মেডিটেশন (পর্ব-১)

0
401

দ্রুতকর্মা দাস: আপনার কি ধ্যান করা উচিত? ডা. জন হেইডার, একজন মনস্তত্ত্ববিদ, বিশ্বাস করেন যে, ধ্যান “দাঁতের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় নিয়মিত ব্রাশ করার মতই জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়।” কিন্তু প্রশ্ন হল আপনি কি সাধারণ কোন জিনিস দিয়ে ব্যাশ করছেন না কি উপকারী কোন রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে ব্রাশ করছেন? এ ব্যাপারটি আপনার দাতের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় একটি দিক। ঠিক একইভাবে, পারমার্থিকভাবে আপনার ধ্যান কতটা উপযোগী, কি ধরনের ধ্যান আপনি অনুশীলন করছেন এবং কেন, এই বিষয়গুলো জানাও অতীব জরুরী। যখন আমরা আমাদের মনকে জড় জগতের কোন কিছুর প্রতি কিংবা আমাদের নিজেদের মধ্যে উত্থিত ভাবনারাজি এবং অনুভূতির প্রতি নিক্ষেপ করি, আমরা তখন এক ধ্যানের মধ্যে নিয়োজিত হই। এর মানে এটিও একটি ধ্যান। এই প্রকার ধ্যান কিরকম সেটি আরও উপলদ্ধি করতে চলুন আমরা প্রবেশ করি। শহরের একজন ব্যক্তির মনের ভিতর। কিশোর বয়স থেকে কি রকম ধ্যানে তিনি মগ্ন ছিলেন তা অবলোকন করা যাক। ছোটন (ছদ্মনাম) এস. এস. সি পাশ করার পর এইচ.এস.সি পড়ার জন্য স্বনামধন্য কলেজে ভর্তি হয়। গ্রাম থেকে মফস্বলে এসে নতুন পরিবেশ তার কাছে নতুন এক জগতের সন্ধান দেয়। ধ্যান শুরু হয় মেধাবীদের শীর্ষে কিভাবে উঠা যায়। আর সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে সঙ্গিনী হিসেবে আসে তার আরেক ধ্যানের বিষয়।
পড়ালেখার পাশাপাশি নতুন মাত্রায় ধ্যান সংযোজন প্রথম দিকে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে ছোটনের প্রধান ধ্যানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় সেই সঙ্গিনীই। এদিকে ছোটনের প্রধান ধ্যানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় সেই সঙ্গিনীই। এদিকে ছোটনের পারিবারিক অবস্থাও কারণে ঠিক ততটা ভালো রেজাল্ট ছোটনের হয়নি। এভাবে অনার্স মাষ্টার্সও সম্পন্ন হল ততদিনে এক রঙিন জীবন লাভে প্রত্যয়ী সঙ্গিনীর ধ্যান আরও দৃঢ় করল ছোটন। একসময় একটি স্বল্প বেতনের একটি চাকরীও হল, তারপর বিয়ে। বিয়ের পর যে রঙ ছড়াবে বলে ছোটন আত্মপ্রত্যয়ী ছিল তা হতে হতেও যেন আর হচ্ছিল না সাময়িক আশা আকাক্সক্ষা পূরণার্থে ধর্না দিত বিভিন্ন মঠ-মন্দিরে। কখনো দেব-দেবীদের কাছে, কখনো যায় বাবাদের কাছে। হাত জোড় করে চাইত এটি দাও, ওটা দাও, তার কিছু পেত, কিছু না বরং যা কিছু পেত মনে হয় সমস্ত ভোগান্তির উৎস এগুলি সন্তান, স্ত্রীর চাওয়া পাওয়ার সাথে বাড়তি সংযোজন মা-বাবার অসুস্থতা ইত্যাদি। ধ্যান সম্প্রসারণ আরো অনেক। একসময় অর্থাভাব মেটাতে গিয়ে যে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম সে করেছিল তাও আটকাতে পারেনি তার প্রিয় সন্তানের আকস্মিক মৃত্যু। একসময় পিতা–মাতাও মারা গেল। কিন্তু মারা যাওয়ার আগে যে ভোগান্তি ছোটনকে সহ্য করতে হল তার মূল্য তিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল আত্মহত্যার। কেননা যে তার অন্তরঙ্গজন সেই সঙ্গিনীও নাকি তিরস্কার করল। হঠাৎ তার বোধগম্য হয় কেন সে আত্মহত্যা করবে? অনেক বছর আগে পেছনের সেই কলেজ জীবনের দিকে সে ফিরে তাকায়। কি থেকে কি হল? সারাজীবন সে কিসের ধ্যানে মগ্ন ছিল যার পরিণতি আজকের এই দূরাবস্থা। আত্মীয় স্বজন কাছের কিন্তু আবার অনেক দূরের। বিয়ে করার আগেই সঙ্গিনীর প্রতি যে গভীর ধ্যানে সে আচ্ছন্ন ছিল তার পরিণতি অবৈধ যৌনসঙ্গের ফলে দায়বদ্ধতা চিরস্থায়ী বৈবাহিক জীবনের রূপকার। ঠিক কিরকম ধ্যানের ফলে ছোটনের জীবন আজ একটু অন্যরকম হতে পারত? এ প্রশ্নের উত্তর এ প্রতিবেদনের সমাপ্তি দিকে দেয়া হবে। তবে তার আগে বৈদিক প্রেক্ষাপটে থেকে ছোটনের সামগ্রিক জীবনের ধ্যানগুলোকে বিশ্লেষণ করা যাক।
