রাশিয়ায় হরিনাম সংকীর্তনের বিজয়

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২২ | ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২২ | ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 418 বার দেখা হয়েছে

রাশিয়ায় হরিনাম সংকীর্তনের বিজয়

রাশিয়ায় হরেকৃষ্ণ ভক্তের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে এবং প্রত্যেকেই সমগ্র বিশ্বের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম জপ করছে। বিগত ২৩ নভেম্বর ২০২১-এ, ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে রাশিয়ার কৃষ্ণভাবনামৃত সোসাইটি এবং সোসাইটির আইন বিভাগের প্রধান মহাবলরাম দাসের একটি আপিলের ভিত্তিতে একটি সিদ্ধান্ত নেয়। ইসিএইচআর (European Convention on Human Rights)-এর কাছে আবেদনের কারণ ছিল রাশিয়ান ফেডারেশনের উলিয়ানভস্ক অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা কৃষ্ণভাবনামৃত সংস্থার নেতিবাচক মূল্যায়ন এবং মস্কোতে জনসমক্ষে সংকীর্তন করা এবং হরিনাম জপ করা অনুমোদন করতে অস্বীকার করা। ঘটনাগুলি যথাক্রমে ২০১০ এবং ২০১৩ সালে সংঘটিত হয়েছিল এবং আদালতের সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে প্রায় ৮ বছর লেগে যায়। আপীলে মহাবলরাম দাস কৃষ্ণভক্তদের মানহানির হাত থেকে রক্ষা করতে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের অক্ষমতা সম্পর্কে অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে, এটি “সম্প্রদায় থেকে সাবধান!” প্রকল্প সম্পর্কে ছিল। ২০০৮ সালে উলিয়ানভস্ক অঞ্চলের কর্তৃপক্ষের দ্বারা সংগঠিত এবং “সাবধান থাকুন: সম্প্রদায়!” নামক ইস্তেহারে প্রচার করা হয়েছে। মহাবলরাম দাসের মতে, “সম্প্রদায়” শব্দটি রাশিয়ান মিডিয়াতে একটি নেতিবাচক অর্থ বহন করে। দ্বিতীয় অভিযোগটি মস্কো কর্তৃপক্ষের হরিনাম পালনে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে। ইস্‌কন রাশিয়া প্রায় ৭০টিরও বেশি আঞ্চলিক কেন্দ্র নিয়ে গঠিত, যার সবকটিই রাশিয়ান ফেডারেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজ করার জন্য সরকারের অনুমতি রয়েছে তাদের। সোসাইটির শিক্ষাগুলি শতাব্দী প্রাচীন বৈষ্ণব দর্শনের উপর ভিত্তি করে রচিত, যা ভক্তি-যোগ নামেও পরিচিত, যা ভারতে উদ্ভূত হয়েছিল। রাশিয়ায় হরে কৃষ্ণ আন্দোলন ১৯৭১ সালে শুরু হয়েছিল, যখন শ্রীল প্রভুপাদ মস্কো সফর করেছিলেন এবং ১৯৮৮ সালে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএসএসআর-এ নিবন্ধিত হয়েছিল। মস্কো কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডে, ফ্রান্সের আদালত, মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার সুরক্ষার জন্য যে নিয়মপত্র রয়েছে, সেটির ৯ম ও ১১শ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন খুঁজে পেয়েছে। ৯ম অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “যেকোনো আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ তার জনগণের কার্যকালাপ, চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিবে” এবং ১১শ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “সমাবেশ-সমিতির স্বাধীনতা”। আদালত নৈতিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে আবেদনকারীদের প্রত্যেকের পক্ষে রাশিয়ান ফেডারেশন থেকে ৭,৫০০ ইউরো (যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৭,২৩,০০০ টাকা) পুনরুদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে, ইসিএইচআর বলেছে, “এটি বিশেষভাবে আশ্চর্যজনক যে আঞ্চলিক রাজ্য কর্তৃপক্ষ একটি সরকারীভাবে নিবন্ধিত এবং আইনসম্মতভাবে পরিচালিত ধর্মীয় সংগঠনের ধর্মের উপর অপবাদ দেওয়ার ব্যাপারে নিজেদের বেশ স্বাধীন ভাবছে।” মহাবলরাম দাস প্রভুর মতে, এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, যেসকল সমস্যা তাকে ইসিএইচআর-এর কাছে আবেদন করতে বাধ্য করেছিল, সেগুলি পদ্ধতিগত সমস্যা নয় বরং সেগুলোকে উপেক্ষা করা হলে, রাশিয়ায় কৃষ্ণের ভক্তদের দীর্ঘমেয়াদী কৃষ্ণভাবনা পালনে অসুবিধার কারণ হতে পারে। সম্প্রতি রাশিয়ায় কৃষ্ণভাবনা কেন্দ্রের কার্যকলাপের জন্য কোনো গুরুতর সমস্যা ছিল না। এখন রাশিয়ার অনেক শহরে আইন-কানুন এবং মহামারীর বিধিনিষেধ মেনে হরিনাম সংকীর্তনগুলো নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। এখনো পর্যন্ত, অন্যান্য অনেক উদীয়মান সমস্যা রাশিয়ান আদালতে সমাধান করা হচ্ছে, যাতে কোনো আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় আপিলের প্রয়োজন লাগছে না।