রাখি বন্ধন

0
1450

সংকীর্তন গৌর দাস


শুধুমাত্র সূতো নয় হৃদগ্রন্থি বন্ধনের এক অনন্য সংস্কৃতি

ভারতবর্ষ সুপ্রাচীনকাল থেকেই মহান এই কথাটি ধ্রুব  সত্যের মতোই। কেন? কি আছে এই ভারতে? যার জন্য ভারতকে এমন তকমা দেওয়া হচ্ছে। হ্যাঁ, আছে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই ভারত অতি উন্নত সংস্কৃতি, প্রথা, জীবনদর্শন, আভিজাত্যে পূর্ণ এক পবিত্র ভূমি।
যার পবিত্র সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হয়ে হাজারো বিজ্ঞানী, দার্শনিক, পরমার্থবাদীসহ অনেক পাশ্চাত্যবাসী পাড়ি জমিয়েছেন এই মহান ভারতমাতার পাদপীঠে। কারণ একটাই উন্নত রস আস্বাদন। আর এসব সংস্কৃতি বা জীবনাদর্শ নয় কোন মনগড়া দর্শন। এর পেছনে রয়েছে বিস্তর ইতিহাস এবং পরম্পরার ধারাবাহিকতা। এক সময় সম্পূর্ণ পৃথিবীটাই ভারতবর্ষ ছিল। আমরা প্রত্নত্ত্ববিদ এবং ইতিহাসবেত্তাদের নিকট থেকে এমনই প্রমাণ সিদ্ধ তথ্য পাই। পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে তা সংকীর্ণ হয়ে আজকের দৃশ্যমান ভারতে পরিণত হয়েছে। ঠিক যেভাবে সংকীর্ণ হয়েছে ভারত মাতার বিস্তীর্ণ আয়তন ঠিক সেভাবেই বিলুপ্ত হয়েছে বেশিরভাগ উন্নত সংস্কৃতিও। তথাপিও এখনো যে সমস্ত রসময় এবং হৃদয় স্নিগ্ধকারী সংস্কৃতিসমূহ জীবন্ত রয়েছে যা মানবজাতির হৃদয়ের খোরাক এবং দৃঢ় আন্তঃআত্ম বন্ধনের পরিচায়ক আজ সেরকম একটি ঐতিহ্য নিয়ে আমরা আলোকপাত করতে যাচ্ছি। কেননা এ নিয়ে আমরা অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে থাকি।
রাখি বন্ধন বা রক্ষা বন্ধন এমনই একটি খুবই সুন্দর ঐতিহ্য। মূলত শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথিতে এ উৎসব পালিত হয়। ভারতবর্ষে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই উদ্্যাপন করে এই রাখি বন্ধন। প্রকৃতপক্ষে রাখি বন্ধনে ভ্রাতাদের মঙ্গল বিধানের জন্য ভগিনীরা তাদের ললাটে তিলক অংকন করে হাতে রাখি বন্ধন করে থাকেন। সমস্ত অমঙ্গল খেকে ভাইদের রক্ষা করার জন্য মাঙ্গলিক এই রাখি ব্যবহার করা হয় বিধায় একে রক্ষা বন্ধন উৎসবও বলা হয়।
এ উৎসবকে আমরা শুধুমাত্র ভাই-বোনদের মধ্যে রাখি বিনিময় বললে খানিকটা ভুল হবে। এটি শুধুমাত্র বোনেদের ভাইদের প্রতি রাখি নিবেদন নয়। এই দিনে নব বিবাহিত স্ত্রীরা তাদের পতিদেবকে ভগবানকে নিবেদিত রাখি উৎসর্গ করেন। গুরুকুলে গুরুদেবগণ তাদের শিষ্যদের আশীর্বাদসূচক রাখি প্রদান করে থাকেন।
বাংলাদেশে প্রতিবেশীদের মধ্যেও এই রাখি আদান-প্রদানের সংস্কৃতি রয়েছে সেইদিন। আমার শৈশবে আমি আমার প্রতিবেশীদের মধ্যে এমন আদান প্রদানের ঐতিহ্য দেখেছি। তাছাড়া বৈষ্ণব কুটুম্বকমেও বলা হচ্ছে – “এটি শুধু কেবল কিছু ফিতা বা সুতোর বন্ধন নয় এর মাধ্যমে হৃদগ্রন্থির বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয়।” এটি সমভাবে আমাদের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। শুধু তাই নয় মজার ব্যাপার হচ্ছে বিরাট বিরাট রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানেও রাখি বন্ধন এক বিস্ময়কর ভূমিকা পালন করেছে।
