রথযাত্রা অত্যন্ত অনুভব সম্পন্ন একটি উৎসব

0
18

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) প্রতিষ্ঠাতা
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
তখন সবকিছুই আপনার কাছে প্রকাশিত হবে। চেতোদর্পন মার্জনম্। এই হরে কৃষ্ণ মন্ত্র জপ করার অর্থ হল আপনার হৃদয়ের অন্তঃস্থল মার্জন করা। কেননা আমাদের হৃদয় বা মন বা চেতনা অসংখ্য নোংরা বস্তু দ্বারা আচ্ছন্ন রয়েছে। তাই আমরা যদি এই হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করি তাহলে এই সমস্ত নোংরা বস্তু পরিষ্কার হয়ে যাবে।তখন আমি দেখতে সমর্থ হব যে “আমি কি ,আমার অবস্থানটি কি, আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি এবং আমাকে কি করতে হবে। এটি হচ্ছে মানুষের বিবেচ্য। কুকুর, বিড়াল তারা এসব করতে পারে না। কিন্তু একজন মানষ, এটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে করতে পারে। তাই এ বিষয়ে আপনারা দেখতে পারবেন যে এই সমস্ত তরুনেরা কেবল আপনাদের দেশ থেকেই নয়, অন্যান্য দেশ থেকেও আফ্রিকা,ইউরোপ, এশিয়া প্রত্যেক জায়গাতেই যখনই তারা এই দর্শনকে হৃদয়ঙ্গম করছে, তারা এই আন্দোলনে যোগদান করছে। আর এটা কঠিন কিছু নয়। হরেকৃষ্ণ মন্ত্র বিক্রি করার জন্য আমরা কোন পয়সা দাবী করছি না। আমরা সর্বত্রই কীর্তন করছি। এই রথযাত্রাতেও আপনারা তা দেখছেন ।এখন আমাদের একমাত্র কাজই হলো হরেকৃষ্ণ কীর্তন করা। আর এই হাজার লোক কেবলমাত্র হরেকৃষ্ণ মন্ত্র কীর্তনকে অনুসরণ করছে। তাহলে আপনারা বুঝতে পারছেন যে এই হরেকৃষ্ণ মন্ত্রের শক্তি কতটা। আমরা আমাদের অনুসরণ করার জন্য কাউকে টাকা পয়সা দিচ্ছি না। আমরা কেবলমাত্র হরোকৃষ্ণ কীর্তন করছি। এটি অত্যন্ত শক্তিসম্পন্ন। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের এক মহান আচার্য নরোত্তম দাস ঠাকুর, তিনি গান গেয়েছেন,গোলকের প্রেমধন হরিনাম সংকীর্তন। এই হরেকৃষ্ণ আন্দোলন বা হরেকৃষ্ণ কীর্তন, এটি জড়-জাগতিক কোন কিছু নয়। তাই আপনি কখনও হরেকৃষ্ণ কীর্তন করতে করতে ক্লান্ত হবেন না। আপনি বাস্তাবিকভাবে তা করে দেখুন। আপনি চব্বিশ ঘন্টা কীর্তন করুন। তাই এক বলা হয়েছে ‘গোলোকের প্রেমধন’। এই কীর্তন তরঙ্গ চিন্ময় জগৎ থেকে আসছে। ঠিক আপনারা যে রকম রেডিও বা টেলিভিশনে দূরবর্তী স্থান থেকে জাগতিক ধ্বনি তরঙ্গ গ্রহণ করেন তেমনি আরেকটি যন্ত্র রয়েছে যা চিন্ময় জগতের তরঙ্গ গ্রহণ করতে পারে। আর সেই তরঙ্গ হচ্ছে হরেকৃষ্ণ মন্ত্র।
গোলকের প্রেমধন হরিনাম সংকীর্তন’
রতি না জন্মিল কেনে তায়।