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের জুন মাসে রাশিয়ার তমস্ক নগরে ঘটনার সূত্রপাত। রাশিয়ান একটি অর্থডক্স চার্চ ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক তাৎপর্যকৃত “শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা যথাযথ” এর রাশিয়ান ভাষায় অনুবাদকৃত গ্রন্থটি নিষিদ্ধ করার জন্য সাইবেরিয়ার তমস্ক আদালতে আপিল করে। তাদের অজুহাত ছিল শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা রাশিয়াতে ‘সামাজিক বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টি করেছে!
দ্যুতক্রীড়া, আমিষাহার, জুয়া, অবৈধ যৌন সঙ্গ ইত্যাদি পরিত্যাগের বাণী প্রচার করে সামাজিক-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকার, মেয়র, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও মিডিয়া থেকে পুরস্কৃত হল যে ভগবদ্‌গীতা, কতিপয় দুষ্কৃতকারী হঠাৎ পাগলের মতো বলছে এটিই নাকি সামাজিক বিশৃঙ্খলা। ইস্‌কন রাশিয়ার একজন মুখপাত্র জুরি প্লেসকব বলেন, “রাশিয়ায় ভগবদ্‌গীতা যথাযথ ২৫ বছর পর্যন্ত প্রচারিত হচ্ছে, কিন্তু কখনো এর জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির রেকর্ড নেই।”
ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার কাদাকিন এক মন্তব্যে যেটিকে আপিলকারীদের পাগলামো বলে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য, রাশিয়ান হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের প্রচার, প্রসার ও জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের শুরু থেকেই এর বিপরীতমুখী অবস্থান নেয়। আর তাই নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টিও এরই (ভগবদ্‌গীতা নিষিদ্ধের) ধারাবাহিকতা।
www.petions24.com/gita-এ “ভগবদ্‌গীতা যথাযথ” গ্রন্থটি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সারাবিশ্বে ভোটগ্রহণ শুরু হতে থাকে। এ ভোট গ্রহণ ১৯ ডিসেম্বর রায় ঘোষনার পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকে। যদিও ঐদিনই চূড়ান্ত রায় ঘোষণার কথা ছিল কিন্তু উক্ত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সারাবিশ্ব থেকে এত বিশাল সংখ্যক ভোট আসে যে আদালত ঐদিন রায় মুলতবি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় এবং চূড়ান্ত রায়ের তারিখ নির্ধারণ হয় ২৮ তারিখ। সারাবিশ্বে অসংখ্য লোক এই রায়ের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এতে বাংলাদেশও অনবদ্য ভূমিকা রাখে বিশেষত চট্টগ্রাম সারা বিশ্বে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে ষষ্ঠ স্থান লাভ করে। ২৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত রায়ের দিন। আদালত রায় দিল, ‘শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা যথাযথ’ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এর উপর আনা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যেই নিষেধাজ্ঞা সেটিই তুলে নেয়া হল। আর এভাবে এর মাধ্যমে ইস্‌কনের বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা যথাযথ’ রাশিয়ায় বিজয় হল। সারাবিশ্বে শুরু হল বিজয় উল্লাস।
তথ্যসূত্র: দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস, উইকিপিডিয়া, টাইমস্ অব ইন্ডিয়া, ইস্‌কন নিউজ, ডেইলি ভাঙ্কর, সি.এন.এন., বিবিসি, রয়টার্স, ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, TV9, NDTV, Zee News IAN LIVE * বিশ্ব মিডিয়াসমূহ।


 

চৈতন্য সন্দেশ জানুয়ারি-২০২২ প্রকাশিত
সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।