চলুন দেখে নিই কোথা হতে এই সংস্কৃতির প্রারম্ভিকতা। আমরা সবাই দানবীর অসুররাজ বলি মহারাজ সম্পর্কে জানি। তিনি ছিলেন দান করার জন্য বিখ্যাত এবং পরম বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ মহারাজের বংশধর। বলি মহারাজ যখন তাঁর দানের সুকৃতির মাধ্যমে ত্রিজগতের প্রভাবশালী হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের সমকক্ষ হয়ে ত্রিলোকে আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস করছিল। ঠিক তখনই দেবতাদের প্রার্থনায় ভগবান বামনদেব আবির্ভূত হয়ে তাঁর কাছ থেকে ত্রিপাদ ভূমি দান চাইলেন। যদিও বলি মহারাজ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর কার্য বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাঁর সকল ঐশ্বর্য নাশ হতে চলেছে জেনেও সমগ্র বিশ্বব্রহ্মা-ের অধীশ্বরকে সেবা করার সুযোগ হারাতে চান নি। দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের আদেশ অমান্য করে তিনি শ্রীবামনদেবকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে আত্মেৎসর্গ করেন। তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান তাকে নিম্ন লোকে বৈকুন্ঠাবাস দিতে চাইলে কিন্তু তিনি সেই ধামের রক্ষার দায়িত্ব নেয়ার জন্য ভগবানকে প্রার্থনা করেন এবং ভক্তের মনোভিলাষ পূর্ণ করার জন্য ভগবান একেবারে দ্বাররক্ষী হিসেবে ভূমিকা গ্রহণ করেন।
এদিকে শ্রীবিষ্ণুর পাদপঙ্কজের সেবাবিহীন মাতা লক্ষ্মীদেবী বৈকুন্ঠে কষ্টে দিন অতিবাহিত করছিলেন তিনি চাইছিলেন যেন ভগবান শীঘ্রই বৈকুন্ঠে ফিরে আসেন। আর তাই এক দরিদ্র ব্রাহ্মণপত্নীর বেশে তিনি বলি মহারাজের ধামে গেলেন এবং ভ্রাতা বলে সম্বোধন করে আশ্রয় চাইলেন। তখন ছিল শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথি তাই লক্ষ্মীদেবী বলি মহারাজকে সেই সুযোগে রাখি বন্ধন করলেন। বিনিময়ে বলি মহারাজ উপহার দিতে চাইলে তিনি শ্রীবিষ্ণুকে চাইলেন এবং পরিশেষে শ্রীবিষ্ণুকে নিয়ে বৈকুন্ঠে গমন করলেন। বিষ্ণুপুরাণে এই লীলাটি পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ভবিষ্য পুরাণে বর্ণিত হয়েছে একদা দেবতা এবং অসুরদের যুদ্ধে বজ্র, বৃষ্টি ও দুর্যোগের দেবতা ইন্দ্র’ দৈত্যরাজ বলি মহারাজের সাথে স্বর্গের আধিপত্য নিয়ে এক ভয়ংকর যুদ্ধে লিপ্ত হন। দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকা এ যুদ্ধে দৈত্যরাজ বলির আঘাতে ইন্দ্রদেব ও দেবতাগণ বিধ্বস্তপ্রায় হলে ইন্দ্রপত্নীর শচীদেবী আকুল হয়ে শ্রীবিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করেন তখন তাঁর প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীবিষ্ণু শচীদেবীকে আশীর্বাদস্বরূপ একটি রাখি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ইন্দ্র তা ধারণ করে যুদ্ধে জয়লাভ করেন। সেই থেকেই ভগবানকে নিবেদিত রাখি ভক্তগণ ধারণ করেন কোন সাধারণ দড়ি হিসেবে নয় বরং পরমেশ্বর ভগবানের আশীর্বাদ হিসেবে। পুরাণে এও কথিত রয়েছে যমুনা দেবী এবং যমরাজ সম্পর্কে ভ্রাতা এবং ভগিনী হোন। কিন্তু একদা যমুনার খুব আক্ষেপ ছিল এজন্য যে যমরাজ ১২ বছর ধরে তাঁর সাথে কোন সাক্ষাত করেন নি। এই দুঃখের কথা যমুনা দেবী শ্রী গঙ্গাকে প্রকাশ করলে গঙ্গার অনুরোধে যমরাজ তাঁর ভগিনীকে দেখতে আসেন। বহু বছর পর প্রাণপ্রিয় ভ্রাতাকে কাছে পেয়ে তিনি সর্বোচ্চ আপ্যায়ন করলেন আর অন্তে তাঁর কপালে চন্দনের ফোঁটা ও হাতে রাখি বন্ধন করলেন যেন সমস্ত আপদ থেকে সুরক্ষিত থাকে। আর যমরাজ যমুনা দেবীকে উপহার দিতে চাইলে দেবী বলেন আমি যেন জন্ম জন্মান্তরে আপনার দর্শন লাভ করতে পারি। আর তাই যমরাজ তাঁকে অমরত্ব বর প্রদান করেন। ভারতবর্ষে যমরাজ এবং যমুনা দেবীর এই লীলাটি যথেষ্ট সমাদৃত।

