য তাদের কাছে অর্থ কম ছিল না।
কম্বোডিয়ায় ফিরে এসে টেডের ফোকাস এখন রাজনীতিতে। সেই সময় গৃহযুদ্ধের এই প্রথম ডেমোক্রোটিক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রিয় দেশকে টেলে সাজানোর তাগিদেই নির্বাচন প্রার্থী হন টেড। তিনি মনে মনে যুক্তি দাঁড় করালেন যে, এক রাজনীতিবিদ হিসেবে ভোটের জন্য হলেও আমি জুয়াখেলা খেলতে পারব না। কেননা জনগণ যখন জানবে আমি একজন জুয়াড়ি তখন তারা আমাকে ভোট দিবে না।
তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একদক্ষ রিপাবালিকান প্রার্থী ছিলেন। দলের জন্য অর্থ সংগ্রহে তিনি ছিলেন উন্মুখ। তিনি সাবেক মার্কিন রিচার্ড নিক্সন, প্রেসিডেন্ট রিগ্রান এবং জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সান্নিধ্য ও পেয়েছিলেন।
তিনি ‘ফ্রী ডেভেলপমেন্ট রিপাবলিকান পার্টি’ নামে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। তবে নিবন্ধিত নামটি জনগণের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছিল। তারা দলটিকে কম্বোডিয়া রাজপরিবারের বিরোধী বলে ধরে নিয়েছিল। সেহেতু তিনি নির্বাচনে হেরে গেলেন। এখানে নির্বাচন করতে গিয়ে তাকে এক লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে হয়েছিল। কিন্তু লাভ হল না। সব অর্থ হারিয়ে লস এঞ্জলেসে মাত্র একশ ডলার নিয়ে আসে টেড। পরিবার তাকে আর চাইনা। তাকে কেউই কাজ দিয়ে সহায়তা করছে না, এমনকি তিনি যাদেরকে আর্থিক পৃষ্টপোষকতা করেছিলেন তারাও। পরিবার পরিজন ও সমাজের লোক জন তাকে যে সম্মান করত এখন তা আর করে না। এখন নিজেকে নিজে ঘৃণা করছে টেড। তাই সে অনেকবার আত্মহত্যা করতে উদ্যোগী হয়। জুয়াখেলা প্রচণ্ড ঘৃণা করেন। পুনঃপুনঃ স্মরণ করছিলেন, তিনি ছোট ছেলের সাথে কতই না অশোভনীয় আচরণল করেছিলেন। পরিবারের সাথে তো বটেই। আর এগুলো সব ঘটেছে জুয়ার কারণে।
পরিশেষে তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “আমি তোমাদের বলতে চাই, দয়া করে জুয়া খেলা খেলিও না। যদি খেল, তাহলে তোমাদের সব কিছুই শেষ হয়ে যাবে। পরিবারের সাথে, পৃথিবীর সাথে যে সম্পর্ক তা আর থাকবে না। কারণ জুয়াখেলা সাক্ষাৎ শয়তান।”

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, জানুয়ারি ২০২১ সংখ্যা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here