রামায়ণ (পর্ব-২)

0
82

কম্বোডিয়ায় রামায়ণ

কম্বোডিয়ার প্রচলিত রামায়ণ Reamker (রিমকার) বা Ramakerti (রামকীর্তি) নামে পরিচিত। রামকীর্তি কথাটির অর্থ হল-“রামের গুণকীর্তন” যা সংস্কৃত ভাষায় পদ্যাকারে রচিত। যা জগতের ভাল-মন্দের ভারসাম্য এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনের ভিত্তিতে সংকলিত।

দক্ষিণ আমেরিকায় রামায়ণ

দক্ষিণ আমেরিকায় “মায়ান্ সভ্যতা” এর কিছু অংশ এখনো দেখা যায়। এর ভৌগোলিক ইতিহাস মতে, মায়ান্ সভ্যতার মূল উৎস পাওয়া যায় “মায়াসুর” হতে। যিনি ছিলেন রাবণের পিতামহ। এছাড়াও, দক্ষিণ আমেরিকার হন্ডুরাসে Howher Monkey Godবা হনুমানজীর বৃহৎ একটি ভাষ্কর্য দেখা যায়। যা ভারতীয় রামায়ণ কাহিনির সাথেই সম্পর্কিত এবং মায়ান্ সভ্যতা এখনো এটির উপাসনা করেন।

ইরাক ও ইরানে রামায়ণ

১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সালে একটি ইরাকী প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা দলের অনুসন্ধানে ইরাকের সিলেমেনিয়া একটি স্থানে গুহার অভ্যন্তরীণ কিছু প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার করে। যেখানকার নিদর্শনে ভগবান শ্রীরাম এবং হনুমানজীর ভাষ্কর্য দেখা যায়।
তাছাড়াও ইরানে এক সময় অগ্নি উপাসনা করা হতো। যার মূল উৎস পাওয়া যায় ত্রেতাযুগে। যেখানে অগ্নিতে বিভিন্ন অর্ঘ্য আহুতি দানের মাধ্যমে ভগবানের আরাধনা করা হতো। এশিয়ায় পশ্চিমাঞ্চলের এই দেশে অর্থাৎ ইরানে যে রামায়ণটি প্রচলিত তার নাম “Dastan-e-Ram O Sita|”

ইন্দোনেশিয়ায় রামায়ণ

ইন্দোনেশিয়ায় প্রাচীন রামায়ণের বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ভাষ্কর্যের দর্শন পাওয়া যায়। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে “পাণ্ডব বীচ” নামক একটি দ্বীপ অবস্থিত। যেখানে পঞ্চপাণ্ডব তথা যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবের বিশাল ভাষ্কর্য (যা ভূমি হতে আনুমানিক ৩৫ ফিট উঁচু) নিদর্শন দেখা যায়। দ্বীপটির নিকটেই প্রায় ৫৫ থেকে ৬৫ ফিট উঁচু বৃহৎ একটি ভাষ্কর্য দেখতে পাওয়া যায়। যা হল যুদ্ধক্ষেত্রে বানরসেনাদের সাথে যুদ্ধরত কুম্ভকর্ণ।
এটি ইন্দোনেশিয়ার বৃহৎ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। পরবর্তী ভাষ্কর্যটি হল ভবন সমৃদ্ধ সেতু, যেখানে বানরদের পাথর উত্তোলন করতে দেখা যায়। যদিও এসমস্ত স্থান পর্যটন কেন্দ্র রূপে দেখা যায়, কিন্তু তা প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক পটভূমি। এছাড়াও এখানে রামের ধনুর্বাণ হাতে শিকারের বিভিন্ন মূর্তিও দর্শন করা যায়। ইন্দোনেশিয়ায় প্রবেশ করার সময়, বিভিন্ন এয়ারপোর্ট বা টার্মিনালে রাম নামটির দেখা মিলে। ইন্দোনেশিয়ায় ‘রামায়ণ বালি’ নামক অঞ্চলে Ramakavaca বা “রাম কবচ” হিসেবে “জাভায়” নামক অঞ্চলে Kakawin Ramayana ev Yogesvana Ramayan নামে এবং সেমেতেরায় Ramayan Swarnadwipa নামে পরিচিত।