ধর্ম (জাগতিক তথাকথিত ধর্ম), অর্থ (অর্থনৈতিক অর্জন), কাম (ইন্দ্রিয় তৃপ্তি)এবং মোক্ষ (মুক্তির সংগ্রাম) এ সব ছোটনের ধ্যানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক জড়িত ছিল। সাধারণত একজন ব্যক্তি দেহাত্মবুদ্ধির ফলে ভগবানের চিন্তা করে জাগতিক আনুকূল্য পাওয়ার উদ্দেশ্যেই, অর্থনৈতিক আনুকূল্য পাওয়া ছিল তার জন্য তখন গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গীনির সাথে জড়িত হওয়ার ফলে ইন্দ্রিয় তৃপ্তির বাসনা তার আরেকটি প্রধান ধ্যান হয়ে উঠে এবং সময়ে সময়ে তার ধ্যানেও বিষয় ছিল এ সব কিছু ছেড়ে যদি মুক্তি পেতাম। ছোটন শেষের দিকে মুক্তি বলতে বেছে নিয়েছে কিন্তু আত্মহত্যাকে। অবশ্যই, এটি বিস্ময়কর নয় যে একজন ব্যক্তি দেহগত চেতনার স্তরে মাঝে মাঝে চায় সবকিছু ছেয়ে দিযে মুক্ত হতে । কেনানা দেহ হল সমস্ত দুঃখদুর্দশার ভাণ্ডার। ভগবদ্‌গীতায় চার প্রকার দুঃখের কথা বলা হয়েছে। জন্ম, মৃত্যু, জরা (বার্ধক্য), ব্যাধি (রোগ) । দেহ গত স্তরে একজন ব্যক্তির কাছে সেগুলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে সূক্ষ্মভাবে আবার মাঝে ভয়ানকরূপে প্রকাশিত হয়। ছোটন তার প্রথমদিকে বাবা-মায়ের বার্ধক্য এবং পরে তাদের সাধে তার একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে সে বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়েন। সে নিজেও বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল। আরো তিনটি দুঃখ এর সঙ্গে জড়িত। সেগুলো হল আধাত্মিক (মন এবং শরীর থেকে প্রদত্ত দুঃখ) এবং আদিদৈবিক (প্রকৃতি প্রদত্ত দুঃখ) ছোটন অন্য সবার মত অন্যদের কাছ থেকে দুঃখদূর্দশা ভোগ করেছিল।আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবরাও এখন তার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছে। যার ফলে মানসিক এবং শারীরিকভাবে সে চরম যন্ত্রণা ভোগ করছে। তার উপরে কখনো চরম শীত ও গ্রীস্মের ফলে শারীরিকভাবে ভোগ করছে প্রকৃতি প্রদত্ত রোগব্যাধির।
এক্ষেত্রে জড়জগতের তথাকথিত কিছু ধ্যান পদ্ধতি লোকেদেরকে আশ্বাস দিচ্ছে যে কিভাবে এ দুঃখদুর্দশাগুলোর মধ্য থেকেও বেঁচে থাকা যায়। তারা এগুলোর সমাধানের পথ বের করার চেষ্টায় খানিকটা সফল হতেও পারে কিন্তু পরক্ষণেই নতুন আরেকটি সমস্যা এসে আবারও দুর্দশাগ্রস্থ করে তোলে। এক্ষেত্রে তারা সমস্যার মূল উৎসের চিরতরে নির্মূল করতে অক্ষম। আর যতটুকুও সফল হওয়া যায় তাও অস্থায়ী এবং মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এর কোন চিহৃই থাকে না। (চলবে….)
[আগামী সংখ্যায় ছোটনের ধ্যানের বিষয়বস্তুর কিভাবে পরিবর্তন করা যায় সে বিষয়ে আলোকপাত করা হবে। আর এজন্যে ছোটনের সমস্যার কি অপূর্ব সমাধান হয়েছিল তা জানা যাবে।] হরেকৃষ্ণ!

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ মে ২০১২ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here