অর্থাৎ ‘‘ওহ্ আমি এতই অভাগা যে আমি এই হরেকৃষ্ণ মন্ত্র কীর্তন করার জন্য কোন আসক্তি লাভ করছি না।’’ সংসার দাবানলে দিবানিশি হিয়া জলে। সংসার অর্থাৎ এই জড় জগত অত্যন্ত অস্বচ্ছন্দ স্থান। প্রত্যেকেই সর্বদা উদ্বিগ্নতায় পূর্ণ। আপনি যতই ধনী হোন না কেন, আপনি যতই ক্ষমতা সম্পন্ন হোন না কেন, কিন্তু উদ্বিগ্নতা থাকবেই। আপনার বুঝতে পারবেন, আপনাদের রাষ্ট্রপতি নিক্সন, যখন সকল জনসাধারণ চাইল তিনি পদত্যাগ করুন তখন তার কতই না উদ্বিগ্নতা। তাই এই জড় জগতের অর্থই হল আপনি কোন অবস্থায় আছেন সেটা কোন ব্যাপার নয়। এটি উদ্বিগ্নতায় পূর্ণ। একে বলা হয় প্রচণ্ড আগুন, সর্বদা হৃদয়কে পোড়াচ্ছে। তাই আপনি যদি এই উদ্বিগ্নতাপূর্ণ অস্বচ্ছন্দ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই এই হরেকৃষ্ণ মন্ত্র গ্রহণ করতে হবে। এটি আমাদের অনুরোধ। আপনি এটা চেষ্টা করে দেখতে পারেন এবং আপনি এর বাস্তব ফল দেখতে পারবেন। এতে আপনার কোনরকম মূল্য দিতে হচ্ছে না, তাই এত কোন ক্ষতি নেই। তাই আমাদের একমাত্র অনুরোধ হচ্ছে, করজোড়ে আপনাদের কাছে আবেদন করছি, আমরা কেবল অনুরোধ করছি আপনারা সংকীর্তনে যুক্ত হন। এটি আমাদের পন্থা। আমরা খুব একটা হিংস্র নই। এখন, আপনারা দেখেছেন, আমাদের শোভাযাত্রা এসেছে, অনেকক্ষণ, প্রায় তিন ঘন্টা। কোন হিংস্রতা নেই এবং আপনাদের দেশের পুলিশ বিভাগও, তারাও অত্যন্ত প্রশংসা করেছে, কেননা তাদের অভিজ্ঞতা হলো যে যখনই কোন শোভাযাত্রা হবে, তখনই সেখানে হিংস্রতা থাকবে। তারা বলে “শান্তি ভঙ্গকারী জনতা”। কিন্তু এই লোকেরা শান্তি ভঙ্গকারী নয়। তাই এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন, যাকে আপনারা ইতমধ্যে গ্রহণ করেছেন, এই আন্দোলনকে আপনাদের অনেক তরুণেরাই গ্রহণ করেছে। আমরা অনুরোধ করছি। আপনাদের আমন্ত্রণ জানানোর এটি আরেকটি উৎসব। তো আমাদের একমাত্র অনুরোধ হচ্ছে আপনারা হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করুন তাহলে আপনারা অনেক বেশি সুখ অনুভব করবেন। কোন উদ্বিগ্নতা থাকবে না এবং তারপর আপনি আপনার কাজ করতে পারবেন। আপনি কি করছেন সটা কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু এই হরেকৃষ্ণ মন্ত্র কীর্তন জাগতিক উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্ত করে আপনাকে আরও সুখী করে তুলবে। এবং আমরা যদি এই পন্থাটি নিয়মিত করে যাই, তাহলে পারমার্থিক জীবন সম্বন্ধে সবকিছু পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে এবং অতি সহজেই আমরা আমাদের প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে সমর্থ হব।