রাশিয়ায় রামায়ণ

রাশিয়ায় “কল্মইক” প্রজাতির লোকেদের কাছে রামায়ণ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ এবং তারা মঙ্গোলিয়ানদেরই সমগোত্রীয়। পুরাণ ইতিহাস মতে, দশরথের স্ত্রী তথা ভরতের মাতা এসেছিলেন তৎকালীন কোকা-প্রদেশ হতে। ‘কেকা’ শব্দটির অর্থ হল ‘ময়ূরের ডাক বা ধ্বনি’। দেশটি ময়ূর দ্বারা পরিবৃত হওয়ায় তার নাম হয় কেকা প্রদেশ।
সেই দেশটি বর্তমানে “রাশিয়া” নামে পরিচিত। কোকা প্রদেশ হতে এসেছিলেন বলে, দশরথের স্ত্রী তথা ভরতের মাতার নাম ছিল “কৈকেয়ী”। এছাড়া রাশিয়াতে সীতা দেবীর নাম অনুসারে “সীতা” নদী এবং শ্রীরামের নাম অনুসারে “রাম” নামক একটি জলাশয় রয়েছে। রাশিয়াতে “কাম” এবং “মোক্ষ” নামের দুটি নদীও বিদ্যমান।
সূত্র: উইকিপিডিয়া

মিশর বা ইজিপ্টে রামায়ণ

মিশর বা ইংরেজী “ইজিপ্ট” (Egyp) দেশটির নামকরণ করা হয় শ্রীরামের পিতামহ “অজপতি বা অজ হতে।” মিশরের রাজবংশের রাজাদের নাম (Ramasis) বলে আখ্যায়িত ছিল। যা “Ram Eisus” শব্দ হতে আগত। এটির বাংলা অর্থ “ভগবান রাম”। তারা নিজেদের ভগবানের বংশধর হিসেবে বিবেচনা করত। এমনকি মিশরে অনেক বৈষ্ণব রাজার সন্ধানও পাওয়া যায়। “Egypdian Mythand Legend” গ্রন্থের পৃষ্ঠা নং ৩৬৮ “Long Missing Links” গ্রন্থটিতে চন্দন এবং বৈষ্ণবীয় তিলক পরিধানরত রাজার চিত্রকর্ম দেখা যায়।

তিব্বত, চীন এবং জাপানে রামায়ণ

পূর্ব এশিয় দেশ চীনে রামায়ণ “Liudu-ji-Jing” নামে পরিচিত। যা অত্যন্ত প্রাচীন এবং চীনা ভাষায় রচিত। চীনের তিব্বতেও পুরোনো রামায়ণ সংস্করণের নিদর্শন পাওয়া যায়। জাপানে দুইটি খণ্ডের রামায়ণ দেখা যায় একটি হল: “Hobutsush” এবং অন্যটি “Sambo Ekotova” নামে পরিচিত। এছাড়াও, জাপানে রামায়ণ “Ramaenna” বা “Ramaensho” নামেও খ্যাত।

ফিলিপাইন, লাউস এবংমালেশিয়ায় রামায়ণ

ফিলিপাইনে সংস্করণকৃত রামায়ণটির নাম “Maharadia Lawana” ফিলিপাইনের বিখ্যাত নৃত্য “সিংকিল” রামায়ণের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। মালেশিয়ায় মালয় ভাষায় রচিত রামায়ণটির নাম “Hikayat Seri Rama” যা সংস্কৃত রামায়ণ হতেই সংকলিত। এছাড়াও স্বতন্ত্র দেশ লাউসে প্রচলিত রামায়ণটির নাম “Phra Lak Phra Ram” যা বাল্মীকি রামায়ণ মতে রচিত। লাউসে রামায়ণ সম্পর্কিত বিভিন্ন মন্দিরও দেখা যায়। অনেকের মতে, লাউস দেশটির নাম এসেছে রামপুত্র লবের রাম থেকে।

নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় রামায়ণ

দক্ষিণ এশিয় দেশ নেপালে দুটি পৃথক ভাষায় রামায়ণ রচিত। একটি হল প্রধান নেপালি ভাষায়, যার নাম “Bhanubhaktako Ramayan” এবং অন্যটি হল “খাস” ভাষায় যা “Bhanubhaktako Ramayan” “ভানুভক্তক রামায়ণ” নামে পরিচিত। এছাড়াও, পাশ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কায় রামায়ণের বহুল নিদর্শন এবং মন্দির দর্শন করা যায়। শ্রীলঙ্কায় রামায়ণ গ্রন্থটির নাম “Janakiharan” হিসেবে বিখ্যাত। সুতরাং, বৃহৎ বৈদিক সভ্যতা বা সংস্কৃতির এই রামায়ণ শুধুুমাত্র ভারতবর্ষ নামক একটি দেশেই নয় বরং সমগ্র পৃথিবী জুড়েই পরিব্যাপ্ত।
[পরবর্তী সংখ্যায় থাকছে রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। চোখ রাখুন…

লেখক পরিচিতি: শ্রীমান অমরেন্দ্র দাস শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্য শ্রীমৎ রাধাগোবিন্দ দাস গোস্বামী মহারাজের একজন শিষ্য। তিনি সারা বিশ্বের বিভিন্ন শহর, বিশ্ববিদ্যালয়, মন্দির, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউবে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করে চলেছেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি ম্যাসাচুটেস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং ওর ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি এবং মায়াপুরে ভক্তিশাস্ত্রী ডিগ্রি লাভ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here