জাগতিক দৃষ্টিকোণের দিকে দেখলেও এই রাখি বন্ধন রাজনৈতিকভাবেও সমঝোতা ও ঐক্য রক্ষার্থে যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিল এক সময়। কেননা ইতিহাস বলছে ৩২৬ খ্রিস্টাব্দে যখন আলেকজান্ডার ও পোরাসের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয় তখন আলেকজান্ডারকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে তাঁর পত্নীর পোরাসকে ভ্রাতা হিসেবে সম্বোধন করেন এবং রাখি পূর্ণিমার সময় তার হাতে রাখি পরিধান করান। আর সেই কৃতজ্ঞতায় পোরাস আলেকজান্ডারকে কোন প্রকার ক্ষতি না করে সুরক্ষা প্রদানের প্রতিজ্ঞা করেন।
তাছাড়া চিতোরের রাণী কর্মাবতী গুজরাটের রাজা বাহাদুর শাহ কর্তৃক আক্রমণের হুমকিপ্রাপ্ত হয়ে মুঘল সম্রাটরা হুমায়ুনের সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং তাঁকে ভ্রাতা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব হিসেবে রাখি প্রেরণ করেন এবং সম্রাটও তা গ্রহণ করে তাদের রক্ষা করবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেছিলেন। যদিও সম্রাট তাঁর সৈন্য সামন্ত নিয়ে পৌঁছানোর আগেই রাণী সপরিবারে আত্মহত্যা করেন। কেননা তিনি শক্রুর হাতে পরাজয় বরণ করার চাইতে আত্মবলিদানকে যথেষ্ট সম্মানজনক মনে করেছিলেন। এমন অনিন্দ্য সুন্দর হৃদয় বিনিময়কারী সংস্কৃতিটি সনাতন শাস্ত্রীয় ভাবধারা থেকে উৎসারিত হলেও বর্তমান আধুনিক বিশ্বে আজ তা সর্বজনীন। সকলেই রাখি বন্ধনের মাধ্যমে হৃদগত সম্বন্ধে সম্বন্ধিত হয়ে এক অদৃশ্য ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে যা বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং প্রেমের প্রসারে ঈর্ষাময় জগতে ধূ ধূ মরুভুমিতে এক পসরা বৃষ্টি।
লেখক পরিচিতি: সংকীর্তন গৌর দাস শ্রীমৎ লোকনাথ স্বামী মহারাজের শিষ্য । মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিবিএ, এমবিএ এবং পিজিডি এইচ আর এম সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি কেএসআরএম স্টীল এ মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগে অফিসার হিসেবে যুক্ত আছেন। তিনি চট্টগ্রাম ইস্্কন ইয়ুথ ফোরামের একজন যুব প্রচারক, বিভিন্ন ক্যাম্প, ফ্যাস্টিভ্যাল ও কোর্স ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষ্ণসেবায় যুক্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here