এখন এই উৎসব সম্বন্ধে আমি কিছুটা বর্ণনা করব। এখানে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, জগন্নাথ, বলদেবও সুভদ্রা। তাঁরা হচ্ছেন কৃষ্ণও তাঁর বড় ভাই এবং তাঁর ভগিনী। ভারতে, দিল্লীর নব্বই মাইল উত্তরে একটি জায়গা রয়েছে। আপনারা নতুন দিল্লীর নাম শুনেছেন। তো সেই জায়গাটির নাম কুরুক্ষেত্র। স্থানটিকে পবিত্র স্থান, তীর্থক্ষেত্র রূপে গ্রহণ করা হয়। মানুষ এখনও সেখানে সমবেত হয়, বিশেষত গ্রহণের সময়, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ। তো পাঁচ হাজার বৎসর আগে একবার সূর্যগ্রহণ কালে ভারতের সমস্ত অঞ্চল থেকে সমস্ত মানুষের কুরুক্ষেত্রে এসেছিল। সেসময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার রাজা ছিলেন। তিনিও তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও ভগিনীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। কৃষ্ণ তাঁর শিশুকালে বৃন্দাবনে মহারাজ নন্দ ও মাতা যশোদার পালিত পুত্র রূপে বড় হয়েছিলেন তারপর তিনি যখন বড় হলেন আপনারা কৃষ্ণ গ্রন্থে এই ইতিহাস পাবেন। তো ঘটনা হল যে বৃন্দাবনে কৃষ্ণ একজন অতি প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাই তিনি যখন বৃন্দাবন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সেখানকার মানুষেরা, তারা অত্যন্ত বিষন্ন হয়েছিলেন। সুতরাং কৃষ্ণ যখন তাঁর ভ্রাতা ও ভগিনীকে সঙ্গে নিয়ে দ্বারকা থেকে কুরুক্ষেত্রে এলেন, বৃন্দাবনের এই সকল মানুষেরা, তাঁরা খবর পেলেন যে কৃষ্ণ সেখানে আসছেন। বৃন্দাবনও প্রায় একই দূরত্বে। কুরুক্ষেত্রের দূরত্বটা বেশী। যাই হোক, তাদের ভালবাসা বশতঃ তাঁরা কৃষ্ণকে দেখতে এলেন এবং পরম প্রেমাস্পদ শ্রীমতি রাধারাণী, তিনি কৃষ্ণকে অনুরোধ করতে লাগলেন, “তুমি সেই একই কৃষ্ণ। আমি সেই একই রাধারাণী। কিন্তু স্থানটি এক নয়। তুমি রাজকীয় ঐশ^র্য নিয়ে এখানে কুরুক্ষেত্রে এসেছ আর আমরা গ্রাম থেকে এসেছি। তাই ছিল রাধারাণীর অনুরোধ। আর এটি অত্যন্ত উৎফুল্লজনক অনুভূতি। যারা উত্তম ভক্ত, তারা সেটি উপভোগ করতে পারে। তো আমরা এই ঘটনাটি পাশ্চাত্য দেশগুলির বহু জায়গায় বাৎসরিকভাবে উদ্যাপন করি। এই মুহূর্তে আমরা লন্ডন, সানফ্রান্সিসকো, শিকাগো, ফিলাডেলফিয়া এবং আর কোথায়? হ্যাঁ, বাফালো, মেলবোর্নে এই উৎসব উদযাপন করছি। অতএব এটি একটি অত্যন্ত অনুভব সম্পন্ন উৎসব। আপনারা এখানে এসেছেন। তাই আমি আপনাদের ধন্যবাদ ধন্যবাদ জানাই এবং আমাদের দর্শনটি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। আপনারা সকলেই শিক্ষিত যুবক যুবতী। আমাদের সাতান্নাটি গ্রন্থ রয়েছে। সেই সব গ্রন্থ পড়ার চেষ্টা করুন এবং হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। আর এটি অত্যন্ত ঐকান্তিকভাবে গ্রহণ করুন, তাহলে আপনারা সুখী হবেন।
আপনাদের অজস্র ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here